বুধবার, ১০ জুন ২০২৬, ২৭ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩
কালবেলা প্রতিবেদক
প্রকাশ : ২৫ মার্চ ২০২৬, ১২:০০ এএম
আপডেট : ২৫ মার্চ ২০২৬, ০৯:৩১ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
ক্রান্তিকালের কথকতা

গণহত্যার ব্লুপ্রিন্ট: পাকিস্তানি জেনারেলদের ভাষ্য

জাকির হোসেন
ছবি : কালবেলা গ্রাফিক্স
ছবি : কালবেলা গ্রাফিক্স

একাত্তরের ১৭ মার্চ। রাত প্রায় ১০টা। স্বস্তি নেই লেফটেন্যান্ট জেনারেল টিক্কা খানের মনে। প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খানের কাছ থেকে তিনি চূড়ান্ত নির্দেশনা পেয়েছেন। যত দ্রুত সম্ভব এ নির্দেশনা তাকে বাস্তবায়িত করতে হবে। তাই তিনি ফোন করলেন। ১৪তম ডিভিশনের জিওসি মেজর জেনারেল খাদিম হুসেন রাজার কাছে। টিক্কা খান টেলিফোনে খাদিম হুসেন রাজাকে বললেন, ‘এখনই মেজর জেনারেল রাও ফরমান আলিকে সঙ্গে নিয়ে আমার বাসায় চলে আসুন।’ রাও ফরমান আলি তখন পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নরের উপদেষ্টা। টিক্কা খানের এ নির্দেশ পাওয়ার পর ওই রাতেই রাও ফরমান আলি ও খাদিম হুসেন রাজা গেলেন টিক্কা খানের কমান্ড হাউসে। তারা দুজন টিক্কা খানের বাসায় গিয়ে দেখলেন, সেখানে আরও একজন জেনারেল রয়েছেন, তিনি হলেন হামিদ খান। কালক্ষেপণ না করে জেনারেল টিক্কা খান তাদের দুজনের উদ্দেশে বললেন, ‘প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খানের সঙ্গে শেখ মুজিবের আলোচনা খুব একটা এগোচ্ছে না। তাই প্রেসিডেন্ট এখন সামরিক হস্তক্ষেপের পক্ষে। এ লক্ষ্যে আপনারা এখন আনুষঙ্গিক পরিকল্পনা তৈরি করুন।’ এ কয়েকটি বাক্য ছাড়া জেনারেল টিক্কা খান আর কিছুই বললেন না এবং কোনো লিখিত নির্দেশনাও দিলেন না। টিক্কা খান শুধু বললেন, ‘আপনারা দুজন মিলে পরিকল্পনা তৈরি করুন। আগামীকাল (১৮ মার্চ) এ পরিকল্পনা নিয়ে আমার সঙ্গে আলোচনা করবেন।’

