কালবেলা প্রতিবেদক
প্রকাশ : ২৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ১২:০০ এএম
আপডেট : ২৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ০১:০৩ পিএম
প্রিন্ট সংস্করণ
কালবেলা বিশেষ সাক্ষাৎকার

জনগণের প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণ ছাড়া জবাবদিহি আসবে না

ড. মির্জা এম হাসান। ছবি : কালবেলা
ড. মির্জা এম হাসান। ছবি : কালবেলা

কেমন হলো ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন?

ড. মির্জা এম হাসান: সবচেয়ে বড় স্বস্তির বিষয় হলো, নির্বাচনটা হয়ে গেছে এবং আমরা যে সহিংসতার আশঙ্কা করছিলাম, তা হয়নি। এটি একটি বিশাল ব্যাপার। এটি প্রমাণ করেছে যে, বাংলাদেশে চাইলে সহিংসতামুক্ত নির্বাচন করা সম্ভব। হয়তো এর জন্য অনেক কাঠখড় পোড়াতে হয়; কিন্তু এটি সম্ভব। আরেকটা বিষয় হলো, নির্বাচনের ফল খুব একটা আশ্চর্যজনক হয়নি। যদিও আমাদের আশঙ্কা ছিল জামায়াত জিতে যেতে পারে। তবে সামগ্রিকভাবে ফলাফল মানুষের প্রত্যাশা অনুযায়ী হয়েছে বলে মনে করি। ব্যক্তিগতভাবে আমি আরও খুশি হতাম যদি বিএনপি দুই-তৃতীয়াংশ আসন না পেয়ে সাধারণ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেত। কারণ, এখন বিশাল শক্তি নিয়ে সরকার গঠন করতে যাওয়ায় তারা সংস্কারের অনেক প্রস্তাব উপেক্ষা বা প্রতিরোধ করতে পারে। সাধারণ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেলে তারা বিরোধী দলের সঙ্গে সমঝোতা করতে বাধ্য হতো। তবে সব মিলিয়ে, দীর্ঘদিন পর শান্তিপূর্ণভাবে মানুষের অংশগ্রহণে এমন একটি নির্বাচন হওয়াকে আমি বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের ইতিবাচক দিক হিসেবেই দেখি।

অন্তর্বর্তী সরকার অনেকগুলো সংস্কার প্রস্তাব রেখে যাচ্ছে। অতীত অভিজ্ঞতার আলোকে এসব সংস্কার প্রস্তাব বাস্তবায়নে আপনি কতটা আশাবাদী?

ড. মির্জা এম হাসান: আমি খুব বেশি আশাবাদী নই। তবে ১৯৯১ বা ২০০৬-০৭ সালের পরিস্থিতির চেয়ে এবারের প্রেক্ষাপট কিছুটা ভিন্ন। আগের পরিবর্তনগুলোয় রাজনৈতিক দল বা সামরিক বাহিনীর ভূমিকা ছিল প্রধান, কিন্তু এবারই প্রথম বাংলাদেশের ইতিহাসে জনগণের নেতৃত্বে একটি অভ্যুত্থানের মাধ্যমে পরিবর্তন এসেছে। কোনো নির্দিষ্ট দলের নেতৃত্বে এটি হয়নি। এ কারণে আমরা সনদ তৈরি করতে পেরেছি এবং স্বৈরাচারবিরোধী মৌলিক জায়গাগুলোয় হাত দিতে পেরেছি। অতীতে দেখা গেছে, প্রধানমন্ত্রীর একচ্ছত্র ক্ষমতা থেকেই স্বৈরাচারের শুরু হয়। এবার সেই ‘প্রধানমন্ত্রীর স্বৈরাচার’ যেন ফিরে না আসে, সেজন্য আমরা ভিন্ন ধরনের জবাবদিহি এবং প্রতিষ্ঠানের কথা বলেছি। তবে আগামী কয়েক মাসে দেখার বিষয় হলো, আমরা সেই ‘চেকস অ্যান্ড ব্যালেন্স’ বা ভারসাম্য রক্ষা করতে পারব কি না, নাকি জনগণ আবারও হেরে যাবে।

নতুন সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জগুলো কী হবে বলে মনে করেন?

