বুধবার, ১০ জুন ২০২৬, ২৭ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩
কালবেলা প্রতিবেদক
প্রকাশ : ০৮ এপ্রিল ২০২৬, ১২:০০ এএম
আপডেট : ০৮ এপ্রিল ২০২৬, ০৪:২৪ পিএম
প্রিন্ট সংস্করণ

যুদ্ধে টিকে থাকাই ইরানের বিজয়

নেসরিন মালিক
ছবি : কালবেলা গ্রাফিক্স
ছবি : কালবেলা গ্রাফিক্স

পাঁচ সপ্তাহ। আমরা এখন পাঁচ সপ্তাহ পার করেছি এবং ইরানের সঙ্গে যুদ্ধের ষষ্ঠ সপ্তাহে প্রবেশ করছি, যা শুরু হয়েছিল একটি ‘নির্ভুল ও শক্তিশালী সামরিক অভিযান’ হিসেবে, যার লক্ষ্য ছিল ‘তাৎক্ষণিক পারমাণবিক হুমকি’ দূর করা এবং ইরানের জনগণকে তাদের সরকার পরিবর্তনে উৎসাহিত করা, তা এখন আর কোনোভাবেই নির্ভুল বা শক্তিশালী বলা যায় না। উপসাগরীয় দেশগুলো ইরানের পাল্টা হামলায় বিপর্যস্ত, হরমুজ প্রণালি বন্ধ, আর সামরিক আঘাত বা গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে সরকার পতনের কোনো লক্ষণও নেই। ভূপাতিত দুটি মার্কিন বিমানচালককে উদ্ধার করা নিয়ে অতিরিক্ত উদযাপন করা হচ্ছে, কারণ, পরিকল্পনা অনুযায়ী আর কিছুই এগোচ্ছে না। ভুলটি আগের মতোই, অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাস ও অজ্ঞতার মিশ্রণ, যা ইরানের রাজনৈতিক বাস্তবতার কারণে আরও জটিল হয়ে উঠেছে।

যুদ্ধের শুরুতে এক ধরনের মানসিক ধাক্কা কাজ করে। এমন এক মানসিক বিলম্ব, যেখানে মানুষ দ্রুত বুঝতে পারে না যে, বিপজ্জনক সংঘাত সহজে নিয়ন্ত্রণে আনা যায় না। যুক্তরাষ্ট্র জড়িত থাকলে এই বিলম্ব আরও বেশি হয়। কারণ, অনেকের কাছে এখনো কল্পনাতীত যে, শক্তিশালী সামরিক ক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও যুক্তরাষ্ট্র দ্রুত লক্ষ্য অর্জন করতে পারবে না। দুর্বল প্রতিপক্ষ দ্রুত হার মানবে না। মিত্ররা স্বয়ংক্রিয়ভাবে যুক্তরাষ্ট্রের পাশে এসে দাঁড়াবে না। আর যুদ্ধের প্রভাব শুধু নির্দিষ্ট অঞ্চল ও জনগণের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না।

এই পূর্বাভাসগুলোর কোনোটি বাস্তবে ঘটেনি। এ সংঘাত জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা সৃষ্টি করেছে। দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধ হলে একটি বিরল বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মন্দার আশঙ্কাও করা হচ্ছে। ডোনাল্ড ট্রাম্প ইউরোপীয় ও উপসাগরীয় মিত্রদের এ যুদ্ধে অংশ নিতে বা হরমুজ প্রণালি খুলে দিতে রাজি করাতে পারেননি। আর ইরানের সরকারও ভেঙে পড়েনি, উপরন্তু যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সরঞ্জাম ও জনবলের ওপর চাপ বাড়াচ্ছে।

এই ভুলগুলো এসেছে আমেরিকার ক্ষমতার ওপর অতিরিক্ত আস্থার কারণে। ইরানের ওপর হামলা শুরু হওয়ার পর অনেকেই আবারও আমেরিকান আধিপত্যের উত্তেজনায় ভেসে যায়। নিউইয়র্ক পোস্টের সম্পাদকীয় বোর্ড এটিকে একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ বলে উল্লেখ করে। ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল লিখেছিল, এই যুদ্ধ ঝুঁকিপূর্ণ হলেও এটি মধ্যপ্রাচ্যকে নতুনভাবে গড়ে তুলতে পারে এবং বিশ্বকে আরও নিরাপদ করতে পারে। যারা এ ধারণা নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেছিল, তাদের সমালোচনা করা হয়। নিউইয়র্ক টাইমসের কলামিস্ট ব্রেট স্টিফেন্স বলেছিলেন, এত হতাশাবাদ দেখে তিনি বিস্মিত, যুদ্ধ শুরু হওয়ার দুই সপ্তাহের মধ্যেই এটি শেষ হয়ে যাবে। বাস্তবে তা হয়নি।

