

বাংলাদেশে ১ লাখ ৬১ হাজার কিলোমিটার খাল রয়েছে। বন্যা ও খরা প্রতিরোধ, নদীর প্রবাহ বৃদ্ধিই শুধু নয়, খাল-নদী খনন ও পুনঃখনন এখন সময়ের দাবি। এ কর্মসূচি বাস্তবায়িত হলে দেশের পানিসম্পদের সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা সম্ভব হবে, কৃষিকাজে পানি সরবরাহ বৃদ্ধি পাবে এবং ভূগর্ভে পানির জোগান বাড়বে। এ প্রসঙ্গে একটি কথা স্পষ্টভাবে বলা দরকার, কৃষির জন্য খাল খনন করা প্রয়োজন এবং কৃষি হতে হবে খালনির্ভর, টিউবওয়েল নির্ভর নয়। বিবেচনায় রাখা প্রয়োজন, ভূগর্ভস্থ পানি তোলার তাণ্ডব এরই মধ্যে দেশকে কিন্তু ধ্বংসের দোরগোড়ায় নিয়ে গেছে
মরমি কবি হাছন রাজার বিখ্যাত বাউল গান, ‘কি ঘর বানাইমু আমি শূন্যেরই মাঝার’। এই গানে তিনি সংসারের অনিত্যতা ও শূন্যতায় বিলীন হওয়ার কথা বুঝিয়েছেন। কবির বিবেচনায় দালানকোঠা বা পার্থিব ঘরবাড়ি স্থায়ী নয়। নতুন সরকারের সম্প্রতি আলোচিত খাল খনন উদ্যোগের বিষয়ে খোঁজখবর এবং চিন্তার পরিপ্রেক্ষিতে হাছন রাজার এ গানটি বারবার মনে পড়ছে। কারণ, দখল-দূষণে বাড়তে থাকা উদ্বেগের মধ্যেই খাল খননের উদ্যোগ নেয় তারেক সরকার। তার আনুষ্ঠানিক সূচনাও হয়ে গেল সোমবার। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এদিন দিনাজপুরের কাহারোল উপজেলার সাহাপাড়ায় খাল খনন কর্মসূচির উদ্বোধন করেন। প্রধানমন্ত্রীর খাল পুনঃখননের উদ্বোধনের মাধ্যমে দেশব্যাপী ‘নদী-নালা-খাল ও জলাধার খনন ও পুনঃখনন’ কর্মসূচি বাস্তবায়নের কাজ শুরু হলো। প্রসঙ্গত, শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের সুদূরপ্রসারী কাজগুলোর একটি হচ্ছে খাল খনন। ১৯৭৭ সালে বাংলাদেশের গ্রামীণ উন্নয়ন ও কৃষি পুনরুজ্জীবনের উদ্দেশ্য নিয়ে খাল খনন কর্মসূচি চালু করেছিলেন রাষ্ট্রপতি জিয়া। তিনি দূরদর্শিতা ও বুদ্ধিমত্তায় খাল খনন কর্মসূচির মাধ্যমে একটি যুগান্তকারী মডেল স্থাপন করেন। এ কর্মসূচির মূল লক্ষ্য ছিল বর্ষাকালে অতিরিক্ত পানি ধরে রাখা এবং শুষ্ক মৌসুমে কৃষিকাজে সেচব্যবস্থা নিশ্চিত করে বাংলাদেশকে খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ একটি দেশের মডেল তৈরি করা। পাশাপাশি সহজ যোগাযোগ ও পরিবহন ব্যবস্থা গড়ে তোলাও ছিল খাল খননের অন্যতম উদ্দেশ্য। ‘কাজের বিনিময়ে খাদ্য’ মডেলে পরিচালিত এ উদ্যোগে গ্রামের মানুষ অংশগ্রহণ করেছে। স্বেচ্ছাশ্রমেও অংশ নিয়েছে অনেকে। ফলে এর নানানবিধ সামাজিক প্রভাব তৈরি হয়। এ খাল খনন কর্মসূচি ১৯৭৭ থেকে ১৯৮১ সালের মধ্যে বাংলাদেশের গ্রামীণ উন্নয়ন ও কৃষি সম্প্রসারণে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রেখেছে। এ সময়ে ২৭৯টি প্রকল্পের মাধ্যমে প্রায় দেড় হাজার খাল খনন করা হয়। এ খালের দৈর্ঘ্য ছিল প্রায় ৩ হাজার ৬৩৬ মাইল। এর মাধ্যমে লক্ষাধিক একর জমিকে সেচের আওতায় আনা গেছে। শহীদ জিয়ার খাল খনন কর্মসূচির ফলে শুষ্ক মৌসুমেও কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি পায় এবং গ্রামীণ জনগণের জন্য কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হয়।
