

বাজারে আজ এক অদ্ভুত বাস্তবতা দেখা যাচ্ছে। অনেক নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম কমেছে। পেঁয়াজ, ডিম ও আলুর মতো পণ্যের দাম কমে যাওয়ায় সাধারণ ভোক্তার জন্য এটি নিঃসন্দেহে স্বস্তির। বাজারে গেলে আগের তুলনায় কিছুটা কম খরচে নিত্যপণ্য কেনা যাচ্ছে। স্বাভাবিকভাবেই মানুষ মনে করে দাম কমলে জীবন কিছুটা সহজ হয়। কিন্তু এ দৃশ্যের আরেকটি দিকও রয়েছে। যে মানুষটি এ পণ্যগুলো উৎপাদন করেন, সেই কৃষক বা খামারির জীবনে তখন কী ঘটে? বাজারে পণ্যের দাম কমলে ভোক্তা যেমন স্বস্তি পান, উৎপাদক কৃষক বা খামারি অনেক সময় ততটাই বিপদে পড়েন। কারণ, পণ্যের দাম কমলেও উৎপাদন খরচ কমে না; বরং অনেক ক্ষেত্রেই তা ক্রমাগত বাড়তেই থাকে। ফলে এমন পরিস্থিতি তৈরি হয় যখন কৃষক নিজের উৎপাদিত ফসল বিক্রি করেও উৎপাদন ব্যয় তুলতে পারেন না। তখন পণ্যের দাম কমে, কিন্তু কৃষকের জীবনের মূল্য যেন আরও কমে যায়।
কৃষক ও ভোক্তা এ দুই শ্রেণিই রাষ্ট্রের অর্থনীতি ও সামাজিক ভারসাম্যের প্রধান ভিত্তি। অথচ বছরের পর বছর ধরে কৃষিপণ্যের দামের যে অস্থির চিত্র আমরা দেখে আসছি, তা এখন আর শুধু মৌসুমি সমস্যা নয়; ধীরে ধীরে এটি একটি কাঠামোগত সংকটে পরিণত হয়েছে। এ সংকটের কেন্দ্রে রয়েছে কৃষিপণ্যের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে কার্যকর নীতির ঘাটতি এবং দুর্বল বাজারব্যবস্থা। উৎপাদন বাড়লেও বাজার কাঠামোর দুর্বলতার কারণে কৃষক অনেক সময় সেই উৎপাদনের ন্যায্য মূল্য পান না।
ধরা যাক, বাংলাদেশ আজ বিশ্বের অন্যতম শীর্ষ আলু উৎপাদনকারী দেশ। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, দেশে প্রায় ৫ লাখ হেক্টর জমিতে আলু চাষ হয় এবং বছরে উৎপাদন দাঁড়ায় প্রায় ১ কোটি ১০ থেকে ১ কোটি ২০ লাখ টন। উৎপাদনের দিক থেকে বাংলাদেশ বিশ্বের প্রথম দশটি দেশের একটি। কিন্তু এ সাফল্যের আড়ালে লুকিয়ে আছে কৃষকের লোকসানের কঠিন বাস্তবতা। মাঠপর্যায়ের হিসাবে এক হেক্টর জমিতে আলু চাষ করতে প্রায় ২ লাখ ৮০ হাজার থেকে ৩ লাখ ২০ হাজার টাকা পর্যন্ত ব্যয় হয়। বীজ, সার ও কীটনাশক, সেচ, জমি প্রস্তুত, যন্ত্রভাড়া এবং শ্রমিক মজুরি মিলিয়ে এ ব্যয় দ্রুত বেড়ে যায়। গড় হিসাবে এক হেক্টর জমিতে আলুর উৎপাদন হয় প্রায় ২১ থেকে ২৪ টন, অর্থাৎ প্রায় ২১ হাজার থেকে ২৪ হাজার কেজি। সেই হিসেবে কেজিপ্রতি উৎপাদন খরচ পড়ে প্রায় ১৫ থেকে ১৮ টাকা। অথচ অনেক সময় কৃষককে আলু বিক্রি করতে হয় মাত্র ১০ থেকে ১২ টাকায়। অর্থাৎ, প্রতি কেজিতে প্রায় ৫ থেকে ৮ টাকা পর্যন্ত লোকসান হয়। এই হিসাবে এক হেক্টর জমিতে আলু চাষে কৃষকের মোট লোকসান দাঁড়াতে পারে প্রায় ১ লাখ ৫ হাজার থেকে ১ লাখ ৯০ হাজার টাকা পর্যন্ত। চলতি মৌসুমে বগুড়া, রংপুর ও দিনাজপুরের পাইকারি বাজারে গ্র্যানুলা আলু মণপ্রতি মাত্র ১৭০ থেকে ২০০ টাকায় বিক্রি হয়েছে। পরিবহন ও আড়ত খরচ বাদ দিলে কৃষকের হাতে আসে আরও কম অর্থ।
