

টানা দেড় দশকের ফ্যাসিস্ট শাসন অবসানের পরও ঘটনা-দুর্ঘটনার শেষ নেই বাংলাদেশে। গত ফেব্রুয়ারি থেকে চলতি মাস পর্যন্ত ঘটনার ঘনঘটায় দম ফেলার সময় পাচ্ছে না জাতি। ১২ ফেব্রুয়ারি ঈদ আনন্দের মতো উৎসবমুখর হয়েছে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। মন্ত্রিপরিষদ গঠনের পরপরই গুচ্ছ কর্মসূচি নিয়ে মাঠে নেমেছে বিএনপি সরকার। তারুণ্যনির্ভর মন্ত্রিসভা থেকে শুরু করে ব্যক্তিগত আচরণ দিয়ে একের পর এক চমক দিয়ে যাচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তবে, ইতিবাচক প্রচারণার বিপরীতে আছে বিরোধীপক্ষের নেতিবাচক প্রোপাগান্ডা। পানি ধরে রাখার জন্য নতুন করে ‘খালা কাটা কর্মসূচি’ শুরু হয়েছে। সমালোচকরা খাল কেটে কুমির আনার পুরোনো গল্প সামনে এনেছে। এরই মধ্যে উদযাপিত হয়ে গেল মুসলমানদের অন্যতম বৃহৎ ধর্মীয় উৎসব ঈদুল ফিতর। ঈদযাত্রার ভালো-মন্দ নিয়ে নানা সমালোচনা শুনতে হয়েছে সরকারকে। দিন-রাত দৌড়ঝাঁপ করেও, অতি আত্মবিশ্বাসী বয়ানের কারণে ট্রলের শিকার হয়েছেন তিন পথের এক মন্ত্রী শেখ রবিউল আলম।
নেটিজেনের পাশাপাশি বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমানও কড়া সমালোচনা করেছেন ঈদযাত্রা নিয়ে। জনগণের সঙ্গে সরকার ধোঁকাবাজি করছে বলে মন্তব্য করেন তিনি। গত সোমবার মৌলভীবাজারে ঈদ শুভেচ্ছা বিনিময়কালে ডা. শফিক অভিযোগ করেন, ‘মন্ত্রী বলেছেন অতিরিক্ত ভাড়া ফেরত দেওয়া হবে। দেশবাসীর প্রশ্ন, লাখ লাখ মানুষ ঢাকা ছেড়েছে। এই বিপুলসংখ্যক মানুষের কাছে ফেরতকৃত টাকা কীভাবে পৌঁছাবেন তিনি? এটা দেশবাসীর সঙ্গে প্রতারণা ছাড়া আর কিছুই নয়।’ সরকারের উদ্দেশে তিনি বলেন, ‘নির্বাচন শেষ হয়েছে। অনিয়ম হলেও আমরা তা মেনে নিয়েছি, যাতে দেশটা অচল না হয়। আপনারা যদি সঠিক ধারায় ফিরে না আসেন, তাহলে সারা দেশের মানুষ কিন্তু জুলাই যোদ্ধা, এ মানুষগুলো আপনাদের ক্ষমা করবে না।’
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সাধারণ সদস্যদের সঙ্গে ঈদ শুভেচ্ছা বিনিময় করে অসাধারণ উদাহরণ তৈরি করেছেন তারেক রহমান। কিন্তু সেটি ঢাকা পড়ে গেছে প্রধানমন্ত্রীর ঈদ শুভেচ্ছা বিনিময় অনুষ্ঠানের বিশৃঙ্খলা এবং তার মেয়ে জাইমা রহমানের ক্রীড়া প্রতিভা নিয়ে করা ট্রলের আড়ালে। বিশ্লেষকরা বলছেন, প্রধানমন্ত্রীর স্মার্টনেস ও সদিচ্ছার সঙ্গে তাল মেলাতে পারছেন না তার কর্মচারীরা। অনভিজ্ঞতা ধরা পড়ছে প্রতি পদে পদে। পদ নিয়ে সারাক্ষণ আত্মশ্লাঘায় ভোগার কারণে দ্রুত শিখে উঠতে পারছে না তারা। মন্ত্রীদের অতিকথনে জটিলতা আরও বাড়ছে। ঈদের একটি টিভি অনুষ্ঠানে জাইমা রহমানের ক্রীড়া প্রতিভা তুলে ধরেন টেকনোক্র্যাট প্রতিমন্ত্রী আমিনুল হক। ঘরোয়া আলাপচারিতার বিষয় জাতীয় গণমাধ্যমে উপস্থাপনের শৈল্পিক জ্ঞান না থাকায় এমনটি হয়েছে বলে মনে করছেন অভিজ্ঞরা। তা ছাড়া, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এখন লোভী সমাজের ডলার আয়ের অসামাজিক ক্ষেত্র। সবাই মুখিয়ে থাকে নিজের অ্যাকাউন্টকে লাভজনক করতে। নিদহীন ঈদের পর এবার আলোচনায় ‘ঈদের পর কঠোর আন্দোলন’।