টিক্কা খানের নির্দেশনা অনুযায়ী রাও ফরমান আলি ১৮ মার্চ সকালে খাদিম হুসেন রাজার অফিসে যান। এরপর তারা দুজন মিলে সামরিক অভিযানের ‘ব্লুপ্রিন্ট’ তৈরি করতে বসেন। খাদিম হুসেন রাজা চেয়েছিলেন তাদের এ পরিকল্পনা নিয়ে তার বাঙালি এডিসির মনে যেন কোনো ধরনের সন্দেহের উদ্রেক না হয়। এজন্য তিনি তার স্ত্রী রুবিনাকে বলেছিলেন, তিনি যেন বাঙালি এডিসিকে অফিস থেকে দূরে ব্যস্ত রাখেন। অল্প কিছুক্ষণের মধ্যে খাদিম হুসেন রাজা ও রাও ফরমান আলি সামরিক অভিযানের রূপরেখার ব্যাপারে ঐকমত্য হন। তারপর যার যার অংশ লিখতে শুরু করেন। রাও ফরমান আলি ছিলেন ঢাকা গ্যারিসনের অপারেশনের দায়িত্বে আর বাংলাদেশের বাকি অংশে অভিযানের দায়িত্বে ছিলেন খাদিম হুসেন রাজা। ঢাকার গ্যারিসনে কীভাবে অপারেশন চালাবে, তা রাও ফরমান আলি দ্রুত লিখে ফেলেন। আর খাদিম হুসেন রাজা বাকি প্রদেশের সেনাদের কাজের বিন্যাস করেন। এরপর ওইদিন (১৮ মার্চ) রাতে তারা দুজন কমান্ড হাউসে গিয়ে টিক্কা খানের কাছে তাদের পরিকল্পনার ‘ব্লুপ্রিন্ট’ জমা দেন। তাদের এ ব্লুপ্রিন্ট টিক্কা খান বিনাবাক্যে গ্রহণ করেন। এ ব্লুপ্রিন্টের নাম দেওয়া হয় ‘অপারেশন সার্চলাইট’। এ নামটি বাছাই করার পেছনে কোনো আলাদা বিশেষত্ব ছিল না। সামরিক অভিযানের ‘ব্লুপ্রিন্ট’ তৈরির পর তারা দুজন ছিলেন নির্দেশের অপেক্ষায়। এ ক্ষেত্রে সমস্যা ছিল নিরাপত্তা ও গোপনীয়তা রক্ষা করে তাদের অধীন কমান্ডারদের কাছে এ ‘ব্লুপ্রিন্ট’ পাঠানো। তাদের হাতে সময় বেশি ছিল না। কেননা, তারা বুঝতে পেরেছিলেন সমঝোতা-আলোচনা আর বেশি দিন এগিয়ে নেওয়া সম্ভব হবে না। মেজর জেনারেল খাদিম হুসেন রাজা তার লেখা ‘অ্যা স্ট্রেঞ্জার ইন মাই ওন কান্ট্রি’ শীর্ষক বইয়ে সার্চলাইট অপারেশনের পরিকল্পনা বিষয়ে এমনটিই লিখেছেন।

