

সংকট ব্যবস্থাপনায় তখনই বড় জটিলতা সৃষ্টি হয়, যখন সংকটকে সংকট মনে করা না হয়। বাক্যটিতে বেশ কয়েকবার এ সংকট কথাটি এসেছে, এবং ব্যবস্থাপনা এ কারণেই জরুরি, যেন তা সমাধানের বাইরে চলে না যায়। বর্তমানে দেশে যে জ্বালানি মহাসংকট চলছে, তা বিবেচনায় নিলে বলতেই হবে—সরকার শুরু থেকে এর প্রতি উদাসীন ছিল।
যে কোনো সমস্যা এক সপ্তাহের বেশি সময় ধরে চলতে থাকলে তা নিয়ে কর্তৃপক্ষের যে ধরনের তৎপরতা থাকার কথা, তা মোটেও দৃশ্যমান ছিল না। একটা সংকট এক মাস পেরিয়ে দুমাস হতে চলল, অথচ সমাধানের চাইতে কথাই বেশি ছিল। মানুষ যখন ঘণ্টা পেরিয়ে দিন পার করেও পেট্রোল বা অকটেন পাচ্ছিল না, তখন একেবারে শেষ সময়ে এসে সরকার একটা কাজই দৃশ্যমান করল—দাম বাড়াল।
এতেও লাইনে দাঁড়িয়ে জ্বালানি সংগ্রহের প্রত্যাশায় থাকা মানুষের কোনো স্বস্তি আসেনি। বারবার একটি কথাই বলার চেষ্টা করেছেন জ্বালানিমন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রী যে, মজুতের কোনো অভাব নেই। তাহলে মানুষ তেল পায় না কেন? ভিক্টিম ব্লেমিংয়ের মতো মানুষকে আতঙ্কিত হতে না করা হলেও আতঙ্ক দূর করার কোনো ব্যবস্থা লক্ষ করা যায়নি। রোববারও সংসদে জ্বালানিমন্ত্রী বলেছেন, জ্বালানি তেলের সংকট নেই, পাম্পগুলোয় কৃত্রিম সংকট তৈরি হচ্ছে। মন্ত্রীকে কে বোঝাবেন যে, কৃত্রিম সংকট থেকে মানুষকে মুক্তি দেওয়ার দায়িত্বও সরকারের।
বলা হলো, এপ্রিলে জ্বালানি তেলের দাম বাড়বে না। অথচ এপ্রিলেই বাড়ল। কিন্তু এর জন্য সন্তোষজনক কোনো ব্যাখ্যা নেই। কেন বাড়িয়েছে তা স্পষ্ট করে উচ্চারিত না হলেও জানা যায় ঠিকই। ঋণের কিস্তি পাওয়ার জন্য আইএমএফের সঙ্গে সরকারের আলোচনা চলছে। আইএমএফের প্রধান তিনটি শর্তের একটি হলো জ্বালানি ও বিদ্যুতে ভর্তুকি কমাতে হবে। সেই শর্ত মেনে সরকার তেলের দাম বাড়িয়েছে। এখন বিদ্যুতের দামও বাড়ানোর প্রক্রিয়া চলছে।
দাম বাড়ানোর এক দিন আগে জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী বলেছেন, ইতিহাসের সবথেকে বেশি পরিশোধিত জ্বালানির মজুত এ মুহূর্তে বাংলাদেশের হাতে রয়েছে। জ্বালানি তেল নিয়ে দেশের সরেজমিন চিত্র এবং সরকারি তথ্যের এ বিপরীত অবস্থানের প্রেক্ষাপটে একটি প্রশ্নই ঘুরেফিরে সামনে আসছে—মজুত ও সরবরাহ যদি পর্যাপ্তই থাকে, তাহলে এত তেল যাচ্ছে কোথায়?
লেখার শুরুতেই বলেছি, সংকট তখনই ভয়াবহ রূপ নেয়, যখন তাকে সংকট হিসেবে স্বীকারই করা হয় না। বর্তমান বাংলাদেশের জ্বালানি পরিস্থিতি যেন সেই অস্বীকারেরই প্রতিচ্ছবি, যেখানে বাস্তবতা একদিকে, আর সরকারি ভাষ্য অন্যদিকে। ফল, একটি সীমিত জ্বালানি সংকট ধীরে ধীরে রূপ নিচ্ছে বহুমাত্রিক অর্থনৈতিক সংকটে, যার অভিঘাত সবচেয়ে বেশি পড়ছে সাধারণ মানুষের ওপর।
এপ্রিল মাসে দাম না বাড়ানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েও একই মাসে দাম বৃদ্ধি—এ ধরনের সিদ্ধান্ত মানুষের আস্থাকে আরও দুর্বল করে। বিশেষ করে ভর্তুকি কমানোর চাপের কারণে জ্বালানি ও বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর পথ বেছে নেওয়া হয়েছে। কিন্তু এ সিদ্ধান্তের সামাজিক ও অর্থনৈতিক প্রভাব কতটা গভীর হবে, তা নিয়ে পর্যাপ্ত বিবেচনা ছিল কি?
