

ইরান যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের সরবরাহ, মূল্যস্থিতি এবং পরিবহন ব্যয় নিয়ে যে গভীর উদ্বেগ তৈরি হয়েছে, তা অমূলক নয়। মধ্যপ্রাচ্যের সামান্য অস্থিরতাও বৈশ্বিক জ্বালানি ব্যবস্থায় বড় ধরনের অভিঘাত সৃষ্টি করতে পারে। বাংলাদেশ আমদানিনির্ভর দেশ হিসেবে সেই চাপ থেকে পুরোপুরি মুক্ত থাকতে পারে না। কিন্তু এ বাস্তবতার মধ্যেও একটি বিষয় বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। শুরু থেকেই সরকার পরিস্থিতির গুরুত্ব অনুধাবন করেছে এবং জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিয়েছে। তেলের পর্যাপ্ত মজুত, আমদানি কার্যক্রমের ধারাবাহিকতা, সরবরাহ ব্যবস্থার তদারকি এবং ভোক্তা পর্যায়ে চাহিদা অনুযায়ী জোগান নিশ্চিত করার যে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, তা নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয়।
এ কথা এখন স্পষ্ট যে, জ্বালানি সংকট নিয়ে সরকার কোনো ধরনের আত্মতুষ্টিতে ভোগেনি। আন্তর্জাতিক অস্থিরতার প্রথম ধাক্কা থেকেই সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়, রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থা এবং প্রশাসনিক কাঠামোকে সক্রিয় রাখা হয়েছে। সরকারি পর্যায় থেকে বিশেষ নির্দেশনা জারি করা হয়েছে, যাতে মজুত, পরিবহন, বিপণন ও বিতরণ ব্যবস্থায় কোথাও শৈথিল্য না থাকে। মাঠপর্যায়ে নজরদারি জোরদার করা হয়েছে। প্রয়োজনীয় সমন্বয়ের মাধ্যমে জনজীবন, কৃষি, শিল্প ও পরিবহন খাতে জ্বালানির প্রবাহ অব্যাহত রাখার চেষ্টা চলছে। একটি দায়িত্বশীল সরকারের কাছ থেকে নাগরিকরা এমন তৎপরতাই প্রত্যাশা করে। সে অর্থে সরকার তার দায়িত্ব পালনে আন্তরিকতা, সক্ষমতা এবং দূরদর্শিতার পরিচয় দিয়েছে। তবু দুঃখজনক হলো, সরকারি এ প্রস্তুতি ও তৎপরতার পরও ভোক্তা পর্যায়ে উদ্বেগ পুরোপুরি কাটছে না। এর একটি কারণ হলো বৈশ্বিক অস্থিরতার বাস্তব প্রভাব, অন্যটি হলো গুজব, অতিরঞ্জন ও কৃত্রিম সংকট তৈরির অপচেষ্টা। সাধারণ মানুষের স্বাভাবিক উদ্বেগকে পুঁজি করে কিছু অসাধু গোষ্ঠী বাজারে অস্থিরতা ছড়াতে চায়। কেউ মজুত বাড়ায়, কেউ সরবরাহ ব্যাহত হওয়ার গুজব তোলে, কেউ অতিরিক্ত দামে বিক্রির পথ খোঁজে, আবার কেউ রাজনৈতিক ফায়দা হাসিলের উদ্দেশ্যে পরিস্থিতি ঘোলাটে করার চেষ্টা করে। এরা শুধু বাজারবিরোধী নয়, জনস্বার্থবিরোধীও বটে। জ্বালানি তেলের মতো সংবেদনশীল বিষয়ে এমন অপতৎপরতা সরাসরি অর্থনীতি, উৎপাদন ও জনমনে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। এ বাস্তবতায় সরকারের সামনে এখন দ্বিমুখী দায়িত্ব রয়েছে। একদিকে যেমন যথেষ্ট মজুত, দ্রুত আমদানি এবং সুশৃঙ্খল সরবরাহ নিশ্চিত রাখতে হবে, অন্যদিকে তেল নিয়ে তেলেসমাতি করতে চাওয়া চক্রের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিতে হবে। এখানে কোনো শৈথিল্যের সুযোগ নেই। রাজনৈতিকভাবে অপপ্রচার মোকাবিলা, সামাজিকভাবে সচেতনতা সৃষ্টি এবং প্রশাসনিকভাবে কঠোর নজরদারি ও শাস্তির ব্যবস্থা গ্রহণ জরুরি। যারা কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করে, অতিমুনাফার লোভে সাধারণ মানুষকে জিম্মি করতে চায়, কিংবা রাষ্ট্রের স্থিতিশীলতা নষ্টের পাঁয়তারা করে, তাদের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান পদক্ষেপ নিতে হবে। আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা ও বাজার শৃঙ্খলা রক্ষার স্বার্থে এদের প্রতি কোনোরকম ছাড় দেওয়ার সুযোগ নেই।
এ কথা জোর দিয়েই বলা যায়, বর্তমান সংকটে সরকারের উদ্যোগ ও তৎপরতার কোনো ঘাটতি নেই। এখন প্রয়োজন সেই উদ্যোগকে আরও দৃঢ় হাতে বাস্তবায়ন করা এবং ষড়যন্ত্রকারীদের সব পথ রুদ্ধ করা। জ্বালানি নিরাপত্তা শুধু অর্থনৈতিক প্রশ্ন নয়, এটি জাতীয় স্থিতিশীলতারও প্রশ্ন। কাজেই সরকার যে সতর্ক, সক্রিয় ও দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করছে, তা নিঃসন্দেহে ভূয়সী প্রশংসার দাবিদার। একই সঙ্গে এ তৎপরতা অব্যাহত রেখে জনস্বার্থবিরোধী সব অপচেষ্টার বিরুদ্ধে কঠোর বার্তা দেওয়া সময়ের দাবি।