

বাংলাদেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে ক্ষমতার পরিবর্তন সবসময়ই উচ্চ প্রত্যাশা, উদ্বেগ এবং কৌতূহলের জন্ম দেয়। বিএনপি সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর প্রথম দেড় মাস মূলত একটি ‘Transition phase’ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। এ সময়কাল সাধারণত নীতিনির্ধারণ, প্রশাসনিক পুনর্বিন্যাস এবং রাজনৈতিক বার্তা প্রতিষ্ঠার জন্য গুরুত্বপূর্ণ। তবে জনমতের বিচারে এ সময়ের মূল্যায়ন সবসময় পুরোপুরিভাবে বাস্তব অবস্থার ইঙ্গিত দেয় না, তবে ‘Morning shows the day’ বলে যে কথাটি রয়েছে, সেটি অনেকটাই প্রমাণ করে।
প্রথমত, রাজনৈতিক পরিবেশ ও স্থিতিশীলতার প্রশ্নে একটি মিশ্র চিত্র দেখা যায়। কেন্দ্রীয় পর্যায়ে সরকার রাজনৈতিক সহনশীলতা ও অন্তর্ভুক্তিমূলক রাজনীতির বার্তা দেওয়ার চেষ্টা করেছে। বিরোধী মতামত প্রকাশের ক্ষেত্র বেশ উন্মুক্ত হয়েছে, এমন ধারণা জনমতের একটি অংশে প্রতিফলিত হয়েছে। তবে মাঠপর্যায়ে এ বার্তার প্রতিফলন পুরোপুরি সমান নয়। স্থানীয় পর্যায়ে দলীয় প্রভাব বিস্তার, ক্ষমতার পুনর্বিন্যাস এবং অভ্যন্তরীণ প্রতিযোগিতার কারণে কিছু সংঘাতের খবর পাওয়া যাচ্ছে। ফলে কেন্দ্রীয় নীতির সঙ্গে স্থানীয় বাস্তবতার কিছুটা ফাঁক আছে।
অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনা, সাধারণ মানুষের জীবনে সবচেয়ে বেশি প্রভাব ফেলে, সেখানে সরকার এখনো প্রত্যাশা পূরণে উল্লেখযোগ্য সাফল্য দেখাতে পারেনি বলে জনমতের বড় অংশ মনে করে। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্যস্ফীতি এখনো নিয়ন্ত্রণে আসেনি, যা মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত জনগোষ্ঠীর জন্য চাপ সৃষ্টি করছে। যদিও সরকার অর্থনৈতিক সংস্কারের ইঙ্গিত দিয়েছে এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্ক জোরদারের চেষ্টা করছে, তবুও এসব উদ্যোগ এখনো বাস্তব ফলাফলে রূপ নেয়নি। ব্যবসায়ী ও বিনিয়োগকারী মহলও এখনো নীতিগত স্বচ্ছতা (Policy Clarity) এবং স্থিতিশীলতার অপেক্ষায় রয়েছে, যা অর্থনীতিতে আস্থার ঘাটতির ইঙ্গিত দেয়। তবে এক্ষেত্রে সরকারকে খুব বেশি দোষ দেওয়া যায় না, কারণ ক্ষমতা গ্রহণের দুই দিন পর শুরু হয় রোজা। সুবিধাবাদী ব্যাবসায়ীরা এ সময়ে ওত পেতে থাকে। প্রকৃতপক্ষে রোজার প্রথম ১০ দিন এর সুবিধা নিলেও পরবর্তী দিনগুলো কিছুটা সহনশীল হয়েছে (রোজার মাসে যতটুকু সম্ভব)। তদুপরি, ইরান যুদ্ধের বৈশ্বিক প্রভাব বাংলাদেশেও পড়েছে।
আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়েও জনমত দ্বিধাবিভক্ত। একদিকে কিছু এলাকায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর উপস্থিতি বৃদ্ধি এবং রাজনৈতিক সহিংসতার হ্রাস ইতিবাচক হিসেবে দেখা হচ্ছে। অন্যদিকে, স্থানীয় পর্যায়ে চাঁদাবাজি, প্রভাব বিস্তার এবং প্রশাসনের নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন রয়ে গেছে। ফলে একটি ‘Control vs Perception gap’ তৈরি হয়েছে, যেখানে সরকারের নিয়ন্ত্রণের দাবি এবং জনগণের অভিজ্ঞতা এক নয়। তবে এটি সত্যি যে, যে সব এলাকার এমপি নিজ এলাকায় উপস্থিত থেকে আইনশৃঙ্খলা, দখলদারিত্ব, চাঁদাবাজি, ঘুষ ইত্যাদির ব্যাপারে সোচ্চার ছিলেন, সেসব এলাকার জনগণের অভিজ্ঞতা ভিন্ন ও স্বস্তিদায়ক। আবার অনেক এমপিই এ ব্যাপারে ব্যর্থ হয়েছেন।
