

ব্রিটিশ পার্লামেন্টে ১৮০৭ সালের ২৫ মার্চ ‘স্লেভ ট্রেড অ্যাক্ট’ পাসের ঘটনাটি ছিল মানব ইতিহাসের এক অনন্য এবং বৈপ্লবিক অধ্যায়। যদিও এ আইনটি দ্বারা তৎক্ষণাৎ দাসপ্রথা সম্পূর্ণ নির্মূল হয়নি, তবে এটি আটলান্টিক মহাসাগরীয় দাস ব্যবসার মতো একটি অমানবিক প্রথার মূলে কুঠারাঘাত করেছিল।
অষ্টাদশ শতাব্দী জুড়ে ব্রিটেন ছিল বিশ্বের অন্যতম প্রধান দাস ব্যবসায়ী শক্তি। আফ্রিকা থেকে আটলান্টিক পাড়ি দিয়ে লাখ লাখ মানুষকে আমেরিকায় দাস হিসেবে পাচার করা হতো। এ অমানবিক ব্যবসার বিরুদ্ধে প্রথম সোচ্চার হন কোয়েকার সম্প্রদায়ের মানুষ এবং পরবর্তীকালে ইভানজেলিকাল খ্রিষ্টানরা। তাদের দাবি ছিল—মানুষ কেনাবেচা করা শুধু অনৈতিক নয়, বরং এটি ধর্মীয় এবং মানবিক মূল্যবোধের চরম পরিপন্থি।
এ আন্দোলনের মূল নায়ক ছিলেন ব্রিটিশ পার্লামেন্ট সদস্য উইলিয়াম উইলবারফোর্স। তিনি টানা দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে পার্লামেন্টে দাস ব্যবসার বিরুদ্ধে লড়াই চালিয়ে যান। তার সঙ্গে ছিলেন টমাস ক্লার্কসন এবং ওলাউডাহ ইকুয়ানো (যিনি নিজে একজন প্রাক্তন দাস ছিলেন)। তাদের অক্লান্ত পরিশ্রম, জনমত গঠন এবং দাস জাহাজের বিভীষিকাময় বর্ণনা সাধারণ মানুষের মধ্যে ক্ষোভের সৃষ্টি করে। দীর্ঘ তর্কের পর, ১৮০৭ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি হাউস অব কমন্সে বিলটি বিপুল ভোটে জয়লাভ করে এবং ২৫ মার্চ এতে রাজকীয় সম্মতি (Royal Assent) মেলে।
১৮০৭ সালের এ আইনের একটি সূক্ষ্ম দিক ছিল এই যে, এটি ‘দাস ব্যবসা’ (Slave Trade) নিষিদ্ধ করেছিল, কিন্তু ‘দাসপ্রথা’ (Slavery) নয়। এর অর্থ হলো, ব্রিটিশ সাম্রাজ্যে নতুন করে কোনো মানুষকে দাস হিসেবে আনা অবৈধ হয়ে যায়, কিন্তু যারা আগে থেকেই দাস হিসেবে কাজ করছিলেন, তাদের অবস্থার পরিবর্তন হয়নি। তবে এ আইনটি পাস হওয়ার ফলে আটলান্টিক দাসের বাজারের মেরুদণ্ড ভেঙে যায়। ব্রিটিশ নৌবাহিনীকে আটলান্টিক মহাসাগরে টহল দেওয়ার দায়িত্ব দেওয়া হয় যাতে কোনো জাহাজ অবৈধভাবে দাস পাচার করতে না পারে।
১৮০৭ সালের আইনটি ছিল প্রথম বড় পদক্ষেপ। এর প্রায় ২৬ বছর পর ১৮৩৩ সালে ‘স্লেভারি অ্যাবলিশন অ্যাক্ট’ পাসের মাধ্যমে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের সর্বত্র দাসপ্রথাকে আইনত নিষিদ্ধ করা হয়। ১৮০৭ সালের ২৫ মার্চের সেই সিদ্ধান্তটি বিশ্বকে এ বার্তা দিয়েছিল যে, অর্থনৈতিক মুনাফার চেয়ে মানবিক মর্যাদা অনেক বেশি মূল্যবান। এটি পরবর্তী সময়ে আমেরিকা এবং বিশ্বের অন্যান্য প্রান্তেও দাসপ্রথাবিরোধী আন্দোলনের প্রেরণা হিসেবে কাজ করেছে।