ফ্যাসিস্ট হাসিনা সরকারের বিরুদ্ধে টানা সাড়ে ১৫ বছর আন্দোলন করেছে বিএনপির নেতৃত্বে সমমনা দলগুলো। শতভাগ গণতান্ত্রিক এবং নিরীহ কর্মসূচিতেও অত্যাচারের স্ট্রিমরোলার চালাত দোর্দণ্ড প্রতাপশালী আওয়ামী লীগ সরকার। হামলা-মামলা-গুম-খুন-অপহরণে পর্যুদস্ত করে তুলেছিল বিএনপির নেতাকর্মী ও তাদের পরিবারকে। তবু রাজপথ আঁকড়ে পড়েছিল তারা। পুলিশি হস্তক্ষেপে তাদের ছোট-বড় সব কর্মসূচিই জনগণের কাছে অর্থহীন করে তুলে ধরা হতো। হতাশ নেতাকর্মীরা অনেক সময় জনতার কাছে মাজাভাঙা দল বলে হাসি-ঠাট্টার শিকার হয়েছে। সরকার সমর্থিত গণমাধ্যমে আওয়ামী বুদ্ধিজীবীরা বিএনপিকে উপহাসের পাত্র হিসেবে উপস্থাপন করত। বছর জুড়ে নানা কর্মকাণ্ড চালালেও, ‘ঈদের পর কঠোর কর্মসূচি’ ঘোষণা দিলেই বিএনপিকে নিয়ে মজা করার ট্রেন্ড চালু হয়ে যায়। যদিও ঈদুল আজহার পরই জুলাই অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকার পালিয়ে যায়। জামায়াত সরকারবিরোধী যুগপৎ আন্দোলনে থাকলেও মাঝেমধ্যে আন্ডারগ্রাউন্ডে চলে যেত। কালের পরিক্রমায় জামায়াত এখন প্রধান বিরোধী দল এবং ঈদের পরই কঠোর কর্মসূচির হুমকি দিয়ে রেখেছে। জুলাই সনদ, গণভোট বাস্তবায়ন ও জুলাই সংস্কার পরিষদ গঠন নিয়ে রাজপথে আন্দোলনে নামবে জামায়াত ও এনসিপি। জুলাই আদেশে বলা হয়েছে, সংসদ নির্বাচনের ফল ঘোষিত হওয়ার ৩০ দিনের মধ্যে যে পদ্ধতিতে জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশন আহ্বান করা হয়, একইভাবে সংবিধান সংস্কার পরিষদের অধিবেশন ডাকা হবে। সে অনুযায়ী গত ১৪ ফেব্রুয়ারি নির্বাচনের ফলের গেজেট প্রকাশ করে নির্বাচন কমিশন। ফলে জুলাই আদেশ অনুসারে সংবিধান সংস্কার পরিষদের প্রথম অধিবেশন আহ্বানের শেষ সময় ছিল গত রোববার। তবে নির্ধারিত সময়ের মধ্যেও রাষ্ট্রপতির পক্ষ থেকে সেই অধিবেশন আহ্বান করা হয়নি। এতে সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠন ও কার্যক্রম শুরু হওয়া নিয়ে নতুন করে জটিলতা ও অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। এ প্রসঙ্গে জামায়াত ও এনসিপি সংবিধান সংস্কার পরিষদের পক্ষে একাট্টা অবস্থানে থাকলেও বিএনপি সংবিধানের বাধ্যবাধকতার বিষয়টি সামনে এনেছে। সরকার বলেছে, এ ধরনের কোনো পরিষদ করতে হলে আগে সংবিধান সংশোধন করতে হবে। দলটির নেতারা বলছেন, সংবিধানে নির্ধারিত সময় ও পদ্ধতি অনুসরণ না করলে ভবিষ্যতে এ নিয়ে আইনি জটিলতা তৈরি হতে পারে। অন্যদিকে জামায়াত ও এনসিপির নেতারা মনে করছেন, জুলাই আদেশের উদ্দেশ্য ছিল দ্রুত সংস্কার প্রক্রিয়া শুরু করা। সেই সংস্কারের পক্ষে গণভোটে জনগণ রায় দিলেও বিএনপির নেতৃত্বাধীন সরকার সেটি বাস্তবায়ন করছে না। গত শনিবার জামায়াতে ইসলামী, এনসিপিসহ ১১-দলীয় ঐক্যের লিয়াজোঁ কমিটির জরুরি বৈঠকে সংবিধান সংস্কার পরিষদের বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হয়। বৈঠক শেষে জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ও ১১-দলীয় নির্বাচনী ঐক্যের সমন্বয়ক হামিদুর রহমান আযাদ সাংবাদিকদের বলেন, জুলাই