

ঢাকার দক্ষিণ কেরানীগঞ্জের কদমতলী এলাকায় ‘মেসার্স সেজার্স গ্যাস প্রো’ লাইটার কারখানাটিতে আগুন লেগে অঙ্গার হয়েছেন ছয়জন। আহত হয়ে বেশ কয়েকজন ভর্তি হয়েছেন হাসপাতালে। কালবেলার পক্ষ থেকে মর্মান্তিক এ ঘটনায় নিহতদের আত্মার শান্তি কামনা করছি। শোকসন্তপ্ত পরিবার-পরিজনের প্রতি জানাই গভীর সমবেদনা। তবে দীর্ঘদিন ধরে সিলগালা করে রাখা কারখানাটি কীভাবে চালু ছিল—এ বিষয়টি বিস্মিত করেছে সবাইকে।
শনিবার ভয়াবহ এ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। আগুন লাগা কারখানাটি থেকে ঘন কালো ধোঁয়ার কুণ্ডলী অনেক ওপরে উঠছিল, যা ধীরে ধীরে মুহূর্তে আশপাশে ছড়িয়ে পড়ে। পুরো কারখানাটি দাউ দাউ করে জ্বলছিল। ফায়ার সার্ভিসের সঙ্গে স্থানীয় লোকজনও আগুন নেভাতে সহায়তা করে। ফায়ার সার্ভিস কর্মকর্তারা দুপুর ১টা ১১ মিনিটে গ্যাস লাইটার তৈরির কারখানায় আগুন লাগার খবর পান। দ্রুত কেরানীগঞ্জ ফায়ার স্টেশন থেকে দুটি ইউনিট ঘটনাস্থলে গিয়ে আগুন নেভাতে শুরু করে। এরপর সদর দপ্তরসহ অন্যান্য স্টেশন থেকে আরও পাঁচটি ইউনিট তাতে যুক্ত হয়। দুপুর আড়াইটার দিকে আগুন নিয়ন্ত্রণে নেওয়া সম্ভব হলেও বিকেল পৌনে ৫টার দিকে তা পুরোপুরি নেভানো সম্ভব হয়। এরপর শুরু হয় তল্লাশি। কারখানাটি টিনশেড হওয়ায় স্বাভাবিকভাবেই এর ভেতরে নানা দাহ্য বস্তু রাখা ছিল। আগুন লাগার পর কারখানার ভেতরে থাকা গ্যাস সিলিন্ডারগুলো একের পর এক বিস্ফোরিত হয়। এ শব্দে আশপাশের এলাকা প্রকম্পিত হয়। স্থানীয়রা আতঙ্কিত হয়ে পড়েন। তবে ঢাকায় অতীতে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনাগুলোর মতো এখানেও আগুন প্রতিরোধের মতো কোনো ব্যবস্থা ছিল না বলে জানা যায়। আগুন নেভানোর পর উদ্ধারকর্মীরা ভেতরে তল্লাশি চালিয়ে পুড়ে অঙ্গার হওয়া পাঁচটি মরদেহ উদ্ধার করেন। এ ছাড়া রাত সোয়া ১২টার দিকে আরও একজনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। বেশ কয়েকজন শ্রমিককে খুঁজে পাওয়া যায়নি বলেও স্বজনদের ভাষ্যে। তবে ঈদের ছুটির পর না হলে হতাহতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারত। কেননা কারখানাটিতে অন্তত ২০০ শ্রমিক কাজ করেন। এ ঘটনায় গভীর শোক ও দুঃখ প্রকাশ করেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। এটিকে অত্যন্ত বেদনাদায়ক ঘটনা এবং এ প্রাণহানির ক্ষতি অপূরণীয় বলে মন্তব্য করে তিনি আহতদের সুচিকিৎসার ব্যবস্থা করতে সংশ্লিষ্টদের নির্দেশ দেন। এরই মধ্যে স্বাস্থ্যমন্ত্রী নিহত শ্রমিকদের পরিবারকে শ্রম মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে ২ লাখ টাকা করে আর্থিক সহায়তার ঘোষণা এবং আহতদের সরকারি খরচে চিকিৎসার ঘোষণা দেন, যা প্রশংসনীয়। তবে এতেই তাদের দায়িত্ব শেষ বলে ধরে নেওয়ার কোনো কারণ নেই।
আমরা মনে করি, একই কারখানায় এর আগে একাধিকবার অগ্নিকাণ্ডের ঘটনার পর সিলগালা করে দেওয়ার পরও কারখানাটি কীভাবে চালছিল, তা খতিয়ে দেখা সবচেয়ে জরুরি কাজ। রাজধানী ঢাকা শহরের কাছে প্রশাসনের নাকের ডগায় বসে ঝুঁকিপূর্ণ এ কারখানা চালু থাকা স্পষ্টতই প্রশাসনিক নজরদারির ঘাটতি, দুর্বলতা এবং তাদের দায়িত্বজ্ঞানহীনতারই প্রকাশ। সংশ্লিষ্টরা দায়িত্বশীল হলে মর্মান্তিক এ ঘটনা অবশ্যই এড়ানো যেত। রক্ষা পেত এতগুলো প্রাণ। আমাদের প্রত্যাশা, সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে দুর্ঘটনার কারণ অবিলম্বে খুঁজে বের করে দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির আওতায় আনা হবে। পাশাপাশি বন্ধ কারখানা চালুর পেছনে প্রশাসনিক কিংবা রাজনৈতিক কোনো সম্পৃক্ততা আছে কি না, সেটিও খুঁজে বের করে শাস্তির আওতায় আনা হবে। অতীতে পুরান ঢাকার নিমতলী ট্র্যাজেডির মতো বেশকিছু ঘটনার কথা আমরা জানি। আমরা চাই না এমন হৃদয়বিদারক ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটুক।