

‘যারে দেখতে নারি চলন বাকা’ প্রবাদটি বাংলাদেশে তুমুল জনপ্রিয় ও বহুল ব্যবহৃত। এক শিক্ষার্থীর লেখাপড়া নিয়ে প্রতিবেশী চাচা সবসময় নেতিবাচক মন্তব্য করতেন। বলতেন, যতই পড়ুক ও ঠিক ফেল করবে। পাস করার পর বললেন, পাস করলেও চাকরি পাবে না। চাকরি পাওয়ার পর বলতেন, বেতন হবে না। ভবিষ্যদ্বাণী ব্যর্থ হওয়ার পরও বলতেন, বোনাস পাবে না। সবশেষ বললেন, আমি তো থাকব না। দেখো, পেনশন পাবে না।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিয়ে শুরু থেকেই একশ্রেণির মানুষ প্রতিবেশী চাচার ভূমিকায় নেমেছে। নির্বাচন হবে না বলে নানা প্রোপাগান্ডা ছড়িয়ে আসছে। ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের উদ্দেশ্য-বিধেয় নিয়ে জনমনে সন্দেহ-সংশয় উৎপাদন করেছে। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থ দুর্বল নেতৃত্ব ও জাতীয় সংস্কারের চেয়ে আন্তর্জাতিক চুক্তির প্রতি সরকারের অতি মনোযোগ, সংশয়কে দিনে দিনে শঙ্কায় পরিণত করেছে। বিশ্বাস-অবিশ্বাসের দোলাচলে দুলতে দুলতে জনগণ এখন নির্বাচনের দোরগোড়ায়। প্রার্থীরা প্রচারণায় দিন-রাত একাকার করে এখন ঘরে বসে হিসাব কষছে। রাত পোহালেই কাল নির্বাচন। অথচ আজও সংশয় কাটেনি অনেকের। নির্বাচন বানচালের নানারকম উদ্ভট কাহিনি ছড়াচ্ছে। দলীয় কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ অনলাইনে ‘নো বোট নো ভোট’ প্রচার চালাচ্ছে। গত দেড় দশক জুড়ে একতরফা নির্বাচনের নামে প্রহসন করেছে তারা। সে কথা বেমালুম ভুলে গিয়ে এখন ‘অন্তর্ভুক্তিমূলক’ নয় বলে অনুষ্ঠেয় ত্রয়োদশ নির্বাচন বিতর্কিত করতে চাইছে। তাদের নেতাকর্মীদের পাশাপাশি সমর্থক শিক্ষক-সাংবাদিকসহ পেশাজীবীরা মনে করেন, আওয়ামী লীগ ছাড়া নির্বাচন গ্রহণযোগ্য হবে না। শুধু, চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানে পরাজিতরাই নয়; একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে হেরে যাওয়া শক্তিও ইনিয়েবিনিয়ে নির্বাচন নিয়ে শঙ্কা ছড়াচ্ছে। ফিল্ড লেভেল প্লেয়িং নয় বলে অভিযোগ করছে। বিশ্লেষকদের মতে, বিএনপির কাছে শোচনীয় পরাজয়ের আশঙ্কায় এমনটি করছে তারা। আবার, নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা ধরে রাখার জোর চেষ্টাও চালিয়ে যাচ্ছে। এটা তাদের ঐতিহাসিক দ্বিচারিতার পরিচয় বলে মনে করে অনেকে।
জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তপশিল ঘোষণার দুই মাসে দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রয়েছে বলে মনে করছে সরকার ও নির্বাচন কমিশন। তবে ভোটের দিন এ পরিস্থিতির অবনতি হতে পারে বলে আশঙ্কা করছে সরকারের গোয়েন্দা সংস্থাগুলো। ১২ ফেব্রুয়ারি ভোটগ্রহণের দিন বেশ কিছু নির্বাচনী আসনে সহিংসতার ঘটনা ঘটতে পারে। গোপালগঞ্জ, ফরিদপুর, মাদারীপুর, গাজীপুরসহ কয়েকটি জেলায় আওয়ামী লীগ ভোট বন্ধের চেষ্টা চালাতে পারে। এ ছাড়া বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থী থাকা আসনগুলোয়ও আধিপত্য বিস্তার কেন্দ্র করে একই ধরনের ঘটনার আশঙ্কা করা হচ্ছে। পাশাপাশি কয়েকটি জেলায় বিএনপি ও জামায়াতের মধ্যেও কোন্দল হতে পারে বলে তথ্য রয়েছে গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর হাতে। এসব মাথায় রেখে নির্বাচনে আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় নিরাপত্তা কৌশল ঠিক করা হয়েছে। সেনাবাহিনী, র্যাব, পুলিশ, বিজিবি, আনসারসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ৯ লাখ সদস্য মোতায়েন থাকবে। ভোটকেন্দ্রগুলো গোয়েন্দা নজরদারির আওতায় আনা হয়েছে। অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস বলেছেন, ‘নির্বাচনের প্রস্তুতিপর্ব খুব ভালোভাবে সম্পন্ন হয়েছে। উই আর ভেরি হ্যাপি। আমাদের জন্য এখন চ্যালেঞ্জ সুষ্ঠুভাবে ভোটগ্রহণ।’ ইসি মনে করছে, নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বী রাজনৈতিক দল, প্রার্থী ও ভোটারদের মধ্যে উৎসবমুখর পরিবেশ বিরাজ করছে। গত তিনটি নির্বাচনে মানুষ এ ধরনের পরিবেশ পায়নি। এ কারণে মানুষের মধ্যে সহিংসতার পরিবর্তে নির্বিঘ্নে ভোটকেন্দ্রে যাওয়ার আকাঙ্ক্ষা বেশি। তবে শঙ্কার বিষয়টি তারা পুরোপুরি উড়িয়েও দিচ্ছেন না। গত ১১ ডিসেম্বর তপশিল ঘোষণার দিন থেকে ৫ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত সারা দেশে সাড়ে পাঁচশর বেশি নির্বাচনী অপরাধ সংঘটিত হয়েছে। এর মধ্যে ১৭টি রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড, প্রতিদ্বন্দ্বী সমর্থকদের মধ্যে ১৮০টি সংঘর্ষ, ২৮টি অবরোধ বা বিক্ষোভ, প্রার্থীর ওপর আক্রমণ ৪২টি ও প্রচারে বাধা দেওয়ার ১১৯টি ঘটনা ঘটেছে।
এবারের নির্বাচনে থাকছে ৪২ হাজার ৭৭৯টি ভোটকেন্দ্র। সব কেন্দ্র গোয়েন্দা নজরদারিতে রয়েছে। ২৫ হাজার ৭০০ বডিওর্ন ক্যামেরা সেট করা হয়েছে। রয়েছে কেন্দ্রভিত্তিক সিসিটিভি ক্যামেরা। এ ছাড়া নির্বাচন সুরক্ষা অ্যাপস চালু হয়েছে। কোনো কেন্দ্রে গণ্ডগোল হলে এই অ্যাপের মাধ্যমে সরাসরি জানালে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে। নির্বাচনে সুবিধার জন্য একটি হটলাইন নাম্বার চালু থাকবে, যা হলো ৩৩৩। এবার বিদেশি পর্যবেক্ষক থাকবেন ৪০০ জন। দেশি পর্যবেক্ষক ৫০ হাজার। বিদেশি সাংবাদিক থাকবেন ১২০ জন।
এবার ২৯৯টি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন ২ হাজার ২৯ জন প্রার্থী। এর মধ্যে রাজনৈতিক দলের প্রার্থী ১ হাজার ৭৫৫ এবং স্বতন্ত্র ২৭৪। নারী প্রার্থী ৮৩ জন। আবার নারী প্রার্থীদের মধ্যে দলীয় ৬৩ এবং স্বতন্ত্র ২০ জন। বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী, জাতীয় নাগরিক পার্টি-এনসিপি, ইসলামী আন্দোলনসহ নিবন্ধিত ৫১টি রাজনৈতিক দল অংশ নিয়েছে। কমবেশি অর্ধশত আসনে বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থীরা স্বতন্ত্র হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় রয়েছেন। তবে দলীয় কার্যক্রম স্থগিত থাকায় আওয়ামী লীগ এ নির্বাচনে অংশ নেয়নি। একইভাবে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন ১৪-দলীয় জোটেরও কয়েকটি দল নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছে না। ত্রয়োদশ নির্বাচনে ভোটার ১২ কোটি ৭৭ লাখ ১১ হাজার ৭৯৩ জন। এর মধ্যে পুরুষ ৬ কোটি ৪৮ লাখ ২৫ হাজার ৩৬১, নারী ৬ কোটি ২৮ লাখ ৮৫ হাজার ২০০ এবং তৃতীয় লিঙ্গের ১ হাজার ২৩২ জন। এবারই প্রথম বিশ্বের ১২৪টি দেশ থেকে পোস্টাল ব্যালটের মাধ্যমে প্রায় সাড়ে চার লাখ প্রবাসী বাংলাদেশি ভোট দিয়েছেন।