সনদ বাস্তবায়নের জন্য দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া না হলে জনগণকে সঙ্গে নিয়ে রাজপথের আন্দোলনে যেতে বাধ্য হবে ১১-দলীয় নির্বাচনী ঐক্য। শিগগির শীর্ষ নেতারা বৈঠক করে আন্দোলন কর্মসূচি ঘোষণা করবেন। এনসিপির আহ্বায়ক ও বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম বলেন, ‘সরকার পুরোনো পথে হাঁটতে শুরু করেছে। সংস্কারের বিপক্ষে স্পষ্ট অবস্থান নিয়েছে। দেশের তরুণ প্রজন্মের প্রতি যে আশা বাংলাদেশের মানুষ দেখিয়েছে, এনসিপির পক্ষ থেকে তার সর্বোচ্চ প্রতিফলন দেখাতে হবে। সংস্কার বাস্তবায়ন না হলে সংসদ ও রাজপথে আন্দোলন অব্যাহত থাকবে।’ সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠন ঘিরে সৃষ্ট অচলাবস্থা দ্রুত সমাধান না হলে রাজপথে আন্দোলনে নামার ইঙ্গিত দিয়েছেন বিরোধীদলীয় নেতা ও জামায়াতের আমির ডা. শফিকুর রহমানও। তিনি বলেন, ‘সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠন নিয়ে যে সংকট তৈরি হয়েছে, তার সমাধান সংসদের ভেতরেই হওয়া উচিত। সংসদের ভেতরে যদি বিষয়টির সমাধান না হয় এবং জনগণের প্রত্যাশার প্রতিফলন না ঘটে, তাহলে রাজপথে আন্দোলনের পথ বেছে নিতে বাধ্য হতে পারে বিরোধীপক্ষ।’
এদিকে, ক্ষমতাসীন দল বিএনপি রাজনীতিতে সরাসরি প্রতিপক্ষ হওয়ায় জামায়াতকে সবসময় ধর্ম ব্যবসায়ী ও মুক্তিযুদ্ধবিরোধী বলে গালমন্দ করে আসছে। বিএনপি মহাসচিব ও স্থানীয় সরকারমন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, ‘দেশের ৯০ ভাগ মানুষ ধার্মিক, তারা ধর্ম নিয়ে ব্যবসা পছন্দ করে না। একটি দলের নেতারা এবার বেহেশতে নিতে পারল না। তারা মা-বোনদের বেহেশতে নেওয়ার কথা বলে ভুলিয়ে দেয়, এসবে ভুলবেন না। আমরা কাজ করতে এসেছি, কাজ করে যাব। আমরা কাজ করে বেহেশতে যাব।’ গত সোমবার ঠাকুরগাঁওয়ে নেহা নদী পুনঃখনন কর্মসূচির উদ্বোধন শেষে তিনি এসব মন্তব্য করেন। ধর্মকে পুঁজি করে রাজনীতির কঠোর সমালোচনা করে মির্জা ফখরুল বলেন, ‘ধর্মকে ব্যবহার করা যায় না। আল্লাহর সন্তুষ্টি ছাড়া বেহেশতে যাওয়া যাবে না। সৎ থাকতে হবে, হালাল রুজি করে খেতে হবে। না হলে বেহেশতে যাওয়া যাবে না।’
দেশের রাজনীতিতে বিএনপির পুরোনো মিত্র জামায়াত এখন প্রধান শত্রু। তাদের সঙ্গে আছে তরুণ বিপ্লবীদের দল এনসিপি। যদিও জামায়াত-এনসিপি দুই বোতলের একই সিপি। গতানুগতিক অভিযোগ এবং রাজনৈতিক চর্চার ফলে তাদের কাছে মানুষের আর বাড়তি প্রত্যাশা নেই বললেই চলে। এদিকে, পুরোনো শত্রু আওয়ামী লীগ মিত্রতার বেশে নানারকম গায়েবি আওয়াজ দিয়ে যাচ্ছে। রাজনৈতিক কার্যক্রম নিষিদ্ধ অর্থাৎ মাঠে অফলাইনে থাকলেও অনলাইনে চরম সক্রিয়। জমানো টাকায় ফাঁকা মাঠ দ্রুত জমিয়ে ফেলতে পারে। এই মুহূর্তে দেশে গুরুত্বপূর্ণ কোনো মিত্র দল নেই বিএনপির। উপরন্তু, দেশের বাইরে আছে ইন্দো-মার্কিন চাপ। এর মধ্যে সুপারসনিক গতির প্রধানমন্ত্রী তার গড়পড়তা পারিষদবর্গ নিয়ে কতটুকু নির্বিঘ্নে পথ পাড়ি দেবেন, সেটা অবশ্য সময়ই বলে দেবে। তবে রাজনীতির মাঠে ‘ঈদের পর’ সমাগত।
লেখক: হেড অব নিউজ, আরটিভি