

এরই মধ্যে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সম্পন্ন হয়েছে। এখন সামনে সংরক্ষিত নারী আসনের সাংসদ নির্বাচন। এরই মধ্যে রাজনৈতিক দলগুলো ঢাকঢোল পিটিয়ে মনোনয়ন ফরম বিক্রি করছে, চলছে নানা হিসাবনিকাশ ও দলীয় সমীকরণ। কিন্তু এ প্রক্রিয়ার ভেতরেই আবারও স্পষ্ট হয়ে উঠছে এক পুরোনো বাস্তবতা, নারীর প্রত্যক্ষ রাজনৈতিক অংশগ্রহণ এখনো কতটা সীমিত। সরাসরি নির্বাচনে যেখানে নারীর উপস্থিতি ছিল নগণ্য, সেখানে সংরক্ষিত আসনের ক্ষেত্রে তাদের প্রবেশ যেন অনেকটাই নির্ভর করছে দলীয় অনুগ্রহের ওপর। ফলে প্রশ্ন উঠছে, এ ব্যবস্থায় কি সত্যিই নারী নেতৃত্ব বিকশিত হচ্ছে, নাকি এটি কেবল একটি আনুষ্ঠানিকতা?
বাংলাদেশের সাম্প্রতিক নির্বাচনী চিত্র বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, রাজনৈতিক দলগুলোর নারী প্রার্থী মনোনয়নে অনীহা এখনো প্রকট। বিভিন্ন তথ্য অনুযায়ী, নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী বহু দলের মধ্যেই নারী প্রার্থীর উপস্থিতি ছিল অত্যন্ত কম, এমনকি অনেক দলে একজন নারী প্রার্থীও ছিল না। এই বাস্তবতা কি শুধু একটি পরিসংখ্যান? নাকি এর গভীরে লুকিয়ে আছে আমাদের সমাজের দীর্ঘদিনের পুরুষতান্ত্রিক মানসিকতা?
সিমোন দ্য বোভোয়ার তার কালজয়ী গ্রন্থ ‘দ্বিতীয় লিঙ্গ’-তে লিখেছিলেন, নারী জন্মগতভাবে নারী নয়, বরং তাকে নারী বানিয়ে তোলে এই সমাজ। আজকের রাজনৈতিক বাস্তবতার দিকে তাকালে তার সেই উক্তিটি অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক মনে হয়। আমাদের রাজনীতি যেন সচেতনভাবেই নারীকে একটি নির্দিষ্ট গণ্ডির মধ্যে আটকে রাখতে চায়, যেখানে তিনি শুধু সমর্থক হবেন; কিন্তু নীতিনির্ধারক হতে পারবেন না।
অনেকে হয়তো বলবেন, সংবিধানে তো নারী কোটা বা সংরক্ষিত আসনের ব্যবস্থা আছেই, তাহলে এত হাহাকার কেন? কিন্তু একটু গভীরভাবে চিন্তা করলে দেখা যাবে, এই সংরক্ষিত আসন ব্যবস্থা আসলে নারীর ক্ষমতায়নের চেয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর ‘সুবিধা’ হিসেবে বেশি ব্যবহৃত হয়। সংরক্ষিত আসনের একজন সংসদ সদস্য যখন সংসদে বসেন, তিনি কি সাধারণ আসনে জয়ী একজন পুরুষ সংসদ সদস্যের সমান গুরুত্ব পান? সম্ভবত পান না। কারণ তার পেছনে সরাসরি জনগণের রায় থাকে না। তিনি মনোনীত হন দলের অনুকম্পায় বা দলীয় আনুপাতিক হারে। ফলে তার আনুগত্য থাকে দলের প্রতি, জনগণের প্রতি দায়বদ্ধতার সুযোগ সেখানে সীমিত। আমাদের কি তবে কোটার চেয়ে সরাসরি ভোটে নির্বাচিত নারী সংসদ সদস্য বেশি প্রয়োজন নয়? উত্তরটি হলো, অবশ্যই প্রয়োজন। কারণ, সরাসরি ভোট শুধু একজন ব্যক্তিকে জেতায় না, বরং তার রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব ও সক্ষমতাকে জনগণের কাছে প্রতিষ্ঠিত করে। যখন একজন নারী সরাসরি নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন, তখন তাকে মাঠপর্যায়ে লড়াই করতে হয়, জনগণের পালস বুঝতে হয় এবং পুরুষ প্রার্থীদের সমান চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হয়। এ প্রক্রিয়াই তাকে একজন শক্তিশালী নেতায় রূপান্তরিত করে।
সরাসরি নির্বাচনে জয়ী নারী সংসদ সদস্যরা যখন সংসদে যান, তখন তাদের সিদ্ধান্তগুলো হয় অনেক বেশি ফলপ্রসূ এবং বাস্তবধর্মী। তারা জানেন তৃণমূলের সমস্যাগুলো কী, কারণ তারা সে পথ দিয়েই হেঁটে এসেছেন। পক্ষান্তরে, সংরক্ষিত আসনে বসে থাকা অনেক নারীই শুধু আলংকারিক উপস্থিতি হিসেবে রয়ে যান। আমরা কি চাই না, আমাদের দেশের অর্ধেক জনগোষ্ঠী ক্ষমতার চালকের আসনে বসুক? যদি চাই, তবে কোটার নিরাপদ বলয় থেকে নারীকে বের করে এনে সরাসরি যুদ্ধের ময়দানে দাঁড় করানোর সুযোগ দিতে হবে। সরাসরি ভোটে নির্বাচিত নারী যখন সংসদ কক্ষে প্রবেশ করেন, তখন তিনি কারও করুণায় নয়, বরং নিজের যোগ্যতায় সেখানে যান। এটি তার আত্মবিশ্বাসকে যেমন তুঙ্গে নিয়ে যায়, তেমনি নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে তার কণ্ঠস্বরকে করে তোলে জোরালো। ক্ষমতার ভারসাম্যে তখন নারী ও পুরুষ একে অপরের পরিপূরক হয়ে দাঁড়াতে পারে।
রাজনৈতিক দলগুলোর এই যে নারী প্রার্থী মনোনয়নে অনীহা, তার পেছনে ‘উইনেবিলিটি’ বা জেতার সক্ষমতার একটি অজুহাত প্রায়ই দেওয়া হয়। বলা হয়, নারীরা সরাসরি ভোটে জিততে পারবেন না। কিন্তু এ ধারণা কি যৌক্তিক? আদতে সুযোগ না দিয়ে সক্ষমতা বিচার করা এক ধরনের অবিচার। জুলাই সনদ ২০২৫-এ রাজনৈতিক দলগুলোর জন্য ৫ শতাংশ নারী প্রার্থীর মনোনয়নের লক্ষ্যমাত্রা ছিল। কিন্তু অধিকাংশ দলই সেই দায়বদ্ধতা পূরণ করতে ব্যর্থ হয়েছে। এটি প্রমাণ করে যে, সংস্কারের কথা মুখে বললেও অন্তরে আমরা এখনো সেই পুরোনো পুরুষতান্ত্রিক মানসিকতাকেই লালন করছি। যখন রাজনৈতিক দলগুলো যোগ্য নারীকে মনোনয়ন দিতে কার্পণ্য করে, তখন তারা প্রকারান্তরে অর্ধেক জনশক্তিকে উন্নয়নের মূলধারা থেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলে। অথচ অর্থনৈতিক পরিসংখ্যানেও নারীর অবস্থান এখন উদ্বেগের বিষয়। সাম্প্রতিক শ্রম জরিপ অনুযায়ী, গত এক বছরে যে বিপুলসংখ্যক মানুষ কর্মসংস্থান হারিয়েছে, তার বড় একটি অংশই নারী। পোশাকশিল্পে নারীর অংশগ্রহণ কমে আসা এবং দাতা সংস্থাগুলোর বড় বড় প্রকল্প বন্ধ হয়ে যাওয়া এ সংকটকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। যখন একজন নারী অর্থনৈতিকভাবে পরাধীন হয়ে পড়েন, তখন তার পক্ষে