ইলিয়াস হোসেন
প্রকাশ : ১৩ মে ২০২৬, ১২:০০ এএম
আপডেট : ১৩ মে ২০২৬, ০৩:২৭ পিএম
প্রিন্ট সংস্করণ
যে কথা কেউ শোনে না

মানুষ বেশি মায়া কম

মানুষ বেশি মায়া কম

বিশাল পৃথিবীর তিন ভাগ জল, এক ভাগ স্থল। এই এক ভাগে কোটি কোটি বছরে গড়ে উঠেছে মানুষের বসতি। স্থলভাগের আবার ৩১ থেকে ৩২ ভাগ বনভূমি। সেখানেও বিচ্ছিন্নভাবে কিছু যাযাবর শ্রেণি বসবাস করে আসছে শতাব্দীর পর শতাব্দী। তবে, দেশভেদে এ চিত্র একেক রকম। যেমন, অস্ট্রেলিয়ার মতো দেশে প্রায় ৯৫ ভাগ ভূমি জনবসতিহীন। মাত্র ৫ শতাংশ জায়গায় মানুষ বসবাস করে। পৃথিবীর স্থলভাগের প্রায় এক-চতুর্থাংশ বা তার বেশি এখনো জনমানবহীন। সেগুলো মূলত প্রাকৃতিক বনাঞ্চল, মরুভূমি বা বরফাচ্ছাদিত এলাকা।

রহস্যময় দুনিয়া জীববৈচিত্র্যে ভরপুর। এর মধ্যে প্রাণিকুলের শ্রেষ্ঠ হচ্ছে মানবজাতি। যদিও মানুষ নিজেই নিজেকে শ্রেষ্ঠ বলে দাবি করে আসছে আদিম যুগ থেকে। এখন পর্যন্ত অন্য কোনো প্রাণী চ্যালেঞ্জ করে টিকে থাকতে পারেনি। তবে, মানুষ ছাড়া অন্যদের স্বভাব-চরিত্র, জীবনধারা, জাতীয়তা ধরিত্রীজুড়ে প্রায় একই। প্রাকৃতিক প্রয়োজনে বংশবিস্তার বাদে আর কোনো দায়িত্ব নেই তাদের। শুধু মানুষই মৌলিক কিছু বিষয় ছাড়া চিন্তাধারায় একান্ত নিজস্ব। জীবনের প্রয়োজনে-অপ্রয়োজনে একেক দেশে একেক আয়োজন তাদের। ডানে আনন্দের বিষয়টি বামে বেদনার। একই পণ্য নিয়ে এক দেশে হাহাকার, অন্য দেশ নির্বিকার।

এশিয়া-আফ্রিকার তৃতীয় শ্রেণির দেশগুলোর গরিব মানুষের প্রধান সংকট খাদ্য সংগ্রহ। উদয়াস্ত খেটেও দুবেলা খাবার নিশ্চিত করতে হিমশিম খাচ্ছে যুগের পর যুগ। অথচ, বিশ্বের উন্নত দেশগুলোর সংকট খাবারে নয়, ব্যবহারে। যুক্তরাষ্ট্রে উৎপাদিত মোট খাবারের ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ খুচরা বিক্রেতা, রেস্তোরাঁ এবং ভোক্তাদের মাধ্যমে অপচয় বা ফেলে দেওয়া হয়। এর মধ্যে পচনশীল ফল, সবজি, দুগ্ধজাত পণ্য এবং তৈরি খাবার অন্যতম। যুক্তরাজ্যে চাহিদার তুলনায় উৎপাদন বা সরবরাহ বেশি হওয়ায় প্রচুর পরিমাণে খাদ্যদ্রব্য, বিশেষ করে ফল ও সবজি ফেলে দেওয়া হয়। চাহিদার চেয়ে অনেক বেশি উৎপাদন করে তাদের কৃষক। ফলে, বিক্রি না হওয়ায় ফেলে দিতে হয়। সৌদি আরবে প্রায় ৮০ শতাংশ আমদানি করা খাবারের একটি বড় অংশ নষ্ট হয়। রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞার প্রেক্ষাপটে রাশিয়া খাদ্যসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় অনেক পণ্য বাজেয়াপ্তের পর বুলডোজার দিয়ে ধ্বংস করে। জার্মানিতেও প্রচুর পরিমাণে খাদ্য অপচয় হয়। সেগুলো নিয়মিত বর্জ্য হিসেবে নষ্ট করে। অতিরিক্ত উৎপাদন বা ব্যবহারের কারণে তারা পণ্যের মধ্যে সবচেয়ে বেশি ‘প্লাস্টিক বর্জ্য’ ফেলে দেয়। নতুন প্রযুক্তির খোঁজে জার্মানরা দ্রুত ইলেকট্রনিক ডিভাইস পরিবর্তন করে। অনেক সক্রিয় বা আংশিক সচল ইলেকট্রনিক পণ্য ফেলে দেয় তারা। এ ছাড়া, উন্নত দেশে নতুনত্বের আকর্ষণে হাজার হাজার গাড়ি ফেলে রেখে নষ্ট করা হয়। আসলে প্রয়োজনের অতিরিক্ত হলে দামি জিনিসও মূল্যহীন হয়ে পড়ে। যেমন—বাংলাদেশের মানুষ। অতিরিক্ত উৎপাদিত পণ্যের মতো গুরুত্ব হারিয়ে ফেলেছে। সুলভ হওয়ায় মানুষের প্রতি রাষ্ট্রের মায়া-মমতা কমে গেছে।

