কালবেলা প্রতিবেদক
প্রকাশ : ১৭ মার্চ ২০২৬, ১২:০০ এএম
আপডেট : ১৭ মার্চ ২০২৬, ০৯:৪৯ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ

বাংলাদেশে কুমির চাষের সম্ভাবনা বনাম বিড়ম্বনা

ড. মিহির কান্তি মজুমদার
ছবি : কালবেলা গ্রাফিক্স
ছবি : কালবেলা গ্রাফিক্স

পৃথিবীর ১৯৫টি দেশের প্রায় ৯০টি দেশেই কুমির আছে। তবে সব শ্রেণির কুমিরের তেমন চাহিদা নেই, লালনপালনও নেই। বাণিজ্যিকভাবে কুমির চাষ এবং আন্তর্জাতিক বাজারে একটি শিল্প হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে শুধু লোনা পানির কুমির। আর লোনা পানির কুমির চাষের দেশ খুবই সীমিত। ৮-৯টি দেশের এ সুযোগ আছে। বাংলাদেশ এর মধ্যে অন্যতম। নানামুখী বিড়ম্বনার কারণে এটি যেমন জনপ্রিয় হয়নি, তেমনি সম্প্রসারণ ঘটেনি। বিজ্ঞানীদের সর্বশেষ শনাক্তকৃত তালিকা অনুযায়ী, পৃথিবীতে ২৮ প্রজাতির কুমির আছে। এর মধ্যে লোনা পানির কুমির, নীল নদের কুমির (নাইল ক্রোকোডাইল) তথা Crocodylus বা আসল কুমিরের বর্গের ১৮টি প্রজাতি আছে। অ্যালিগেটর বর্গের আছে ৮টি প্রজাতি এবং ঘড়িয়ালের আছে ২টি প্রজাতি।

আসল বর্গের কুমির এশিয়া, আফ্রিকা, আমেরিকা ও অস্ট্রেলিয়ায় পাওয়া যায়। এদের ‘ভি’ (ঠ) আকৃতির মুখ এবং নিচের পাটির চতুর্থ দাঁত বাইরে দৃশ্যমান থাকে, যা এলিগেটর থেকে আলাদা। নীল নদের কুমির ও অ্যালিগেটরের বাণিজ্য আছে আন্তর্জাতিক বাজারে। তবে বিলাসজাত পণ্য তৈরিতে লোনা পানির কুমিরের ধারেকাছে তারা নেই। লোনা পানির কুমির ছাড়া অন্য সব প্রজাতির কুমিরের পেটের চামড়ার আঁশের নিচে ছোট ছোট হাড় থাকে। এ হাড় থাকার কারণে চামড়া ট্যানিং ভালো হয় না। সেলাই করার সময় ফেটে যায় এবং চামড়াজাত পণ্য ফেটে যায় বলে বেশি দিন ব্যবহার করা যায় না। আবার চামড়া কোমল ও মসৃণ হয় না, তাই বিলাসদ্রব্য তৈরি করাও যায় না।

লোনা পানির কুমির তাই বিলাসদ্রব্য উৎপাদনকারী দামি ব্র্যান্ডের কাছে খুবই আকর্ষণীয়। কারণ, এ প্রজাতির কুমিরের পেটের চামড়ার নিচের আঁশগুলো ছোট ছোট বর্গাকৃতির, যা সুদৃশ্য এবং সামঞ্জস্যপূর্ণ। কাজেই পেটের চামড়া অত্যন্ত মসৃণ, নমনীয় ও টেকসই হওয়ার পাশাপাশি ছোট সুদৃশ্য বর্গাকৃতির সামঞ্জস্যপূর্ণ আঁশের কারণে লোনা পানির কুমিরের চামড়া এবং উৎপাদিত পণ্য অত্যন্ত আকর্ষণীয়। সে কারণে ফ্রান্স ও ইতালির নামকরা ফ্যাশন ব্র্যান্ড যেমন—হার্মিস, লুই ভিটন বা গুচি এদের কাছে এ প্রজাতির কুমিরের চামড়া খুবই দামি।