এ সংকট শুধু আলুর মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। পেঁয়াজ চাষের ক্ষেত্রেও একই বাস্তবতা দেখা যায়। কৃষি কর্মকর্তাদের তথ্য অনুযায়ী, প্রতি বিঘা জমিতে পেঁয়াজ উৎপাদনে প্রায় ২৫ হাজার থেকে ৩০ হাজার টাকা পর্যন্ত ব্যয় হয়। বীজ, সার, কীটনাশক, সেচ ও শ্রমিক মজুরি মিলিয়ে খরচ ক্রমেই বাড়ছে। গড় হিসাবে প্রতি বিঘায় উৎপাদন হয় প্রায় ৮০০ থেকে ১ হাজার কেজি। ফলে কেজিপ্রতি উৎপাদন খরচ দাঁড়ায় প্রায় ৩০ থেকে ৩৫ টাকার মতো। অথচ মৌসুমে অনেক কৃষককে পেঁয়াজ বিক্রি করতে হয়েছে ২০ থেকে ২৫ টাকায়। অর্থাৎ, প্রতি কেজিতেই লোকসান গুনতে হয়েছে। ডিম উৎপাদনের ক্ষেত্রেও পরিস্থিতি খুব আলাদা নয়। খামারিদের হিসাবে বর্তমানে একটি ডিম উৎপাদনে গড়ে সাড়ে ১০ থেকে ১১ টাকা পর্যন্ত খরচ হয়। কিন্তু অনেক সময় বাজারে ডিম বিক্রি করতে হয়েছে ৮-৯ টাকায়। ফলে ক্ষুদ্র ও মাঝারি খামারিরা বড় ধরনের আর্থিক সংকটে পড়েছেন এবং অনেকেই খামার বন্ধ করতে বাধ্য হয়েছেন।
এ সংকটকে আরও গভীর করে তোলে কৃষকের অর্থায়নের বাস্তবতা। অধিকাংশ ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষক চাষাবাদের মূলধন জোগাড় করেন ঋণের মাধ্যমে। কেউ এনজিও বা সমবায় সমিতি থেকে, কেউ আবার মহাজনের কাছ থেকে উচ্চ সুদে টাকা নিয়ে ফসল ফলান। মৌসুম শেষে যদি বাজারদর উৎপাদন খরচের নিচে নেমে যায়, তখন লাভ তো দূরের কথা; মূলধন ফেরত পাওয়াই অনিশ্চিত হয়ে পড়ে। অনেক সময় কৃষককে গরু, জমি কিংবা অন্য সম্পদ বিক্রি করে ঋণ শোধ করতে হয়। অর্থাৎ, বাজারে পণ্যের দাম কমে আর কৃষকের সম্পদের দামও তখন কমে যায়। অর্থনীতির ভাষায় বিষয়টি সহজ। যখন উৎপাদন বাড়ে, বাজারে সরবরাহ বৃদ্ধি পায় এবং পণ্যের দাম কমে যায়। এতে ভোক্তারা স্বস্তি পান, কিন্তু ক্ষুদ্র কৃষকের ব্যক্তিগত অর্থনীতি তখন ভেঙে পড়তে পারে, কারণ তার উৎপাদন খরচ আর উঠে আসে না।
অন্যদিকে যখন বাজারে পণ্যের দাম হঠাৎ বেড়ে যায়, তখনো কৃষক সবসময় সেই সুফল পান না। সেই সময়ে লাভের বড় অংশটি চলে যায় মধ্যস্বত্বভোগী, আড়তদার ও পাইকারদের হাতে। কৃষকের ঘরে তখন আর সেই পণ্য থাকে না; ফলে বাজারের বাড়তি দামের সুবিধা তিনি খুব কমই পান। সমস্যার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো সংরক্ষণ সুবিধার সীমাবদ্ধতা। দেশে কোল্ড স্টোরেজ থাকলেও সেখানে আলু সংরক্ষণের ভাড়া অনেক কৃষকের জন্য ব্যয়বহুল। প্রতি বস্তা আলু রাখতে মৌসুম শেষে ৩৫০ থেকে ৪৫০ টাকা পর্যন্ত খরচ হয়। ফলে অনেক কৃষক বাধ্য হয়ে মৌসুমেই কম দামে ফসল বিক্রি করে দেন।
এ বাস্তবতা শুধু অর্থনীতির একটি পরিসংখ্যান নয়; এটি গ্রামীণ জীবনের এক নিঃশব্দ বেদনার গল্প। মাঠের পর মাঠ সবুজ ফসল ফলানো মানুষটির চোখের জল আমরা খুব কমই দেখি। বাজারে দাম বাড়লে আমরা বিরক্ত হই, কিন্তু দাম কমে গেলে যে কৃষকের ঘরে অন্ধকার নেমে আসে, সেই গল্পটি খুব কমই আলোচনায় আসে। তাই প্রশ্নটি এখন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ভোক্তার স্বস্তি নিশ্চিত করতে গিয়ে আমরা কি উৎপাদক কৃষককে ধ্বংসের পথে ঠেলে দিচ্ছি?
