

১৭ বছরের নির্বাসিত জীবন শেষে দেশে ফিরে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান যে বক্তব্য দিয়েছেন, তা বিদ্যমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা। ‘উই হ্যাভ আ প্ল্যান ফর দ্য পিপল, ফর দ্য কান্ট্রি’—এ বাক্যটি এখন শুধু একটি ইংরেজি বাক্য নয়। এ বাক্যটি এ দেশের মানুষের প্রত্যাশার দরজা খুলে দিয়েছে। কিন্তু একই সঙ্গে এ বক্তব্য বাস্তবায়নের প্রশ্নে বহু চ্যালেঞ্জ ও দায়বদ্ধতাও সামনে এনেছে।
তারেক রহমানের বক্তব্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য দিক হলো, তিনি ব্যক্তিগত উচ্চাকাঙ্ক্ষার বদলে সম্মিলিত প্রয়াসের কথা বলেছেন। ‘আই হ্যাভ আ প্ল্যান’ থেকে ‘উই হ্যাভ আ প্ল্যান’-এ উত্তরণ রাজনীতিতে একটি তাৎপর্যপূর্ণ বার্তা বহন করে। এতে বোঝা যায়, তিনি দেশ পরিচালনাকে একক নেতৃত্বের বিষয় হিসেবে দেখছেন না। জনগণকে সঙ্গে নিয়েই পরিবর্তনের কথা বলছেন। এটি গণতান্ত্রিক রাজনীতির জন্য ইতিবাচক ইঙ্গিত। তবে বাস্তবতা হলো, তিনি যে ‘প্ল্যান’-এর কথা বলেছেন, তার কোনো নির্দিষ্ট রূপরেখা এখনো জনগণের সামনে স্পষ্ট হয়নি। ফলে এ নিয়ে দেশ-বিদেশে এবং বিভিন্ন রাজনৈতিক মহলে শুরু হয়েছে জোর আলোচনা। পাশাপাশি এটাকে অনেকেই একটি চমক হিসেবে দেখছেন। রাজনৈতিক নেতৃত্বের বক্তব্যে আবেগ ও অনুপ্রেরণা যেমন জরুরি, তেমনি সুনির্দিষ্ট দিকনির্দেশনাও অপরিহার্য। সবারই প্রত্যাশা শিগগিরই তারেক রহমান তার পরিকল্পনার লক্ষ্য, সময়সীমা, অর্থনৈতিক কাঠামো বা বাস্তবায়নের কৌশল সম্পর্কে বিস্তারিত জানাবেন।
বক্তব্যে তারেক রহমান দেশের সব শ্রেণি-পেশার মানুষের কথা তুলে ধরেছেন। নারী, তরুণ, শিশু, প্রতিবন্ধী, কৃষক ও শ্রমিকের আশা-আকাঙ্ক্ষা ও প্রত্যাশার কথা বলেছেন। এটি একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক রাষ্ট্র গঠনের প্রত্যাশার প্রতিফলন। বিশেষ করে নিরাপত্তা ও শান্তি-শৃঙ্খলা বজায় রাখার ওপর গুরুত্বারোপ বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। ধর্ম-বর্ণ-রাজনৈতিক পরিচয়ের ঊর্ধ্বে উঠে মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার অঙ্গীকার রাজনৈতিক শিষ্টাচারের একটি দায়িত্বশীল বার্তা।
তিনি তার বক্তব্যে বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংগ্রামের বিভিন্ন অধ্যায় দৃঢ়ভাবে তুলে ধরেছেন। একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ, পঁচাত্তরের সিপাহি-জনতার অভ্যুত্থান, নব্বইয়ের গণআন্দোলন এবং চব্বিশের ফ্যাসিবাদবিরোধী অভ্যুত্থান তথা বর্ষা বিপ্লবের প্রসঙ্গ টেনে তিনি যে ধারাবাহিকতার কথা বলেছেন, তাকে এগিয়ে নিতে পারলে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের পাতায় বিএনপির অবস্থান আরও দৃঢ় হবে। বিশেষত, তরুণ প্রজন্মের আত্মত্যাগের কথা উল্লেখ করে তাদের নেতৃত্বে এগিয়ে যাওয়ার আহ্বান বাংলাদেশের বিদ্যমান রাজনৈতিক ধারাবাহিকতার বিপরীতে বাঁকবদলের ইঙ্গিত।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, তারেক রহমান সরাসরি জাতীয় নির্বাচন নিয়ে কিছু না বললেও গণতান্ত্রিক অধিকার ফিরে পাওয়ার কথা বলেছেন। এটি ইঙ্গিত দেয় যে, বিএনপির রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে এখন গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার দাবি রয়েছে। তবে এ দাবিকে কার্যকর করতে হলে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে গণতান্ত্রিক চর্চা ও সহনশীলতা বাড়ানো জরুরি।
সবশেষে বলা যায়, তারেক রহমানের এ বক্তব্য আশা জাগায়, কিন্তু সেই আশাকে এগিয়ে নিতে হলে দেশের মধ্যে শান্তি ও স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে হবে। ‘উই হ্যাভ আ প্ল্যান’ তখনই জনগণের আস্থায় পরিণত হবে, যখন সেই পরিকল্পনার স্পষ্ট রূপরেখা, বাস্তবায়নের পথ এবং জবাবদিহির কাঠামো দৃশ্যমান হবে। বাংলাদেশের মানুষ শুধু প্রতিশ্রুতি নয়, বাস্তব পরিবর্তন দেখতে চায়। সেই পরীক্ষাই এখন সামনে।