বাণিজ্যিকভাবে নীল নদের কুমির আফ্রিকার চামড়া শিল্পের প্রধান উৎস। আমেরিকান এলিগেটরের চামড়াও ব্যবহৃত হয় ঘড়ির বেল্ট ও বুট জাতীয় পণ্য উৎপাদনের জন্য। দক্ষিণ আমেরিকায় অ্যালিগেটর এবং ওই প্রজাতির কাইমেন খুব বেশি পাওয়া যায়। তবে আঁশের নিচে হাড়ের উপস্থিতির কারণে এর চামড়া বেশ শক্ত এবং পণ্য টেকসই হয় না। বিলাসদ্রব্য তৈরিও হয় না একই কারণে। কাইমেনের চামড়া দিয়ে তৈরি একটি মানিব্যাগের দাম যেখানে সর্বোচ্চ ১৫০ ডলার, সেখানে লোনা পানির কুমিরের চামড়া দিয়ে তৈরি একটি মানিব্যাগের দাম সর্বনিম্ন ৪০০ থেকে ১০০০ ডলার।

বিশ্ববাজারে গুণগত মান, চাহিদা ও মূল্যের কারণে লোনা পানির কুমিরের চাষ শুধু বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ নয়, এটি মাল্টিবিলিয়ন ডলারের শিল্পে রূপান্তরিত হয়েছে। লোনা পানির কুমির যেমন সব দেশে নেই, তেমনি প্রকৃতিতে পর্যাপ্ত কুমির না থাকায় এ প্রজাতির কুমির চাষ করে রপ্তানি বাণিজ্যে তাদের অংশগ্রহণের সুযোগও নেই। আমাদের প্রতিবেশী ভারতের প্রকৃতিতে এ প্রজাতির পর্যাপ্ত কুমির নেই। কাজেই, সেখানে চাষ করার পর্যাপ্ত সুযোগ থাকার পরও তারা আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে অংশগ্রহণ করতে পারে না। কুমির সংরক্ষণের প্রয়োজনে কুমির বা বন্যপ্রাণী-সংক্রান্ত আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে CITES (Convention on International Trade in Engendered Species of Wild Fauna and Flora) নামক সংস্থার সার্টিফিকেট প্রয়োজন হয়। প্রকৃতিতে সংশ্লিষ্ট প্রজাতির পর্যাপ্ত কুমিরের অনুপস্থিতি থাকলে সাইটিস সার্টিফিকেট পাওয়া যায় না, তাই অধিকাংশ দেশ লোনা পানির কুমির চাষ করে কুমিরের চামড়া, মাংস, হাড় ও অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ রপ্তানি করতে পারে না। এ সুযোগ আছে অস্ট্রেলিয়া, পাপুয়া নিউ গিনি ও দক্ষিণ এশিয়ার থাইল্যান্ড, ভিয়েতনাম, ইন্দোনেশিয়া, কম্বোডিয়া, মালয়েশিয়া ও বাংলাদেশের। থাইল্যান্ডের এক হাজারেরও বেশি কুমির খামারে ১২ লাখের বেশি কুমির আছে। প্রায় ৬০ হাজার কুমিরের সমন্বয়ে বিশ্বের সবচেয়ে বড় সমুত প্রাকান কুমির ফার্ম থাইল্যান্ডে। প্রায় ৪০ হাজার কুমির সংবলিত দ্বিতীয় বৃহত্তম ফার্ম পাপুয়া নিউগিনির মেইনল্যান্ড হোল্ডিংস। কম্বোডিয়ায় ৯০০ খামারের কুমিরের সংখ্যা তিন লাখের বেশি। ভিয়েতনামের এক হাজার কুমির খামারে পাঁচ লাখের বেশি কুমির আছে। ভিয়েতনাম শুধু ২০১৯ সালে চীনে এক লাখ কুমির রপ্তানি করেছে। বাংলাদেশে কুমির খামার আছে মাত্র দুটি। একটির মালিক উদ্দীপন নামের উন্নয়ন সংস্থা। এটি বাংলাদেশের প্রথম কুমির খামার। কুমির আছে বর্তমানে ছোট-বড় মিলিয়ে চার হাজারের বেশি। অন্যটির মালিক আকিজ গ্রুপ।

