

ইতিহাস কখনো কখনো নিঃশব্দে এগোয়। আবার কখনো একটি মৃত্যু তাকে হঠাৎ জাগিয়ে তোলে। ওসমান হাদির মৃত্যু ঠিক তেমনই একটি মর্মান্তিক ঘটনা। হাদির চলে যাওয়া শুধু একজন মানুষের প্রস্থান নয়, বরং একটি আদর্শের পুনরুত্থান। বলা যায়, হাদির মৃত্যুর মধ্য দিয়ে ফিরে এসেছে বর্ষা বিপ্লবের আদর্শ। নতুন করে উজ্জীবিত হয়েছে সেই বিপ্লবী চেতনা, যা একসময় সমাজকে বদলে দেওয়ার স্বপ্ন দেখিয়েছিল।
স্বাপ্নিক যুবাপুরুষ ওসমান হাদিদের মৃত্যু নেই। ওরা আসে, দলে দলে আসে। সময়ের প্রয়োজনে ওরা শাসক শ্রেণির মুখোমুখি হয়। মৃত্যুভয়কে উপেক্ষা করে স্বৈরাচারের বুলেটের সামনে বুক চিতিয়ে দাঁড়ায়। ফ্যাসিবাদের তখতে তাউস জ্বালিয়ে পুড়িয়ে ছারখার করে দেয়। ওসমান হাদিদের প্রতিবাদ ও আত্মত্যাগ আমরা প্রত্যক্ষ করেছি বায়ান্নের ভাষা আন্দোলনে, ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থানে, একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে, নব্বইয়ের স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে এবং চব্বিশের বর্ষা বিপ্লবে। আমরা হাদিদের দেখেছি কিউবার রাজধানী হাভানার রাস্তায়, চীনের তিয়েনানমেন স্কয়ারে, ভিয়েতনামের সায়গনে, তিউনিশিয়ার রাস্তায় আর মিশরের তাহরির স্কয়ারে। যুগে যুগে সব দেশে, সব কালে ওসমান হাদিরাই বিপ্লবের নেতৃত্ব দিয়েছে।
বর্ষা বিপ্লবের সম্মুখ সারির যোদ্ধা ছিলেন আমাদের ওসমান হাদি। তার কোনো ব্যক্তিগত চাওয়া ছিল না। আকাঙ্ক্ষা ছিল একটি ইনসাফভিত্তিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার। যেখানে রাষ্ট্র মানুষকে গুম ও খুন করবে না। প্রতিটি মানুষের অধিকার ও সুযোগের সাম্য প্রতিষ্ঠিত হবে। নিশ্চিত হবে মানুষের বাক ও চিন্তার স্বাধীনতা। রাষ্ট্রের সব স্তরে জনপ্রতিনিধিদের শাসন প্রতিষ্ঠিত হবে।
জুলাই বিপ্লব কেবল একটি রাজনৈতিক ঘটনা ছিল না। এটি ছিল অন্যায়, দমন-পীড়ন ও ভয়ের সংস্কৃতির বিরুদ্ধে মানুষের সম্মিলিত প্রতিবাদ। এই বিপ্লব মানুষের মধ্যে সাহস জাগিয়েছে, নাগরিক অধিকার ও মর্যাদার প্রশ্নকে সামনে নিয়ে এসেছে। কিন্তু সময়ের প্রবাহে, ক্ষমতার কৌশল ও স্বার্থের রাজনীতিতে সেই আদর্শ ধীরে ধীরে বিবর্ণ হয়। বিপ্লবের ভাষা টিকে থাকলেও তার আত্মা ক্ষয়প্রাপ্ত হতে থাকে। দূর থেকে ভেসে আসতে শুরু করে হায়েনার হাসি, আর পিশাচের গর্জন। আর সেই গর্জনের শব্দ শুনে আদিম গুহা মানবের মতো সজাগ হতে শুরু করে দোসরের দল।
এই প্রেক্ষাপটে হাদির মৃত্যু এক গভীর নাড়া দিয়ে যায়। তিনি ছিলেন সেই প্রজন্মের প্রতিনিধি, যারা নীরবতা ভাঙতে চেয়েছিল, ভয়ের দেয়াল অতিক্রম করতে চেয়েছিল। তার মৃত্যু যেন সমাজকে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়ে দেয়—কেন এখনো ন্যায়বিচার অধরা, কেন এখনো সত্য বলার মূল্য দিতে হয় জীবন দিয়ে? এ প্রশ্নগুলোই মানুষকে আবার ফিরিয়ে নিয়ে যায় জুলাই বিপ্লবের মূল দর্শনের কাছে।