এখন যখন সেই প্রাথমিক মানসিক বিভ্রান্তি কেটে গেছে, তখন আলোচনায় এসেছে অচলাবস্থা, সম্ভাব্য সমাধানের পথ এবং এমন উপায়, যাতে ট্রাম্প অপমান এড়িয়ে এই যুদ্ধ থেকে বের হতে পারেন। এখন প্রশ্ন আর কত দ্রুত যুদ্ধ শেষ হবে তা নয়, বরং ২০০৩ সালে ইরাক যুদ্ধের সময় জেনারেল ডেভিড পেট্রেয়াস যে প্রশ্ন তুলেছিলেন, সেটিই আবার সামনে এসেছে, এ যুদ্ধের শেষ কোথায়।

এখন পরিষ্কার হয়ে উঠছে, ইরান একটি জটিল রাষ্ট্র, যার অভ্যন্তরীণ বাস্তবতা এত সহজ নয় যে, সেটিকে একটি সরল গল্পে ব্যাখ্যা করা যাবে। সেই গল্পে বলা হয়েছিল, একটি খারাপ সরকারকে দুর্বল করা হলে জনগণই তাকে সরিয়ে দেবে। বাস্তবে বিষয়টি এত সহজ নয়।

প্রথম ভুল ছিল ইরানের অসম যুদ্ধ কৌশল চালানোর সক্ষমতা ও আগ্রহকে অবমূল্যায়ন করা। উপসাগরীয় অঞ্চলকে অচল করে দিতে তাদের শক্তিশালী সামরিক বাহিনী থাকা জরুরি নয়। তারা এমনভাবে আঘাত হানতে পারে, যা সরাসরি বড় ধরনের ধ্বংস বা বিপুল প্রাণহানি ঘটায় না। কিন্তু স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাহত করে, জ্বালানি অবকাঠামোকে ঝুঁকিতে ফেলে, অর্থনীতিকে দুর্বল করে এবং যুদ্ধের খরচ যুক্তরাষ্ট্রের মিত্রদের ওপর চাপিয়ে দেয়। সস্তা ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্রের ধারাবাহিক হামলার মাধ্যমেই তারা এ লক্ষ্য অর্জন করেছে।

দ্বিতীয় ভুল ছিল এই অদ্ভুত ধারণা যে, ইরান তাদের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অস্ত্র ব্যবহার করবে না, অর্থাৎ হরমুজ প্রণালি বন্ধ করবে না। অথচ গত বছরের ১২ দিনের যুদ্ধের সময়ও এই প্রণালি বন্ধ করার সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা হয়েছিল। সে সময় কাতারের কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথোপকথনে তারা যে বিষয়টি নিয়ে সবচেয়ে বেশি উদ্বিগ্ন ছিল, তা ক্ষেপণাস্ত্র হামলা নয়, বরং প্রণালি বন্ধ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা।

তৃতীয় ভুল ছিল গণঅভ্যুত্থানের প্রত্যাশা। সেটি ঘটেনি। এর পেছনে একাধিক কারণ রয়েছে। সবচেয়ে স্পষ্ট কারণ হলো, যখন একটি দেশ বোমাবর্ষণের মধ্যে থাকে, তখন মানুষ রাস্তায় নামতে চায় না। পাশাপাশি কয়েক মাস আগেই যে সরকার বিক্ষোভকারীদের হত্যা করেছে, তাদের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করা সহজ নয়। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে জনমতের বিভাজন, যা আগে থেকেই জটিল ছিল এবং বাইরের হামলার কারণে আরও তীব্র হয়েছে, যেখানে বেসামরিক মানুষ ও অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

এসব ভুলের মূল কারণ একটাই, ইরানের রাজনৈতিক ব্যবস্থাকে না বোঝা। নানা সমালোচনা থাকা সত্ত্বেও এ শাসনব্যবস্থার দীর্ঘস্থায়ী সংঘাত সহ্য করার সক্ষমতা অনেক বেশি। সুস্পষ্ট সামরিক বিজয়ের সম্ভাবনা না থাকলেও তারা সংঘাত চালিয়ে যেতে পারে, যা যুক্তরাষ্ট্রের জন্য কল্পনাতীত।

মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতি দীর্ঘদিন ধরে যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাবকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে। গত চার দশকে অনেক দেশ যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে তুলে অর্থনৈতিক সহায়তা, বিনিয়োগ এবং নিরাপত্তা সুবিধা পেয়েছে। এ কারণে ইরান তার উপসাগরীয় প্রতিবেশীদের সন্দেহের চোখে দেখে। তাদের দৃষ্টিতে এসব দেশ যুক্তরাষ্ট্রের ঘাঁটি স্থাপন ও ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার মাধ্যমে পরোক্ষভাবে এ যুদ্ধে জড়িত হয়ে গেছে।