অস্ট্রেলিয়া ও পাপুয়া নিউ গিনির প্রকৃতিতে কুমির অনেক বেশি। তারা র্যাঞ্চিং পদ্ধতিতে কুমির লালনপালন করে ও রপ্তানি বাণিজ্যে অংশ নেয়। র্যাঞ্চিং পদ্ধতিতে ডিম সংগ্রহের মাধ্যমে যেমন হাজার মানুষের কর্মসংস্থান হয়, তেমনি কুমিরের আবাসস্থল সংরক্ষণ হয়। নিয়ন্ত্রিত পরিবেশে সে ডিম ফুটিয়ে বাচ্চা তৈরি করে কুমির চাষ করা হয়। অন্যান্য দেশে সম্পূর্ণভাবে নিয়ন্ত্রিত খামারে চাষ ও লালনপালন হয়। কুমিরের মাংসের খুবই চাহিদা। উচ্চ প্রোটিনযুক্ত এ মাংসে কোলেস্টেরল অত্যন্ত কম। চীন ও হংকংয়ে চাহিদা প্রচুর। বর্তমানে হালাল সার্টিফিকেটের মাধ্যমে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে এর বাজার সম্প্রসারিত হচ্ছে। কুমিরের রক্তে ক্রোকোডিলিন নামের ব্যাকটেরিয়াল উপাদান থাকায় এর চাহিদা বাড়ছে। কুমিরের তেল কসমেটিকস ও এর ওষুধ তৈরিতে ব্যবহৃত হয়। দাঁত, হাড় ও অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ ট্র্যাডিশনাল চীনা ওষুধের ব্যবহার হচ্ছে সেই প্রাচীনকাল থেকে। বর্তমানে ব্লক চেইন প্রযুক্তির মাধ্যমে প্রতিটি লোনা পানির কুমিরের চামড়া কোন দেশের কোন খামারে উৎপাদিত হয়েছে, তা নিশ্চিত করা যায়। চামড়ার ট্রেসেবিলিটি নিশ্চিত হওয়ার কারণে এর মূল্য বাড়ছে। প্রতি বছর কুমিরের আন্তর্জাতিক বাজার সম্প্রসারণ ঘটছে। সংশ্লিষ্ট খাতের বিশেষজ্ঞদের মতে, ২০৩৩ সালে এ খাতের আন্তর্জাতিক বাজার ১৯.২ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছাবে। বাংলাদেশসহ ৮-৯টি দেশের এ সুযোগ থাকলেও সেখানে আমাদের প্রবেশ প্রায় নেই। বরং বিড়ম্বনা অনেক।

