

দেশে জাতীয় পরিচয়পত্র বা এনআইডি এখন নাগরিক জীবনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নথি। মোবাইল সিম নিবন্ধন, আয়কর রিটার্ন দাখিল, ব্যাংক হিসাব খোলা, পাসপোর্ট, ড্রাইভিং লাইসেন্স থেকে শুরু করে প্রায় সব গুরুত্বপূর্ণ সেবার সঙ্গে এনআইডি সরাসরি যুক্ত। অথচ এই গুরুত্বপূর্ণ ব্যবস্থাপনাতেই নির্বাচন কমিশনের দীর্ঘদিনের গাফিলতি ও অব্যবস্থাপনার কারণে সাধারণ মানুষ চরম ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন। সম্প্রতি প্রকাশিত তথ্য সেই উদ্বেগজনক বাস্তবতাকেই সামনে নিয়ে এসেছে।
২০১৬ সালের ২ অক্টোবর থেকে ২০২০ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত স্মার্টকার্ড বিতরণের সময় নাগরিকদের দশ আঙুলের ছাপ ও দুই চোখের আইরিশের প্রতিচ্ছবি সংগ্রহ করা হলেও তার একটি বড় অংশ এখনো ইসির মূল সার্ভারে আপলোড করা হয়নি। প্রায় সোয়া কোটি নাগরিকের বায়োমেট্রিক তথ্য বছরের পর বছর পড়ে আছে; কিন্তু তা কার্যকর ডাটাবেজে যুক্ত হয়নি। ফলে সিম নিবন্ধন, আয়কর রিটার্ন জমা, ড্রাইভিং লাইসেন্স নবায়নসহ নানা সেবা নিতে গিয়ে মানুষকে ভোগান্তিতে পড়তে হচ্ছে। অনেকেই বাধ্য হয়ে নির্বাচন কমিশন কার্যালয়ে ছুটে যাচ্ছেন, ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়াচ্ছেন, অথচ সমস্যার স্থায়ী সমাধান পাচ্ছেন না।
এটি কেবল প্রযুক্তিগত দুর্বলতা নয়; এটি একটি বড় ধরনের প্রশাসনিক ব্যর্থতা। নাগরিকদের কাছ থেকে তথ্য সংগ্রহ করে বছরের পর বছর তা সার্ভারে যুক্ত না করা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। বিশেষ করে যখন সেই তথ্য নাগরিকের মৌলিক সেবা পাওয়ার পূর্বশর্ত হয়ে দাঁড়ায়। নির্বাচন কমিশন দীর্ঘদিন ধরে স্মার্টকার্ড ও ডিজিটাল পরিচয়ব্যবস্থার সফলতার কথা বললেও বাস্তবে সেই অবকাঠামোর দুর্বলতা এখন স্পষ্ট হয়ে উঠছে।
আরও উদ্বেগজনক বিষয় হলো, বর্তমানে ইসির সার্ভারে ৮ কোটির বেশি নাগরিকের ফরম-২ নেই। অর্থাৎ যেসব নাগরিক ২০১২ সালের আগে ভোটার হয়েছেন, তাদের মূল নিবন্ধন ফরম এখনো ডিজিটাল সার্ভারে যুক্ত করা সম্ভব হয়নি। এই ফরম-২ এনআইডি সংশোধনের ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দলিল। এতে নাগরিকের দেওয়া মূল তথ্য সংরক্ষিত থাকে। কিন্তু সেটি না থাকায় নাম, জন্মতারিখ বা অন্যান্য তথ্য সংশোধনের সময় মাঠ কর্মকর্তারা জটিলতায় পড়ছেন এবং সাধারণ মানুষকে অযথা হয়রানির শিকার হতে হচ্ছে।
একটি আধুনিক রাষ্ট্রে নাগরিক তথ্য ব্যবস্থাপনা এতটা দুর্বল হতে পারে না। প্রশ্ন হলো, এত বছর ধরে এই কাজ সম্পন্ন করা গেল না কেন? বারবার উদ্যোগ নেওয়ার কথা বলা হলেও বাস্তবে দৃশ্যমান অগ্রগতি নেই। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বক্তব্যেও অসামঞ্জস্য দেখা যায়। কেউ বলছেন তথ্য পাঠানো হয়েছে, কেউ বলছেন আপলোড বাকি আছে, আবার কেউ বলছেন মূল সার্ভারে যুক্ত হতে সময় লাগে। কিন্তু এসব অজুহাত নাগরিক ভোগান্তির দায় এড়াতে পারে না।
প্রযুক্তিনির্ভর সেবা চালুর আগে তার অবকাঠামো শক্তিশালী করা জরুরি। নির্বাচন কমিশনের উচিত দ্রুত সব বায়োমেট্রিক তথ্য ও ফরম-২ সার্ভারে আপলোড সম্পন্ন করা। একই সঙ্গে নাগরিকদের মোবাইল নম্বর বাধ্যতামূলকভাবে সংযুক্ত করে একটি কার্যকর যোগাযোগব্যবস্থা গড়ে তোলা প্রয়োজন। এনআইডি-সংক্রান্ত যে কোনো পরিবর্তন বা সমস্যা সম্পর্কে নাগরিককে তাৎক্ষণিকভাবে জানানো হলে ভোগান্তি অনেকাংশে কমে আসবে।
এনআইডি কেবল ভোটার তালিকার বিষয় নয়; এটি এখন রাষ্ট্রীয় সেবার কেন্দ্রীয় পরিচয়ব্যবস্থা। তাই নির্বাচন কমিশনের দায়িত্বও বহুগুণ বেড়েছে।
আমরা মনে করি, নির্বাচন কমিশনকে এখনই কার্যকর ও সময়োপযোগী পদক্ষেপ নিতে হবে। নাগরিকদের ভোগান্তিকে আর অবহেলা করার সুযোগ নেই। একটি দায়িত্বশীল ও আধুনিক রাষ্ট্রে নাগরিক সেবা কখনোই প্রশাসনিক গাফিলতির শিকার হতে পারেন না।