কালবেলা প্রতিবেদক
প্রকাশ : ০৮ এপ্রিল ২০২৬, ১২:০০ এএম
আপডেট : ০৮ এপ্রিল ২০২৬, ০৪:০৫ পিএম
প্রিন্ট সংস্করণ
যে কথা কেউ শোনে না

সামনে জামায়াত পেছনে আওয়ামী লীগ

ইলিয়াস হোসেন
ছবি : কালবেলা গ্রাফিক্স
ছবি : কালবেলা গ্রাফিক্স

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে প্রায় দুমাস ধরে রাষ্ট্র পরিচালনা করছে বিএনপি সরকার। একশ দিন নয়, ১৮০ দিবস অর্থাৎ ছয়মাসের কর্মসূচি দিয়ে নিজেদের মধুচন্দ্রিমাকাল ঘোষণা করেছে তারা। এরই মধ্যে ব্যক্তিগত নৈপুণ্যে আলোচনা এবং প্রশংসায় ভাসছেন তারেক রহমান। বর্তমান সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকে বেশ কিছু জনকল্যাণমুখী ও সংস্কারমূলক উদ্যোগ নিয়েছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো—ব্যক্তিগত খরচে চলাচলের সিদ্ধান্ত, ১৮০ দিনের অ্যাকশন প্ল্যান, ফ্যামিলি কার্ডের মাধ্যমে টিসিবির পণ্য বিতরণ, কৃষকদের ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত কৃষিঋণ মওকুফ এবং প্রযুক্তি ও আইসিটি খাতে সংস্কার। প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তারেক রহমান সরকারি গাড়ি, চালক ও জ্বালানি ব্যবহার না করে নিজ ব্যবস্থাপনায় চলাচল করছেন। প্রটোকল কমিয়ে শনিবারও অফিস করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। এ নিয়ে জনমনে ব্যাপক চমকের সৃষ্টি হয়। প্রধানমন্ত্রীর লাটবহরের নামে সাধারণ পথচারীদের আটকে রাখা হচ্ছে না। জ্যামে আটকা প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে কুশল বিনিময় করে অভিভূত হচ্ছেন পথচলতি মানুষ। অতি সাধারণ বেশভূষা, চলাফেরায় মনোযোগ আকর্ষণ করেছেন তিনি। আটপৌরে মধ্যবিত্ত পরিবারের অভিভাবকের মতো স্ত্রী-কন্যাকে গুরুত্ব দেওয়ায় ধন্য ধন্য করছে নাগরিক সমাজ। কিন্তু, এসবের বাইরেও হিসাবের খাতা খুলে রেখেছে সংশ্লিষ্টরা। বেশি ভালো, ভালো না—এই আপ্তবাক্যে বিশ্বাসী মানুষের সংখ্যাও কম নয় দেশে। তারা বলছেন, সরকারপ্রধান কেন তার জন্য বরাদ্দ সম্মান ও সুযোগ-সুবিধা নেবেন না? প্রটোকল কমানোয় নিরাপত্তা ঝুঁকি বেড়েছে। সাশ্রয়ের চেয়ে নিরাপত্তা জরুরি।