বাংলাদেশে মাগার নামে পরিচিত মিঠা পানির কুমির, লোনা পানির কুমির ও ঘড়িয়াল—এ তিন প্রকারের কুমির আছে। প্রকৃতিতে মিঠা পানির কুমির এখন নেই। ৫-৬টি আছে চিড়িয়াখানা ও সাফারি পার্কে। ঘড়িয়ালের আবাসস্থল যমুনা ও পদ্মা নদীতে হলেও প্রকৃতিতে খুব নেই। ঘড়িয়াল প্রজননের উপযোগী পদ্মার রাজশাহী পয়েন্টে মাঝেমধ্যে ছোট আকারের ঘড়িয়াল জেলেদের জালে ধরা পড়ে। এদের অধিকাংশের ঠাঁই হয় চিড়িয়াখানা ও সাফারি পার্কে। রংপুর, রাজশাহী ও ঢাকার চিড়িয়াখানা এবং দুটি সাফারি পার্কে ১০ থেকে ১২টি ঘড়িয়াল আছে। তবে অপর্যাপ্ত সুবিাধার কারণে ডিম ফোটানো যায়নি। লোনা পানির কুমির শুধু সুন্দরবনের নদী-খালে আছে। বন বিভাগের ২০১০ সালের সার্ভে অনুযায়ী, সুন্দরবনে ১২০ থেকে ১৩০টি লোনা পানির কুমির আছে। অথচ সুন্দরবনে কুমির প্রয়োজন আরও অনেক বেশি। ২০০৪ সালের প্রতিবেদন অনুযায়ী, এর সংখ্যা ছিল প্রায় তিনশ। সুন্দরবন এলাকার সরকারি অনুমোদনে চামড়া রপ্তানির জন্য ১৯৫০-এর দশকে দুই থেকে তিন হাজার কুমির হত্যা করা হয়। সুন্দরবনের করমজল পয়েন্টে ২০০০ সালে লোনা পানির কুমির প্রজনন কেন্দ্র তৈরি করা হয়। এ কেন্দ্র শিক্ষা, গবেষণা ও পর্যটনে ভূমিকা রাখে। কুমির প্রকৃতিতে ছাড়াও হয়। পদ্মাও যমুনায় ঘড়িয়াল ছাড়া প্রয়োজন। আমাদের প্রকৃতির জলাশয়ের সর্বোচ্চ খাদক এই কুমির ও ঘড়িয়াল। এরা বড় রাক্ষুসী মাছ খেয়ে ছোট মাছের বংশ বিস্তারে অবদান রাখে। অন্যদিকে, রোগাক্রান্ত ও মরা মাছ এবং মরা জীবজন্তু খেয়ে জলাশয়ের ইকোসিস্টেম মানসম্মত রাখে।

পুরুষ কুমিরের দ্রুত বৃদ্ধি ঘটে এবং এর মাংসের চাহিদা বেশি। কুমিরের মাংসের দামও খুব চড়া। এক কেজি মাংসের দাম ২০০০ ডলার বা ২৫ হাজার টাকা। অন্যদিকে, অত্যন্ত মসৃণ হওয়ায় মেয়ে কুমিরের চামড়ার চাহিদা বেশি। ডিম ফোটানোর যন্ত্র নিয়ন্ত্রণ করে খামার মালিক কোন কুমির বেশি তৈরি করবেন—তা নির্ধারণ করতে পারবেন। ডিম ফোটানোর তাপমাত্রা ৩০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের নিচে রাখলে অধিকাংশ মেয়ে কুমির হবে। অন্যদিকে, তাপমাত্রা এর ওপরে রাখলে পুরুষ কুমির হবে। কাজেই, প্রকৃতিতে ছাড়া এবং আন্তর্জাতিক বাজারে চামড়া, মাংস, হাড়, দাঁতসহ অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের বাজারের চাহিদা অনুযায়ী খামারে পুরুষ বা মেয়ে কুমিরের উৎপাদন করার সুযোগ আছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সুদমুক্ত ইইএফ ফান্ডে বাংলাদেশে ময়মনসিংহের ভালুকায় ২০০৪ সালে প্রথম কুমির চাষ শুরু হয়। পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয়ের কোনো বিধিবিধানের অনুপস্থিতিতে দুটি প্রধান শর্তে খামারের অনুমোদন দেয়। প্রকৃতি থেকে ডিম বা কুমির আহরণ করা যাবে না এবং প্রকৃতিতে কুমির ছাড়া যাবে না। নিরলস প্রচেষ্টা ও আগ্রহে মালয়েশিয়া থেকে ৭৫টি (১৫টি মেয়ে ও ৬০টি পুরুষ) কুমির আমদানি করে বাংলাদেশে এ প্রথম খামার গড়ে ওঠে। কিন্তু কোম্পানির পার্টনারদের মধ্যে মতপার্থক্য থাকায়, উদ্যোক্তা মোস্তাক আহমেদ খামার বিক্রি করতে বাধ্য হন। ক্রেতা গোষ্ঠী খামার নিয়ে খুব অগ্রসর হতে পারেনি। দক্ষ কর্মীর অভাবে ভালোমানের চামড়া ছাড়াতে পারেনি। অপর্যাপ্ত কুমিরের জন্য মাংস ও অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ পুঁতে ফেলতে হয়েছে বন বিভাগের নির্দেশে। সাধারণত এক হাজারের নিচে কুমিরের সংখ্যা থাকলে মাংস রপ্তানির ক্রেতা পাওয়া যায় না। সে কারণে খামার থেকে এ পর্যন্ত ৬৭টি জীবিত কুমির জার্মানিতে গবেষণার জন্য রপ্তানি হয়। আর জাপানে ৮৩০টি চামড়া রপ্তানি হয়েছে। মাংস ও অন্যান্য অঙ্গ নষ্ট হওয়ায় খামার লাভের মুখ দেখেনি কখনো। দ্বিতীয় কুমির খামারের মালিক আকিজ গ্রুপ। ২০০৯ সালে খামারের অনুমোদন নিয়ে রাঙামাটির নানিয়ারচরে খামার তৈরি করলেও বিভিন্ন কারণে এ শিল্পগোষ্ঠীও অগ্রসর হতে পারেনি। আর পূর্ববর্তী দুই খামারের অবস্থা দেখে আর কোনো তৃতীয় উদ্যোক্তা এ পথে হাঁটেনি।