এ দেশে বেঁচে থাকাটা লটারি জেতার মতো। প্রতি বছর অসংখ্য মানুষ পানিতে ডুবে ও সাপের কামড়ে মারা যায়। এটা ধারাবাহিক কিংবদন্তি ঘটনার অনিবার্য নিয়তি মনে করে এ সমাজ। গণমাধ্যমের হিসাবে সড়ক দুর্ঘটনায় প্রতিদিন গড়ে ১৫ জন মারা যায়। অনেকের ধারণা, সংখ্যাটা দ্বিগুণও হতে পারে। কেননা, সব মৃত্যু খবরে আসে না। ছুটির দিন বা উৎসব পার্বণে এ সংখ্যা আরও বাড়ে। অপরিকল্পিত বা অতি লোভের শিল্প প্রতিষ্ঠানের অগ্নিকাণ্ডে হত্যাকাণ্ড আকছার ঘটছে। এমনকি, মাথায় নির্মাণ সামগ্রী পড়ে নিরীহ পথচারীর মৃত্যু সাধারণ ঘটনা! ছিনতাই-নির্যাতন-ধর্ষণে খুন, দেশে ব্যাটাগিরি দেখানোর মাধ্যম। এ রকম অসংখ্য অকারণে প্রতিনিয়ত মানুষ মারা যায়। সৌভাগ্য থাকলে খুন-ধর্ষণের শিকার ব্যক্তিকে নিয়ে আলোচনা হয়। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের উত্তাপ প্রশাসনের গায়ে লাগলে বিচারের উদ্যোগ নেয়। তবে, সে বিচার কবে শেষ হবে কেউ জানে না। এ রকম নিত্যনৈমিত্তিক ঘটনার ঘনঘটায় নতুন করে আবির্ভূত হয়েছে বিলুপ্তপ্রায় ‘হাম’। এ পরিস্থিতিতে সাধারণ মানুষ বলতেই পারে, ‘তারার জ্বালায় বাঁচি না। তারার আবার ভাই হয়েছে’।

মার্চের মাঝামাঝি থেকে গত সোমবার পর্যন্ত চারশর বেশি শিশু হামে মারা গেছে। তবে বেসরকারি হিসেবে এ সংখ্যা আরও বেশি হতে পারে। টিকার অভাব এবং টিকাদান কর্মসূচিতে অবহেলার কারণে প্রায় নির্মূল হওয়া রোগটি এখন মহামারি আকারে ফিরেছে। দেশের ৬১টি জেলায় এ সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়েছে। এর মধ্যে ৮৩ ভাগ আক্রান্তই ৫ বছরের কম বয়সী। উদভ্রান্ত বাবা-মা আক্রান্ত শিশুকে নিয়ে হাসপাতাল-ক্লিনিকে ছুটছে। সুযোগ না পেয়ে অনেকে চিকিৎসকের পরামর্শে বাসায় রেখে সেবা দিচ্ছে। প্রতিদিন গণমাধ্যমে মৃত শিশুর নিষ্পাপ মুখ আর হতাশ পিতা-মাতার ছবি দেখা যাচ্ছে। এ নিয়ে শুরু হয়েছে চিরাচরিত দোষারোপের রাজনীতি। এক্ষেত্রে ২০২১ সাল থেকে অবহেলার অভিযোগে হাসিনা ও ইউনূস সরকারকে ধুয়ে দিচ্ছে নেটিজেনরা। বর্তমান সরকার এ পরিস্থিতিকে ‘মহামারি’ ঘোষণা না করায় সমালোচনা করছে জনস্বাস্থ্যবিদরা। এ মৃত্যুর মিছিলকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গাজার শিশু হত্যার সঙ্গে তুলনা করছে কেউ কেউ। কথার কচকচানিতে স্বজনহারাদের ব্যথা আরও বাড়ছে। ভুক্তভোগীরা মনে করছে, সব কিছু নিয়ে রাজনীতি করাটা এক ধরনের অসুস্থতা।