এ বাস্তবতায় যুক্তরাষ্ট্র ধরে নিয়েছিল, শেষ পর্যন্ত সবাই আত্মসমর্পণ করবে। কেউ যুক্তরাষ্ট্রের শক্তির সুবিধা নিতে চাইবে, কেউ তার আধিপত্য মেনে নেবে; কিন্তু এ ধারণা সব দেশের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়। বিশেষ করে এমন দেশের ক্ষেত্রে নয়, যারা দীর্ঘদিন অবরোধ ও নিষেধাজ্ঞার মধ্যে থেকেও নিজস্ব কৌশল তৈরি করেছে, যেখানে শক্তির অর্থ আধিপত্য নয়, টিকে থাকা।

হিজবুল্লাহ থেকে হুতিদের মতো ইরানের মিত্র গোষ্ঠীগুলো দেখায়, কীভাবে ইরান নিজের সীমার বাইরে থেকেও প্রভাব বজায় রাখতে পারে এবং নিজের স্বার্থ রক্ষা করতে পারে।

ট্রাম্প এমন এক প্রতিপক্ষের মুখোমুখি, যাকে তিনি বোঝেন না। একদিকে তার অজ্ঞতা, অন্যদিকে এ শাসনব্যবস্থার ভিন্ন ধরনের চরিত্র, যা দশকের পর দশক ধরে নিজস্ব কাঠামো গড়ে তুলেছে। এখানে সাফল্যের অর্থ হলো যুক্তরাষ্ট্রের আধিপত্যের মুখেও নিজের শর্তে টিকে থাকা।

এ যুদ্ধ নির্ধারিত সময়ের চেয়ে দীর্ঘ হয়েছে, এর শেষ স্পষ্ট নয় এবং সবার জন্য ব্যয় বাড়ছে। কারণ, এটি শুধু যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে ইরানের লড়াই নয়, এটি এমন পক্ষগুলোর মধ্যে সংঘাত, যাদের কাছে বিজয়ের অর্থই ভিন্ন।

লেখক: দ্য গার্ডিয়ানের কলামিস্ট। গার্ডিয়ানে প্রকাশিত নিবন্ধটি ভাষান্তর করেছেন তহমিনা মিলি

কালবেলা অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন
  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

আলভারেজকে নিয়ে রিয়ালের ‘মেগা বিড’, প্রত্যাখ্যানের ঘোষণায় চমকে দিল অ্যাটলেটিকো 

সম্পদ-দলীয় প্রতীক সবই হারাচ্ছেন মমতা!

বিমান বাহিনীর ১৩১তম জুনিয়র কমান্ড ও স্টাফ কোর্সের সনদপত্র বিতরণ

চিকিৎসকদের নিয়ে সাংবাদিক মাসুদ কামালের বক্তব্যের নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়েছে ড্যাব

সেনাবাহিনীর সহযোগিতায় চোখে আলো ফিরেছে ৮৪ জনের

বাজেটে মোবাইল, বিদ্যুৎ ও প্রযুক্তিপণ্যে বড় সুখবর

ইসলামী ব্যাংক ইসলাম নয়, মির্জা ফখরুল ইসলামও ইসলাম নয় : স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী

বিশ্বকাপ উন্মাদনায় দেশের পতাকা থাকুক সবার উপরে

গাজায় সহিংসতার দায়ে ইসরায়েলি অর্থমন্ত্রীর ওপর ফ্রান্সের নিষেধাজ্ঞা

ঢাকায় নিখোঁজ জবি শিক্ষার্থীর বাবা, সন্ধান চায় ছেলে

১০

নতুন রিসাইক্লিং উদ্যোগ / ৯০ শতাংশর বেশি প্লাস্টিক বর্জ্য কমিয়েছে সিঙ্গার বাংলাদেশ

১১

সরকারি বাঙলা কলেজে অনুষ্ঠিত হচ্ছে প্রাক্তন শিক্ষার্থীদের মিলনমেলা

১২

বাংলার নদী, বাংলার জীবন : ইতিহাস থেকে বর্তমান অবস্থা

১৩

ইসলামী ব্যাংক ইসলাম নয়, জামায়াতে ইসলামীও ইসলাম নয় : স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী

১৪

সাউথইস্ট ইউনিভার্সিটির ফার্মেসি বিভাগে ‘হিট’ প্রকল্পের আওতায় ওয়ার্কশপ অনুষ্ঠিত

১৫

ল্যাবএইডে ডেঙ্গু প্রতিরোধে সচেতনতামূলক সেমিনার অনুষ্ঠিত

১৬

বিশ্ববাজারে স্বর্ণের দামে বড় পতন

১৭

কক্সবাজারে ১৯ রোহিঙ্গা আটক

১৮

হিজবুল্লাহর রকেট হামলায় পিছু হটল ইসরায়েলি বাহিনী

১৯

ব্রাজিলের পতাকা টানাতে গিয়ে কিশোরের মৃত্যু

২০
X