

বেগম খালেদা জিয়ার মৃত্যু এমন এক সময়ে হলো যখন দেশ গণতন্ত্রের নতুন অধ্যায়ে প্রবেশে উন্মুখ। তিনি হতে পারতেন সে অভিযাত্রার একজন মহাসারথি। তার এ প্রয়াণ ভবিষ্যতের বাংলাদেশের জন্য বিরাট এক শূন্যতা তৈরি করেছে। যে কোনো ব্যক্তির দায় ও দায়িত্ব, জীবন ও কর্ম অন্য আরেকজনের মাধ্যমে মেটানো যায়। কারণ, বাংলা ব্যাকরণে সে বিধান দেওয়াই আছে! বিশেষ্যের কাজ বিশেষ্য দিয়ে সহজে পূরণ হয়ে যায়। কিন্তু যিনি আপাদমস্তক ‘সর্বনাম’ তার জীবনের রিপ্লেসমেন্ট, কর্মের প্রযোজনা অন্য কাউকে দিয়ে পূর্ণ করা সম্ভব নয়। বুঝিয়ে বলছি! বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের চেয়ারপারসনের পদটি বেগম জিয়ারই উত্তরসূরি দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানকে দিয়ে এতদিন চলেছে, যেমন এখন আরও সুচারুরূপেও চলা সম্ভব। কিন্তু ত্যাগে-স্থৈর্যে-গাম্ভীর্যে বেগম জিয়া এ পদের যে প্রোজ্জ্বল মহিমা সৃষ্টি করে গেছেন, তার সমান্তরাল ভাবমূর্তি সৃজন কি সম্ভব? আমাদের স্থির প্রতীতি, যুগ-যুগান্তরের ইতিহাসে এরূপ সম্মোহনী শক্তি, সৌরভের দীপ্তি, সুষমার ব্যাপ্তি এক আধজনের জীবনে ও কর্মে প্রতিভাত হয়। অন্যরা শুধু পদের রুটিন কর্তব্য সমাপনান্তে দেহান্তরিত হন। কেন বেগম জিয়াকে আলাদা করে দেখা? সেটা তার শুধু বিশেষ্যের চৌহদ্দিতে সীমাবদ্ধ না থেকে ‘সর্বনাম’ হওয়ার মধ্যে নিহিত। তার বিপুল জীবনের বিস্তীর্ণ ক্যানভাসে আশ্রয় পেয়েছে বদ্বীপ বাংলার লাখ লাখ মানুষের প্রাণের পরম্পরা। অধিকার প্রার্থীর দস্তখত, ভোট দেওয়া নিযুত মানুষের নিঃসীম ভালোবাসা, বিপন্ন গণতন্ত্রের জন্য লড়াইরত যোদ্ধার সুগ্রথিত পদক্ষেপ, ভদ্রজনোচিত রাজনৈতিক কর্মীর সাধুতা, আধিপত্যবাদের নির্মমতার রুদ্ররোষে ঝুলতে থাকা সীমান্তকন্যা ফেলানীর বিস্রস্ত বয়ন একই সঙ্গে খুঁজে পাবেন এক বেগম জিয়ায়।
চিন্তাবিদ মোতাহের হোসেন চৌধুরী লিখেছেন, ‘রাষ্ট্র সমাজের দেহ, আত্মা নয়। আত্মা ব্যক্তি। ব্যক্তি মানে সকল মানুষ নয়, কতিপয় ব্যক্তি—যাঁরা প্রতিভা ও সাধনার বলে নিজেদের সুমানসিকতার প্রতীক করে তুলতে পেরেছেন তাঁরা। তাঁদেরই মনের রঙে সমাজ-মন অনুরঞ্জিত হয়, সূর্যের রঙে যেমন অনুরঞ্জিত হয় মেঘ।’ যদি প্রাণযোগ করে মোতাহের পড়তে পারেন, তবে এখানে ‘সুমানসিকতার প্রতীক’ কথাটার সঙ্গে সর্বনাম বেগম খালেদা জিয়াকে সহজে রিলেট করতে পারবেন। ব্যক্তির ‘প্রতিভা ও সাধনা’ কথাটায় জোর দিলে প্রতিভা নিয়ে বিতর্ক করতে পারবেন কিন্তু বেগম জিয়া যে অতুল সাধনায় অতল সিদ্ধি অর্জন করেছিলেন, সেটা নিশ্চয়ই মেনে নেবেন। আমরা ‘প্রতিভা’কে রোল নম্বর বা জিপিএ অথবা একাডেমিক কাগজ মনে না করলে খালেদা জিয়ার ‘রাজনৈতিক প্রতিভা’ নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করতে পারি না। ৪৫ বছর