হাদির মৃত্যুর পর যে প্রতিক্রিয়া দেখা যায়, তা নিছক আবেগপ্রবণ শোক নয়; বরং তা এক ধরনের রাজনৈতিক ও নৈতিক পুনর্জাগরণ। রাজপথ, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও নাগরিক আলোচনায় আবার উচ্চারিত হচ্ছে জুলাই বিপ্লবের স্লোগান, দাবি ও স্বপ্ন। মানুষ নতুন করে উপলব্ধি করছে যে, বিপ্লব মানে শুধু ক্ষমতার পরিবর্তন নয়। বরং ন্যায়ভিত্তিক সমাজ প্রতিষ্ঠার দীর্ঘ সংগ্রাম।
হাদির মৃত্যু কোনো সমাপ্তি নয়; এটি একটি নতুন সূচনা। তার রক্তে রঞ্জিত বাস্তবতা মানুষকে স্মরণ করিয়ে দিয়েছে, আদর্শ কখনো মরে না। বিপ্লবের চেতনা কখনো কখনো শহীদের কাঁধে ভর করে ফিরে আসে। জুলাই বিপ্লবও তেমনই এক আদর্শ, যা হাদির মৃত্যুর মধ্য দিয়ে নতুন করে উজ্জীবিত হয়েছে, আরও গভীর, আরও দৃঢ় হয়ে।
ওসমান হাদি ছিলেন ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র। ইনকিলাব জিন্দাবাদ একটি স্লোগান, একটি ইতিহাস, একটি চেতনা। কিছু শব্দ আছে—তা কেবল শব্দ থাকে না। সময়ের বুক চিরে ইতিহাস হয়ে ওঠে। ‘ইনকিলাব জিন্দাবাদ’ তেমনই একটি বাক্য। এ বাক্যটি মূলত উর্দু-ফার্সি ভাষাগত ঐতিহ্য থেকে এসেছে। ইনকিলাব ফার্সি-আরবি উৎস থেকে আসা শব্দ, অর্থ আমূল পরিবর্তন, উলট-পালট, বিপ্লব। আর জিন্দাবাদ অর্থ চিরজীবী হোক, জয় হোক, দীর্ঘজীবী হোক। সরাসরি অর্থ দাঁড়ায় ‘বিপ্লব চিরজীবী হোক’। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের জাতি ধর্ম নির্বিশেষ আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে অধিকার আদায়ের স্লোগান হিসেবে উচ্চারিত হয়েছে ইনকিলাব জিন্দাবাদ। এ স্লোগানকে যারা সাম্প্রদায়িকতার রঙে রাঙাতে চান তাদের জানা প্রয়োজন, আমাদের উপমহাদেশে এ স্লোগানটি রাজনৈতিকভাবে জনপ্রিয় হয় ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনে। বিশেষভাবে এটি জড়িয়ে আছে ভগৎ সিং, চন্দ্রশেখর আজাদ এবং হিন্দুস্তান সোশ্যালিস্ট রিপাবলিকান অ্যাসোসিয়েশনের সঙ্গে। ভগৎ সিংয়ের কণ্ঠে ‘ইনকিলাব জিন্দাবাদ’ শুধু ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে ছিল না। এটা ছিল শোষণ, বৈষম্য ও ভয়ের বিরুদ্ধে একটি ঘোষণা। ফাঁসির মঞ্চেও তিনি এ স্লোগান উচ্চারণ করেছিলেন। এ স্লোগান কখনোই কেবল ক্ষমতা বদলের ডাক নয়। এটি আমাদের মনে করিয়ে দেয় শাসক বদলালেই বিপ্লব হয় না। কাঠামো না বদলালে মুক্তি আসে না। অন্যায় টিকে থাকলে বিপ্লব অসম্পূর্ণ থাকে। এ স্লোগান তাই রাজনৈতিক স্বাধীনতার পাশাপাশি সামাজিক ও অর্থনৈতিক ন্যায়ের দাবি বহন করে।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি নির্মম কিন্তু শক্তিশালী সত্য বারবার প্রমাণিত হয়েছে যে, কিছু মৃত্যু আন্দোলন থামায়নি, বরং আন্দোলনকে অপ্রতিরোধ্য করেছে। এ মৃত্যুগুলো ব্যক্তিগত ট্র্যাজেডি ছিল; কিন্তু সমষ্টিগতভাবে সেগুলো জাতির চেতনাকে নাড়িয়ে দিয়েছে। বাংলাদেশের ইতিহাস আমাদের শেখায়—কিছু মানুষ মৃত্যুর পরও নেতৃত্ব দেন। কিছু মৃত্যু আন্দোলনের সমাপ্তি নয়, সূচনা। এই শহীদরা তাই কেবল অতীতের স্মৃতি নন, তারা আমাদের অনিশেষ প্রেরণার উৎস।