বর্তমানে মূল্যস্ফীতি প্রায় ৮.৭১ শতাংশ, আর মজুরি বৃদ্ধি ৮.০৯ শতাংশ। অর্থাৎ, আয় বৃদ্ধির তুলনায় ব্যয় দ্রুত বাড়ছে। বাস্তব আয়ের এ পতন সরাসরি মানুষের জীবনযাত্রাকে কঠিন করে তুলছে। জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি এ চাপকে আরও বাড়াবে, কারণ এর প্রভাব শুধু পরিবহনেই সীমাবদ্ধ নয়; কৃষি, শিল্প, উৎপাদন—সব ক্ষেত্রেই এর প্রতিফলন দেখা যাবে।
বিশেষ করে কৃষি খাত সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে। সেচ, চাষ, ফসল সংগ্রহ ও পরিবহন—সবকিছুতেই ডিজেলের ওপর নির্ভরতা রয়েছে। সামান্য সরবরাহ ব্যাঘাতও উৎপাদন খরচ বাড়িয়ে দেয়, যা শেষ পর্যন্ত খাদ্যের দামে প্রতিফলিত হয়। দেশের মোট ধান উৎপাদনের বড় অংশ বোরো মৌসুমে হয়, আর সেই মৌসুমই এখন অনিশ্চয়তার মুখে।
অন্যদিকে শিল্প খাতেও সংকট প্রকট হচ্ছে। গ্যাসের অভাবে উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি ডিজেলের সংকটে জেনারেটর চালানো কঠিন হয়ে পড়ছে। লোডশেডিং পরিস্থিতিকে আরও জটিল করছে। পোশাক খাতসহ রপ্তানিনির্ভর শিল্পগুলো এরই মধ্যে সতর্কবার্তা দিচ্ছে, যা সামগ্রিক অর্থনীতির জন্য অশনিসংকেত।
দারিদ্র্যের হারও উদ্বেগজনকভাবে বাড়ছে। সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, দেশের প্রায় ৩ কোটি ৬০ লাখ মানুষ এখন দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাস করছে। নতুন করে দরিদ্রের সংখ্যা বাড়ছে, যা নির্দেশ করে যে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সুফল সমানভাবে বণ্টিত হচ্ছে না। আয় বৈষম্যও বাড়ছে। মোট আয়ের বড় অংশ এখন অল্পসংখ্যক মানুষের হাতে কেন্দ্রীভূত।
বেকারত্ব পরিস্থিতিও আশাব্যঞ্জক নয়। কর্মক্ষম জনগোষ্ঠী বাড়লেও সেই অনুপাতে কর্মসংস্থান তৈরি হচ্ছে না। বিশেষ করে শিক্ষিত তরুণদের মধ্যে বেকারত্বের হার উদ্বেগজনক। এ বাস্তবতায় জ্বালানি সংকট আরও বিনিয়োগ অনিশ্চয়তা তৈরি করবে, যা নতুন কর্মসংস্থানের পথকে বাধাগ্রস্ত করবে।
সব মিলিয়ে বর্তমান পরিস্থিতি শুধু জ্বালানি খাতের সংকট নয়, এটি একটি বৃহত্তর অর্থনৈতিক দুর্বলতার প্রতিফলন। আমদানি ব্যয় বাড়বে, বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ তৈরি হবে, মূল্যস্ফীতি বাড়বে—সব মিলিয়ে অর্থনীতির ভারসাম্য নষ্ট হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে। এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় সবচেয়ে জরুরি হলো বাস্তবতাকে স্বীকার করা। সংকটকে অস্বীকার করে নয়, বরং স্বচ্ছতা, জবাবদিহি এবং কার্যকর নীতির মাধ্যমে সমাধানের পথ খুঁজতে হবে। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, বিনিয়োগ পরিবেশ উন্নয়ন এবং জ্বালানি খাতে দক্ষ ব্যবস্থাপনা—সবকিছু একসঙ্গে করতে হবে।
সবচেয়ে বড় কথা, নীতিনির্ধারণে মানুষের বাস্তব জীবনকে প্রাধান্য দিতে হবে। অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার মানও সমানভাবে বিবেচ্য। সময়োপযোগী ও জনবান্ধব সিদ্ধান্ত ছাড়া এ সংকট থেকে উত্তরণ সম্ভব নয়।
সংকটের সময় সবচেয়ে বড় বিপদ সংকট নয়, বরং তা অস্বীকার করা। আর সেই অস্বীকারই আজ বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
লেখক: জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক ও রাজনীতিক বিশ্লেষক