অপারেশন সার্চলাইট বিষয়ে মেজর জেনারেল খাদিম হুসেন রাজা তার বইয়ে লিখেছেন, ২৪ মার্চ দুটি হেলিকপ্টার নিয়ে রাও ফরমান আলি এবং তিনি নিজে ঢাকার বাইরে অবস্থানরত ব্রিগেড কমান্ডারদের সামরিক ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য প্রস্তুত হওয়ার নির্দেশনা দিতে রওনা হন। তারা চেয়েছিলেন গোপনীয়তা বজায় রেখে বিভাগীয় কমান্ডারদের সরাসরি নির্দেশনা দেবেন এবং মাঠপর্যায়ে যদি কোনো সমস্যা থাকে সেটি কৌশলে সমাধান করবেন। তারা যশোর, কুমিল্লা, চট্টগ্রামে যান। সিলেট, রংপুর এবং রাজশাহী ক্যান্টনমেন্টে পাঠানো হয় সিনিয়র স্টাফ অফিসারদের। অভিযানের জন্য প্রস্তুত হতে বলা হলেও ব্রিগেড কমান্ডারদের জানানো হয়েছিল, আঘাত হানার সময় পরে জানানো হবে। সিদ্ধান্ত হয়েছিল সব গ্যারিসনকে একই সঙ্গে একসময়ে অপারেশনে নামতে হবে। পূর্ব পাকিস্তানে সামরিক বাহিনী আটটি স্থায়ী ও অস্থায়ী ক্যান্টনমেন্টে বিন্যস্ত ছিল—ঢাকা, কুমিল্লা, চট্টগ্রাম, সিলেট, যশোর, রাজশাহী, রংপুর ও সৈয়দপুর। এর সঙ্গে ২ নম্বর ইস্টবেঙ্গল রেজিমেন্টের অবস্থান ছিল ঢাকার কাছে, জয়দেবপুরে। ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা দেশের বিভিন্ন ব্যারাক ঘুরে পরিকল্পনা বাস্তবায়নের ব্যবস্থা তদারকি করলেও, অপারেশন সার্চলাইটে অংশ নেওয়ার জন্য সামরিক বাহিনীর কারও কাছেই কোনো লিখিত অর্ডার পাঠানো হয়েছিল না। সময় জানিয়ে মেজর জেনারেল খাদিম হুসেনের কাছে লেফটেন্যান্ট জেনারেল টিক্কা খানের কাছ থেকে ফোনটি এসেছিল ২৫ মার্চ বেলা ১১টায়। সংক্ষেপে বলা হয়েছিল, ‘খাদিম, আজ রাতেই’। সময় নির্দিষ্ট হয়েছিল রাত ১টা। গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডারের হিসাবে অবশ্য তখন থাকবে ২৬ মার্চ। হিসাব করা হয়েছিল, প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান ততক্ষণে নিরাপদে করাচি পৌঁছে যাবেন। উল্লেখ্য, ওইদিন সন্ধ্যায় তিনি করাচির উদ্দেশে ঢাকা ছাড়েন। প্রায়ই বলা হয়ে থাকে, ইতিহাস ‘বিজয়ীদের দ্বারা রচিত হয়’। উভয়দিক থেকেই মেজর জেনারেল খাদিম হুসেন রাজার স্মৃতিচারণগুলো অবশ্যই মূল্যবান। তার বর্ণনাগুলো একাধারে রসিকতাপূর্ণ এবং সঠিক তথ্যসমৃদ্ধ। খাদিম হুসেন রাজা মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে নানা বিপজ্জনক ও বিষণ্নতায় ভরা ঘটনাবলির পাশাপাশি একটি বিশেষ ঘটনার কথা উল্লেখ করেছেন। তা হলো পাকিস্তানি জেনারেলদের কাছে আওয়ামী লীগপ্রধান শেখ মুজিবুর রহমানের কোড নাম ছিল ময়না। এ বিষয়ে তিনি লিখেছেন, কয়েকদিন আগের কথা, মে. জে. ফরমান এবং খাদিম হুসেন রাজা তাদের সন্তানদের লাহোরে পাঠিয়ে দিয়েছিলেন বিমানে করে। বিমানটি সৈন্য পরিবহন করে খালি অবস্থায় পশ্চিম পাকিস্তানে ফেরত যাচ্ছিল। খাদিম হুসেন রাজার কন্যা রুবিনা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে মাস্টার্সের ছাত্রী ছিলেন। তাকে একটি সাংকেতিক শব্দ শিখিয়ে দিয়েছিলেন। কখনো টেলিফোনে কথা বলার সময় তারা যদি শেখ মুজিবের ব্যাপারে কোনো কথা বলেন, তবে শেখ মুজিবের সাংকেতিক নাম হবে ‘ময়না’। খাদিম হুসেন রাজা ভুলেই গিয়েছিলেন যে, জিওসি হাউসে সত্যিই একটি পোষা ময়না আছে, যেটাকে তার এক বন্ধু সিলেট থেকে উপহারস্বরূপ পাঠিয়েছিলেন। ২৫ আর ২৬ মার্চের মধ্যবর্তী রাতে লে. কর্নেল জেড এ খান খুব একটা ক্ষয়ক্ষতি ছাড়াই শেখ মুজিবকে বন্দি করতে সক্ষম হন। শেখ মুজিব অক্ষত ছিলেন এবং জিওসি হাউসের কাছেই একটি বালিকা বিদ্যালয়ে তাকে নিরাপদে রাখা হয়েছিল। প্রহরীর সংখ্যা কমানোর উদ্দেশ্যে খাদিম হুসেন রাজা তাকে কমান্ড হাউসের গেস্টরুমে নিয়ে আসেন। রাত আরও গভীর হওয়ার পর কিছু ভারী অস্ত্র ব্যবহারের বিকট শব্দ শোনা যেতে লাগল। ট্যাংকের গোলাবর্ষণ আর রিকয়েললেস রাইফেলের গর্জন সহ্য করার মতো শক্তি পোষা ময়নাটির ছিল না এবং অবশেষে ময়নাটি আর সহ্য করতে না পেরে মারা গেল। সামরিক অভিযানের ব্যাপারে কথা বলার জন্য খাদিম হুসেন রাজার স্ত্রী তার মেয়ে রুবিনাকে ফোন দিয়েছিল। ‘ময়না’ নামটি যে কোডওয়ার্ড, তা বেমালুম ভুলে গিয়ে তিনি সত্যিকারের ময়নাটি সম্পর্কে বলেন যে, বেচারা ‘ময়না’ মারা গিয়েছে। গভীর রাত হওয়া সত্ত্বেও পুরো লাহোরে এ খবর তাৎক্ষণিকভাবে ছড়িয়ে পড়েছিল যে, শেখ মুজিবকে হত্যা করা হয়েছে। যা হোক, পরদিন অবশ্য মিডিয়ায় সত্য খবরটিই প্রকাশ পায় শেখ মুজিব নিরাপদে আছেন এবং কর্তৃপক্ষের হেফাজতে আছেন।

