

জামালের বয়স ৯ বছর। তার শরীর পক্ষাঘাতগ্রস্ত। সে সারাক্ষণ অনিয়ন্ত্রিত ও তীব্র খিঁচুনিতে ভোগে। এ খিঁচুনি এতটাই ভয়াবহ যে, সে ঘুমাতে পারে না, তার মাও ঘুমাতে পারেন না। খিঁচুনি নিয়ন্ত্রণে রাখতে একটি ওষুধ প্রয়োজন, যার নাম ব্যাকলোফেন। এ ওষুধ পেশি শিথিল করে এবং শরীরের কাঁপুনি থামায়। হঠাৎ করে ব্যাকলোফেন বন্ধ হয়ে গেলে মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকি দেখা দিতে পারে।
এক সপ্তাহ আগে গাজার আল-মাওয়াসি শরণার্থীশিবিরে থাকা পরিবারের তাঁবু থেকে জামালের মা, আমার চাচাতো বোন শাইমা আমাকে লিখেছিলেন। তখন তার ছেলের ওষুধ ছাড়া সপ্তম দিন চলছিল। তীব্র স্নায়বিক খিঁচুনি জামালের হাত-পা শক্ত করে ধরে ফেলে আর যন্ত্রণায় সে চিৎকার করে ওঠে।
গাজার কোথাও ব্যাকলোফেন পাওয়া যাচ্ছে না। না হাসপাতালে, না ক্লিনিকে, না স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের গুদামে, এমনকি রেড ক্রসের কাছেও নয়। শাইমা সব জায়গায় খোঁজ নিয়েছেন। এ ওষুধটি সেই অসংখ্য ওষুধের একটি, যেগুলো ইসরায়েল গাজায় প্রবেশ করতে দিচ্ছে না। এর সঙ্গে ব্যথানাশক ও অ্যান্টিবায়োটিকও আটকে রাখা হয়েছে।
এখন জামাল প্রতিদিন অসংখ্যবার খিঁচুনিতে আক্রান্ত হচ্ছে। এ রোগের জন্য অন্য কোনো ওষুধ নেই, কোনো বিকল্পও নেই। তার জন্য কোনো স্বস্তি নেই, আছে শুধু অসহ্য যন্ত্রণা। কিন্তু জামালের এই গল্প যেন বলা না হয়, সেটাই চান যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী মাইক পম্পেওর মতো মানুষরা। গত মাসে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক, ইসরায়েলকেন্দ্রিক মিরইয়াম ইনস্টিটিউটে বক্তব্য রাখতে গিয়ে পম্পেও বলেন, আমাদের নিশ্চিত করতে হবে যে, ইতিহাস সঠিকভাবে লেখা হয়, যেন ইতিহাসের বইয়ে গাজার ভুক্তভোগীদের কথা লেখা না হয়। এ কথায় উপস্থিত দর্শকরা করতালি দেয়।
পম্পেও আরও বলেন, প্রতিটি যুদ্ধে বেসামরিক মানুষের প্রাণহানি হয়, কিন্তু এ ক্ষেত্রে প্রকৃত ভুক্তভোগী নাকি ইসরায়েলের জনগণ। তার আশঙ্কা, ৭ অক্টোবরের ঘটনা এবং গাজায় যুদ্ধকে ভবিষ্যতে ‘ভুলভাবে’ মনে রাখা হবে। পম্পেও যেন বলতে চান, গাজার মানুষ ইসরায়েলের যুদ্ধে কেবল ‘পার্শ্বক্ষতি’। তাদের নাম থাকবে না, মুখ থাকবে না, স্মৃতিও থাকবে না। মানব ইতিহাসের পাতাগুলো থেকে তাদের গল্প মুছে ফেলাই তার ইচ্ছা।
তার এ বক্তব্য ইসরায়েলের গণহত্যার পরবর্তী ধাপকে প্রকাশ করে। গাজার মানুষ, তাদের মসজিদ, স্কুল ও বিশ্ববিদ্যালয়, সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান, অর্থনীতি এবং ভূমি ধ্বংস করেও সন্তুষ্ট না হয়ে ইসরায়েল এবং পম্পেওর মতো তার খ্রিষ্টান জায়নবাদী মিত্ররা এখন স্মৃতি ও আত্মত্যাগ মুছে দেওয়ার পথে নেমেছে। এ প্রচারণা গাজার ভেতর ও বাইরে দুই জায়গায় স্পষ্ট। ফিলিস্তিনি শরণার্থীদের জন্য জাতিসংঘের ত্রাণ ও কর্মসংস্থান সংস্থা ইউএনআরডব্লিউএ, যে প্রতিষ্ঠান দীর্ঘদিন ধরে ফিলিস্তিনি শরণার্থীদের অবস্থান এবং আন্তর্জাতিক আইনে তাদের প্রত্যাবর্তনের অধিকার রক্ষা করে আসছে, সেটিকে পরিকল্পিতভাবে দুর্বল ও ভেঙে ফেলা হচ্ছে। টিকটক, যেখানে ফিলিস্তিনিদের কণ্ঠ তুলনামূলকভাবে কিছুটা বেশি শোনা যেত, সেটিও এখন ইসরায়েলপন্থি একটি গোষ্ঠীর নিয়ন্ত্রণে গিয়ে ফিলিস্তিনপন্থি অ্যাকাউন্টগুলো সীমিত করছে। যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্যসহ বিভিন্ন দেশে স্থানীয় আইন ব্যবহার করে ফিলিস্তিনপন্থি তরুণদের দমন করা হচ্ছে। মতপ্রকাশের যে অধিকার তাদের থাকার কথা, সেটির জন্যই বহু মানুষকে আটক করা হচ্ছে। এমনকি যুক্তরাষ্ট্রে অঙ্গরাজ্য পর্যায়েও আইন করা হচ্ছে, যাতে স্কুলে ইসরায়েল ও ফিলিস্তিন বিষয়ে কী শেখানো হবে, তা নিয়ন্ত্রণ করা যায়।
