

আমাদের দৈনন্দিন জীবন, বিশেষত শহর ও নগর জীবনের অপরিহার্য অংশ হয়ে ওঠা গ্যাস সিলিন্ডারে বিস্ফোরণে দুর্ঘটনা থামছেই না। বরং এ দুর্ঘটনা হতাশাজনকভাবে দিন দিন বেড়েই চলেছে।
সোমবার একই দিনে চট্টগ্রাম নগরী ও রাজধানী ঢাকায় গ্যাস সিলিন্ডার বিস্ফোরণের ঘটনায় তিনজন নিহত এবং ১০ জন আহত হয়েছেন। আহতরা আশঙ্কাজনক অবস্থায় একাধিক হাসপাতালে ভর্তি হয়ে জীবনমৃত্যুর সন্ধিক্ষণে রয়েছেন। সোমবার চট্টগ্রাম নগরীর হালিশহর এলাকায় একটি বাসায় সিলিন্ডারের গ্যাস জমে ভয়াবহ এ ঘটনা ঘটে। এ ঘটনায় নারী ও শিশুসহ নয়জন দগ্ধ হয়। তাদের মধ্যেই তিনজন মারা গেছেন। একইদিন রাজধানীর হাজারীবাগের রায়েরবাজার এলাকায় গ্যাস লিকেজ থেকে আগুনে একই পরিবারের নারী ও শিশুসহ চারজন দগ্ধ হয়। তারা সবাই আশঙ্কাজনক অবস্থায় জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে চিকিৎসাধীন।
দেশে এলপিজি সিলিন্ডার দুর্ঘটনা নতুন কোনো সমস্যা নয়। বছরের পর বছর ধরে একে কেন্দ্র করে ভয়াবহ সব দুর্ঘটনা ঘটে চলেছে। এ-সংক্রান্ত দুর্ঘটনা যেন প্রতি বছর আগের বছরের সংখ্যাকে পেরিয়ে যাবে, এটাই নিয়তি হয়ে দাঁড়িয়েছে। কেননা ঠিক কী কী কারণে বিস্ফোরণগুলো ঘটে, তা এরই মধ্যে উদ্ঘাটিত হয়েছে। কিন্তু সমাধান করা হয়নি। যখনই সিলিন্ডার বিস্ফোরণে বড় কোনো দুর্ঘটনা ঘটে, তখন নানা আলোচনা শোনা যায়। কীভাবে সমাধান করা যায়, কার দায় বেশি, কার কম ইত্যাকার আলোচনায় সরব থাকে সব গণমাধ্যমসহ নাগরিকদের মুখ। কয়েক দিন পার হলেই সব আলোচনা হারিয়ে যায়। সংকট রয়ে যায় আগের মতোই। দুর্ঘটনাও ঘটতে থাকে। এভাবেই চলছে।
প্রশ্ন হচ্ছে, এ পরিস্থিতির অবসান হবে কবে? মানুষের জীবন-মরণের প্রশ্নটি যেখানে জড়িত, সে বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের কেন এমন উদাসীনতা? ফায়ার সার্ভিসের তথ্য বলছে, শুধু ২০২১ সালেই ৮৯৪টি সিলিন্ডার বিস্ফোরণ ও অগ্নিকাণ্ড ঘটে। যেখানে হতাহত হয় অনেকে। ২০২৫ সালে সিলিন্ডার ও লাইন লিকেজজনিত দুর্ঘটনায় এ সংখ্যা উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। গত বছর প্রথমার্ধের একটি সমন্বিত তথ্য দেখাচ্ছে, বাসাবাড়িতেই সবচেয়ে বেশি, অর্থাৎ ৮ হাজার ৭০৫টি অগ্নিকাণ্ড ঘটেছে। এর মধ্যে সিলিন্ডার বিস্ফোরণ ও গ্যাস লিকেজ উল্লেখযোগ্য কারণ। এ সময় প্রাণহানি ঘটে ৮৫ জনের। আহতের সংখ্যা কম নয়। এসব ঘটনায় সিলিন্ডারের ত্রুটিপূর্ণ রেগুলেটর, মানহীন সিলিন্ডার, পাইপ এবং মেয়াদোত্তীর্ণ সিলিন্ডার ব্যবহারই প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। দেখা গেছে, এলপিজি সিলিন্ডার দুর্ঘটনার ১০টির মধ্যে ৭টিই ত্রুটিপূর্ণ রেগুলেটর ব্যবহারের কারণে ঘটে। তবে সিলিন্ডার বিস্ফোরণে সচেতনতার অভাবও অন্যতম একটি কারণ।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সচেতনতা ও নিয়মিত পর্যবেক্ষণে এ ভয়াবহ বিস্ফোরণ থেকে বাঁচা সম্ভব, বিশেষত পচা ডিমের মতো গন্ধ বা ‘হিস’ শব্দ হচ্ছে কি না, পরীক্ষার পাশাপাশি ব্যবহারের পর সিলিন্ডার ও চুলা বন্ধ করতে হবে।
আমরা মনে করি, গ্যাস সিলিন্ডার বিস্ফোরণ ও দুর্ঘটনা রোধে সরকারের সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান এবং ব্যক্তির দায় যেমন রয়েছে; তেমনি অভাব রয়েছে জনসচেতনতার। এ ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্টদের কঠোর মনিটরিং বাড়াতে হবে। বিশেষ করে নিম্নমানের সিলিন্ডার বাজারজাত বন্ধে নিয়মিত ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা, বাৎসরিক সিলিন্ডার পরীক্ষা বাধ্যতামূলক করা, মেয়াদোত্তীর্ণ সিলিন্ডারের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা গ্রহণের মতো পদক্ষেপ বাড়াতে হবে। পাশাপাশি দুর্ঘটনা ও ঝুঁকি কমাতে গণসচেতনতা তৈরির জন্য সরকারের পাশাপাশি গণমাধ্যমকেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে হবে।