লেখক: সাংবাদিক ও গবেষক

কালবেলা অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন
  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

বিশ্বকাপের আগেই সুসংবাদ / নেইমারকে নিয়ে ব্রাজিল শিবিরে স্বস্তির বার্তা

মাঝ আকাশে বিমানের জানালার কাচ ভাঙলেন যাত্রী!

আলভারেজকে নিয়ে রিয়ালের ‘মেগা বিড’, প্রত্যাখ্যানের ঘোষণায় চমকে দিল অ্যাটলেটিকো 

সম্পদ-দলীয় প্রতীক সবই হারাচ্ছেন মমতা!

বিমান বাহিনীর ১৩১তম জুনিয়র কমান্ড ও স্টাফ কোর্সের সনদপত্র বিতরণ

চিকিৎসকদের নিয়ে সাংবাদিক মাসুদ কামালের বক্তব্যের নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়েছে ড্যাব

সেনাবাহিনীর সহযোগিতায় চোখে আলো ফিরেছে ৮৪ জনের

বাজেটে মোবাইল, বিদ্যুৎ ও প্রযুক্তিপণ্যে বড় সুখবর

ইসলামী ব্যাংক ইসলাম নয়, মির্জা ফখরুল ইসলামও ইসলাম নয় : স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী

বিশ্বকাপ উন্মাদনায় দেশের পতাকা থাকুক সবার উপরে

১০

গাজায় সহিংসতার দায়ে ইসরায়েলি অর্থমন্ত্রীর ওপর ফ্রান্সের নিষেধাজ্ঞা

১১

ঢাকায় নিখোঁজ জবি শিক্ষার্থীর বাবা, সন্ধান চায় ছেলে

১২

নতুন রিসাইক্লিং উদ্যোগ / ৯০ শতাংশর বেশি প্লাস্টিক বর্জ্য কমিয়েছে সিঙ্গার বাংলাদেশ

১৩

সরকারি বাঙলা কলেজে অনুষ্ঠিত হচ্ছে প্রাক্তন শিক্ষার্থীদের মিলনমেলা

১৪

বাংলার নদী, বাংলার জীবন : ইতিহাস থেকে বর্তমান অবস্থা

১৫

ইসলামী ব্যাংক ইসলাম নয়, জামায়াতে ইসলামীও ইসলাম নয় : স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী

১৬

সাউথইস্ট ইউনিভার্সিটির ফার্মেসি বিভাগে ‘হিট’ প্রকল্পের আওতায় ওয়ার্কশপ অনুষ্ঠিত

১৭

ল্যাবএইডে ডেঙ্গু প্রতিরোধে সচেতনতামূলক সেমিনার অনুষ্ঠিত

১৮

বিশ্ববাজারে স্বর্ণের দামে বড় পতন

১৯

কক্সবাজারে ১৯ রোহিঙ্গা আটক

২০
X