এ নিয়ে নানান ধরনের গবেষণা হয়েছে। ডক্টরেটও করেছেন ডাকসাইটের আমলা মহীউদ্দীন খান আলমগীর। পরে তিনি হাসিনা সরকারে মন্ত্রী হন।
আবার খাল খননের ধারা থমকে যেতে সময় লাগেনি। জিয়া নেই তো ভেস্তে গেল খাল কাটা কর্মসূচি এবং কাটার বদলে শুরু হলো খাল দখল। এই দখল প্রক্রিয়া নদী পর্যন্ত ঠেকেছে। আর দখল-দূষণে অনেক নদী হারিয়ে গেছে। কাজেই খালের দশা সহজেই অনুমেয়। এ অবস্থায় দেশের পানি ও কৃষির যখন ত্রাহি দশা তখন বিএনপি গ্রহণ করে খাল খনন কর্মসূচি এবং এটি নির্বাচনী ইশতেহারেও স্থান পায়। আর এখানেই শেষ নয়, কাজও শুরু হয়েছে। গাজীপুরের শ্রীপুরে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের খনন করা চৌক্কার খাল পরিদর্শন শেষে সাংবাদিকদের পানিসম্পদ মন্ত্রী শহীদ উদ্দীন চৌধুরী এ্যানি গত ২ মার্চ জানান, ১৮০ দিনের মধ্যে ১২০০ কিলোমিটার খাল খনন দৃশ্যমান হবে। তিনি স্মরণ করিয়ে দেন, নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী পাঁচ বছরে ২০ হাজার কিলোমিটার খাল খনন বা পুনঃখননের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। মন্ত্রী আরও বলেন, ‘শপথ নেওয়ার এক সপ্তাহও পার হয়নি; দায়িত্ব নেওয়ার পরদিন থেকেই আমরা কাজ শুরু করেছি।’ সাধু! সাধু! কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, খাল খনন করা হবে কোথায়? অনেক খালের তো অস্তিত্বও নেই। এ ক্ষেত্রে তো হাছন রাজার ‘শূন্যেরই মাঝার’ গান খাটবে না। আর যাই হোক, শূন্যের মাঝারে খাল খনন করা যায় না।
যদিও খাল খননের কঠিন বাস্তবতা প্রকারন্তরে মন্ত্রী শহীদ উদ্দীন চৌধুরী জানান দিতে দ্বিধা করেননি। তিনি বলেছিলেন, ‘দীর্ঘদিন ধরে প্রভাবশালী ব্যক্তিরা অবৈধভাবে খাল দখল করে দোকানপাট, বাড়িঘর নির্মাণ করে আসছিলেন।’ একই সময় তিনি আসলে এক ধরনের আপ্তবাক্য উচ্চারণ করেছেন, ‘খাল হলো সরকারের সম্পত্তি এবং এটি শুধু জনসাধারণের প্রয়োজনে ব্যবহৃত হবে।’ বলা বাহুল্য, যাত্রাগানের বিবেকের মতো এ ধরনের ডায়ালগ এর আগে বহুজন, বহুবার উচ্চারণ করেছেন। কিন্তু ওই পর্যন্তই; কাজের কাজ কিছু হয়নি। বরং এ আওয়াজকে পুঁজি করে চাঁদা-বাণিজ্য হয়েছে। এ শুধু খাল দখল করে ভবন-মার্কেট নির্মাণ নয়, খালের প্রবাহের মধ্যে দোকানপাট উচ্ছেদের আওয়াজ দিয়ে চাঁদাবাজির বহু ঘটনা আছে। অনেকেই মনে করেন, খালের পানি প্রবাহের মধ্যে নির্মিত দোকানপাট আগে উচ্ছেদ করতে হবে। তারও আগে প্রয়োজন শহরের খালের আবর্জনা এবং গ্রামের খালের কচুরিপানা পরিষ্কার করা এবং এ দায়িত্ব জেলা প্রশাসন তথা ডিসিকে দিতে হবে। এ ব্যাপারেও একটি গানের কলি স্মরণ করা যেতে পারে, ‘সব ভালো তুই একা বাসিস নে, একটু ভালোবাসতে দিস মোরে!’ সব কাজ শুধু সরকারের ওপরমহল থেকে হবে কেন? সেই ব্রিটিশ আমলের ফরম্যাটে এখনো মহাক্ষমতাধর ডিসিরা কী করেন!
