জাকির হোসেন
প্রকাশ : ০৫ এপ্রিল ২০২৬, ১২:০০ এএম
আপডেট : ০৫ এপ্রিল ২০২৬, ০৮:৩৩ পিএম
প্রিন্ট সংস্করণ
ক্রান্তিকালের কথকতা

সরকারপ্রধানদের সিনেমাপ্রীতি

সরকারপ্রধানদের সিনেমাপ্রীতি

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান মেয়ে জাইমা রহমানকে নিয়ে প্রেক্ষাগৃহে সিনেমা দেখেছেন। শুক্রবার (৩ এপ্রিল) সন্ধ্যায় রাজধানীর জিগাতলায় বিডিআর সীমান্ত সম্ভার সিনেমা হলে তারা সিনেমা দেখতে গিয়েছিলেন। ছুটির দিনে আনন্দ বিনোদনের অংশ হিসেবে প্রধানমন্ত্রী প্রেক্ষাগৃহে সিনেমা দেখেছেন। সন্ধ্যা ৭টা ১০ মিনিটে শো শুরু হয়ে শেষ হয়েছে রাত ১০টা ১০ মিনিটে। এর আগে আমাদের দেশে কোনো সরকারপ্রধান ছুটির দিনে প্রেক্ষাগৃহে গিয়ে সিনেমা দেখেননি। ফলে তারেক রহমানের সিনেমা দেখার খবর রাজনৈতিক মহল তো বটেই—সারা দেশের মানুষকে আলোড়িত করেছে। গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে প্রথমে বলা হয়েছিল প্রধানমন্ত্রী ‘বনলতা এক্সপ্রেস’ দেখতে গিয়েছেন। দায়িত্বশীল সূত্রের ভিত্তিতেই এ খবর প্রকাশ করা হয়েছিল। তবে পরে জানা গেল প্রধানমন্ত্রী যে ছবিটি দেখেছেন তার নাম ‘প্রজেক্ট হেইল মেরি’ (Project Hail Mary)। সিনেমা শেষে প্রেক্ষাগৃহ ত্যাগের সময় একজন সাংবাদিক জানতে চেয়েছিলেন সিনেমাটি কেমন। প্রধানমন্ত্রী এক কথায় উত্তর দিয়েছেন, ‘ভালো, দেখতে পারেন।’

এবার সিনেমাটি সম্পর্কে দুয়েকটা কথা বলি, ‘প্রজেক্ট হেইল মেরি’ চলতি বছর মুক্তিপ্রাপ্ত সায়েন্স ফিকশন চলচ্চিত্র। অ্যান্ডি উইয়ারের উপন্যাস অবলম্বনে নির্মিত এ চলচ্চিত্র স্টার সিনেপ্লেক্সের সীমান্ত সম্ভার শাখায় প্রদর্শিত হচ্ছে। চলচ্চিত্রটি শুধু মহাকাশ অভিযানের গল্প নয়, এটি মানবিকতা, বুদ্ধিমত্তা এবং আন্তঃগ্রহ বন্ধুত্বের এক অসাধারণ উপস্থাপন। চলচ্চিত্রটি দর্শকদের একদিকে যেমন রোমাঞ্চকর অভিযানে নিয়ে যায়, অন্যদিকে তেমনি গভীর আবেগের স্পর্শও দেয়। চলচ্চিত্রটির গল্প শুরু হয় এক রহস্যময় পরিস্থিতিতে। প্রধান চরিত্র রাইল্যান্ড গ্রেস একটি মহাকাশযানে ঘুম ভেঙে জেগে ওঠে, কিন্তু সে নিজের পরিচয় বা মিশনের কথা কিছুই মনে করতে পারে না। ধীরে ধীরে তার স্মৃতি ফিরে আসতে থাকে এবং সে জানতে পারে যে, পৃথিবী এক ভয়াবহ সংকটের মুখে পড়েছে। সূর্যের শক্তি ধীরে ধীরে কমে যাচ্ছে, যার ফলে পৃথিবীতে তীব্র ঠান্ডা নেমে আসার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। এই বিপদের মূল কারণ এক অজানা জীবাণু, যা সূর্যের শক্তি শোষণ করে নিচ্ছে।