বিনিয়োগের বাধা দূর করতে ব্যবসায়ী নেতাদের সঙ্গে বৈঠক, কর ও শুল্ক কাঠামোতে সংস্কারের উদ্যোগ এবং PayPal পরিষেবা চালুর জন্য কার্যকর পদক্ষেপ নিয়েছে। কিন্তু, গত দুমাসে নিত্যপণ্যের দাম নিয়ন্ত্রণে তেমন কোনো মুনশিয়ানা দেখাতে পারেনি সরকার। নতুন করে আলোচনায় এসেছে ফ্যাসিস্ট আমলে সুবিধাভোগী ব্যবসায়ীদের নাম। বিশ্বজুড়ে জ্বালানি সংকটের ঝাপটা লেগেছে দেশেও। সংকট সর্বজনীন হলেও শঙ্কা একান্তই নিজস্ব। ‘পর্যাপ্ত মজুত আছে, সংকট নেই’—সরকারের এ কথায় আস্থা রাখছে না কেউ। তেল নিয়ে তেলেসমাতি চলছেই। পাম্প থেকে শুরু করে মোটরসাইকেল মালিক পর্যন্ত সুযোগ পেলেই মজুত করছে। অনাগত দিনের কথা ভেবে মানুষ আতঙ্কে ভুগছে। নতুন সরকারের জন্য এটা বড় চ্যালেঞ্জ। গত ঈদ যাত্রায় সফলতা দাবি করেছেন সরকারের মন্ত্রীরা। কিন্তু পাস নম্বর দেয়নি যাত্রীরা। অব্যবস্থাপনা আর দুর্ঘটনায় প্রায় চারশ মানুষ মারা গেছে। শিক্ষার্থীদের জন্য জাপানে স্টুডেন্ট ভিসার ক্ষেত্রে জামানতবিহীন ঋণের সীমা ৩ লাখ থেকে বাড়িয়ে ১০ লাখ টাকা করা হয়েছে। তরুণরা এতে খুশি। কিন্তু, ঋণ পেতে ব্যাংকিং সেক্টরের আমলাতান্ত্রিক জটিলতার নিরসন চায় তারা। জাতীয় অ্যাথলেটদের জন্য ‘স্পোর্টস অ্যালাউন্স’ চালু করে প্রশংসিত হয়েছে সরকার। তবে, খেলার মানোন্নয়নে ব্যবস্থাপনা পর্ষদের দৃশ্যমান কোনো উন্নতি হয়নি। উপরন্তু কমিটি নিয়ে রাজনীতি বেড়েছে। বাফুফে, বিসিসি সব ক্রীড়া প্রতিষ্ঠানেই অসন্তোষ চলছে। শুধু যোগ্যতা ও দক্ষতা দেখে নিয়োগ দিলেই হচ্ছে না। ফ্যাসিস্ট, অন্তর্বর্তী নাকি বর্তমান সরকারের অনুগত— সেটাও এখন দেখতে হচ্ছে।

অর্থনীতির চাকা সচল রেখে পরিকল্পনা অনুযায়ী নতুন বাংলাদেশ গড়তে হবে। সেজন্য প্রতি পদে পদে বাধা আসবে। ভেতর-বাহির সব জায়গা থেকেই বাধাবিপত্তি আসতে পারে। চব্বিশের রক্তাক্ত গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে ফ্যাসিস্টমুক্ত দেশে জনগণের প্রত্যাশা বেড়েছে কয়েকগুণ। অভ্যুত্থানের সহযোগী সংগঠন জামায়াতে ইসলামী এখন প্রধান বিরোধী দল। দীর্ঘদিন ধরে দলটির নেতাকর্মীদের অনেকে গুপ্ত রাজনীতির সঙ্গে জড়িত ছিল। বর্তমানে তারা প্রকাশ্যে দলীয় রাজনীতি করছে। এদের অনেকে আগে আওয়ামী লীগ বা বিএনপির নেতা-কর্মী-সমর্থক হিসেবে পরিচিত ছিল। সাংবিধানিক এবং সংসদীয় রাজনীতির ধারক ও বাহক হিসেবে তারা এখন সরকারের সমালোচনা করবে— এটাই স্বাভাবিক। সরকারের গৃহীত পদক্ষেপ জনবিরোধী মনে হলে প্রতিবাদ করবে। সংসদে সুবিধা করতে না পারলে রাজপথে নামবে। অর্থাৎ সামনে থেকে বিরোধিতা করবে। আর, চব্বিশের পাঁচ আগস্টের পরপরই পলাতক আওয়ামী লীগ পেছন থেকে শত্রুতা করে আসছে। দুটি দলই প্রাচীন। একটি কর্মীনির্ভর। অন্যটি ধর্মনির্ভর। এই দুই মিলিত শক্তির বিপরীতে কতটুকু প্রস্তুত ক্ষমতাসীন দল বিএনপি। দলটি উদার গণতান্ত্রিক ও সমর্থকনির্ভর। ধর্ম বা ক্যাডারভিত্তিক রাজনীতিতে অভ্যস্ত নয় বিএনপি। এর জন্য তাদের অনেক মূল্যও দিতে হয়। এর পরও স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব নীতি ও আধুনিকতার জন্য জনগণের প্রথম পছন্দ শহীদ জিয়ার বিএনপি। কিন্তু ক্ষমতা পেলে দলটি খেই হারিয়ে ফেলে প্রায়ই। ১৯৯১-৯৬ সালের বিএনপি সরকার সর্বদা প্রশংসিত সব মহলে। প্রত্যাশা বাড়ায়, তার চেয়ে কয়েকগুণ ভালো করলে বর্তমানে প্রশংসা পাবে। এরই মধ্যে টুকটাক ভুল করলেও কঠোর সমালোচনা করছে না শুভাকাঙ্ক্ষীরা। হানিমুন পিরিয়ড পর্যন্ত সময় দিতে চায় তারা।