খাল নিয়ে নড়াচড়া অন্তর্বর্তী সরকারও শুরু করেছিল। তবে এটি শুধুই কাগজপত্রে। বাণিজ্যনির্ভর প্রকল্পের আওতায় সারা দেশে ৩০ হাজার খাল চিহ্নিত করতে ৩১ কোটি টাকার প্রকল্প গ্রহণ করেছে পানি উন্নয়ন বোর্ড। সহযোগী সংস্থা হিসেবে কাজ করবে পরিকল্পনা কমিশনের কৃষি, পানিসম্পদ ও পল্লী প্রতিষ্ঠান বিভাগ। ২০২৯ সালের জুনের মধ্যে প্রকল্পটি শেষ করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। অন্তর্বর্তী সরকারের পরিকল্পনা উপদেষ্টা প্রকল্পটি অনুমোদন দিয়ে গেছেন। প্রশ্ন হচ্ছে, দেশের খাল ও নদী চিহ্নিত করতে নতুন করে প্রকল্প গ্রহণ করতে হবে কেন? এটা তো পানি উন্নয়ন বোর্ডের অতি সাধারণ রুটিন কাজ। প্রসঙ্গত, হাসিনা সরকারের সময় পানিসম্পদ উপমন্ত্রী ছিলেন এনামুল হক শামীম। তার অন্যরকম দাপট ছিল। এরপরও দেশের ছোট নদী ও খাল খনন প্রকল্পে লুটপাট সামাল দিতে পারেননি। আর মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে থাকা কর্নেল শামীম ছিলেন কালেক্টর। তিনি প্রধানত অফিস করতেন পানি ভবনে। পানি উন্নয়ন বোর্ড এমনই এক জিনিস! এটি অতিক্ষুদ্র একটি উদাহরণ। পানি উন্নয়ন বোর্ড মানেই সাগর চুরির মহা-আয়োজন। এ সংস্থার ওপর নির্ভর করে খাল খনন করতে গেলে সিনেমার সেই ডায়ালগ বাস্তবও হতে পারে, ‘ও, আমার হইয়ে গিয়েছে!’ এ এক চিন্তার বিষয়। আরও অনেক চিন্তার বিষয় আছে।
পানি উন্নয়ন বোর্ডের হিসাবমতে, দেশে ৩০ হাজারেরও বেশি খাল রয়েছে। কিন্তু বিএস বা আরএস খতিয়ানে অনেক খালের অস্তিত্ব কাজির গোয়ালের গরুর মতো। বহু স্থানে খাল ভরাট করে ভবন, বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান ও অন্যান্য স্থাপনা নির্মাণ করা হয়েছে। এদিকে নদ-নদীর একটি হালনাগাদ তথ্যভান্ডার থাকলেও খাল নিয়ে পূর্ণাঙ্গ ও একীভূত কোনো ডেটাবেজ নেই। ফলে খাল খনন, পুনঃখনন ও রক্ষণাবেক্ষণে বিভিন্ন সংস্থার মধ্যে সমন্বয়ের ঘাটতি ও দ্বৈততা বড় সমস্যাই হয়ে থাকছে। সমন্বিত পানিসম্পদ ব্যবস্থাপনার (আইডব্লিউআরএম) মতে, সারা দেশের খালগুলোর উৎপত্তিস্থল, আউটফল, প্রবাহপথ, বেসিন ও সাববেসিন চিহ্নিত করে একটি জিও-ইনফরমেশন সিস্টেমভিত্তিক খাল নেটওয়ার্ক তৈরি করা দরকার। এর আগে ‘বাংলাদেশের নদ-নদীগুলোর তথ্যাদি হালনাগাদকরণ ও তথ্যপ্রযুক্তিভিত্তিক ব্যবস্থাপনা’ প্রকল্পের মাধ্যমে প্রবাহমান নদীগুলোর তথ্য হালনাগাদ করতে হবে। নতুন খাল প্রকল্পের ডেটাবেজ সেই নদী ডেটাবেজের সঙ্গে সংযুক্ত করার প্রয়োজন রয়েছে।
দেশে এখনো খালের কোনো মানসম্মত শ্রেণিবিন্যাস নেই। ফলে বিভিন্ন সংস্থা অপরিকল্পিতভাবে খাল খনন ও রক্ষণাবেক্ষণ করে আসছে। এতে দ্বৈততা তৈরি হচ্ছে। এক খাল একাধিক সংস্থা কর্তৃক ‘কাগুজি খনন’ তো আছেই। এ অবস্থায় সংশ্লিষ্টরা মনে করেন, একটি স্থায়ী ও তথ্যনির্ভর ডেটাবেজ তৈরি হলে ভবিষ্যতে পানিসম্পদ পরিকল্পনা, বন্যা নিয়ন্ত্রণ, সেচ সম্প্রসারণ ও পরিবেশ সংরক্ষণে দীর্ঘমেয়াদি সুফল মিলবে। সংস্থাভিত্তিক দায়িত্ব স্পষ্ট হলে সমন্বয় বাড়বে এবং অপচয় কমবে বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা।
বাংলাদেশে ১ লাখ ৬১ হাজার কিলোমিটার খাল রয়েছে। বন্যা ও খরা প্রতিরোধ, নদীর প্রবাহ বৃদ্ধিই শুধু নয়, খাল-নদী খনন ও পুনঃখনন এখন সময়ের দাবি। এ কর্মসূচি বাস্তবায়িত হলে দেশের পানিসম্পদের সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা সম্ভব হবে, কৃষিকাজে পানি সরবরাহ বৃদ্ধি পাবে এবং ভূগর্ভে পানির জোগান বাড়বে। এ প্রসঙ্গে একটি কথা স্পষ্টভাবে বলা দরকার, কৃষির জন্য খাল খনন করা প্রয়োজন এবং কৃষি হতে হবে খালনির্ভর, টিউবওয়েল নির্ভর নয়। বিবেচনায় রাখা প্রয়োজন, ভূগর্ভস্থ পানি তোলার তাণ্ডব এরই মধ্যে দেশকে কিন্তু ধ্বংসের দোরগোড়ায় নিয়ে গেছে!
লেখক: জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক