

সবকিছু পরিকল্পনা মোতাবেক এগিয়ে গেলে আসছে ১২ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশের ১৩তম জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট অনুষ্ঠিত হবে বলে প্রত্যাশিত। ঠিক সাত বছর আগে অর্থাৎ, ২০১৯ সালের ফেব্রুয়ারি ও মার্চ মাসে পশ্চিম আফ্রিকার দেশ নাইজেরিয়ায় ষষ্ঠ সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। এ নির্বাচনের আগে একের পর এক ভয়াবহ রক্তপাতের ঘটনা ঘটতে থাকে। মুসলমান ও খ্রিষ্টানদের মধ্যকার পুরোনো শত্রুতা এবং উভয়পক্ষের হতাহতের ধারাবাহিকতায় নাইজেরিয়ার কাজুরু অঞ্চলে ঘটে যাওয়া সংঘাতে এ সময় ১৪১ জনের প্রাণহানি ঘটে। আহত হয় কয়েকশ সাধারণ মানুষ। খ্রিষ্টান সম্প্রদায়ের ১১ জন সদস্য সন্দেহভাজন ফুলানি গোত্রের বন্দুকধারীর গুলিতে মৃত্যুবরণ করে। এ ঘটনার জবাব দিতে আদারা নামক মিলিশিয়ারা ফুলানিদের বসতিতে আক্রমণ চালায়। আক্রমণের শিকার ফুলানিদের পক্ষে ‘মাইয়্যতি আল্লাহ’ নামক সংগঠন দাবি করে যে, সংঘর্ষের পর ৬৬ জন মুসলমানকে তারা কবর দিতে পেরেছে। আর বাকি ৬৬ জনের মৃত্যু হলেও তাদের দেহাবশেষ খুঁজে পাওয়া যায়নি।
২০০৭ সালের ২৭ ডিসেম্বরে অনুষ্ঠিত কেনিয়ার প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের ফল যায় ক্ষমতাসীন প্রেসিডেন্ট মুওয়াই কিবাকির বিপক্ষে। তবে তার বিরোধী দল অরেনফ ডেমোক্রেটিক পার্টি ও তার দলীয় নেতা রাইলা ওডিংগা এ ফল মেনে নিতে পারেননি। এর ফলে দেশব্যাপী সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ে। পরবর্তী এক মাসের মধ্যে এ সহিংসতায় ১ হাজার ৩০০ মানুষ প্রাণ হারায় ও ৬ লাখ গৃহহারা হয়।
১৯৯৭ সালে ইন্দোনেশিয়ার জাতীয় সংসদ নির্বাচন উপলক্ষে প্রচারণার শেষ দিনে (২৩ মে) জুমার নামাজের পর বিরোধী দল সরকারি দলের মিছিলে হামলা করে। এ থেকে সৃষ্ট দাঙ্গায় ১৩৭ জনের মৃত্যু ঘটে। এ ছাড়া উভয়পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষে ৪টি গির্জা, ১টি বৌদ্ধমন্দির, ২টি হোটেল, ২১টি গাড়ি, ১৩০টি বাড়িঘর ও ৪টি সরকারি অফিস ধ্বংস হয়।
১৯৯১ সালের ২৬ ডিসেম্বর আলজেরিয়ার জাতীয় সংসদের প্রথম দফা নির্বাচন হয়। এ নির্বাচনের প্রথম রাউন্ডে সরকারবিরোধী ইসলামী জোট এগিয়ে থাকে। দ্বিতীয় রাউন্ড নির্বাচনের জন্য নির্ধারিত তারিখ ছিল ১৯৯২ সালের ১৬ জানুয়ারি। কিন্তু দুই-তৃতীয়াংশ আসন পেয়ে ইসলামিক জোট সংবিধান বদল করে দেশে ইসলামী শাসন কায়েম করবে এমন আশঙ্কায় সেনাবাহিনী দ্বিতীয় দফা নির্বাচনের পাঁচ দিন আগে অর্থাৎ, ১১ জানুয়ারি অভ্যুত্থান ঘটায়। আর অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়েই ক্ষমতাসীন প্রেসিডেন্ট চাদলি ব্যান্ড জেডিডকে পদত্যাগ করতে বাধ্য করা হয় এবং নির্বাচন থেকে এনে উদারপন্থি মোহামেদ বাউদিয়াফকে ক্ষমতায় বসানো হয়। সেদিন থেকেই আলজেরিয়ায় গৃহযুদ্ধ শুরু হয়, যা চলে ৮ ফেব্রুয়ারি ২০২২ সাল পর্যন্ত। এ গৃহযুদ্ধে ন্যূনতম ৪৪ হাজার থেকে ২ লাখ পর্যন্ত মানুষ প্রাণ হারায় বলে বিভিন্ন পরিসংখ্যানে তথ্য প্রকাশিত হয়। এ যুদ্ধকে তাই ‘নোংরা যুদ্ধ’ বা ‘ডার্টি ওয়ার’ বলা হয়।
পাকিস্তানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও পাকিস্তান পিপলস পার্টির তৎকালীন প্রধান বেনজির ভুট্টো ২০০৮ সালের জানুয়ারিতে অনুষ্ঠিতব্য নির্বাচনের আগে ২৭ অক্টোবর ২০০৭ তারিখে নির্বাসন থেকে দেশে ফেরেন। ওইদিনই বিমানবন্দর থেকে নেমে বাসায় যাওয়ার মুহূর্তে করাচিতে প্রথমবারের মতো আক্রমণের শিকার হন এ নেত্রী। সেদিন আত্মঘাতী বোমা বিস্ফোরণের পর বেনজির ভুট্টো অক্ষত থাকলেও মৃত্যু ঘটে ১৪৯ জনের আর আহত হয় ৪৫০ জন। ২৭ ডিসেম্বর ২০০৭ তারিখে নির্বাচন র্যালি শেষে ঘরে ফেরার সময় তাকে দ্বিতীয়বারের মতো আক্রমণ করা হয়। এ সময় প্রথমে তাকে গুলি করা হয় এবং পরে আত্মঘাতী বোমা বিস্ফোরণ ঘটানো হয়। ফলে বেনজির ভুট্টোসহ ২৪ জনের মৃত্যু ঘটে।
ফার্নান্দো এলকি বিয়াদেস ভিল ভিসেনক্লো ছিলেন ইকুয়েডরের সাংবাদিক, শ্রমিক নেতা ও রাজনীতিবিদ। ২০২৩ সালের ৯ আগস্ট নির্বাচনের জন্য প্রচারকালে গাড়িতে ওঠার পূর্বমুহূর্তে আততায়ীর হাতে গুলিবিদ্ধ হন তিনি। ওই সময় তিনি ছাড়া আরও দুজন পুলিশ সদস্য ও সাতজন বেসামরিক ব্যক্তির মৃত্যু ঘটে।
মধ্য আফ্রিকা এলাকার দেশ চাদের ষষ্ঠ প্রেসিডেন্ট ছিলেন এককালের সেনা কর্মকর্তা ও রাজনীতিবিদ ইদ্রিস ডেবাই। ২০২১ সালের ১১ এপ্রিল ষষ্ঠবারের মতো প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন তিনি। এর সাত দিন পর (১৮ এপ্রিল) নকৌ জেলার মেলে নামক গ্রামে একটি অনুষ্ঠান শেষে নিজ বাসভবনে ফেরার পথে সরকারি বাহিনী ও বিদ্রোহী সেনাদের মধ্যে গুলিবিনিময় চলাকালে ক্রসফায়ারে শিকার হন। এ সময় বুলেটের আঘাতে তিনি আহত হন এবং দুদিন পর মৃত্যুবরণ করেন। এরপর এ দেশে সেনা শাসন শুরু হয়।
২০২২ সালের ৪ থেকে ৮ জুলাই জাপানের হাউস অব কাউন্সিলস নির্বাচনে অংশ নেন এলডিপি পার্টির নেতা কেই সাতো। স্থানীয় এ নেতার সমর্থনে বক্তৃতা করার সময় গুলিবিদ্ধ হন জাপানের সবচেয়ে বেশি সময় ধরে (প্রায় ৯ বছর) প্রধানমন্ত্রী দায়িত্ব পালন করা রাজনীতিবিদ সিনজো অ্যাবে। টেট সুইয়া ইয়ামাগামি (৪১) নামক একজন ঘাতক অ্যাবের পেছন থেকে দুটি গুলি করে। এতে তিনি মারাত্মকভাবে আহত হন এবং হেলিকপ্টার করে হাসপাতালে যাওয়ার সময় অধিক রক্তক্ষরণে মৃত্যুবরণ করেন।