দীর্ঘমেয়াদি টিকাদান কর্মসূচির (EPI) ফলে বাংলাদেশসহ বিশ্বজুড়ে হাম প্রায় নির্মূলের পর্যায়ে চলে গিয়েছিল। দেশে গত পাঁচ বছরে হামে কোনো শিশু প্রাণ হারায়নি। গত বছরের শেষের দিকে টিকা কেনায় অনিয়মের কারণে এবং জরুরি মজুত না থাকায় হঠাৎ হামের প্রাদুর্ভাব বাড়ে। বিএনপি সরকার জরুরি ভিত্তিতে ৬ থেকে ৫৯ মাস বয়সী শিশুদের জন্য গণটিকাদান কর্মসূচি শুরু করেছে। বিশেষজ্ঞরা টিকাদান, আইসোলেশন ও দ্রুত সঠিক চিকিৎসার ওপর জোর দিচ্ছেন। করোনার মতো হয়তো একসময় কেটে যাবে হামের ভয়াবহতা। কিন্তু, যারা সন্তান হারাল, তারা এ সময়কে ভুলতে পারবে না। তাদের স্মৃতিতে ভেসে উঠবে কাদের অবহেলায় প্রিয়জন হারিয়েছে। সময় বড় বেরহম। প্রকৃতির প্রতিশোধ অনিবার্য। হামে অমিত সম্ভাবনাময় শিশুদের মৃত্যু, অভিশাপ হয়ে ঘামাবে উদাসীন বুড়ো ভামদের। এ দেবশিশুদের মৃত্যুর দায় এড়াতে পারে না কোনো বিবেকবান মানুষ।

হাজারো সমস্যার এ দেশে, যে কোনো বেশে শুধু ক্ষমতা উপভোগ করতে চায় দায়িত্বশীলরা। সামাজিক দায়িত্ব পালনে কোনো ধরনের মমতা অনুভব করে না তারা। সাধারণ মানুষও তাদের অনুকরণে সব কিছু দ্রুত পেতে চায়। ‘একজনের আয়ে দশজন বসে খাওয়ার সংস্কৃতি’ দেশকে কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে এগোতে দিচ্ছে না। সরকারের ধারাবাহিক কর্মসূচির ঘাটতি, দুর্নীতি, সুশীল সমাজের উদাসীনতা ও ধর্মান্ধতার উত্থানে দেশে জনবিস্ফোরণ ঘটেছে। একসময়ের সফল পরিবার পরিকল্পনা কার্যক্রম বর্তমানে এক সন্ধিক্ষণে রয়েছে। কিছু সূচকে স্থবিরতা ও চ্যালেঞ্জ দেখা যাচ্ছে। দেশে আধুনিক জন্মনিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি ব্যবহারের হার প্রত্যাশিত গতিতে বাড়ছে না। কিছু প্রতিবেদনে দেখা গেছে, আধুনিক পদ্ধতি ব্যবহারের হার ৫৪ থেকে কমে ৫২ ভাগে নেমে এসেছে। অনেক দম্পতি পদ্ধতি গ্রহণ করতে চাইলেও সঠিক সরবরাহ বা তথ্যের অভাবে তা পারছে না। ঢাকা-চট্টগ্রামের মতো বিভাগগুলোর তুলনায় সিলেট-ময়মনসিংহে পরিবার পরিকল্পনা পদ্ধতি ব্যবহারের হার তুলনামূলক কম। মাঠপর্যায়ে উপকরণ সরবরাহের নিরবচ্ছিন্নতা নিশ্চিত করা এবং জনসচেতনতা বাড়ানোই এখন প্রধান চ্যালেঞ্জ। যদিও, সামগ্রিকভাবে জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার নিয়ন্ত্রণে রাখতে সরকার নতুন কৌশল ও জনবল বৃদ্ধির কথা বলছে।

