

বিশ্বের নারী ও পুরুষের সম্মিলিত গড় আয়ু ৭৩.৫ বছর। আর বাংলাদেশের নারী ও পুরুষের গড় আয়ু ৭৫.৫ বছর। বিশ্বে যেখানে পুরুষদের গড় আয়ু ৭১ বছর, সেখানে বাংলাদেশিদের তা ৭৪ বছর। নারীদের বৈশ্বিক গড় আয়ু ৭৬ বছর হলেও বাংলাদেশে তা ৭৭ বছর।
জাতিসংঘের জনসংখ্যা তহবিলের (ইউএনএফপিএ) ‘বিশ্ব জনসংখ্যা পরিস্থিতি (এসডব্লিউওপি) ২০২৫’ শীর্ষক এক প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে আসে। বাংলাদেশের মানুষের গড় আয়ু বিশ্বের গড় আয়ুকে ছাড়িয়ে গেছে। দেশের নারী ও পুরুষের সম্মিলিত গড় আয়ু এখন বৈশ্বিক গড় আয়ুর চেয়ে বেশি।
আবার যুক্তরাষ্ট্রের রোগ নিয়ন্ত্রণ ও প্রতিরোধ কেন্দ্রের (সিডিসি) তথ্যমতে, দেশটিতে নারীদের গড় আয়ু ৮২ বছর আর পুরুষের তা ৭৬ বছর। শুধু যুক্তরাষ্ট্রেই নয়, সারা বিশ্বেই পুরুষের তুলনায় নারীরা সাধারণত বেশিদিন বাঁচে। কিন্তু কেন? অনেক কারণের মধ্যে প্রধান দুটি কারণ বায়োলজিক্যাল বা জীবতাত্ত্বিক। প্রথমটি হচ্ছে, সেক্স হরমোন বা লিঙ্গ নির্ধারক হরমোনবিষয়ক, অন্তত সিসজেন্ডার মানুষদের ক্ষেত্রে। যাদের লৈঙ্গিক স্বকীয়তা বায়োলজিক্যাল সেক্সের সঙ্গে মিলে যায়, তাদের বলা হয় সিসজেন্ডার। তারা হচ্ছে ট্রান্সজেন্ডারের বিপরীত। সিসজেন্ডার নারীরা সিসজেন্ডার পুরুষের তুলনায় বেশি পরিমাণ ইস্ট্রোজেন এবং কম পরিমাণ টেস্টোস্টেরন হরমোন উৎপাদন করে।
বাংলাদেশের চিকিৎসা বিজ্ঞানের দৃষ্টিতে, ক্রোমোজোমের ত্রুটির কারণে যেসব ব্যক্তি নারী বা পুরুষ-কোনো শ্রেণিতেই পুরোপুরি অন্তর্ভুক্ত হন না, তারা হিজড়া বা তৃতীয় লিঙ্গ হিসেবে পরিচিত। কিন্তু ‘ট্রান্সজেন্ডার’ শব্দটি আরও বিস্তৃত, যা কেবল শারীরিক ক্রোমোজোমের ত্রুটি নয়, বরং মানসিক লিঙ্গবোধের পার্থক্যের ওপর ভিত্তি করে নির্ধারিত হয়।
ট্রান্সজেন্ডার হওয়া কোনো রোগ বা মানসিক বিকার নয়, এটি একটি স্বাভাবিক আত্মপরিচয়। অনেকে তাদের মানসিক পরিচয়ের সঙ্গে শরীরকে মেলাতে হরমোন থেরাপি বা সার্জারি করতে পারেন, আবার অনেকে তা না করেও নিজের পরিচয় প্রকাশ করতে পারেন। সহজ কথায়, ট্রান্সজেন্ডার হলো সেই ব্যক্তিরা, যাদের শরীর ও মন-দুই ভিন্ন লিঙ্গবোধ ধারণ করে।
অন্যদিকে, বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) ২০২৪ সালের সর্বশেষ তথ্য থেকে পাওয়া যায়, দেশের পুরুষ ও নারীর সম্মিলিত গড় আয়ু প্রায় ৭২ বছর দুই মাস। পুরুষদের গড় আয়ু প্রায় ৭০ বছর আট মাস এবং নারীদের গড় আয়ু প্রায় ৭৪ বছর দুই মাস। অর্থাৎ, পুরুষদের গড় বয়সের তুলনায় নারীদের গড় বয়স প্রায় তিন বছর চার মাস বেশি।
নারীদের গড় আয়ুষ্কাল পুরুষদের চেয়ে বেশি হওয়ার মূল কারণ তাদের শক্তিশালী ইমিউন সিস্টেম, জেনেটিক সুবিধা (XX ক্রোমোজোম) এবং কম ঝুঁকিপূর্ণ জীবনধারা। নারীদের শরীরে ইস্ট্রোজেন হরমোন হৃদরোগ থেকে সুরক্ষা দেয় এবং বার্ধক্য প্রক্রিয়া পুরুষদের তুলনায় ধীরগতির হয়। কিন্তু পুরুষদের টেস্টোস্টেরন বেশি থাকে, যা উচ্চ রক্তচাপ ও আগ্রাসী আচরণের ঝুঁকি বাড়ায়। এর ফলে বিশ্বজুড়েই নারীরা পুরুষদের চেয়ে বেশিদিন বেঁচে থাকেন।