ভারতের দশম লোকসভা নির্বাচন হয় ১৯৯১ সালের ২০ মে থেকে ১৫ জুনের মধ্যে। ২১ মে তামিলনাড়ুর শ্রীপেরুমদুর এলাকায় কংগ্রেস দলের সভাপতি হিসেবে রাজীব গান্ধী নির্বাচনী প্রচারণায় নামেন। রাত সাড়ে ৮টায় বিশাখাপত্তমে প্রচারণা চালানোর পর তিনি অ্যামবাসাডর গাড়িতে পরবর্তী গন্তব্যে যাত্রা করেন। রাত ১০টা ১০ মিনিটে নির্বাচন প্রচারণা মঞ্চে ওঠার সময় রাজীব গান্ধীর পা ছুঁয়ে সালামের ভান করেন ঘাতক কালাইভানি রাজারত্ন। তার পোশাকের নিচে লুকানো ছিল বিস্ফোরকভর্তি জ্যাকেট, যা তাৎক্ষণিকভাবে বিস্ফোরিত হলে মৃত্যু ঘটে ঘাতকসহ রাজীব গান্ধী ও তার ১৩ জন সহযোগীর।
বাংলাদেশের মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাধ বিজ্ঞান বিভাগের একদল শিক্ষক ও গবেষক ‘পার্লামেন্টারি ইলেকশন অ্যান্ড পলিটিক্যাল ভায়োলেন্স ইন বাংলাদেশ’ শীর্ষক একটি গবেষণা করেছেন, যা ইন্টারনেটে পাওয়া যায়। এ গবেষণা পত্রের ৮৩, ৮৪ ও ৮৫ নম্বর পৃষ্ঠায় দেখা যায়—২০০৮ সালে অনুষ্ঠিত নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগের ছয় মাসে দুজন এবং পরের ছয় মাসে ১০ জন রাজনৈতিক সহিংসতায় প্রাণ হারান। আর ২০১৪ সালের দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগের ছয় মাসে ১০৮ এবং পরের ছয় মাসে ৩১ জন নিহত হন। এ গবেষণাপত্রের ৮৫ নম্বর পাতায় দুটি নির্বাচনে সম্পদের ক্ষতি, ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ ও লুটতরাজের যে বিবরণ উঠে এসেছে, তা রীতিমতো আতঙ্কজনক ও লজ্জাকর।
গবেষণা কিংবা সঠিক তথ্য-উপাত্তের স্বল্পতা থাকলেও এ কথা নির্দ্বিধায় বলা যায় যে, ১৯৭৩ সালের প্রথম এবং ২০২৪ সালের ১২তম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রতিটিতে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে। স্থানীয় সরকার নির্বাচন এমনকি ছাত্র সংসদ নির্বাচনের ইতিহাস ও সহিংসতা কালিমামুক্ত নয়। ভবিষ্যতে প্রতিরোধকল্পে এমন সহিংসতা নেপথ্যে কিছু সাধারণ বা কমন কারণ নিয়ে আলোচনা প্রয়োজন।
ব্যক্তিগত বীরত্ব বা ক্ষমতা প্রদর্শন মানুষের সহজাত প্রবৃত্তি। নির্বাচনের আগে প্রতিপক্ষকে হরহামেশা সামনে পাওয়া যায়। তাই বীরত্ব বা ক্ষমতা প্রদর্শনের প্রকৃতিগত উন্মাদনা সহিংসতা ক্ষেত্র তৈরি করে। একজন প্রার্থীর নিজের ক্ষমতা ও প্রতিপক্ষের দুর্বলতা অনেক ভোটারের কাছে প্রার্থীর যোগ্যতা যাচাইয়ের মানদণ্ড। তারা মনে করেন, তীব্র