প্রশাসনিক ক্ষেত্রেও সরকার একটি পুনর্বিন্যাস প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। গুরুত্বপূর্ণ পদে বদলি ও নতুন নিয়োগের মাধ্যমে প্রশাসনে ভারসাম্য আনার চেষ্টা করা হচ্ছে। তবে নীতিগত ঘোষণা ও তার বাস্তবায়নের মধ্যে সময়ের ব্যবধান এবং মাঠপর্যায়ে সমন্বয়ের ঘাটতি প্রশাসনিক দক্ষতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে। অনেক ক্ষেত্রে আওয়ামী লীগ সরকারের সুবিধাভোগীরা গুরুত্বপূর্ণ পদে আসীন হয়েছেন। এ পর্যায়ে প্রশাসন ‘Stabilization stage’-এ রয়েছে বলা যেতে পারে, যেখানে কাঠামো তৈরি হচ্ছে, কিন্তু কার্যকারিতা এখনো পুরোপুরি দৃশ্যমান নয়। এখানেও একক প্রচেষ্টা বেশি পরিলক্ষিত হচ্ছে। অর্থাৎ, দেশের প্রধানমন্ত্রী সর্বোচ্চ চেষ্টা করছেন, কিন্তু ১০ থেকে ১২ জন মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী ছাড়া দৃশ্যমান ইনিশিয়েটিভ দেখা যায়নি।
জনমতের দৃষ্টিকোণ থেকে এ সময়কালকে তিনটি ভাগে ভাগ করা যায়। প্রথমত, একটি অংশ পরিবর্তনের আশায় ইতিবাচক মনোভাব পোষণ করছে এবং সরকারের প্রতি সময় দেওয়ার পক্ষে। দ্বিতীয়ত, একটি অংশ দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি ও স্থানীয় শৃঙ্খলার অভাবে হতাশ। তৃতীয়ত, একটি বড় অংশ অপেক্ষমাণ অবস্থানে রয়েছে। তারা এখনো চূড়ান্ত মত গঠন করেনি, বরং বাস্তব ফলাফল দেখতে চায়।
সামগ্রিকভাবে, দেশের প্রধানমন্ত্রী বেশ আস্থা অর্জন করতে পেরেছেন। তার সরকারের বেশ কিছু মন্ত্রীও সক্ষমতা দেখিয়েছেন। কিছু মন্ত্রীর অতিকথন ও চাটুকারিতা সরকার ও দলীয় সমর্থকদের বেশ বিব্রতও করেছে। এরই মধ্যে দু-একজন মন্ত্রী বা প্রতিমন্ত্রীর দুর্নীতির বিষয়টিও জনগণকে ভাবাচ্ছে।
এ প্রেক্ষাপটে সরকারের একটি SWOT (Strength-Weakness-Opportunity-Threats) বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, সরকারের শক্তির জায়গা হলো রাজনৈতিক পরিবর্তনের ম্যান্ডেট অর্থাৎ বিপুল জনসমর্থন, সংস্কারের সুযোগ এবং আন্তর্জাতিক পুনঃসংযোগের সম্ভাবনা। দুর্বলতার মধ্যে রয়েছে অর্থনৈতিক চাপ, মাঠপর্যায়ে নিয়ন্ত্রণের ঘাটতি, প্রশাসনিক অদক্ষতা এবং বিরোধীদলের অপপ্রচার প্রতিরোধের সক্ষমতা। সুযোগ হিসেবে রয়েছে কাঠামোগত সংস্কার ও বিনিয়োগ পরিবেশ উন্নয়নের সম্ভাবনা আর হুমকি হিসেবে রয়েছে, জ্বালানি সংকট মূল্যস্ফীতি অব্যাহত থাকা, সিন্ডিকেট, বিরোধীদল কর্তৃক যে কোনো সংকট তৈরির সক্ষমতা, দলীয় কোন্দল এবং জনআস্থার দ্রুত ক্ষয়।
সামগ্রিকভাবে মূল্যায়নে দেখা যায়, রাজনীতি আংশিকভাবে স্থিতিশীল হলেও স্থানীয় সংঘাত একটি ঝুঁকি হিসেবে রয়েছে। অর্থনীতি চাপের মধ্যে থাকলেও সংস্কারের চেষ্টা রয়েছে। প্রশাসন পুনর্বিন্যাসের মধ্যে থাকায় সমন্বয়ের অভাব রয়েছে। তবে দক্ষতা বৃদ্ধির সুযোগ ও চেষ্টাও বিদ্যমান। আইনশৃঙ্খলা বেশ নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। তবে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ওপর আস্থা প্রতিষ্ঠা হয়নি। এ ক্ষেত্রে দীর্ঘ সময় প্রয়োজন বলে মনে করেন বেশিরভাগ মানুষ।
দেড় মাস একটি সরকারের জন্য খুবই স্বল্প সময়; বিশেষ করে বাংলাদেশের মতো জটিল অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক কাঠামোর দেশে। এ সময়ের মূল্যায়ন চূড়ান্ত নয়; বরং এটি একটি সূচনামাত্র। জনগণ এখনো সরকারকে একটি ‘Performance window’ দিয়েছে। আগামী তিন থেকে ছয় মাস হবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময়, যখন নীতিগত ঘোষণা বাস্তব ফলাফলে রূপান্তরিত হতে হবে। না হলে, আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচনে তার ব্যাপক প্রভাব পড়বে। তবে, এখনো জনগণ বিএনপির ওপর বিরূপ নয়, এটি নিঃসন্দেহে বলা যায়।
লেখক: রাজনীতি বিশ্লেষক