বর্তমানে দুটি খামারের কোনোটিরই লাইসেন্স নবায়ন করা সম্ভব হয়নি। পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয় ২০১৯ সালে কুমির লালন-পালন বিধিমালা জারি করে। এ বিধিমালার ৭(১) বিধি অনুযায়ী প্রত্যেক কুমিরের জন্য বন বিভাগে এক হাজার টাকা হিসাবে বাৎসরিক পজেশন ফি দিতে হবে। না হলে লাইসেন্স নবায়ন হবে না বা নতুন লাইসেন্স হবে না। ভালুকার কুমিরের খামারে এখন কুমিরের সংখ্যা ছোট-বড় মিলিয়ে প্রায় সাড়ে চার হাজার। ডিম ফুটিয়ে কুমিরের সংখ্যা প্রতি বছর দেড় থেকে দুই হাজার বৃদ্ধির সুযোগ আছে। অথচ কুমির প্রতি বাৎসরিক এক হাজার টাকার পজেশন ফি কেন দিতে হবে বোধগম্য নয়। নিজের খামারে কুমির উৎপাদন করবে লাইসেন্স নিয়ে। লাইসেন্স ফি দিলেও এত অঙ্কের পজেশন ফি দেওয়া কোনো ফার্মের পক্ষে সম্ভব নয়। কুমির চাষে অগ্রগামী কোনো দেশে এরূপ চড়া ফি নেই। অন্যদিকে, ওই বিধিমালার ১১(১) বিধি অনুযায়ী, শুধু সাইটিস রেজিস্ট্রিকৃত খামার থেকে কুমির বা কুমিরজাত পণ্য আমদানি বা রপ্তানি করতে হবে। এটি এখনই পালন করা সম্ভব নয়। সাইটিস রেজিস্ট্রিভুক্ত খামারের চামড়ার মূল্য বেশি। কিন্তু এর জন্য কাঠখড় পোড়াতে হয় অনেক। লাগে অনেক প্রস্তুতি ও ব্যয়, যা প্রথম পর্যায়ে সম্ভব নয়। থাইল্যান্ড কুমির চাষে পৃথিবীতে সেরা। তাদের এক হাজারের বেশি কুমির খামার মাত্র ২৬টি সাইটিস রেজিস্ট্রি সম্ভব হয়েছে। অন্য ফার্মগুলো সাইটিস সার্টিফিকেট নিয়ে রপ্তানি করে।