টেকসই কৃষির জন্য দরকার টেকসই বাজার ব্যবস্থা। কৃষিপণ্যের ন্যূনতম সহায়ক মূল্য নির্ধারণ, রপ্তানিতে প্রণোদনা, কোল্ড স্টোরেজ ভাড়ায় ভর্তুকি, সমবায়ভিত্তিক বিপণন ব্যবস্থা এবং কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাত শিল্পে বিনিয়োগ এখন সময়ের দাবি। পাশাপাশি কৃষক ও ভোক্তার উভয়ের স্বার্থ রক্ষায় একটি সুস্পষ্ট, গ্রহণযোগ্য ও দীর্ঘমেয়াদি কৃষিপণ্য মূল্যনীতি প্রণয়ন অত্যন্ত জরুরি। উৎপাদন খরচের প্রকৃত হিসাব, কৃষকের ন্যায্য লাভের অধিকার, বাজারজাতকরণ ব্যয় এবং যুক্তিসংগত মুনাফার সীমা বিবেচনায় এনে পণ্যের দাম নির্ধারণ করা হলে বাজার ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা ও স্থিতিশীলতা আসতে পারে। তবে এ কাজ খণ্ডিত প্রশাসনিক সিদ্ধান্তে সম্ভব নয়; এর জন্য প্রয়োজন একটি শক্তিশালী, তথ্যভিত্তিক ও ধারাবাহিক প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো।
শেষ পর্যন্ত বিষয়টি অত্যন্ত স্পষ্ট। একটি দেশের কৃষক যদি ন্যায্যমূল্য না পান, তবে সেই দেশের কৃষি উৎপাদনও দীর্ঘমেয়াদে টেকসই থাকে না। কৃষকের আর্থিক নিরাপত্তা, বাজারে ন্যায্য অংশগ্রহণ এবং উৎপাদনের সম্মান নিশ্চিত করা ছাড়া খাদ্যনিরাপত্তার ভিত্তি শক্ত করা সম্ভব নয়। তাই বাজারে পণ্যের দাম কমলে আমরা স্বস্তি পাই, এটি স্বাভাবিক। কিন্তু সেই স্বস্তির আড়ালে যদি কৃষকের জীবন আরও অনিশ্চিত হয়ে পড়ে, তবে সেটি কোনো সুস্থ অর্থনীতির লক্ষণ হতে পারে না। একটি ন্যায়সংগত অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় ভোক্তার স্বস্তি ও কৃষকের সম্মান দুটিই সমান গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, শেষ পর্যন্ত কৃষকের মুখে হাসি না থাকলে দেশের খাদ্যনিরাপত্তাও টেকসই হয় না। তাই এখন সময় এসেছে বাজারের হিসাবের পাশাপাশি কৃষকের জীবনের হিসাবটিকেও সমান গুরুত্ব দিয়ে দেখার।
লেখক: কৃষিবিদ, কলামিস্ট ও চেয়ারম্যান, ডিআরপি ফাউন্ডেশন
প্রকাশিত নিবন্ধের বক্তব্য ও দায়িত্ব লেখকদের নিজস্ব