এ সংকট মোকাবিলার জন্য রাইল্যান্ড গ্রেসকে পাঠানো হয়েছে এক দূরবর্তী নক্ষত্রের দিকে, যেখানে এ সমস্যার সমাধান খুঁজে পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। একা, সীমিত সম্পদ নিয়ে এবং বিশাল অজানার মধ্যে সে তার মিশন চালিয়ে যেতে থাকে। এই একাকিত্বের মাঝেই গল্পে আসে এক চমকপ্রদ মোড়, রাইল্যান্ডের সঙ্গে দেখা হয় এক ভিনগ্রহের প্রাণীর, যার নাম রকি।

রকি এবং রাইল্যান্ড দুই ভিন্ন গ্রহের বাসিন্দা, সম্পূর্ণ ভিন্ন ভাষা ও সংস্কৃতির অধিকারী। প্রথমে একে অপরকে বুঝতে না পারলেও ধীরে ধীরে তাদের মধ্যে গড়ে ওঠে গভীর বন্ধুত্ব। তারা একসঙ্গে কাজ করে নিজেদের গ্রহকে বাঁচানোর উপায় খুঁজে বের করার চেষ্টা করে। এ বন্ধুত্বই চলচ্চিত্রটির সবচেয়ে শক্তিশালী দিক, যা প্রমাণ করে যে সহযোগিতা ও বোঝাপড়া সব সীমা অতিক্রম করতে পারে।

চলচ্চিত্রটির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো এর বৈজ্ঞানিক ভিত্তি। বাস্তবসম্মত বিজ্ঞান, যুক্তিপূর্ণ সমস্যা সমাধান এবং সূক্ষ্ম বিশ্লেষণ গল্পটিকে আরও বিশ্বাসযোগ্য করে তোলে। একই সঙ্গে এটি দর্শকদের শেখায় যে, জ্ঞান ও কৌতূহলই মানবজাতির সবচেয়ে বড় শক্তি।

অর্থাৎ, প্রজেক্ট হেইল মেরি শুধু একটি সায়েন্স ফিকশন চলচ্চিত্র নয়; এটি আশা, বন্ধুত্ব এবং আত্মত্যাগের গল্প। একা একজন মানুষও যদি দৃঢ় মনোবল ও জ্ঞানের সাহায্যে এগিয়ে যায়, তবে সে পুরো পৃথিবীকে বাঁচানোর মতো বড় কাজও করতে পারে—এ বার্তাই চলচ্চিত্রটিতে স্বচ্ছ ও গভীরভাবে তুলে ধরা হয়েছে।

বিশ্ব রাজনীতির মঞ্চে সরকারপ্রধানদের আমরা সাধারণত দেখি কঠোর সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী, কূটনৈতিক আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু কিংবা সংকট মোকাবিলায় নেতৃত্বদানকারী হিসেবে। কিন্তু এ ক্ষমতাধর ব্যক্তিরাও শেষ পর্যন্ত মানুষ, তাদেরও ব্যক্তিগত পছন্দ-অপছন্দ, বিনোদন এবং অবসর কাটানোর নিজস্ব উপায় রয়েছে। ইতিহাসের বিভিন্ন সময়ে বহু দেশের সরকারপ্রধানদের মধ্যে সিনেমা দেখার প্রবণতা লক্ষ করা গেছে, যা শুধু বিনোদন নয়; বরং সংস্কৃতি, রাজনীতি এবং জনমতের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত।

প্রথমেই যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ফ্র্যাঙ্কলিন ডি রুজভেল্টের কথা উল্লেখ করা যায়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় তিনি নিয়মিতভাবে হোয়াইট হাউসে সিনেমা দেখতেন। যুদ্ধের কঠিন সময়ে মানসিক চাপ কমাতে এবং আশাবাদী মনোভাব বজায় রাখতে সিনেমা তার কাছে গুরুত্বপূর্ণ ছিল। তিনি প্রায়ই পরিবার ও ঘনিষ্ঠ সহযোগীদের সঙ্গে সিনেমা দেখতেন। এর মাধ্যমে বোঝা যায়, সিনেমা শুধু বিনোদনের মাধ্যম নয়, নেতৃত্বের মানসিক ভারসাম্য রক্ষার একটি উপায় হিসেবেও কাজ করত।