তারা আধিপত্যবাদ এবং ভয়ের সংস্কৃতির কবর রচনা করেছেন। অধিপত্যবাদীরা শুধু বন্দুক, আইন কিংবা কারাগারের মাধ্যমে শাসন করে না। তারা শাসন করে মানুষকে ‘ভয়’ দেখানো মাধ্যমে। এ ভয় কোনো আকস্মিক আতঙ্ক নয়; এটি পরিকল্পিত, প্রাতিষ্ঠানিক ও সাংস্কৃতিক। ফ্যাসিবাদের প্রথম কাজ হলো মানুষকে কথা বলতে বাধ্য করা। আর কথা বলার ধরনটিও ঠিক করে দেওয়া। এজন্য তারা একটি ‘ভয়ের সংস্কৃতি’ চালু করে। যেখানে সবাইকে কথা বলতে হবে; কিন্তু নিজের ভাষায় নয়, রাষ্ট্রের নির্ধারিত ভাষায়। কথা বলাও অপরাধ, না বলাও অপরাধ। ফ্যাসিবাদী শাসনে কথা বললে বিপদ; কিন্তু নীরব থাকলেও নিরাপত্তা নেই। কারণ নীরবতা প্রশ্ন তৈরি করে, আর প্রশ্নই ফ্যাসিবাদের সবচেয়ে বড় শত্রু। যে চুপ থাকে সে অনুগত নয়, এ সন্দেহ ফ্যাসিবাদী ক্ষমতার মজ্জায় ঢুকে থাকে। তাই তারা চায় প্রশংসার স্লোগান, আনুগত্যের বিবৃতি, বাধ্যতামূলক উল্লাস। আর উল্লাস না করলে সন্দেহ, সন্দেহ মানেই শাস্তি। এই ভয়ের সংস্কৃতিতে সবাই কথা বলে; কিন্তু কেউ সত্য বলে না। এখানে সংবাদ আছে; কিন্তু তথ্য নেই। আলোচনা আছে; কিন্তু বিতর্ক নেই। গণমাধ্যম তখন আর চতুর্থ স্তম্ভ থাকে না, সে হয়ে ওঠে একটি প্রচারমাধ্যম। রাষ্ট্র যা বলে গণমাধ্যম তা অতি আন্তরিকতার সঙ্গে প্রকাশ করে। আর জনগণ শুধু শোনে, অথবা শোনার ভান করে।
ফ্যাসিস্টরা নীরবতাকে ভয় পায়, কারণ নীরবতা ও নৈশব্দেরও ভাষা আছে। নীরব মানুষ নিয়ন্ত্রণের বাইরে। সে হাততালি দেয় না, সে স্লোগানে গলা মেলায় না, সে ‘জয়ধ্বনি’ তোলে না। নীরবতা মানে সম্মতি নয়, আত্মসমর্পণ নয়, কখনো কখনো প্রতিবাদের প্রস্তুতি। ফ্যাসিবাদ জানে ইতিহাসের বড় বিস্ফোরণগুলো এসেছে দীর্ঘ নীরবতার পর। ভয় টিকিয়ে রাখার যন্ত্রপাতি এই ভয়ের সংস্কৃতি টিকিয়ে রাখতে ব্যবহার হয় নজরদারি, মামলা, নিপীড়ন, হত্যা ও গুম। আয়নাঘরে প্রতিবাদকারীদের শাস্তি দেওয়া হয় হাজার জনকে ভয় দেখানোর জন্য; কিন্তু মানুষের নীরবতা ও ভয়েরও একটি সীমা আছে। ফ্যাসিবাদ ভুলে যায়, ভয় দীর্ঘদিন জমে থাকলে একসময় তা সাহসে রূপ নেয়। যখন মানুষ বুঝে ফেলে কথা বললেও বিপদ, চুপ থাকলেও বিপদ, তখন আর হারানোর কিছু থাকে না। সে মুহূর্তেই ভয়ের সংস্কৃতি ভাঙতে শুরু করে। বাংলাদেশে ফ্যাসিবাদের ভয়ের দেয়াল ভেঙে দিয়েছেন ওসমান হাদিরা। যে দেয়াল ভাঙা সহজ ছিল না। তাতে হাত রাখলেই রক্ত ঝরেছে। তবু কেউ কেউ হাত রেখেছে। ওসমান হাদিরা ছিলেন সেই হাত। তারা ভেঙে দিয়েছেন দুর্ভেদ্য ভয়ের দেয়াল। সেই ভাঙনের শব্দ আর থামানো যাবে না।
লেখক: সাংবাদিক ও গবেষক