

দেশের শিক্ষা খাতে দীর্ঘদিনের শিক্ষক সংকট এখন এমন একপর্যায়ে পৌঁছেছে, যেখানে সরকার অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষকদের আবার শ্রেণিকক্ষে ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ নিতে বাধ্য হয়েছে। সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও বেসরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষক সংকট মোকাবিলায় ‘শিক্ষকপুল’ গঠনের পরিকল্পনা নিঃসন্দেহে তাৎক্ষণিক সংকট সামাল দেওয়ার একটি চেষ্টা। কিন্তু বাস্তবতা হলো, এটি কোনো স্থায়ী বা কার্যকর সমাধান নয়। এটি শিক্ষা খাতে দীর্ঘদিনের অব্যবস্থাপনা ও নিয়োগে অবহেলার একটি স্পষ্ট প্রতিফলন।
বর্তমানে দেশের ৬৫ হাজারের বেশি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মধ্যে প্রায় ৩৪ হাজার বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষকের পদ শূন্য। সহকারী শিক্ষক পদও খালি রয়েছে প্রায় ২৫ হাজার। অন্যদিকে এমপিওভুক্ত স্কুল ও কলেজে শূন্য শিক্ষকের সংখ্যা ৬০ হাজারের বেশি। এই বিশাল সংকট রাতারাতি তৈরি হয়নি। বছরের পর বছর নিয়োগে ধীরগতি, প্রশাসনিক জটিলতা এবং পরিকল্পনার অভাবের কারণেই আজ শিক্ষাব্যবস্থা এমন সংকটে পড়েছে।
অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষকদের আবার পাঠদানে যুক্ত করার পেছনে সরকারের যুক্তি হলো, এতে ঘাটতি কিছুটা পূরণ হবে এবং শ্রেণিকক্ষে পাঠদান চালু রাখা সম্ভব হবে। বাস্তবে হয়তো কিছু ক্ষেত্রে সাময়িক উপকার মিলবে। অভিজ্ঞ শিক্ষকরা শিক্ষার্থীদের সহায়তা করতে পারবেন। কিন্তু প্রশ্ন হলো, একটি দেশের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের শিক্ষাব্যবস্থা কি সাময়িক জোড়াতালি দিয়ে চালানো যায়?
অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষকরা দীর্ঘ অভিজ্ঞতাসম্পন্ন হলেও বয়সজনিত সীমাবদ্ধতা অস্বীকার করার উপায় নেই। বর্তমান শিক্ষাব্যবস্থা দ্রুত বদলাচ্ছে। প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষা, নতুন কারিকুলাম, আধুনিক শিখনপদ্ধতি এবং মানসিক স্বাস্থ্যসচেতনতা এখন শিক্ষাদানের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এসব ক্ষেত্রে নতুন প্রজন্মের প্রশিক্ষিত ও প্রযুক্তি সচেতন শিক্ষকের প্রয়োজন বেশি। শুধু অভিজ্ঞতা দিয়ে বর্তমান সময়ের শিক্ষাগত চাহিদা পূরণ করা সম্ভব নয়।
সবচেয়ে বড় উদ্বেগের বিষয় হলো, এ উদ্যোগের ফলে স্থায়ী শিক্ষক নিয়োগ আরও ধীর হয়ে যেতে পারে। এরই মধ্যে দেশে শিক্ষিত বেকারের সংখ্যা ২৭ লাখের বেশি। হাজার হাজার তরুণ শিক্ষক হওয়ার স্বপ্ন নিয়ে প্রস্তুতি নিচ্ছেন। অথচ তাদের নিয়োগ না দিয়ে অবসরপ্রাপ্তদের ফিরিয়ে আনা তরুণদের প্রতি এক ধরনের অবিচার। এতে হতাশা বাড়বে এবং দীর্ঘ মেয়াদে শিক্ষা পেশায় মেধাবীদের আগ্রহ কমে যেতে পারে।
প্রাথমিক শিক্ষক নিয়োগের সাম্প্রতিক পরীক্ষাকে ঘিরেও নানা প্রশ্ন উঠেছে। প্রশ্ন ফাঁস, ডিভাইস ব্যবহার এবং অনিয়মের অভিযোগে দুই শতাধিক প্রার্থী বহিষ্কৃত হয়েছেন। এরপরও নিয়োগ প্রক্রিয়া নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। এসব ঘটনা দেখায়, শিক্ষক নিয়োগ ব্যবস্থায় এখনো স্বচ্ছতা ও দক্ষতার বড় ঘাটতি রয়েছে। অথচ একটি দেশের শিক্ষা ব্যবস্থার ভিত্তিই নির্ভর করে যোগ্য ও মেধাবী শিক্ষক নিয়োগের ওপর।
শুধু শিক্ষক সংখ্যা বাড়ালেই হবে না, শিক্ষকদের পেশাগত মর্যাদা ও কর্মপরিবেশও উন্নত করতে হবে। অনেক মেধাবী তরুণ কম বেতন ও অনিশ্চিত ভবিষ্যতের কারণে শিক্ষকতা পেশায় আসতে আগ্রহ হারাচ্ছেন। এ বাস্তবতা বদলানো জরুরি।
আমরা মনে করি, একটি দেশের উন্নয়ন নির্ভর করে তার শিক্ষাব্যবস্থার ওপর। আর শিক্ষা ব্যবস্থার প্রাণ হলো শিক্ষক। সেই শিক্ষক সংকট সমাধানে যদি দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার বদলে সাময়িক ব্যবস্থা নেওয়া হয়, তাহলে ভবিষ্যতে আরও বড় সংকট তৈরি হবে। অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষকদের শ্রেণিকক্ষে ফেরানো হয়তো আপাতত কিছু চাপ কমাবে, কিন্তু এটি কোনো স্থায়ী সমাধান নয়। স্থায়ী সমাধান একটাই—দক্ষ, মেধাবী ও প্রশিক্ষিত নতুন শিক্ষক দ্রুত নিয়োগ এবং শিক্ষা খাতে কার্যকর সংস্কার। তাহলেই শিক্ষার মান উন্নয়ন সম্ভব হবে এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্ম একটি শক্ত ভিত্তির ওপর দাঁড়াতে পারবে।