

বাংলাদেশ ক্রমেই একটি বয়স্ক জনগোষ্ঠীর দেশের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। আর এ পরিবর্তিত বাস্তবতার ভেতরেই জন্ম নিচ্ছে একটি নতুন অর্থনৈতিক ধারণা—‘সিলভার ইকোনমি’।
গত কয়েক দশকে দেশে মানুষের গড় আয়ু অভাবনীয়ভাবে বেড়েছে। দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য, জনমিতিক পরিবর্তনের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে প্রয়োজনীয় অর্থনৈতিক ও সামাজিক কাঠামো এখনো বাংলাদেশে পরিকল্পিতভাবে গড়ে ওঠেনি।
বিশ্বজুড়ে প্রবীণ জনগোষ্ঠী কেন্দ্র করে যে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালিত হয়, তাকে বলা হচ্ছে ‘সিলভার ইকোনমি’ বা রুপালি অর্থনীতি। সাধারণভাবে ৫০-৬০ বছরোর্ধ্ব মানুষের স্বাস্থ্য, নিরাপত্তা, জীবনযাপন ও আর্থিক সুরক্ষাকে ঘিরেই এ অর্থনীতির আবর্তন। উন্নত দেশগুলোয় সিলভার ইকোনমি এখন আর কোনো সামাজিক কল্যাণমূলক ধারণা নয়; এটি অর্থনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ চালিকাশক্তি। অথচ বাংলাদেশে প্রবীণদের এখনো মূলত ‘নির্ভরশীল গোষ্ঠী’ হিসেবেই দেখা হয়। সিলভার ইকোনমির গুরুত্ব বোঝার জন্য বিশ্ব বাস্তবতার দিকে তাকানো প্রয়োজন। জাপানে জনসংখ্যার একটি বড় অংশ প্রবীণ হলেও দেশটি এটিকে সংকট নয়, বরং সুযোগ হিসেবে দেখেছে। রোবটিক কেয়ার, প্রবীণবান্ধব প্রযুক্তি, বিশেষায়িত স্বাস্থ্যসেবা ও বিনোদন সব মিলিয়ে সেখানে একটি বিশাল বাজার গড়ে উঠেছে। ইউরোপের দেশগুলোয় ‘অ্যাক্টিভ এজিং’ ধারণাকে উৎসাহিত করা হচ্ছে, যেখানে অবসরপ্রাপ্ত প্রবীণরাও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত থাকছেন। ফলে তারা যেমন মানসিকভাবে সুস্থ থাকছেন, তেমনি অর্থনীতিতেও অবদান রাখছেন।
দেশের প্রেক্ষাপটে চিত্রটি দ্রুত বদলাচ্ছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে দেশে প্রবীণ মানুষের সংখ্যা প্রায় দেড় কোটির বেশি। ধারণা করা হচ্ছে, ২০৫০ সাল নাগাদ এ সংখ্যা ৪ কোটি ছাড়িয়ে যাবে। অর্থাৎ, প্রতি চারজন মানুষের মধ্যে একজন হবেন প্রবীণ। এ বিশাল জনগোষ্ঠীকে অবহেলা করা কিংবা কেবল দয়া-দাক্ষিণ্যের মাধ্যমে দেখার প্রবণতা টেকসই উন্নয়নের ধারণার সঙ্গে সাংঘর্ষিক।
রুপালি অর্থনীতির প্রথম এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ হলো হেলথকেয়ার। বয়স বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে ডায়াবেটিস, হৃদরোগ, অস্থিসন্ধি ও স্নায়বিক সমস্যার মতো দীর্ঘমেয়াদি রোগ বাড়ে। অথচ বাংলাদেশে এখনো প্রবীণদের জন্য বিশেষায়িত জেরিয়াট্রিক চিকিৎসা ব্যবস্থা প্রায় অনুপস্থিত। সিলভার ইকোনমি বিকশিত হলে দক্ষ কেয়ারগিভার, ফিজিও থেরাপিস্ট, পুনর্বাসন বিশেষজ্ঞ এবং প্রবীণ চিকিৎসকদের একটি নতুন কর্মক্ষেত্র তৈরি হবে। ঘরে বসে নার্সিং সেবা, টেলিমেডিসিন কিংবা নিয়মিত স্বাস্থ্য পর্যবেক্ষণের যে সম্ভাবনাময় বাজার, তা মূলত রুপালি অর্থনীতিরই অংশ। এ অর্থনীতির দ্বিতীয় স্তম্ভ আবাসন।
সিলভার ইকোনমির ধারণায় এটি কোনো করুণার স্থান নয়; বরং ‘সিনিয়র লিভিং’ বা ‘অ্যাসিস্টেড লিভিং’ কমিউনিটি যেখানে প্রবীণরা সম্মানের সঙ্গে বসবাস করবেন; পাবেন চিকিৎসা সহায়তা, নিরাপত্তা ও সামাজিক সংযোগ। এ ধরনের আবাসন ব্যবস্থা রিয়েল এস্টেট খাতের জন্য যেমন নতুন দিগন্ত খুলে দেবে, তেমনি প্রবীণদের মানসিক-শারীরিক সুস্থতাও নিশ্চিত করবে।
সবচেয়ে সংবেদনশীল স্তম্ভ হলো ইন্স্যুরেন্স ও পেনশন ব্যবস্থা। বাংলাদেশের প্রবীণদের বড় একটি অংশের প্রধান উদ্বেগ আর্থিক অনিশ্চয়তা। সরকারের সর্বজনীন পেনশন স্কিম একটি সময়োপযোগী উদ্যোগ হলেও এর পূর্ণ বাস্তবায়ন ও গ্রহণযোগ্যতা পেতে সময় লাগবে। সিলভার ইকোনমির বিকাশে বেসরকারি বীমা কোম্পানিগুলোর জন্য রয়েছে বড় সুযোগ।
সিলভার ইকোনমি মানে কেবল প্রবীণদের জন্য ব্যয় বাড়ানো নয়। এর অর্থ হলো তাদের অভিজ্ঞতা, দক্ষতা ও সামাজিক মূলধনকে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত করা। অনেক প্রবীণ অবসরের পরও মানসিক ও শারীরিকভাবে কর্মক্ষম থাকেন, কিন্তু সুযোগের অভাবে নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়েন। খণ্ডকালীন কাজ, পরামর্শক ভূমিকা কিংবা সামাজিক উদ্যোগে যুক্ত হওয়ার সুযোগ তৈরি করা গেলে তা ব্যক্তি ও রাষ্ট্র—উভয়ের জন্যই লাভজনক হবে।
প্রবীণদের কেবল অতীতের মানুষ হিসেবে না দেখে সম্ভাবনাময় মানবসম্পদ হিসেবে বিবেচনা করার সময় এসেছে। হেলথকেয়ার, আবাসন ও ইন্স্যুরেন্সের সমন্বয়ে গড়ে ওঠা এ রুপালি অর্থনীতি শুধু অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিই আনবে না, বরং আমাদের সমাজকে আরও মানবিক ও সংবেদনশীল করে তুলবে।
লেখক: এফএসিএইচই, এফএলএমআই (অর্থনীতিবিদ), ম্যানেজিং ডিরেক্টর, ল্যাবএইড ক্যানসার হাসপাতাল অ্যান্ড সুপার স্পেশালিটি সেন্টার, ডেপুটি ম্যানেজিং ডিরেক্টর, ল্যাবএইড গ্রুপ