

দেশে মূল্যস্ফীতি আবারও ৯ শতাংশের ঘরে পৌঁছেছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, গত এপ্রিলে দেশের গড় মূল্যস্ফীতি দাঁড়িয়েছে ৯ দশমিক ০৪ শতাংশে, যা মার্চ মাসের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি। খাদ্য ও খাদ্যবহির্ভূত—উভয় খাতেই পণ্যের দাম বাড়ায় সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় অসহনীয় হয়ে উঠছে। বিশেষ করে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত মানুষের জন্য প্রতিদিনের জীবনযাপন এখন এক কঠিন সংগ্রামে পরিণত হয়েছে।
মূল্যস্ফীতি কেবল একটি অর্থনৈতিক পরিসংখ্যান নয়; এটি মানুষের দৈনন্দিন জীবনের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। বাজারে গেলে চাল, ডাল, তেল, সবজি, মাছ-মাংস সবকিছুর দাম আগের তুলনায় বেশি। আবার বাসা ভাড়া, পরিবহন ব্যয়, চিকিৎসা, শিক্ষা ও বিদ্যুতের খরচও বেড়েছে। ফলে সীমিত আয়ের মানুষ সংসার চালাতে গিয়ে চরম বিপাকে পড়ছেন। একদিকে আয় সীমিত, অন্যদিকে ব্যয় বাড়ছে লাগামহীনভাবে। এতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন খেটে খাওয়া মানুষ, দিনমজুর, শ্রমজীবী ও নিম্ন আয়ের পরিবারগুলো।
বিবিএসের তথ্য বলছে, গ্রামাঞ্চলে মূল্যস্ফীতির চাপ শহরের তুলনায় বেশি। এর অর্থ হলো, কৃষিনির্ভর ও নিম্ন আয়ের গ্রামীণ জনগোষ্ঠী এখন আরও কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি। অন্যদিকে শহরে খাদ্য মূল্যস্ফীতির চাপ বেশি হওয়ায় নগরজীবনও অস্বস্তিকর হয়ে উঠেছে। এ পরিস্থিতি সামাজিক বৈষম্যকে আরও তীব্র করে তুলতে পারে।
বিশ্লেষকদের মতে, জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি এবং আমদানিনির্ভর পণ্যের মূল্যবৃদ্ধি এ মূল্যস্ফীতির প্রধান কারণ। আন্তর্জাতিক বাজারে অস্থিরতা, মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতি এবং বৈদেশিক মুদ্রার চাপ দেশের বাজার ব্যবস্থায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। তবে শুধু বৈশ্বিক পরিস্থিতিকে দায়ী করলেই দায়িত্ব শেষ হয় না। অভ্যন্তরীণ বাজার ব্যবস্থাপনা, মজুতদারি, সিন্ডিকেট এবং দুর্বল তদারকিও মূল্যবৃদ্ধির অন্যতম কারণ।
সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, মূল্যস্ফীতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে মানুষের মজুরি বাড়ছে না। এপ্রিল মাসে মজুরি বৃদ্ধির হার ছিল ৮ দশমিক ১৬ শতাংশ, যা মূল্যস্ফীতির হারের চেয়ে কম। অর্থাৎ মানুষের প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতা কমে যাচ্ছে। একজন শ্রমিক বা নিম্ন আয়ের কর্মজীবী মানুষ আগের তুলনায় কম পণ্য কিনতে পারছেন। এতে তাদের জীবনযাত্রার মান ক্রমাগত নিচের দিকে নামছে। নির্বাচনের সময় বিএনপি সাধারণ মানুষের কাছে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম নিয়ন্ত্রণে রাখা এবং জনগণকে স্বস্তিতে রাখার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। জনগণ সেই আশ্বাসে আস্থা রেখেই তাদের সমর্থন দিয়েছে। এখন সেই প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের সময়। সরকারকে অবশ্যই বাজার নিয়ন্ত্রণে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব যাতে সাধারণ মানুষের ওপর কম পড়ে, সে জন্য বিকল্প নীতি গ্রহণ জরুরি। পাশাপাশি বাজারে সিন্ডিকেট ও কৃত্রিম সংকট সৃষ্টিকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে।
এ ছাড়া নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য টিসিবির কার্যক্রম আরও বিস্তৃত করা, সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি বাড়ানো এবং শ্রমজীবী মানুষের মজুরি বাস্তবসম্মতভাবে সমন্বয় করা প্রয়োজন। কৃষি উৎপাদন ও স্থানীয় শিল্পকে উৎসাহ দিলে আমদানিনির্ভরতা কমবে, যা দীর্ঘ মেয়াদে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে সহায়ক হতে পারে।
জনগণ এখন রাজনৈতিক বক্তব্য নয়, বাস্তব স্বস্তি চায়। বাজারে গিয়ে যেন মানুষ স্বাভাবিক দামে প্রয়োজনীয় পণ্য কিনতে পারে, সেটিই এখন সবচেয়ে বড় প্রত্যাশা। বর্তমান বিএনপি সরকারের উচিত হবে জনগণের এই কষ্ট ও দুর্ভোগ গভীরভাবে উপলব্ধি করে দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করা। কারণ, মূল্যস্ফীতির বোঝা সবচেয়ে বেশি বহন করে সাধারণ মানুষ, আর তাদের স্বস্তি নিশ্চিত করাই একটি দায়িত্বশীল সরকারের প্রধান কর্তব্য।