নানান দিক বিবেচনায় এবারের নির্বাচন দেশবাসী ও বিশ্বের কাছে খুবই গুরুত্বপূর্ণ। রক্তাক্ত জুলাই বিপ্লবের মাধ্যমে ফ্যাসিস্টমুক্ত হয়েছে দেশ। ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ না থাকায় বিএনপি জোটের মূল প্রতিদ্বন্দ্বী হয়েছে দীর্ঘদিনের মিত্র জামায়াত জোট। সংগ্রামে-সংকটে একসঙ্গে অনেক বন্ধুর পথ পাড়ি দিলেও এখন শত্রুতা চরমে। স্বাধীনতাবিরোধী ও ধর্মের অপব্যবহারকারী হিসেবে জামায়াতের ভূমিকা তুলে ধরছে বিএনপি। আবার, দুর্নীতিবাজ-চাঁদাবাজ তকমা দিয়ে বিএনপিকে ঘায়েল করছে জামায়াত। তবে, দুটি দল বা জোটই এ নির্বাচনের মাধ্যমে নতুন বাংলাদেশ বিনির্মাণের স্বপ্ন দেখাচ্ছে জনগণকে। বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান বলেছেন, ‘১২ ফেব্রুয়ারির ভোটকে দেশ গঠনের নির্বাচন হিসেবে চিন্তা করতে হবে। এই দেশ যদি আমরা গড়ে তুলতে না পারি, তাহলে আমরা কোথায় যাব? আমাদের যাওয়ার কোনো জায়গা নেই। আমাদের প্রথম ঠিকানা বাংলাদেশ, শেষ ঠিকানা বাংলাদেশ।’ তিনি বলেন, ‘আমরা দেশকে সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যেতে চাই। আমরা আন্দোলন-সংগ্রাম করেছি। এখন দেশের মানুষকে সঙ্গে নিয়ে দেশকে পুনর্গঠন করতে চাই।’ জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান বলেন, ‘আগামী ১২ তারিখ নতুন ইতিহাস হবে, ইনশাআল্লাহ। হে রাব্বুল আলামিন, ১৩ তারিখ যে সূর্যের উদয় তুমি ঘটাবে, বাংলাদেশে ওই সূর্যের পিঠে তুমি এক নতুন বাংলাদেশ ছড়াইয়া দিয়ো। আমি আপনাদের সাক্ষী রেখে বলছি, আমি জামায়াতে ইসলামীর বিজয় চাই না, আমি এই দেশের ১৮ কোটি মানুষের বিজয় চাই।’ তিনি আরও বলেন, ‘বাংলাদেশকে আমরা ধর্মের ভিত্তিতে বিভক্ত করতে দেব না। ধর্মের ভিত্তিতে বাড়াবাড়ি ইসলাম পছন্দ করে না। কোনো ধার্মিক মানুষ অন্য ধর্মের মানুষের ক্ষতি করতে পারে না।’
হাসিনা রেজিমে নির্বাচনকে প্রহসনের মাধ্যমে নির্বাসনে পাঠানো হয়েছিল। আমি-ডামি, তুমি-আমি আর দিনের ভোট রাতে করে গণতন্ত্রকে হরণ করা হয়েছিল। রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ সব প্রতিষ্ঠানকে দলীয় কার্যালয় বানিয়েছিল আওয়ামী লীগ। সেই অবস্থা থেকে উত্তরণে সব মজলুম দল এক হয়ে শেখ হাসিনাকে দেশছাড়া করেছে। এখন কোনো কোনো মজলুম একে অন্যকে জালিম বলে পরিচয় করিয়ে দিচ্ছে। নির্বাচন কেন্দ্র করে ফ্যাসিস্টবিরোধী আন্দোলনের সহযোদ্ধাদের মধ্যে কোথাও কোথাও শিষ্টাচার ক্ষুণ্ন হয়েছে। ভবিষ্যৎ সম্পর্কে এর নেতিবাচক প্রভাব নিয়ে শঙ্কিত অনেকে। নির্বাচিত হয়ে যে দলই সরকার গঠন করবে, রাষ্ট্র পরিচালনা তার জন্য কঠিন হবে বলেও প্রচার আছে।
স্বাধীনতার পর ১৯৯১-এর নির্বাচনকে সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য বলে মনে করেন সবাই। সেই নির্বাচনেও সূক্ষ্ম কারচুপি হয়েছিল বলে অভিযোগ করেছিলেন শেখ হাসিনা। ত্রয়োদশ নির্বাচন ঘিরে দেড় বছর ধরে চলছে হাজারো জল্পনা-কল্পনা। এ সুযোগে দেড় দশকের ফ্যাসিস্ট সমর্থকরাও চরম বাকস্বাধীনতা ভোগ করছে। প্রাণসংহারী জুলাইকে ঝুলিয়ে দিতে ‘না’ ভোটের ক্যাম্পেইন করছে তারা। এমনিতে, তেরো সংখ্যাটিকে অপয়া মনে করে সাধারণ মানুষ। সময় এসেছে নতুন করে শুরু করার। সবার আগে দেশকে গুরুত্ব দিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বী দলগুলো পারে আনলাকি থার্টিনকে ‘শুভ ত্রয়োদশ’ রচনা করতে। অন্যথায় আরও রক্তগঙ্গা বইবে এই পদ্মা-মেঘনা-যমুনার শ্যামল জনপদে।
লেখক: হেড অব নিউজ, আরটিভি