

আজ মহান স্বাধীনতা দিবস। সবুজ জমিনে রক্তিম সূর্যখচিত মানচিত্রের এ দেশটির স্বাধীনতার ৫৫তম বার্ষিকী। আমাদের স্বাধীনতার ইতিহাস যেমন গৌরবের, তেমনি বেদনারও। কেননা, অনেক রক্ত ও আত্মত্যাগের বিনিময়ে অর্জিত হয়েছে আমাদের স্বাধীনতা। বাঙালি জাতির হাজার বছরের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় অর্জন এ স্বাধীনতা। দীর্ঘকালের পরাধীনতার শৃঙ্খল, শোষণ-বঞ্চনা, অত্যাচার-অনাচারের নাগপাশ ছিন্ন করতে ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ এ জনপদে জ্বলে উঠেছিল স্বাধীনতার অনির্বাণ শিখা। একাত্তরের মার্চ মাস শুরু হতেই স্বাধীনতাকামী বাঙালি শুরু করে আন্দোলন-সংগ্রাম। একাত্তরের ২ মার্চ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে স্বাধীন বাংলার পতাকা উত্তোলন, ৩ মার্চ পল্টন ময়দানে স্বাধীনতার ইশতেহার ঘোষণার পর সারা দেশে বেজে ওঠে রণদামামা। পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ কালরাতে অতর্কিত নিরীহ ও নিরস্ত্র বাঙালির ওপর হত্যাযজ্ঞ শুরু করে। ঢাকাসহ দেশের শহরগুলোতে হাজার হাজার মানুষ হত্যা করে। শুরু হয় পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর সঙ্গে নিরস্ত্র বাঙালির যুদ্ধ। একাত্তরের ১৬ ডিসেম্বর এ রক্তক্ষয়ী জনযুদ্ধের অবসান ঘটেছিল আমাদের চূড়ান্ত বিজয়ের মধ্য দিয়ে। ১৯৭১ সালের এই দিনে দখলদার পাকিস্তানি সামরিক বাহিনী আনুষ্ঠানিকভাবে আত্মসমর্পণ করে। তার আগের ৯ মাসে তারা হত্যা করেছিল এ দেশের ৩০ লাখ মানুষকে। নির্যাতনের শিকার হয়েছিলেন আরও দুই লাখ নারী। আজ মহান স্বাধীনতা দিবসে আমরা গভীর শ্রদ্ধা ও ভালোবাসার সঙ্গে স্মরণ করছি আত্মদানের সেই ইতিহাসকে। স্মরণ করছি আমাদের স্বাধিকার আন্দোলনের অন্যতম নেতা মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী ও শেখ মুজিবুর রহমান, স্বাধীনতার মহান ঘোষক শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান, স্বাধীনতা সংগ্রাম পরিচালনাকারী প্রবাসী সরকার নেতৃত্বদানকারী সৈয়দ নজরুল ইসলাম, তাজউদ্দীন আহমদ, জেনারেল ওসমানীসহ সর্বদলীয় উপদেষ্টা পরিষদের সদস্যদের।
স্বাধীনতার মূল উদ্দেশ্য ছিল সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা; যেখানে ধর্ম-বর্ণ-জাতি নির্বিশেষে সব মানুষের মৌলিক অধিকার নিশ্চিত হবে, যেখানে প্রত্যেক নাগরিক স্বাধীনভাবে চলাচল করতে পারবে, নিজের মতপ্রকাশ করতে পারবে। অত্যন্ত দুঃখের বিষয়, গত ৫৫ বছরেও আমরা গণতন্ত্রের ভিত শক্তিশালী করতে পারিনি। স্বাধীনতার পর দেশের অধিকাংশ সরকার গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার অঙ্গীকার করলেও তারা গণতন্ত্রকে সুসংহত করতে কাজ করেনি। উপরন্তু দুর্নীতি-দুঃশাসনকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিয়েছে। গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার দৃঢ় অঙ্গীকার নিয়ে ক্ষমতায় আসা রাজনৈতিক নেতৃত্ব যে কী ধরনের দুঃশাসন দেশবাসীর ওপর চাপিয়ে দিতে পারে, তার প্রকৃষ্ট উদাহরণ শেখ হাসিনা। তিনি মুক্তিযুদ্ধের চেতনার নামে দেশে ফ্যাসিবাদ কায়েম করেন। শেখ হাসিনা এবং তার সহযোগীরা দুর্নীতির মাধ্যমে অর্জিত হাজার হাজার কোটি টাকা বিদেশে পাচার করেন। আয়নাঘর সৃষ্টির মাধ্যমে মানবতাবিরোধী অপরাধ করেন। চব্বিশে জুলাই মাসের ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের মাধ্যমে স্বৈরতান্ত্রিক শাসনের অবসানের পর দেশের মানুষ নতুন করে গণতন্ত্রের স্বপ্ন দেখেছে। বর্ষা-বিপ্লবের পরিপ্রেক্ষিতে নির্বাচিত সরকার প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের মানুষের মধ্যে নতুন আশাবাদ জেগেছে। আমরা দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি, অতীত পশ্চাতে ফেলে বাংলাদেশ সামনে এগিয়ে যাবে। দেশ এগিয়ে যাওয়া মানে প্রত্যেক নাগরিকের এগিয়ে যাওয়া। গণতন্ত্র মানে রাষ্ট্র পরিচালনায় প্রত্যেক মানুষের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা। এবারের স্বাধীনতা দিবসে গণতান্ত্রিক চেতনা প্রত্যেক মানুষকে স্পর্শ করুক। ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের চেতনায় সমৃদ্ধ, গণতান্ত্রিক ও বৈষম্যহীন বাংলাদেশ গড়ে উঠুক। দিবসটি উপলক্ষে আমাদের পাঠক, লেখক, বিজ্ঞাপনদাতা, শুভানুধ্যায়ীসহ পুরো দেশবাসীর প্রতি রইল শুভেচ্ছা।