

১৯৬১ সালের ১২ এপ্রিল। মানবসভ্যতার ইতিহাসে এক অবিস্মরণীয় দিন। এ দিনেই চিরচেনা পৃথিবীর সীমানা ছাড়িয়ে মহাকাশের অসীম শূন্যতায় প্রথম মানুষের পদধ্বনি প্রতিধ্বনিত হয়েছিল। সোভিয়েত ইউনিয়নের অকুতোভয় নভোচারী ইউরি গাগারিন এদিন মহাকাশযান ‘ভোস্তক-১’-এ চড়ে ইতিহাস রচনা করেন। মাত্র ২৭ বছর বয়সে তিনি হয়ে ওঠেন পৃথিবীর প্রথম মহাকাশচারী।
কাজাখস্তানের বৈকোনুর কসমোড্রোম থেকে স্থানীয় সময় সকাল ৯টা ৭ মিনিটে গাগারিনকে নিয়ে মহাকাশযানটি উৎক্ষেপণ করা হয়। যাত্রা শুরুর মুহূর্তে গাগারিনের মুখ থেকে বেরিয়ে আসা একটি মাত্র শব্দ— ‘পোয়েখালি!’ (চলুন যাওয়া যাক!)—আজও মহাকাশ গবেষণার ইতিহাসে অমর হয়ে আছে। পৃথিবী থেকে প্রায় ৩২৭ কিলোমিটার উচ্চতায় পৌঁছে ভোস্তক-১ নভোযানটি পৃথিবীকে একবার প্রদক্ষিণ করে। মহাকাশে সেই ঐতিহাসিক যাত্রার স্থায়িত্ব ছিল মাত্র ১০৮ মিনিট। কিন্তু এই অল্প সময়েই গাগারিন প্রমাণ করেছিলেন যে, মানুষ চাইলে মহাকাশে টিকে থাকতে পারে এবং পৃথিবীর বাইরে থেকেও মহাজাগতিক সৌন্দর্য উপভোগ করতে পারে। মহাকাশ থেকে পৃথিবীকে দেখে তিনি মুগ্ধ হয়ে বলেছিলেন:
‘পৃথিবী নীল রঙের... কী সুন্দর! এটি আমাদের জন্য এক পরম বিস্ময়।’
গাগারিনের এ যাত্রাটি সহজ ছিল না। সেই সময় মহাকাশ প্রযুক্তি ছিল একেবারেই প্রাথমিক পর্যায়ে। বায়ুমণ্ডলে পুনরায় প্রবেশের সময় প্যারাসুটের মাধ্যমে নিরাপদে অবতরণ করা ছিল জীবনের চরম ঝুঁকি। কিন্তু গাগারিনের অদম্য সাহস এবং সোভিয়েত বিজ্ঞানীদের নিরলস প্রচেষ্টায় তিনি সাফল্যের সঙ্গে রাশিয়ার সারাতোভ অঞ্চলে অবতরণ করেন।
ইউরি গাগারিনের এ সাফল্য বিশ্বজুড়ে আলোড়ন সৃষ্টি করে। এটি কেবল সোভিয়েত ইউনিয়নের জয় ছিল না; বরং সমগ্র মানবজাতির জন্য বিজ্ঞানের এক বিশাল জয়যাত্রা। তার এ যাত্রাটি ‘স্পেস রেস’ বা মহাকাশ প্রতিযোগিতার মোড় ঘুরিয়ে দেয় এবং পরবর্তীকালে চাঁদে মানুষের পদার্পণের পথ প্রশস্ত করে।
আজও ১২ এপ্রিল বিশ্বজুড়ে ‘ইউরি’স নাইট’ এবং আন্তর্জাতিক মহাকাশ উড্ডয়ন দিবস হিসেবে পালিত হয়। গাগারিন আজ আমাদের মাঝে নেই, ১৯৬৮ সালে একটি বিমান দুর্ঘটনায় তিনি অকালে প্রাণ হারান। তবে মহাকাশ বিজয়ের সেই অমর নায়ক হিসেবে তিনি চিরকাল প্রতিটি স্বপ্নদ্রষ্টা মানুষের হৃদয়ে বেঁচে থাকবেন। তার সেই ১০৮ মিনিটের যাত্রা আমাদের শিখিয়েছে যে, মানুষের আকাঙ্ক্ষা ও সাহসের কাছে মহাবিশ্বের বিশালতাও হার মানতে বাধ্য।