খেলাপি ঋণের কারণে একটি আর্থিক প্রতিষ্ঠান ভালুকায় অবস্থিত কুমির খামারের ছোট-বড় ২ হাজার ৪৫৮টি কুমিরসহ খামারের স্থাবর/অস্থাবর সম্পত্তি পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি দিয়ে বিক্রি করেছে। চিড়িয়াখানা ও সাফারি পার্কের ঘড়িয়াল থেকে ডিম সংগ্রহ করে ফুটিয়ে প্রকৃতিতে ছাড়া যায়। প্রকৃতিতে কুমির ও ঘড়িয়াল ছাড়তে পারলে ইকোসিস্টেম সংরক্ষণ হয় ও ছোট মাছের উৎপাদন বাড়ে। জেলেদের জীবন ও জীবিকা উন্নয়ন এবং কুমির/কুমিরজাত পণ্য রপ্তানির সম্ভাবনা দেখে উদ্দীপন ওই খামার ক্রয় করে। খামারের ১৩.৪ একর জমি উদ্দীপনের নামে নাম জারি হয়। টাকা পরিশোধ করা হয় আর্থিক প্রতিষ্ঠানে। কিন্তু প্রথমে বাধা দেয় মাইক্রোক্রেডিট রেগুলেটরি অথরিটি (এমআরএ)। তাদের অনুমোদন নিয়ে ক্রয় করা হয়নি বলে তারা খামার বিক্রি করার নির্দেশনা দেয়। দ্বিতীয় বাধা হিসেবে আবির্ভূত হন অবসরপ্রাপ্ত একজন সচিব। তিনি অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে ৯০ দিনের জন্য উদ্দীপনে প্রশাসক হিসেবে এসেছিলেন। ১৯৭৭ ব্যাচের সুনামধারী কর্মকর্তা। জেলা ম্যাজিস্ট্রেটের দায়িত্ব পালন করেছেন। দায়িত্ব ছিল এ সময়ে নির্বাচনের মাধ্যমে উদ্দীপনে পরিচালনা পর্ষদ গঠনের। কিন্তু এখানে এসে দরপত্রের মাধ্যমে কেনা কুমির খামারে দুর্নীতির গল্প আবিষ্কার করেছেন। তিনি নিজে কুমির খামার পরিদর্শন করেছেন। খামারে ছোট-বড় মিলিয়ে প্রায় সাড়ে চার হাজার কুমির আছে। অথচ কুমির খামার ভুয়া প্রকল্প বলে উদ্দীপন পরিচালনা পর্ষদ সদসদের বিরুদ্ধে দুটি মামলা করা হয়েছে। একটি দুর্নীতি দমন কমিশনে। অন্যটি চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট, ঢাকার আদালতে। তিনি জানেন এটি ডাবল জিওপার্ডি। ফৌজদারি কার্যবিধি অনুযায়ী হয় না। কিন্তু ৪০ বছরের পুরোনো উদ্দীপন দখলের মোহে তিনি এ কাল্পনিক দুর্নীতির গল্প সাজিয়েছেন। তিনি উদ্দীপনের গঠনতন্ত্র বিরতিহীনভাবে ভঙ্গ করে উদ্দীপনের প্রতিষ্ঠাতাসহ অভিজ্ঞদের উদ্দীপনের সাধারণ পর্ষদে বাদ দিয়েছেন। ৩১ জনের সাধারণ পর্ষদে ১৬ জন অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মকর্তাকে অন্তর্ভুক্ত করেছেন। তাদের মাধ্যমে উদ্দীপন পরিচালনা পর্ষদ গঠন করেছেন। ৯০ দিনের মেয়াদ থাকলেও ১৩ মাস থেকেছেন। সাতবার মেয়াদ বাড়িয়েছেন। অস্ত্র ছিল অন্তর্বর্তী সরকারের উচ্চপর্যায়ে নিবিড় যোগাযোগ। উন্নয়ন সংস্থায় কাজের অভিজ্ঞতাবিহীন অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মকর্তাদের মাধ্যমে তিনি উদ্দীপনকে সরকারি কর্মকর্তা ক্লাবে রূপান্তরিত করেছেন। ফলে যা হওয়ার তাই হয়েছে। এক হাজারের বেশি শাখা নিয়ে দেশের প্রথম সারির উন্নয়ন সংস্থা উদ্দীপন মুখ থুবড়ে পড়ার উপক্রম হয়েছে। সঙ্গে দেশের প্রথম কুমির খামার। সে এক লম্বা কাহিনি।