সরাসরি রাজনীতিতে আসার সাহস দেখানো কঠিন হয়ে দাঁড়ায়। নারীর অগ্রযাত্রার পথে আরও একটি বড় বাধা হলো বিনা পারিশ্রমিকের গৃহস্থালি কাজ। গবেষণা বলছে, একজন নারী একজন পুরুষের তুলনায় প্রায় চার গুণ বেশি সময় ব্যয় করেন সাংসারিক কাজে, যার কোনো আর্থিক মূল্যায়ন বা রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি নেই। সমাজ এ কাজগুলোকে নারীর ‘স্বাভাবিক দায়িত্ব’ বলে চাপিয়ে দেয়। এখন প্রশ্ন হলো, একজন নারী যদি দিনের অধিকাংশ সময় সাংসারিক ঘেরাটোপে বন্দি থাকেন, তবে তিনি রাজনীতির মাঠে সময় দেবেন কখন? রাষ্ট্র কি কখনো ভেবে দেখেছে এই অদৃশ্য শ্রমের বোঝা কীভাবে নারীর নেতৃত্ব বিকাশে অন্তরায় হয়ে দাঁড়াচ্ছে? এই পারিবারিক বৈষম্যই শেষ পর্যন্ত রাজনৈতিক বৈষম্যের জন্ম দেয়। পরিবার থেকে যখন একজন মেয়েকে শেখানো হয় যে রাজনীতি তার কাজ নয়, তখন সেই সংস্কারই বড় হয়ে তাকে পিছিয়ে দেয়।
আমাদের মনে রাখা প্রয়োজন, নারীর ক্ষমতায়ন কেবল কিছু আইনি সুযোগ-সুবিধার নাম নয়। এটি একটি মনস্তাত্ত্বিক রূপান্তর। সরাসরি ভোটে জয়ী নারী এমপিরা যখন সংসদে পুরুষ সহকর্মীদের চোখের দিকে তাকিয়ে কথা বলবেন, তখনই প্রকৃত গণতন্ত্রের স্বাদ পাওয়া যাবে। কোটার সুবিধা হয়তো সংখ্যা বাড়াতে পারে, কিন্তু গুণগত পরিবর্তন আনতে পারে না। সরাসরি নির্বাচনের মাধ্যমে যদি ১০০ জন নারীও সংসদে আসেন, তারা যে প্রভাব তৈরি করতে পারবেন, ৩০০ জন সংরক্ষিত আসনের নারী তা পারবেন না। কারণ সরাসরি ভোটে নির্বাচিত নারী সংসদ সদস্য যখন তার এলাকায় যান, তখন হাজারো কিশোরী ও তরুণী তাকে দেখে স্বপ্ন দেখার সাহস পায়। তিনি হয়ে ওঠেন শত শত নারীর প্রেরণার উৎস। চালকের আসনে বসে যখন তিনি নিজ এলাকার উন্নয়নের সিদ্ধান্ত নেন, তখন সমাজ বুঝতে শেখে যে নারীও পারে।
রাষ্ট্র সংস্কারের যে স্বপ্ন আমরা দেখছি, তাতে নারীর পূর্ণ অংশগ্রহণ ছাড়া পূর্ণতা আসবে না। রাজনৈতিক দলগুলোকে তাদের পুরুষতান্ত্রিক খোলস ভেঙে বেরিয়ে আসতে হবে। আসন্ন নির্বাচনগুলোয় সরাসরি আসনে বেশি বেশি নারী প্রার্থী মনোনয়ন দেওয়া এখন সময়ের দাবি। যখন সরাসরি ভোটে নির্বাচিত নারীর সংখ্যা বাড়বে, তখন নীতিনির্ধারণী প্রক্রিয়ায় জেন্ডার সংবেদনশীলতা বৃদ্ধি পাবে। নারী আর সমাজের ‘দ্বিতীয় লিঙ্গ’ হিসেবে নয়, বরং সমমর্যাদার অংশীদার হিসেবে নিজের অধিকার বুঝে নেবে। আমাদের প্রয়োজন এমন এক সংসদ, যেখানে নারী ও পুরুষ কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবেন। কোটার মায়াজাল ছিন্ন করে সরাসরি নির্বাচনের মাধ্যমেই আসুক সেই কাঙ্ক্ষিত মুক্তি। তবেই সার্থক হবে আমাদের গণতান্ত্রিক সংগ্রাম।
লেখক: মানবাধিকার কর্মী এবং রাজনৈতিক বিশ্লেষক