ফ্র্যাঙ্কলিন ডি রুজভেল্ট অনেক সিনেমা দেখতেন। তার প্রিয় সিনেমার বিষয়ে নির্দিষ্টভাবে কিছু উল্লেখ নেই। তবে ১৯৩৯ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত ‘গন উইথ দ্য উইন্ড’ (Gone with the Wind) তার প্রিয় সিনেমার একটি একটি ছিল। এটি বিশ্ব চলচ্চিত্র ইতিহাসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ও প্রভাবশালী সিনেমা হিসেবে বিবেচিত। মার্গারেট মিচেলের একই নামের উপন্যাস অবলম্বনে নির্মিত এ চলচ্চিত্রটি শুধু একটি প্রেমের গল্প নয়—এটি যুদ্ধ, সমাজ, মানবিকতা এবং টিকে থাকার সংগ্রামের এক গভীর প্রতিচ্ছবি।

চলচ্চিত্রটির পটভূমি আমেরিকার গৃহযুদ্ধ এবং তার পরবর্তী পুনর্গঠনকাল। এ অস্থির সময়ে স্কারলেট ও’হারা নামের এক দৃঢ়চেতা ও আত্মকেন্দ্রিক তরুণীর জীবনসংগ্রামই গল্পের মূল কেন্দ্রবিন্দু। যুদ্ধের আগে বিলাসী জীবনযাপন করা স্কারলেট যুদ্ধের পর কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি হয়। তার ব্যক্তিগত জীবনেও নানা টানাপোড়েন দেখা যায়—বিশেষ করে অ্যাশলির প্রতি তার একতরফা ভালোবাসা এবং রেট বাটলারের সঙ্গে জটিল সম্পর্ক গল্পটিকে আরও গভীরতা দেয়।

চলচ্চিত্রটির অন্যতম শক্তি হলো এর চরিত্র নির্মাণ। স্কারলেট চরিত্রটি যেমন জেদি ও স্বার্থপর, তেমনি সে অত্যন্ত সাহসী ও বেঁচে থাকার জন্য লড়াই করতে প্রস্তুত। অন্যদিকে রেট বাটলার চরিত্রটি বাস্তববাদী, আত্মবিশ্বাসী এবং মানবিক অনুভূতিতে পরিপূর্ণ। এই দুই চরিত্রের সম্পর্কই চলচ্চিত্রে আবেগের ভিত্তি তৈরি করে।

তবে এ চলচ্চিত্রটি শুধু প্রশংসিতই নয়, সমালোচিতও হয়েছে। অনেক সমালোচক মনে করেন, এতে দাসপ্রথা এবং দক্ষিণী আমেরিকার অতীতকে অতিরঞ্জিতভাবে রোমান্টিক করে দেখানো হয়েছে। ফলে আধুনিক সময়ে এ চলচ্চিত্রকে নতুন দৃষ্টিকোণ থেকে মূল্যায়ন করা হচ্ছে।

যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী উইনস্টন চার্চিলও সিনেমা দেখতে ভালোবাসতেন। যুদ্ধকালীন ব্যস্ততার মধ্যেও তিনি রাতের বেলায় সিনেমা দেখতেন। চার্চিলের কাছে সিনেমা ছিল এক ধরনের মানসিক বিশ্রাম, যা তাকে পরবর্তী দিনের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণে প্রস্তুত হতে সাহায্য করত। তার এ অভ্যাস প্রমাণ করে যে, কঠিন দায়িত্বের মধ্যেও বিনোদনের প্রয়োজনীয়তা কতটা গুরুত্বপূর্ণ।

অন্যদিকে, সোভিয়েত ইউনিয়নের নেতা জোসেফ স্টালিনের ক্ষেত্রে সিনেমা ছিল এক ভিন্ন মাত্রার বিষয়। তিনি শুধু সিনেমা দেখতেন না, চলচ্চিত্রকে রাজনৈতিক প্রচারের একটি শক্তিশালী মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করতেন। স্টালিন ব্যক্তিগতভাবে চলচ্চিত্র নির্বাচন করতেন এবং প্রায় প্রতিদিন রাতেই সিনেমা দেখতেন। তার কাছে সিনেমা ছিল জনগণের মানসিকতা গঠন এবং রাষ্ট্রের আদর্শ প্রচারের একটি কার্যকর অনুষঙ্গ।

যুক্তরাষ্ট্রের আরেক প্রেসিডেন্ট রোনাল্ড রেগান, যিনি নিজে একজন অভিনেতা ছিলেন, তার সিনেমা প্রীতি ছিল স্বাভাবিক। প্রেসিডেন্ট হওয়ার পরও তিনি সিনেমার সঙ্গে তার সম্পর্ক বজায় রাখেন। হোয়াইট হাউস ও ক্যাম্প ডেভিডে নিয়মিত সিনেমা প্রদর্শনের আয়োজন করা হতো। রেগানের ক্ষেত্রে সিনেমা ছিল তার অতীত জীবনের সঙ্গে সংযোগ রক্ষা এবং বিনোদনের একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম।

