

ভিন্নতা ও বৈচিত্র্যকে মুছে ফেলতে চাইলে আমাদের দুনিয়ার স্বাভাবিক নিয়মের বিরুদ্ধেই দাঁড়াতে হয়। কারণ এই পৃথিবীর প্রকৃত সৌন্দর্য লুকিয়ে আছে তার বিচিত্রতায়-রঙে, রূপে, চিন্তায় এবং সংস্কৃতিতে। একেকটি মানুষ, একেকটি ভাষা, একেকটি বিশ্বাস ও অভ্যাস পৃথিবীকে করে তোলে আরও সমৃদ্ধ, আরও প্রাণবন্ত। যদি সবকিছু একরকম হয়ে যেত, তবে জীবন থেকে হারিয়ে যেত তার গভীরতা, বিস্ময় আর সৃষ্টিশীলতার আনন্দ। বৈচিত্র্যই আমাদের শেখায় সহনশীলতা, পারস্পরিক সম্মান এবং নতুন কিছু আবিষ্কারের সাহস। তাই ভিন্নতাকে নিঃশেষ না করে, বরং তাকে গ্রহণ ও লালন করাই আমাদের প্রকৃত মানবিকতার পরিচয় হওয়া উচিত।
এই ভাবনার মাঝেই উদযাপিত হয় বাংলা নববর্ষ। নতুন বছরের সূচনা, নতুন আশার বার্তা নিয়ে আসে আমাদের জীবনে। ঘরে ঘরে মানুষ যখন নানা রঙে, আনন্দে ও উৎসবে বরণ করে নেয় নতুন বছরকে, তখন সমাজের আরেক প্রান্তে জমে ওঠে বেদনা, শোক এবং হতাশার মেঘ। উৎসবের সর্বজনীনতা যেন কোথাও গিয়ে থেমে যায় বিভাজন, অসহিষ্ণুতা এবং সহিংসতার দেয়ালে।
সম্প্রতি কুষ্টিয়ার দৌলতপুরে একটি মর্মান্তিক ঘটনা আমাদের আবারও নাড়িয়ে দিয়েছে। ধর্ম অবমাননার অভিযোগ তুলে একদল মানুষ হামলা চালিয়ে হত্যা করেছে পীর শামীম রেজা জাহাঙ্গীরকে। মৃত্যুর আগমুহূর্তেও তিনি বারবার হাত জোড় করে নিজের কথা বলার সুযোগ চেয়েছিলেন; কিন্তু সেই মানবিক আবেদন উপেক্ষিত হয়েছে উন্মত্ততার কাছে। এই ঘটনা শুধু এক ব্যক্তির মৃত্যুই নয়; এটি আমাদের সমাজে ক্রমবর্ধমান অসহিষ্ণুতার নগ্ন প্রকাশ।
আমাদের সমাজে দীর্ঘদিন ধরে একমুখী আলোচনা ও চিন্তার প্রাধান্য বাড়ছে। বহুত্ববাদ বা মতের বৈচিত্র্যের জায়গা ক্রমশ সংকুচিত হয়ে পড়ছে। এর ফলেই যখন-তখন গণউচ্ছৃঙ্খলতা সৃষ্টি করে কাউকে আক্রমণ করা, এমনকি হত্যা করার ঘটনাও বেড়ে চলেছে। উদ্বেগজনক বিষয় হলো, এই প্রবণতা কোনো নির্দিষ্ট সময় বা সরকারের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; বরং এটি ধীরে ধীরে আমাদের সামাজিক কাঠামোর গভীরে প্রোথিত হয়ে যাচ্ছে।
গণতন্ত্রের মূল শক্তি হলো মতের ভিন্নতা এবং তার সহাবস্থান। কিন্তু বাস্তবে আমরা দেখতে পাচ্ছি, ভিন্নমতকে ক্রমেই দমন করা হচ্ছে। কেউ ভিন্ন কথা বললেই তাকে ধর্মদ্রোহী, দেশদ্রোহী বা শত্রু হিসেবে চিহ্নিত করা হচ্ছে। এই প্রবণতা একদিকে যেমন গণতন্ত্রকে দুর্বল করে, অন্যদিকে সমাজে তৈরি করে ভয় ও অবিশ্বাসের পরিবেশ। ফলে মানুষ নিজের মত প্রকাশে দ্বিধাগ্রস্ত হয়ে পড়ে, যা একটি সুস্থ সমাজের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর।
