

প্রকৃতিতে মাঘ মাস চলছে। তবে ঢাকায় এ মাসের হাড়কাঁপানো শীতের তেমন কোনো অনুভূতি হচ্ছে না। প্রকৃতির মতোই দেশের রাজনীতির মাঠও এবার ত্রয়োদশ নির্বাচনের প্রচারণায় ধীরে ধীরে উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে। নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী সব পক্ষই পরস্পরকে ঘায়েল করতে ‘বাগাস্ত্র’ ছুড়ে মারছেন। মারামারি-খুনোখুনির তুলনায় এ বাগযুদ্ধটাই গণতন্ত্রের সৌন্দর্য। তবে এ বাক্যবাণে অন্যকে ঘায়েল করতে গিয়ে ইতিহাসের নিষ্পত্তি হওয়া ইস্যুকে সামনে এনে বিতর্কিত করার একটি প্রয়াস লক্ষ করা যাচ্ছে।
দেশের স্বাধীনতার ইতিহাসে মুক্তিযুদ্ধে কে প্রথম ‘উই রিভোল্ট’ বলে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেছিল, তা আমরা সবাই জানি। কিন্তু এলডিপিপ্রধান কর্নেল (অব.) অলি আহমদ উই রিভোল্ট বলে প্রথম বিদ্রোহ করেছিলেন—এ কথা নতুন করে তোলা হয়েছে।
জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান গত সোমবার চট্টগ্রাম নগরীর বন্দর কলেজ মাঠে অনুষ্ঠিত ১১-দলীয় জোটের নির্বাচনী সমাবেশে বলেছেন, “চট্টগ্রাম বাংলাদেশের সংগ্রামী ইতিহাসের এক গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধে এখান থেকেই স্বাধীনতার প্রথম ঘোষণা উচ্চারিত হয়েছিল। চট্টলাবাসীর এক গর্বিত সন্তান ড. কর্নেল অলি আহমদ সবার আগে ‘উই রিভোল্ট’ বলে স্বাধীনতার ডাক দিয়েছিলেন। তিনি জিয়াউর রহমানকে হাতে ধরে সামনে এগিয়ে নিয়েছিলেন।”
এটা অস্বীকার করার উপায় নেই, ড. কর্নেল (অব.) অলি আহমদ একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা। তিনি রণাঙ্গনে যুদ্ধ করে দেশের স্বাধীনতা অর্জনে ভূমিকা রেখেছেন। এজন্য জাতি তাকে চিরদিন স্মরণে রাখবে। কিন্তু তিনি নিজেও তো বলেননি যে, তিনি উই রিভোল্ট বলে দেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করেছিলেন।
ওয়ান ইলেভেনের আগে তখন যে পত্রিকায় কাজ করতাম, সেই পত্রিকার জন্য মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ে কর্নেল অলি সাহেবের একটি সাক্ষাৎকার নিই। তিনি তার গবেষণা অভিসন্দর্ভকে ভিত্তি করে ইংরেজিতে যে বইটি লিখেছেন, তা আমাকে দিয়েছিলেন। পরে বাসায় এসে আমি এই বইটি পড়েছি। বইটি পড়ার সময় আমি লক্ষ করেছি, তিনি তার লেখায় বোঝাতে চেয়েছেন, তিনি স্বাধীনতার ঘোষণা দেওয়ার জন্য জিয়াউর রহমান সাহেবকে প্ররোচিত করেছিলেন। স্মৃতি যদি আমাকে প্রতারিত না করে, তাহলে মনে হয়, তিনি তার এ গ্রন্থেও দাবি করেননি যে, তিনি প্রথম ‘উই রিভোল্ট’ বলে স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়েছিলেন।
মুক্তিযুদ্ধের ওপর লিখিত বই ও মুক্তিযোদ্ধাদের স্মৃতিচারণে এটা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে যে, জিয়াউর রহমানই উই রিভোল্ট বলে পাকিস্তান সরকারের বিরুদ্ধে প্রথম বিদ্রোহ করেন। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে কাজ করেছেন বিশিষ্ট লেখক গোলাম মুরশিদ (৮ এপ্রিল, ১৯৪০-২২ আগস্ট, ২০২৪)। এ বিষয়ে তিনি তার গ্রন্থ ‘মুক্তিযুদ্ধ ও তারপর: একটি নির্দলীয় ইতিহাস’-এ লিখেছেন, “….