আধুনিক যুগে বারাক ওবামার সিনেমাপ্রীতি বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। তিনি প্রতি বছর তার পছন্দের সিনেমার তালিকা প্রকাশ করতেন, যা বিশ্বব্যাপী আলোচনার বিষয় হয়ে উঠত। ওবামার এ অভ্যাস শুধু তার ব্যক্তিগত রুচির প্রতিফলন নয়, এটি সাংস্কৃতিক নেতৃত্বেরও একটি অংশ। তিনি সিনেমার মাধ্যমে সমাজ, রাজনীতি এবং মানবিক বিষয়গুলো সম্পর্কে তার দৃষ্টিভঙ্গি প্রকাশ করতেন।

এ উদাহরণগুলো থেকে স্পষ্ট হয় যে, সরকারপ্রধানদের কাছে সিনেমা শুধু বিনোদনের মাধ্যম নয়। এটি কখনো মানসিক স্বস্তির উৎস, কখনো সংস্কৃতির প্রতিফলন, আবার কখনো রাজনৈতিক প্রচারের অনুষঙ্গ। অনেক নেতা সিনেমার মাধ্যমে জনগণের সঙ্গে সংযোগ স্থাপন করেন এবং সামাজিক বার্তা পৌঁছে দেন। ব্যক্তিগত জীবনে সিনেমা তাদের জন্য একটি স্বস্তির জায়গা তৈরি করে, এতে তারা সাময়িকভাবে দায়িত্বের চাপ থেকে ক্ষণিক স্বস্তি অনুভব করেন।

লেখক: সাংবাদিক ও গবেষক

কালবেলা অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন
  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

মৃত্যুর গুজব ছড়ালেও সুস্থ আছেন অভিনেত্রী তানিয়া বৃষ্টি

স্কুল ফিডিং প্রকল্পে অনিয়ম ও নিম্নমানের খাবার সরবরাহের দায়ে গ্রেপ্তার ২

চলন্ত মাইক্রোবাসে আগুন

‘অবাস্তব কিছু দেখানো হয়নি’ সমালোচনা প্রসঙ্গে নীহা

বিয়ের অনুষ্ঠানে মসজিদে খেজুর ছিটানো যাবে কি

প্রচুর রাগ হলেও শাকিবই আমার রাগ ভাঙায়: বুবলী

তামিম-মোসাদ্দেকে ভর করে অজিদের চ্যালেঞ্জিং লক্ষ্য ছুড়ে দিল টাইগাররা

বিতর্কের মুখে ‘পেদ্দি’ থেকে মুছল জাহ্নবীর আবেদনময়ী দৃশ্য

একনেকে ৩৮৯১ কোটি টাকার ১০ প্রকল্প অনুমোদন, আটকে গেল খুলনা শিপইয়ার্ড সড়ক প্রকল্প

১০ লিটার দুধ দিয়ে গোসল করে আর্জেন্টিনা সমর্থকের ব্রাজিলে যোগদান

১০

ডাকাতি করতে গিয়ে মা-মেয়েকে সঙ্ঘবদ্ধ ‘ধর্ষণ’

১১

বছরে কতবার পরিষ্কার করা হয় মসজিদে নববী?

১২

আত্মসমর্পণের পর পাঁচ আ.লীগ নেতা কারাগারে

১৩

সীমান্তে মাইন বিস্ফোরণে রোহিঙ্গা নিহত

১৪

একনেকে ১০ প্রকল্প অনুমোদন

১৫

কিউবায় ১৫০ বছরের মধ্যে সবচেয়ে শক্তিশালী ভূমিকম্প

১৬

পরম আমাকে বিয়ে করেনি বলে তাদের ভীষণ দুঃখ: রাইমা

১৭

চুক্তি ব্যবস্থাপনায় দক্ষতা বাড়াতে সেতু কর্তৃপক্ষের কর্মকর্তাদের বিশেষ প্রশিক্ষণ শুরু

১৮

আ.লীগ নেতা রানা গ্রেপ্তার

১৯

দক্ষিণ লেবাননে নতুন করে ইসরায়েলি হামলা, বহু হতাহত

২০
X