যা হোক, এ দেশে কুমির খামার সৃষ্টির আছে অনেক সম্ভাবনা। তবে সম্ভাবনার চেয়ে এখন বিড়ম্বনার পাল্লা ভারী। কম্বোডিয়ার মতো ছোট দেশেও ৯০০-এর বেশি খামার। আমাদের মাত্র দুটি, তাও প্রায় অচল। শিক্ষা, গবেষণা ও পর্যটনে ভূমিকার পাশাপাশি রপ্তানি বাণিজ্যে অংশ নেওয়ার সুযোগ অনেক। প্রকৃতিতেও ঘড়িয়াল ও কুমির ছাড়ার সুযোগ আছে। এজন্য প্রয়োজন কুমির লালনপালন বিধিমালা সংশোধন। পাশাপাশি অন্যান্য আর্থিক ও প্রশাসনিক সহযোগিতা। সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও কর্তৃপক্ষ আশা করি ভেবে দেখবেন।

লেখক: সাবেক সচিব

কালবেলা অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন
  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

আ.লীগ-ছাত্রদল সংঘর্ষ : ছাত্রলীগের ৮৪ নেতাকর্মী গ্রেপ্তার

অংশীজনদের নিয়ে আইসিএবি জনস্বার্থ ফোরামের যাত্রা শুরু

অজিদের বিপক্ষে ইতিহাস গড়ে জিতলো বাংলাদেশ

বিচারককে হাইকোর্টে তলব / হবিগঞ্জে ৫ বছরেও শেষ হয়নি ‘ধর্ষণ ও হত্যা’ মামলার বিচার

নকল ও ভেজাল খাদ্যের বিরুদ্ধে অভিযান অপ্রতুল : বিএসটিআইকে ক্যাব

ইরান ও হুথিদের পদক্ষেপের প্রশংসায় হিজবুল্লাহ

মিরপুরে বৃষ্টির হানা, খেলা না হলে কে জিতবে?

শেষ ম্যাচে তারকাবহুল দল নিয়ে নামছে আর্জেন্টিনা

ইসরায়েলি হামলায় লেবাননে নিহত বেড়ে ৩,৬৬৬

স্থায়ী যুদ্ধক্ষেত্রে পরিণত হচ্ছে লেবানন

১০

বাজেটে বেতন নিয়ে সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য সুখবর

১১

রাজশাহীতে বাড়ছে ডেঙ্গু উদ্বেগ

১২

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অধীনে চাকরি, এসএসসি পাসেই আবেদন

১৩

চার খাতে অতিরিক্ত ৪২৬০০ কোটি টাকা ভর্তুকির চাপ : অর্থমন্ত্রী

১৪

তাপপ্রবাহ নিয়ে নতুন বার্তা

১৫

তিন নতুন জিরো : ইউনূস সরকারের তিক্ত প্রাপ্তি

১৬

অভিজ্ঞতা ছাড়াই সিটি ব্যাংকে চাকরি, আবেদন অনলাইনে

১৭

ইনজুরিতে বিশ্বকাপ শেষ এক ডাচ ডিফেন্ডারের

১৮

ডিজিটাল মাধ্যমেও নারী-শিশুরা নিরাপদ নয় : নিপুণ রায় 

১৯

বকেয়া পৌরকরে ১৫ শতাংশ সারচার্জ মওকুফের ঘোষণা ডিএসসিসি প্রশাসকের

২০
X