ভালো ভালো কথা সাময়িক প্রশান্তি আনে দেহ-মনে। তবে, টেকসই উন্নয়নের জন্য যুগোপযোগী পরিকল্পনা ও কঠোর পর্যবেক্ষণের বিকল্প নেই। অনেক পরিবার পরিকল্পনা কর্মীর সন্তান আছে পাঁচ-সাতজন করে। এরকম কর্মীর কথায় তো সাধারণ মানুষ অনুপ্রাণিত হবে না। যেমন, সন্ত্রাসী-মাদকাসক্ত কর্মী পাশে নিয়ে কোনো কোনো জনপ্রতিনিধি দিন-রাত জনসেবা করছেন। সন্ত্রাস-মাদকমুক্ত সমাজের ঘোষণা দিচ্ছেন। এসব শুনে লোকে আড়ালে হাসে। ওই নেতা একটু বেকায়দায় পড়লে বা শীর্ষ নেতার বিরাগভাজন হলে তার বিরুদ্ধে তথ্য-প্রমাণ ছেড়ে দেওয়া হয় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে। প্রতিশ্রুতিকে কাজে দৃশ্যমান না করা পর্যন্ত এখন আর লোকে কোনো কিছু বিশ্বাস করে না। তবে, চারপাশে নিয়োজিত দায়িত্বশীলরা আগের মতোই মন জুগিয়ে বাকবাকুম করে। এ দেখে এখনো বিভ্রান্ত হচ্ছেন কোনো কোনো মন্ত্রী। আমি-তুমি বা হাম-তুম ভালো থাকলেই চলবে—এ ধারণা থেকে দ্রুত সরে আসতে হবে জনপ্রতিনিধিদের। জুলাই-পরবর্তী বাস্তবতায় প্রধানমন্ত্রী প্রতিদিন নতুন নতুন অনুকরণীয় উদাহরণ তৈরি করছেন। আর পরিষদবর্গের কেউ কেউ আমলা নির্ভর পুরোনো দাম্ভিকতায় বিতর্কিত হচ্ছেন। এ বৈপিরীত্যের সঙ্গে একটি গল্প মিলে যায়। গল্পকার বলেন, ‘চাচা তিনবার হজ করে যে সুনাম কুড়িয়েছেন; চাচি একবার ভেগে গিয়েই তার সর্বনাশ করেছেন।’

লেখক: হেড অব নিউজ, আরটিভি

কালবেলা অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন
  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

জয় বাংলা স্লোগান দিয়ে যুবদল নেতার ওপর ককটেল হামলা : শ্রমিক লীগ নেতা গ্রেপ্তার

কলেজছাত্রকে ছুরিকাঘাতে হত্যা, অভিযুক্তদের বাড়ি ভাঙচুর-অগ্নিসংযোগ

পাকিস্তানি রিভলভার ও গুলিসহ যুবক আটক

কক্সবাজারে পাচারচক্রের সদস্য আটক

আজ শুরু হচ্ছে বাংলাদেশ-অস্ট্রেলিয়া লড়াই

ট্রাম্প-নেতানিয়াহুর বাগযুদ্ধকে ‘প্রেমিক-প্রেমিকার ঝগড়া’ বললেন ইসরায়েলি রাষ্ট্রদূত

খাল নেই, তবু কোটি টাকার সেতু

দৃষ্টিহীন মালেকের হাত ধরে আলোকিত হচ্ছে শত শত শিক্ষার্থীর ভবিষ্যৎ

দেশের ৪ বিশ্ববিদ্যালয়ে নতুন উপাচার্য নিয়োগ

প্রকৃতির অলংকার অনিন্দ্যসুন্দর প্রজাপতি ‘হরতনি’

১০

ষষ্ঠ শ্রেণি থেকে কারিগরি শিক্ষা বাধ্যতামূলক করা হচ্ছে : মাহদী আমিন

১১

যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশে বাধা, বিশ্বকাপ থেকে বাদ রেফারি ওমর আরতান

১২

নেইমারের চোটের বর্তমান অবস্থা জানাল ব্রাজিল

১৩

হিজবুল্লাহর বিরুদ্ধে ইসরায়েলের যুদ্ধ শেষ হয়নি : নেতানিয়াহু

১৪

ডিআইজির কক্ষ থেকে আরও ২ কালনাগিনী সাপ উদ্ধার

১৫

আজ টানা ৯ ঘণ্টা বিদ্যুৎ থাকবে না যেসব এলাকায়

১৬

নাইটক্লাব কাণ্ডে তদন্তে স্টোকস, নেতৃত্ব নিয়েও শঙ্কা

১৭

দুই পররাষ্ট্রমন্ত্রীর বৈঠক / ঢাকা-মস্কো সম্পর্ক আরও ঘনিষ্ঠ ও সম্প্রসারণের অঙ্গীকার

১৮

চেকপোস্টে ৩ বিদেশি পিস্তল-গুলিসহ যুবক আটক

১৯

জোড়া পেনাল্টিতে নাটকীয় জয়ে বিশ্বকাপ প্রস্তুতি নেদারল্যান্ডসের

২০
X