গতকাল ও গত রোববার আওয়ামী লীগ এবং জামায়াতের দুজন নারী নেত্রী গ্রেপ্তার হন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এ সংবাদের প্রতিক্রিয়ায় ব্যাপক সরব প্রতিবাদ জানায় দল দুটির সমর্থকরা। মঙ্গলবার ভোরে রাজধানীর ধানমন্ডির একটি বাসা থেকে আটক করা হয় জাতীয় সংসদের সাবেক স্পিকার শিরীন শারমিন চৌধুরীকে। তাকে সাতটি মামলায় কারাগারে পাঠানো হয়। শেখ হাসিনার সরকারের পতনের ২৭ দিনের মাথায় ২০২৪ সালের ২ সেপ্টেম্বর পদত্যাগ করেন সাবেক স্পিকার। ২০১৩ সালের ৩০ এপ্রিল স্পিকার নির্বাচিত হন শিরীন শারমিন। এর পর থেকে টানা তিনি এ দায়িত্বে ছিলেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাকে গ্রেপ্তারের প্রতিবাদে দিনভর সরব থাকে আওয়ামী লীগ সমর্থকরা। তিনি উচ্চশিক্ষিত, মার্জিত নারী বলে উল্লেখ করা হয় বিভিন্ন স্ট্যাটাসে। তিনি প্রহসনের নির্বাচনে জয়ী হয়ে স্পিকারের দায়িত্ব পেয়েছিলেন। সে কথা কেউ লিখছেন না। অন্যদিকে, গত রোববার রাত ১১টার দিকে নিজ বাসা থেকে জামায়াতের ভোলা পৌরসভার নারী কর্মী বিবি সাওদাকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। তাকে গ্রেপ্তার করার ঘটনায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। জামায়াতের বিভিন্ন শাখার রাজনৈতিক ও সামাজিক অঙ্গনের ব্যক্তিরা এ নিয়ে প্রকাশ্যে মতামত দিয়েছেন। ‘‘কথা বলার অপরাধে প্রতিবন্ধী সন্তানের মা আটক’। মত প্রকাশের জন্য ৩৭ বছরের নারীকে আটকের ঘটনায় ফ্যাসিস্টের পদধ্বনি পাওয়া যায়।’’— এ রকম হাজারো হৃদয়বিদারক মন্তব্য করেছেন জামায়াতের অনুসারীরা। কিন্তু বাকস্বাধীনতার নামে ওই নারীর অশালীন শব্দ চয়ন নিয়ে কোনো কথা নেই। বিষয় নির্বাচনেও রীতিমতো সাইকো চরিত্রের মানুষ মনে হয়। নেতাকর্মীদের প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আওয়ামী লীগ ও জামায়াতের অনুসারীদের ভক্তি তুলনাহীন। এদিকে, মূল্যায়নের প্রশ্নে অনেক জাতীয়তাবাদী অনলাইন অ্যাক্টিভিস্ট নীরব হয়ে যাচ্ছে। স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন জাগে, সামনে জামায়াত ও পেছনে আওয়ামী লীগ তৎপর হলে বিএনপি কি চিড়েচ্যাপটা হয়ে যাবে?

এরই মধ্যে সংসদে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদের ঝড়ো ব্যাটিংয়ে দিশেহারা হয়ে রাজপথে নেমেছে জামায়াত। বিএনপি সংস্কার চায় না বলে দিন-রাত প্রচার করছে তারা। লোকজনও বারবার শুনতে শুনতে বিভ্রান্ত হচ্ছে। কিন্তু বিএনপির নীতিনির্ধারকরা আমলে নিচ্ছে না। জুলাই জাতীয় সনদ অনুযায়ী রাষ্ট্র সংস্কারে অনুষ্ঠিত গণভোটের রায় বাস্তবায়নের দাবিতে সারা দেশে সাত দিনের কর্মসূচি ঘোষণা করেছে জামায়াতের নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় ঐক্য। আগামী ৯ এপ্রিল থেকে ১৫ এপ্রিল পর্যন্ত সারা দেশে লিফলেট বিতরণ ও গণসংযোগ করবে। রাজধানীর শাহবাগে এ কর্মসূচির উদ্বোধন করা হবে। এ ছাড়া ১১ এপ্রিল সব মহানগরীতে ও ১২ এপ্রিল সব জেলায় বিক্ষোভ এবং ১৩ এপ্রিল রাজধানীর কাকরাইলের ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ারিং ইনস্টিটিউটে জাতীয় সেমিনার অনুষ্ঠিত হবে। ধীরে ধীরে কঠোর কর্মসূচির দিকে যাবে বলে হুঁশিয়ারি দিয়ে রেখেছেন তারা।

রণাঙ্গনের মুক্তিযোদ্ধাদের গড়া দল বিএনপিকে প্রোপাগান্ডার মাধ্যমে স্বাধীনতাবিরোধী তকমা দিয়েছিল আওয়ামী লীগ। জামায়াত জোটসঙ্গী থাকায় প্রচারের পালে আরও হাওয়া লাগে। টানা সতেরো বছর ফ্যাসিস্টবিরোধী আন্দোলন করেছে বিএনপি। গুম-খুন-অপহরণ-হামলা-মামলায় জেরবার হয়েছে দলটির লাখ লাখ নেতাকর্মী। আন্দোলনের চূড়ান্ত পর্যায়ে গণঅভ্যুত্থানে পনেরোশর বেশিরভাগ শহীদ বিএনপির। তাদের হাজার হাজার আহত, অন্ধ, পঙ্গু নেতাকর্মী অভ্যুত্থানের দগদগে স্মৃতি বহন করছেন। তার পরও দলটিকে জুলাইবিরোধী হিসেবে প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করছে জামায়াত। নিজেদের অর্জনকে সুরক্ষা দিতে পারে না বিএনপি। নাকি জনগণের ওপর ছেড়ে দিয়ে শুধু রাষ্ট্রক্ষমতা উপভোগ করতে চায়?

লেখক: হেড অব নিউজ, আরটিভি

কালবেলা অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন
  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

কাপ্তাই হ্রদে ডুবে চবি শিক্ষার্থীর মৃত্যু 

বিশ্বকাপে বাংলাদেশের সমর্থন চাইল নরওয়ে, তুলে ধরল একাধিক কারণ

ঢাকেশ্বরী জাতীয় মন্দিরের উপদেষ্টা মঞ্জুশ্রী রায় চৌধুরীর পরলোকগমন

রামিসা হত্যা : দ্রুতই শুনানি করতে চান রাষ্ট্রপক্ষ

কেআইবিতে জুনিয়রের ঘুসিতে রক্তাক্ত সিনিয়র কর্মকর্তা

ইরানে ইসরায়েলি হামলায় দুই সেনা নিহত

অপু থেকে বুবলী : সন্তান প্রসঙ্গে কেন বারবার একই চিত্র?

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, সংসদ ও পুলিশের প্রতিক্রিয়ায় টিআইবির ব্যাখ্যা

পুকুরে মিলল মাদ্রাসাছাত্রের লাশ

১৯৭১ : একটি গ্রামের গল্প

১০

কেরানীগঞ্জ কেন্দ্রীয় কারাগারে বন্দিদের মাঝে মৌসুমী ফল বিতরণ

১১

রাতের মধ্যে বজ্রবৃষ্টি হতে পারে যেসব জেলায়

১২

ডিজিটাল মাধ্যমেও নারী-শিশুরা নিরাপদ নয় : নিপুণ রায় 

১৩

আসামি ছিনিয়ে নেওয়ার চেষ্টা, আটক ৫

১৪

ময়লাবাহী ট্রাকচাপায় যুবদল ও ছাত্রদল নেতার মৃত্যু

১৫

সরকার অনিয়মের নির্বাচন করলে মুখ থুবড়ে পড়বে : জাতীয় পার্টির মহাসচিব

১৬

সোলার এনার্জিতে উজ্জ্বল পদ্মা সেতুর সার্ভিস এরিয়া, কমছে বিপুল বিদ্যুৎ বিল

১৭

আর্মি স্টেডিয়ামে কূটনৈতিক কোর ও বাংলাদেশের কর্মকর্তাদের প্রীতি ম্যাচ

১৮

প্রধানমন্ত্রীর মূল লক্ষ্য সুখী-সমৃদ্ধ বাংলাদেশ বিনির্মাণ করা : অধ্যাপক ডোনার

১৯

যে জয়ের কথা স্মরণ করলেন মাশরাফি

২০
X