ড. মির্জা এম হাসান: নতুন সরকারের (বিএনপির) জন্য আমি প্রধান তিনটি চ্যালেঞ্জ দেখছি। প্রথমত, নিজেদের দলের ওপর নিয়ন্ত্রণ বা শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা, বিশেষ করে চাঁদাবাজি বন্ধ করা। দ্বিতীয়ত, সরকার আমলাতন্ত্রকে কীভাবে সামলাবে। আমরা দেখেছি, প্রতিটি সংস্কারের ক্ষেত্রে আমলাতন্ত্র বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায়। রাজনৈতিক সরকারগুলো সাধারণত রাজনীতি সামলাতে ব্যস্ত থাকে এবং শাসন প্রক্রিয়া আমলাদের ওপর ছেড়ে দেয়, যা শেষ পর্যন্ত দলীয়করণে রূপ নেয়। তৃতীয়ত, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করা। বর্তমানে দেশে প্রকৃত আইনের শাসন নেই। পুলিশের কার্যক্রম এবং নিম্ন ও উচ্চ আদালত যেন দলীয় প্রভাবমুক্ত হয়ে স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারে, তা নিশ্চিত করা সরকারের জন্য বিশাল চ্যালেঞ্জ হবে।

জাতীয় ঐক্য আগামীতে বজায় থাকবে বলে মনে করেন কী?

ড. মির্জা এম হাসান: ঐক্যের ব্যাপারে আমার কিছুটা ভিন্নমত রয়েছে। ঐক্য বলতে আসলে কী বোঝায়? গণতন্ত্রে ঐক্যের অর্থ হলো, আমরা সবাই মিলে সংবিধান বা ‘রুলস অব দ্য গেম’ মেনে চলব। আমাদের রাজনৈতিক আলোচনা সংসদে হবে, আমরা সমঝোতার মাধ্যমে চলব, এটিই হলো একটি বৃহত্তর সাংবিধানিক কাঠামোর মধ্যে কাজ করা। আমরা অসাংবিধানিক কিছু করব না। যদি একে ঐক্য বলা হয়, তবে সেটাই ঐক্য। কিন্তু মতামতের ঐক্য তো হতে পারে না। দেশ পরিচালনার বিষয়ে আমার একটি নির্দিষ্ট ফিলোসফি বা চিন্তাভাবনা থাকতে পারে আবার আপনাদের ভিন্ন একটি মত থাকতে পারে। সেখানে ঐক্যের প্রশ্নই ওঠে না।

অনেকে রোমান্টিকভাবে ঐক্যের কথা বলেন, কিন্তু গণতন্ত্রে ঐক্য মানে সেটা নয়। গণতন্ত্র মানেই হলো আমি আপনার সঙ্গে একমত নই, তাই আমি আপনার সঙ্গে বিতর্ক করব, যুক্তি দেখাব এবং জনগণকে আমার দিকে আনার চেষ্টা করব। এখানে সংঘাত বা ‘কনফ্লিক্ট’ একটি স্বাভাবিক বিষয়। তবে এ সংঘাত বা আদর্শগত লড়াই একটি সাংবিধানিক কাঠামোর ভেতরেই হতে হবে। আগের কোনো সরকারই এ কাঠামোর মধ্যে থাকতে পারেনি; তারা সংবিধানের বাইরে গিয়ে দমন-পীড়ন চালিয়েছে। আমাদের চ্যালেঞ্জ হলো, বর্তমান সরকার এমন একটি কাঠামো বজায় রাখতে পারছে কি না, যেখানে আমরা স্বাধীনভাবে বিরোধিতা করতে পারব এবং রাজনীতি করতে পারব। এটিই আমাদের লক্ষ্য হওয়া উচিত।

আগামীতে গণমাধ্যম ও নাগরিক সমাজের ভূমিকা কী হওয়া উচিত?