বন্দরে রিপোর্ট করতে যাওয়ার পথে খবর পেয়ে তিনি (জিয়াউর রহমান) সেই মুহূর্তে বিদ্রোহ ঘোষণার সিদ্ধান্ত নেন। তাঁর এই সিদ্ধান্ত তাঁর জীবনকেই রাতারাতি পাল্টে দিয়েছিল। তাঁকে একটা কৃতিত্ব দিতে হবে যে, বাঙালি সেনাবাহিনীর কর্মকর্তাদের মধ্যে তিনিই (জিয়া) সবার আগে বিদ্রোহ করেন। একবার বিদ্রোহের সিদ্ধান্ত নেওয়ার পর জিয়া আর পেছনে ফিরে তাকাননি। ষোলশহরের ঘাঁটিতে পৌঁছে তিনি তাঁর সঙ্গী পশ্চিমা সৈন্যদের নিরস্ত্র করেন। কমান্ডিং অফিসারকে গ্রেফতার করেন তার কক্ষ থেকে এবং তারপর তাকে মেরে ফেলেন ব্যাটম্যানকে দিয়ে। তাঁর শ’ তিনেক সৈন্যের সামনে বক্তৃতা করে তাদের উদ্বুদ্ধ করে রাত সোয়া সোয়া দুটোয় তিনি যাত্রা করেন পুবে কালুরঘাটের দিকে। (গোলাম মুরশিদ, পৃষ্ঠা-৯২, প্রকাশ: জানুয়ারি, ২০১০)।
মুক্তিযুদ্ধের আরেক বীর সেনানী লে. জেনারেল (অব.) মীর শওকত আলী বীরউত্তমের (১১ জানুয়ারি, ১৯৩৮-২০ নভেম্বর, ২০১০) নাম সবাই জানেন। মুক্তিযুদ্ধে এই বীর সেনানীর বীরত্বগাথা নিয়ে তারও সাক্ষাৎকার নেওয়ার সুযোগ হয়েছিল। আমাকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনিও বলেছিলেন, সোয়াত জাহাজ থেকে অস্ত্র গোলাবারুদ উদ্ধারে যাওয়ার মাঝপথে জিয়াউর রহমান ফিরে এসে বাঙালি সব অফিসার ও সৈনিককে নিয়ে বিদ্রোহ করেছিলেন উই রিভোল্ট বলে। এর আগে আরও একটি জনপ্রিয় সাপ্তাহিকে তিনি বলেছিলেন, জিয়াউর রহমান একটি ড্রামের ওপর দাঁড়িয়ে সেনাদের উদ্দেশে বক্তব্য রাখেন ও বিদ্রোহ করেন। ওই পত্রিকাটি একটি স্টোরি লিখেছিল এই বলে যে, বিদ্রোহ বা স্বাধীনতার ঘোষণার মীর শওকতের ড্রাম-তত্ত্ব। সাক্ষাৎকার নেওয়ার সময় আমি তাকে জিজ্ঞাসা করেছিলাম যে, এটা সত্য কি না। তিনি এর সত্যতা স্বীকার করে বলেছিলেন, সেনাবাহিনীতে একটু উঁচু জায়গায় দাঁড়িয়ে বক্তৃতা দেওয়ার নিয়ম। কোনো উঁচু স্থান না পেয়ে একটি ড্রাম এনে দিলে জিয়াউর রহমান এর ওপর দাঁড়িয়ে বক্তব্য রেখেছিলেন।
জেনারেল শওকতের গুলশানের লেকলাগোয়া বাসায় আরও বেশ কয়েকবার গিয়েছিলাম। তখন আমার সঙ্গে ছিলেন দৈনিক দিনকালের সিনিয়র রিপোর্টার ও বর্তমানে ডিইউজে সাধারণ সম্পাদক খুরশীদ আলম। জেনারেল শওকত আমাদের জানিয়েছিলেন, তিনি স্বাধীনতার যুদ্ধ ও তৎপরবর্তী বাংলাদেশের রাজনীতি নিয়ে ইংরেজিতে একটি বই লিখেছেন। তা প্রকাশও করেছিলেন। তবে বইটিতে মুদ্রণ-ত্রুটি ও বানানে ব্যাপক ভুল থাকায় তা বাজারে দেননি। এসব ত্রুটি ঠিক করে আবার ছাপাতে দেবেন বলে জানিয়েছিলেন। কিন্তু এর আগেই তার মৃত্যু হয়। এখন বইটি কোথায় আছে তা কেউ জানে না। বইটি বাজারে থাকলে হয়তো স্বাধীনতা যুদ্ধের অনেক অজানা তথ্য আমরা জানতে পারতাম।
সুতরাং এটা সত্য যে, কর্নেল অলি নন, জিয়াউর রহমানই উই রিভোল্ট বলে বিদ্রোহ করে তখনকার অষ্টম ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের সৈন্যদের নিয়ে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে নেমে পড়েন। প্রতিষ্ঠিত এ সত্যকে নতুন করে বিতর্কিত করার কোনো প্রয়োজন আছে বলে মনে করি না। নির্বাচনী প্রচারে বাগযুদ্ধ চলুক, বাক্যবাণ দিয়ে রাজনীতির মাঠে একে অন্যকে মোকাবিলা করুন আমাদের রাজনীতিবিদরা। তবে কোনোভাবেই স্বাধীনতা যুদ্ধের মীমাংসিত বিষয়গুলোকে নিয়ে বিতর্ক না হোক—এটাই আমাদের চাওয়া।
লেখক: সাংবাদিক