জেদ, বলিষ্ঠ কণ্ঠস্বরের অধিকারী, বাকপটু ও আক্রমণমুখী আচরণের অধিকারী নেতাই শুধু দাবি আদায় এবং এলাকার ভাগ্য উন্নয়নের জন্য সংসদে ও সংসদের বাইরে নানাভাবে কাজ করতে সক্ষম হবে। আর দুর্বল প্রার্থীকে আমলারা সাত-পাঁচ কিছু বুঝ দিয়ে ফিরিয়ে দেবেন। তাই অনেক প্রার্থী সন্ত্রাস ঘটিয়ে নিজের ক্ষমতা ও প্রতিপক্ষের দুর্বলতা প্রমাণের পথ অনুসরণ করে। বিশেষত মনোনয়নবঞ্চিত বিদ্রোহী প্রার্থীরা দলের হাইকমান্ডের সিদ্ধান্ত ভুল প্রমাণের জন্য দলের মনোনয়নপ্রাপ্তদের অফিস জনসভা ও নির্বাচন মিছিলে চরম আঘাত হানে।
নির্বাচনী সন্ত্রাসের নেপথ্যে আরও থাকে বৈষয়িক লাভের হাতছানি। সন্ত্রাস ও সহিংসতা সৃষ্টিকারীকে অতীতে বহু দল ও বহু প্রার্থী পদ-পদবি, চাঁদা তোলার সুযোগ, ইজারা, ঠিকাদারি, সরবরাহ, কমিশন ও এজেন্সির মতো আর্থিকভাবে লাভবান হওয়ার সুযোগ দিয়েছে এবং তাদের আইনের হাত থেকে সুরক্ষা দিয়েছে। প্রশাসনে বিশেষত থানা পর্যায়ে তাদের প্রভাব-প্রতিপত্তি অবৈধ আয়ের অনেক পথ সুগম করে দেয়। যার ফলে অনেকেই নির্বাচনের আগে পেশিশক্তি প্রমাণকে বিনিয়োগ হিসেবে গণ্য করে এবং বেপরোয়া হয়ে ওঠে।
একজন প্রার্থীর ভোটব্যাংক নামে নির্দিষ্ট এলাকায় তার প্রতিপক্ষের সন্ত্রাস ভোটারদের উপস্থিতি কমিয়ে দেয়। বিশেষত ভোটের দিন ভোটব্যাংক নামে পরিচিতি পাওয়া এলাকায় সন্ত্রাস ঘটিয়ে ভোটার উপস্থিতি কমানোর কুপ্রথা এ দেশকে কলঙ্কিত করেছে। বিশেষত সংখ্যালঘু অধ্যুষিত কেন্দ্রে এবং নারী ভোটারদের বুথের সামনে হামলা ঘটিয়ে তাদের ভোটবিমুখ করা এ দেশের একটি কালো অধ্যায়।
নির্বাচনকালে প্রশাসনের পক্ষে একই দিনে প্রয়োজনীয়সংখ্যক ম্যাজিস্ট্রেট কিংবা সেনা ও পুলিশ সদস্য মোতায়েন সম্ভব হয় না। তখন সন্ত্রাসে বিশ্বাসী শক্তিশালী বা দাঙ্গাবাজ প্রার্থী কিংবা তার দলের বিরুদ্ধে জীবন বাজি রেখে প্রতিরোধ বা প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তোলার অনেক কঠিন। কোনো কোনো প্রার্থী বা দল এমন দুর্বলতা কাজে লাগিয়ে এবং প্রশাসনকে ত্রাস বা ভয়ের মধ্যে রেখে উদ্দেশ্য সাধন করতে বেছে নেয় সন্ত্রাসের পঙ্কিল পথ। নির্বাচনী সন্ত্রাস দমনে স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা এবং পরিকল্পনা বাস্তবায়নের সক্ষমতা অর্জন অতি জরুরি। দেশের প্রচলিত আইন সন্ত্রাস দমনের জন্য যথেষ্ট। তবে তার প্রায়োগিক সাফল্য অতি নিম্নস্তরে। আসন্ন নির্বাচন জননিরাপত্তার ইতিহাসে নতুন মাইলফলক যুক্ত করুক, এটাই প্রত্যাশা।
লেখক: অবসরপ্রাপ্ত সেনা কর্মকর্তা, গবেষক, বিশ্লেষক ও কলামিস্ট
ইমেইল: [email protected]