সাধারণত পুরুষরা বেশি ক্ষতিকর ঝুঁকিপূর্ণ অভ্যাসে জড়িয়ে পরেন। যেমন: ক্ষতিকর পদার্থ (মাদক, নিকোটিন) বা আচরণের (জুয়া, ইন্টারনেট) প্রতি শারীরিক ও মানসিক তীব্র নির্ভরশীলতা, যা নিজের ক্ষতি জেনেও নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না। এ অভ্যাসগুলো দীর্ঘমেয়াদি মস্তিষ্কের রোগ সৃষ্টি করে।
গবেষণায় দেখা গেছে, একজন পুরুষ তার মানসিক চাপ বা আবেগের বহিঃপ্রকাশ কম করে, যা শারীরিক অসুস্থতা বাড়িয়ে তোলে। তা ছাড়া পুরুষরা সাধারণত বেশি ঝুঁকিপূর্ণ কাজ করেন এবং অনিয়ন্ত্রিত জীবনধারার কারণে তাদের অকাল মৃত্যুর সম্ভাবনা বেশি থাকে।
বিবিএসর জরিপ অনুযায়ী, নারীরা ২৪ ঘণ্টার প্রায় অর্ধেক সময় গৃহস্থালি কাজ করেন, যেখানে অধিকাংশ পুরুষদের অংশগ্রহণ খুবই কম। নারীরা গড়ে বেশিদিন বাঁচলেও, গৃহস্থালি কাজের অতিরিক্ত চাপ এবং অবৈতনিক পরিশ্রমের ফলে তাদের দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্যগত ঝুঁকি বা অসুস্থতা পুরুষের চেয়ে ২৫ শতাংশ বেশি হতে পারে। নারীদের গৃহস্থালি কাজ বেশি করা তাদের আয়ু বাড়ায় না, বরং এটি একটি বৈষম্যমূলক পরিস্থিতি, যা তাদের স্বাস্থ্যের ক্ষতি করতে পারে।
গবেষণায় দেখা গেছে, পুরুষদের তুলনায় নারীদের শরীরের কোষ ও মস্তিষ্ক ধীরগতিতে বয়সের ছাপ বহন করে। সাধারণত মেয়েরা ১৪ বছরে এবং ছেলেরা ১৬ বছরে শারীরিক পরিপক্বতা পায়। কিন্তু ছেলেরা দেরিতে অর্থাৎ ১৮ থেকে ২৫ বছরে আর্থিক ও মানসিক পরিপক্বতা পায়। প্রথাগতভাবে, পুরুষরা নিজেদের চেয়ে কম বয়সী নারী পছন্দ করেন এবং নারীরা তাদের চেয়ে কিছু বেশি বয়সী পুরুষকে জীবনসঙ্গী হিসেবে বেছে নিতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন।
যদিও নারীদের গৃহস্থালি কাজের সঙ্গে আয়ু বাড়ার সরাসরি কোনো বৈজ্ঞানিক সম্পর্ক নেই; কিন্তু বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) এক সেমিনারে তথ্য দেয়, বাংলাদেশের নারীরা পুরুষের তুলনায় প্রায় ৪ থেকে ৮ গুণ বেশি গৃহস্থালি কাজ করেন। নারীদের দীর্ঘায়ুর প্রধান কারণ হরমোনজনিত সুবিধা, স্বাস্থ্য সচেতনতা এবং কম ঝুঁকিপূর্ণ জীবনধারা। গৃহস্থালি কাজের বোঝা নয়, উল্টো অতিরিক্ত কাজ নারীদের মানসিক ও শারীরিক চাপের কারণ হতে পারে। এ জীবনাচারে নারীদের আয়ুষ্কাল বাড়ে।
এই সেমিনারে বলা হয়, একজন নারী, যিনি চাকরি বা কেনো পেশায় যুক্ত নন, তিনি প্রতিদিন গড়ে কমপক্ষে ৯ থেকে ১০ ঘণ্টা গৃহস্থালি কাজে যুক্ত থাকেন, যেখানে একজন পুরুষ, যিনি চাকরি বা কোনো পেশায় যুক্ত, তিনি গৃহস্থালি কাজে খুবই অল্প সময় দেন। বিবিএসর তথ্যমতে, নারীরা পুরুষের চেয়ে প্রায় ৮ গুণ বেশি গৃহস্থালি কাজ করেন। অবশ্য, ১৫ থেকে ২৪ বছর বয়সী তরুণীরা গৃহস্থালি কাজে বেশি সময় দেন। এ ছাড়া পরুষদের তুলনায় নারীরা ‘জীবনাচারে’ যেমন: সমাজের দৈনন্দিন অভ্যাসের ধরন, কাজের পদ্ধতি, পছন্দ-অপছন্দ, মানসিকতা, নৈতিক মূল্যবোধ এবং সামাজিক আচরণ মূলত একটি সুনির্দিষ্ট পদ্ধতিতে জীবনযাপন করার ধরন তাদের আয়ুষ্কাল বাড়াতে সাহায্য করে।
লেখক: সাংবাদিক ও কলামিস্ট