কিন্তু পম্পেও এবং তার মতো যারা বাইবেলের আয়াত ভুলভাবে ব্যাখ্যা করে ইসরায়েল ও তার গণহত্যাকে সমর্থন করেন, তারা একটি বিষয় বোঝেন না। ফিলিস্তিনিরা আগেও মুছে ফেলার চেষ্টা মোকাবিলা করেছে এবং তা জয় করেছে। এবারও তারা পারবে। স্মৃতি ও সাক্ষ্য দেওয়ার কথা ভাবলে ‘শহীদ’ শব্দটি মনে আসে। ‘মার্টার’ শব্দটি গ্রিক ভাষার ‘মারতুস’ থেকে এসেছে, যার অর্থ সাক্ষী এবং এটি বাইবেলে গুরুত্বপূর্ণভাবে ব্যবহৃত হয়েছে। একইভাবে আরবি ‘শহীদ’ শব্দটিও সাক্ষ্য বা সাক্ষী হওয়ার অর্থ থেকেই এসেছে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এ শব্দটি বিশ্বাসের কারণে সহিংস কষ্ট ভোগ করা এবং ত্যাগের মাধ্যমে দৃঢ়তার অর্থও ধারণ করেছে।
জামাল এবং তার চারপাশের মানুষদের বর্ণনা করতে ‘শহীদ’ শব্দটির চেয়ে উপযুক্ত আর কিছু নেই। তারা জীবিত শহীদ। জামালের ছোট শরীর অসীম যন্ত্রণা প্রত্যক্ষ করেছে। যুদ্ধের সহিংসতা তার শরীরকে বারবার আঘাত করেছে। তবুও সে তার মায়ের মতোই বেঁচে থাকার প্রবল ইচ্ছায় সামনে এগিয়ে চলছে।
জামাল ও শাইমার তাঁবুর চারপাশে আছে আরও হাজার হাজার তাঁবু। দিনরাত সব তাঁবুই কেঁপে ওঠে জামালের চিৎকারে। ভেতরে থাকা মানুষগুলো ঠান্ডায় কাঁপছে, সাম্প্রতিক বন্যার কারণে অনেক তাঁবু ভেজা। সেখানে থাকা হাজার হাজার মানুষের জরুরি ভিত্তিতে হাসপাতালে নেওয়া প্রয়োজন, চিকিৎসা ছাড়া তাদের বাঁচা কঠিন।
ব্যথা আর যন্ত্রণা সীমাহীন। অথচ পম্পেওর মতো মানুষরা এখনো ফিলিস্তিনি জনগণকে মুছে ফেলার এ চলমান এবং বহুদিনের প্রক্রিয়াকে ন্যায্যতা দেওয়ার চেষ্টা করে যাচ্ছেন। ফিলিস্তিনিরা শুধু ভুক্তভোগী নয়, তারা হৃদয়ে কবিও। আর ভাষা, স্মৃতি ও ইতিহাসকে অবমূল্যায়ন করা পম্পেও কখনোই বুঝবেন না যে, একজন কবি আসলে একজন সাক্ষী।
ফিলিস্তিনি কবি মাহমুদ দরবিশ তার এক কবিতায় লিখেছিলেন:
যারা ক্ষণস্থায়ী শব্দের মাঝ দিয়ে চলে যাও
নিজেদের নাম সঙ্গে করে নিয়ে চলে যাও
আমাদের সময়কে তোমাদের সময় থেকে মুক্ত করো, আর চলে যাও
সমুদ্রের নীল আর স্মৃতির বালু থেকে যা পারো নিয়ে নাও
যত ছবি ইচ্ছে নিয়ে নাও, যেন বুঝতে পারো
যা তোমরা কোনোদিনই বুঝবে না
আমাদের মাটির একটি পাথর কীভাবে আমাদের আকাশের ছাদ হয়ে ওঠে।
ফিলিস্তিনি জনগণ স্মৃতি বাঁচিয়ে রাখবে। যেমন তারা বাঁচিয়ে রেখেছে বেইত দারাস, দেইর ইয়াসিন, জেনিন, মুহাম্মদ আল দুররা, আনাস আল শরিফের স্মৃতি এবং মাটি থেকে উপড়ে ফেলা প্রতিটি জলপাইগাছের শিকড়ের ব্যথা। ফিলিস্তিনি জনগণ এবং বিশ্বের লাখো মানুষ একসঙ্গে প্রত্যক্ষ করেছে গাজার ধ্বংস। পম্পেওর বক্তব্যকে অগ্রাহ্য করে এবং জীবিত শহীদ জামালের প্রতি সম্মান জানিয়ে আমরা সবাই গাজার পাথর তুলে নিয়ে একটি নতুন আকাশ গড়ে তুলব।
লেখক: রাষ্ট্রবিজ্ঞানের অধ্যাপক। তৃতীয় প্রজন্মের ফিলিস্তিনি শরণার্থী। বর্তমানে তিনি কানাডার আলবার্টা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগে ভিজিটিং প্রফেসর হিসেবে কর্মরত। আল জাজিরার এই নিবন্ধটি ভাষান্তর করেছেন আবিদ আজাদ