মাত্র এক মাস আগে আমরা উদযাপন করেছি স্বাধীনতার ৫৫ বছর পূর্তি। ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে অর্জিত স্বাধীনতা শুধু একটি ভূখণ্ডের স্বাধীনতা নয়; এটি আমাদের আত্মপরিচয়, মূল্যবোধ এবং মানবিকতার প্রতীক। সেই সংগ্রামের মূল চেতনায় ছিল সাম্য, মানবিক মর্যাদা এবং সহাবস্থান। কিন্তু আজকের বাস্তবতায় আমরা কি সেই চেতনার কাছাকাছি আছি, নাকি ধীরে ধীরে সেখান থেকে দূরে সরে যাচ্ছি? এই প্রশ্নটি এখন সময়ের দাবি।
বাংলাদেশের রাজনীতিতে সংকীর্ণতা নতুন কিছু নয়। বিভিন্ন সময়ে ক্ষমতার পালাবদলের সঙ্গে সঙ্গে এই প্রবণতা রূপ বদলেছে, কিন্তু মূল চরিত্রে খুব একটা পরিবর্তন আসেনি। বিশেষ করে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে অসহিষ্ণুতা ও অনুদারতার চর্চা এমনভাবে বেড়েছে যে, প্রায় প্রতিদিনই কোথাও না কোথাও ভিন্নমতের কারণে নির্যাতন বা সহিংসতার খবর পাওয়া যায়। রাজনীতি যেন প্রতিযোগিতামূলক গণতন্ত্রের নামে বিভাজনকে আরও উসকে দিচ্ছে।
রাজনীতিকরা প্রায়ই ভ্রাতৃত্ব, শান্তি এবং সম্প্রীতির কথা বলেন। কিন্তু বাস্তবে এই কথাগুলো অনেক সময়ই শুধু আনুষ্ঠানিক বাণীতে সীমাবদ্ধ থাকে। কার্যকর উদ্যোগের অভাবে সমাজে ঘৃণা ও বিভাজনের রাজনীতি আরও শক্তিশালী হয়ে ওঠে। আদর্শ ও নৈতিকতার চেয়ে ক্ষমতার স্বার্থই যখন রাজনীতির প্রধান চালিকাশক্তি হয়ে ওঠে, তখন গণতন্ত্রের প্রকৃত অর্থ হারিয়ে যায়। সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেওয়াই হয়ে দাঁড়ায় একমাত্র লক্ষ্য, আর সংখ্যালঘু বা ভিন্নমতের কণ্ঠস্বর হারিয়ে যায় কোলাহলের ভিড়ে।
এই বাস্তবতায় আমাদের নতুন করে ভাবতে হবে—আমরা কেমন বাংলাদেশ চাই? এমন একটি দেশ, যেখানে ভিন্নমতকে দমন করা হবে, নাকি এমন একটি দেশ, যেখানে মতের ভিন্নতা থাকবে, কিন্তু সহাবস্থানও নিশ্চিত হবে? বৈচিত্র্যকে যদি আমরা ভয় পাই, তবে আমরা নিজেরাই নিজেদের সম্ভাবনাকে সীমাবদ্ধ করে ফেলব।
সমাজে সহনশীলতা ফিরিয়ে আনতে হলে শুধু আইন বা শাস্তি যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন মানসিকতার পরিবর্তন। শিক্ষা, সংস্কৃতি এবং পারিবারিক মূল্যবোধের মাধ্যমে আমাদের নতুন প্রজন্মকে শেখাতে হবে ভিন্নতাকে সম্মান করার গুরুত্ব। ধর্ম, ভাষা বা মতের পার্থক্য নয়, মানুষ হিসেবে আমাদের অভিন্ন পরিচয়ই হওয়া উচিত সবচেয়ে বড় ভিত্তি।
বাংলা নববর্ষের এই সময়ে তাই আমাদের অঙ্গীকার হওয়া উচিত—আমরা বৈচিত্র্যকে রক্ষা করব, সহনশীলতাকে শক্তিশালী করব এবং একটি মানবিক সমাজ গড়ে তুলব। কারণ শেষ পর্যন্ত, একটি দেশের উন্নয়ন শুধু অর্থনৈতিক সূচকে মাপা যায় না; তা মাপা যায় মানুষের মধ্যে পারস্পরিক সম্মান, সহমর্মিতা এবং সহাবস্থানের মানদণ্ডে।
নতুন বছরের শুরুতে এটাই হোক আমাদের সবচেয়ে বড় প্রত্যাশা—বৈচিত্র্যের মাঝে ঐক্য, বিভেদের মাঝে সহমর্মিতা, আর সংঘাতের বদলে সহাবস্থানের এক নতুন বাংলাদেশ।
লেখক: জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক ও রাজনীতি বিশ্লেষক