

সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের ঝরে পড়া রোধ ও পুষ্টি নিশ্চিত করার লক্ষ্য নিয়ে শুরু হওয়া মিড ডে মিল কর্মসূচিতে যে তদারকি ব্যবস্থার চরম গলদ এবং অব্যবস্থাপনার সৃষ্টি হয়েছে, তা স্পষ্টভাবে প্রকাশিত হয়েছে দৈনিক কালবেলার এ-সংক্রান্ত একটি প্রতিবেদনে। কোমলমতি শিক্ষার্থীদের মিড ডে মিলে সরবরাহ করা পচা কলা, নষ্ট ডিম রুটির উপস্থিতি এ দায়িত্বজ্ঞানহীনতা ও অব্যবস্থাপনাকেই নির্দেশ করে, যা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।
আমরা জানি, সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ঝরে পড়া রোধ, উপস্থিতি বাড়ানোসহ শিক্ষার্থীদের পুষ্টি নিশ্চিত করতে চালু হয় বহুকাঙ্ক্ষিত মিড ডে মিল কর্মসূচি। মাঝপথে বন্ধও হয়ে যায়। পরবর্তী সময়ে গত বছর নভেম্বরে এটা ফের শুরু হয়। মঙ্গলবার কালবেলায় প্রকাশিত প্রতিবেদন বলছে, এ কর্মসূচিতে মানসম্মত খাবার দেওয়ার কড়া বার্তা থাকলেও বাস্তবে ঘটছে উল্টো। শিক্ষার্থীদের পাতে পরিবেশন করা হচ্ছে পচা কিংবা অপরিপক্ব কলা, নষ্ট ডিম, ফাঙ্গাস ধরা পাউরুটিসহ মানহীন খাবার। ওজনেও রয়েছে গরমিলের অভিযোগ। এমনকি এসব খাবার খেয়ে বিভিন্ন জায়গায় শিক্ষার্থীরা অসুস্থ হয়ে পড়ছে। এ ছাড়া প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের মেনু বা তালিকা অনুযায়ী খাবার বিতরণ না করার অভিযোগ রয়েছে প্রায় সব বিদ্যালয়েই। নিঃসন্দেহে এটি হতাশার কথা।
জানা যায়, সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের স্কুল ফিডিং কর্মসূচির আওতায় প্রথম মেয়াদে ১৫০টি উপজেলার প্রায় বিশ হাজার বিদ্যালয়ের স্কুল ফিডিং কার্যক্রম চলছে। এর মধ্যে গত নভেম্বর শুরু হয়েছে ৫৭টি উপজেলায় আর বাকি উপজেলায় স্কুল ফিডিং কার্যক্রম শুরু হয়েছে গত ২৯ মার্চ। এতে উপকারভোগী শিক্ষার্থীর সংখ্যা ৩১ লাখের অধিক। সরকার যে মহৎ উদ্দেশ্য নিয়ে এ কর্মসূচি চালু করেছে, ঠিকাদারদের দায়িত্বহীনতা ও সংশ্লিষ্টদের খামখেয়ালিপনার কারণে তা যে ভেস্তে যেতে পারে, এ ধারণা উড়িয়ে দেওয়ার উপায় নেই। সেটা হলে তা হবে অত্যন্ত দুঃখজনক। এ বিশাল কর্মযজ্ঞের মূল লক্ষ্য ছিল বিদ্যালয়ে উপস্থিতি বাড়ানো এবং নিম্নবিত্ত পরিবারের শিশুদের পুষ্টির চাহিদা মেটানো। কিন্তু মাঠপর্যায়ের চিত্রে সামাজিক এ উদ্যোগটি ব্যর্থতার ঝুঁকির চিত্রই বড় হয়ে উঠেছে। বিস্ময়কর বিষয় হচ্ছে, এ প্রসঙ্গে স্কুল ফিডিং কর্মসূচির প্রকল্প পরিচালক এক রকমের গা-ঢাকা দিয়েছেন বললে বেশি বলা হবে না। কেননা, এ বিষয়ে তার ব্যাখ্যা জানার সব প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়েছে। অনুমান করা যায়, তিনি সচেতনভাবেই এড়িয়ে চলছেন, যা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। তাকে জবাবদিহির আওতায় আনা জরুরি।
আমরা মনে করি, একটি জাতির সমৃদ্ধি নির্ভর করে তার শিশুদের সুস্থভাবে বেড়ে ওঠার ওপর। রাষ্ট্রীয় কোষাগারের টাকা ব্যয় করে শিশুদের পচা খাবার তুলে দেওয়ার এ অসুস্থ প্রবণতা এখনই বন্ধ করতে হবে। শিশুদের নিয়ে এ তামাশা চলতে দেওয়া যাবে না। এটা চলতে থাকলে, ঝরে পড়া কমার বদলে শিশুদের অসুস্থতা ও অনীহার কারণে মূল উদ্দেশ্যেই অসফল হবে। পুরো ব্যবস্থাপনায় বড় একটি গলদ পরিলক্ষিত হচ্ছে, তা হচ্ছে তদারকি ব্যবস্থায় দুর্বলতা ও সংশ্লিষ্ট সরকারি কর্মকর্তাদের উদাসীনতা। প্রকল্পের পরিচালক থেকে শুরু করে স্থানীয় শিক্ষা কর্মকর্তারা এ দায় এড়াতে পারেন না। তদারকি জোরদার থাকলে পচা খাবার পৌঁছানোর সাহস ঠিকাদাররা পেত না। আর সংশ্লিষ্টদের উদাসীনতা সংকটকে করেছে আরও ঘনীভূত। আমাদের প্রত্যাশা, দ্রুত তদারকি ব্যবস্থায় আমূল পরিবর্তন আনা হবে এবং দায়িত্বে অবহেলাকারীদের জবাবদিহির আওতায় আনা হবে। শিশুরা যেন এ প্রকল্পের সর্বোচ্চ সুফল পায়, তা নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্টরা আন্তরিক হবেন।