ড. মির্জা এম হাসান: সুশীল সমাজ বা নাগরিক সমাজের ভূমিকা বেশ দুর্বল ছিল, যার মূল কারণ দলীয়করণ। ১৯৯১ সাল থেকেই আমরা দেখছি যে, সুশীল সমাজ দুই দলে বিভক্ত হয়ে আছে, যার ফলে তারা কাজ করতে পারেনি। গত ১৮ মাসে বা অভ্যুত্থানের পরও এমন কোনো ঘটনা ঘটেনি, যাতে বলা যায় সুশীল সমাজ স্বাধীন হয়ে গেছে। হাতে গোনা তিন-চারটি সংগঠন ছাড়া বাকিরা—যেমন বার অ্যাসোসিয়েশন, চিকিৎসক বা শিক্ষকদের সংগঠন—অসম্ভব ক্ষমতাধর হলেও তারা দলীয় বৃত্তেই রয়ে গেছে। এখন হয়তো আওয়ামী লীগের অনুসারীরা কিছুটা আড়ালে চলে যাবেন এবং জামায়াতপন্থিরা প্রথমবারের মতো জোরালোভাবে সামনে আসবেন। কিন্তু ‘আমি এই দলের’ বা ‘ওই দলের’—এই মানসিকতা একই থাকছে। তাই স্বাধীন ভূমিকার সম্ভাবনা আমি খুব কম দেখছি, যা খুবই দুঃখজনক। তবে নতুন প্রজন্মের মধ্যে কিছু সিভিল সোসাইটি প্ল্যাটফর্ম তৈরি হচ্ছে। তারা সাহস করলে কিছুটা ইতিবাচক পরিবর্তন আসতে পারে। বর্তমানের ভীতিহীন পরিস্থিতিতে, অর্থাৎ যতদিন বিএনপি বা বর্তমান সরকার আমাদের কথা বলার সুযোগ দিচ্ছে, ততদিন আমাদের দ্রুত কিছু কাজ করে নিতে হবে। এর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো নতুন সুশীল সমাজের উত্থান ও ক্ষমতায়ন এবং সংস্কার বা রিফর্মগুলোর বাস্তবায়ন নিশ্চিত করা।

এবার বেশ কয়েকজন তরুণ সংসদে যাচ্ছেন? সংসদে তাদের ভূমিকা কী হওয়া উচিত বলে মনে করেন?

ড. মির্জা এম হাসান: তরুণদের প্রধান ভূমিকা হওয়া উচিত রাজনীতির পুরোনো লিখিত ও অলিখিত নিয়মকানুন থেকে বেরিয়ে আসার চেষ্টা করা। তবে আমরা কেবল আশাই করতে পারি। কারণ মানসিকতা পরিবর্তন করা এত সহজ নয়। বিএনপি, জামায়াত বা এনসিপি—সব দলেই তরুণরা আছে, তবে তারা যে পুরোপুরি স্বাধীনভাবে রাজনীতি করতে পারবে, তা নিশ্চিত নয়। তরুণদের সিনিয়র রাজনীতিবিদদের যুক্তি ও নির্দেশ মেনে চলতে হবে। প্রবীণরা হয়তো তাদের বোঝাবেন যে, চাইলেই সবকিছু দ্রুত পরিবর্তন করা যায় না, ধীরে ধীরে এগোতে হয়। তাই তরুণ রাজনীতিবিদদের নিয়ে আমরা যতটা আশাবাদী, অতিরিক্ত প্রত্যাশা করলে ততটাই হতাশ হতে পারি। ফলাফলটি সম্ভবত মিশ্র হবে—কিছুটা পরিবর্তন এবং কিছুটা পুরোনো ধারা। রাজনীতিতে টিকে থাকার স্বার্থেই অনেকে পুরোনো নিয়মে অভ্যস্ত হয়ে পড়েন। এনসিপি ছাড়া অন্য দলগুলোয় নেতৃত্ব এখনো প্রবীণদের হাতেই রয়েছে। তাই বাস্তবতা মেনে নিয়েই আমাদের প্রত্যাশা নির্ধারণ করা উচিত।

বাংলাদেশের গণতন্ত্রকে আরও এগিয়ে নিতে আপনার পরামর্শগুলো কী হবে?

ড. মির্জা এম হাসান: বাংলাদেশের গণতন্ত্রকে শুধু টিকিয়ে রাখা নয়, বরং আরও উজ্জীবিত ও সুদৃঢ় করতে হলে আমাদের বর্তমানের পরোক্ষ বা নির্বাচনী গণতন্ত্রের বাইরে চিন্তা করতে হবে। বর্তমানে আমরা জনপ্রতিনিধির মাধ্যমে শাসিত হই। কিন্তু আমি চাই প্রত্যক্ষ গণতন্ত্র, যেখানে নাগরিক হিসেবে আমি সরাসরি নিজেকে উপস্থাপন করতে পারব। বিশ্বের বহু দেশে এর চর্চা আছে। এর জন্য সাংবিধানিক স্বীকৃতি বা ম্যান্ডেট প্রয়োজন, যাতে আমি রাষ্ট্রের ভেতরে ও বাইরে থেকে সরাসরি সরকার ও আমলাতন্ত্রের জবাবদিহি চাইতে পারি। উদাহরণস্বরূপ, ইউনিয়ন পর্যায়ে ওয়ার্ড সভা বা উন্মুক্ত বাজেট ব্যবস্থা আছে, কিন্তু সেখানে আমরা শুধু কথা বলতে পারি।