ধরে দেশের সবচেয়ে বড় দলগুলোর একটিকে একাট্টা করে রাখার রাজনৈতিক দূরদর্শিতাকে মেধার স্বাক্ষর বা প্রথিভার ফলন হিসেবে গ্রাহ্য করতেই হবে। সংকটের বিস্তীর্ণ পথে হেঁটেও তিনি ছিলেন আলোচনার শীর্ষে। ক্ষমতায় যখন থেকেছেন অথবা ক্ষমতা বলয়ের অনেক দূরেও যখন ছিলেন তার ওজস্বিতা এতটুকু ম্লান হয়নি। এ যে রুধির ধারার মতন প্রবহমানতার শক্তি, একেই বলছি ‘আত্মা-সমাজের আত্মা হয়ে ওঠা’। প্রতিপক্ষের সব অপচেষ্টার বিপরীতে তার ‘নীরবতার মুখরতার’ যে সৌন্দর্য জাতি দেখেছে সেটাই তাকে করেছে অনন্য-অতুলনীয়া। সুরুচি সুসার ও সুকৃতির যে ধারায় তিনি নিজেকে সম্পৃক্ত করে নতুন পন্থায় চলেছেন আমৃত্যু, সেটা আগামীর বাংলাদেশকে প্রভাবিত করবে। কোনো কারণে সে ধারার ব্যত্যয় ঘটলে তার সৃষ্ট ‘সমাজ আত্মায়’ টান লাগবে। তার পরিবার দল ও দেশকে সে ধারার প্রতি অকুণ্ঠ সমর্থন অব্যাহত রাখতে হবে।
বেগম খালেদা জিয়ায় মিশে আছে এ দেশের মানুষের অফুরান আবেগ, উচ্ছ্বসিত হৃদয়ের উষ্ণীষ। তিনি যখন পরলোকগমন করলেন তখন দেশে এমন এক অরাজনৈতিক সরকার বিরাজ করছে যেটা তার প্রস্থান মূল্যায়নে দারুণ ইতিবাচক। জাতীয় পতাকা অর্ধনমিত থেকে জাতির সেরা পতাকাবাহীর প্রতি যে সম্মান প্রদর্শিত হচ্ছে, সেটা তার দীর্ঘ কর্মজীবনের শ্রেষ্ঠ প্রাপ্তি। শোকাচ্ছন্ন জাতির সঙ্গে সরকারের সম্পৃক্তিই প্রমাণ করে তার অবস্থান ও অবদান তর্কের ঊর্ধ্বে না হলেও উদাহরণতুল্য। নারীর ক্ষমতায়ন, প্রান্তিকে শিক্ষাবিস্তার, পরমতসহিষ্ণুতা, গণতন্ত্রের জন্য লড়াই এবং স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে অনাপস ভাবমূর্তি নিয়ে তিনি হয়ে উঠেছিলেন সর্বজনের অভিভাবক। জীবনের শেষ প্রান্তে দাঁড়িয়ে উদারতা ও মহানুভবতার যে দীক্ষা তিনি দলের মধ্যে সঞ্চারিত করেছেন, তার তুলনা ক্লেদযুক্ত উপমহাদেশের রাজনীতিতে বিরল। বিশেষত, তার জীবনসংহারী ষড়যন্ত্রের যুক্ত লোকেদের জন্য কোনো বাক্য ব্যয় না করার যে পরিমিতিবোধ, সেটা যুগে যুগে রাজনীতিবিদদের জন্য ‘উত্তম উপদেশ’ হিসেবে পরিগণিত হবে বলে আমরা মনে করি।
দেশের বিপুল মানুষের সুতীব্র আকাঙ্ক্ষার সার্বভৌমত্ব সত্তার উচ্চতর ‘আইকনিক ফিগার’ ছিলেন বেগম জিয়া। দলমত-নির্বিশেষে মানুষের মধ্যে যে আধিপত্যবাদবিরোধী মনোভাব বিরাজিত, তিনি ছিলেন তার শীর্ষব্যক্তিত্ব। আমরা, মানে কক্সবাজারের করিম, ফেঞ্চুগঞ্জের ফয়সাল, বড়াইমারির বড়াল বাড়ৈ বা গুলশানের ব্যস্ত রেস্তোরাঁর ম্যানেজার কাফি শাহরিয়ারের যে সার্বভৌম বাংলাদেশের স্বপ্ন তার সম্মিলিত নাম বা সর্বপ্রকার নামের সমাহার হলেন আপসহীন দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া। তার অন্যসব সত্তাকে ছাড়িয়ে তিনি এ উজ্জ্বল সত্তায় বেঁচে থাকবেন কোটি মানুষের হৃদয়ে... যুগের পর যুগ।
লেখক: প্রাবন্ধিক, কলেজ শিক্ষক