প্রত্যক্ষ গণতন্ত্রের জন্য আমাদের শাসনব্যবস্থার ভেতরে ঢুকে জবাবদিহি নিশ্চিত করার এবং প্রয়োজনে ভুল সিদ্ধান্ত আটকে দেওয়ার ক্ষমতা থাকতে হবে। পুলিশ কমিশন বা দুদকের সংস্কার প্রস্তাবে নাগরিকদের প্রত্যক্ষ ভূমিকার কথা কিছুটা বলা হয়েছিল, কিন্তু আমলাতন্ত্রের চাপে তা বাস্তবায়ন করা যায়নি। নির্বাচনী গণতন্ত্রকে অর্থবহ করতে হলে আমাদের প্রত্যক্ষ গণতন্ত্রের উপাদানগুলো যুক্ত করতে হবে। রাজনৈতিক দলগুলো সাধারণত এটা পছন্দ করে না, তাই গণমাধ্যমকে এ বিষয়ে প্রচার চালাতে হবে, যেন জনগণ এ সম্পর্কে সচেতন হয়।

কালবেলা অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন
  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

ইসলামী ব্যাংক নিয়ে বিতর্ক: শেয়ার মালিকানা প্রকাশের দাবি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর

নাসির-তামিমার ভাগ্য নির্ধারণ আজ, দোষ প্রমাণিত হলেই ভয়ঙ্কর পরিণতি

‘ফিল্মি স্টাইলে’ হামলা চালিয়ে পুলিশের হাত থেকে আসামি ছিনতাই

অবশেষে আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির জানাজা-দাফনের সময় জানাল ইরান

বিশ্বকাপের আগেই সুসংবাদ / নেইমারকে নিয়ে ব্রাজিল শিবিরে স্বস্তির বার্তা

মাঝ আকাশে বিমানের জানালার কাচ ভাঙলেন যাত্রী!

আলভারেজকে নিয়ে রিয়ালের ‘মেগা বিড’, প্রত্যাখ্যানের ঘোষণায় চমকে দিল অ্যাটলেটিকো 

সম্পদ-দলীয় প্রতীক সবই হারাচ্ছেন মমতা!

বিমান বাহিনীর ১৩১তম জুনিয়র কমান্ড ও স্টাফ কোর্সের সনদপত্র বিতরণ

চিকিৎসকদের নিয়ে সাংবাদিক মাসুদ কামালের বক্তব্যের নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়েছে ড্যাব

১০

সেনাবাহিনীর সহযোগিতায় চোখে আলো ফিরেছে ৮৪ জনের

১১

বাজেটে মোবাইল, বিদ্যুৎ ও প্রযুক্তিপণ্যে বড় সুখবর

১২

ইসলামী ব্যাংক ইসলাম নয়, মির্জা ফখরুল ইসলামও ইসলাম নয় : স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী

১৩

বিশ্বকাপ উন্মাদনায় দেশের পতাকা থাকুক সবার উপরে

১৪

গাজায় সহিংসতার দায়ে ইসরায়েলি অর্থমন্ত্রীর ওপর ফ্রান্সের নিষেধাজ্ঞা

১৫

ঢাকায় নিখোঁজ জবি শিক্ষার্থীর বাবা, সন্ধান চায় ছেলে

১৬

নতুন রিসাইক্লিং উদ্যোগ / ৯০ শতাংশর বেশি প্লাস্টিক বর্জ্য কমিয়েছে সিঙ্গার বাংলাদেশ

১৭

সরকারি বাঙলা কলেজে অনুষ্ঠিত হচ্ছে প্রাক্তন শিক্ষার্থীদের মিলনমেলা

১৮

বাংলার নদী, বাংলার জীবন : ইতিহাস থেকে বর্তমান অবস্থা

১৯

ইসলামী ব্যাংক ইসলাম নয়, জামায়াতে ইসলামীও ইসলাম নয় : স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী

২০
X