

দেশে হামের ভয়াবহ প্রাদুর্ভাব শুধুই একটি স্বাস্থ্য সংকট নয়। এটি রাষ্ট্রীয় প্রস্তুতি, নীতিনির্ধারণ এবং প্রশাসনিক সমন্বয়ের দুর্বলতার নির্মম প্রতিফলন। প্রতিদিন নতুন নতুন শিশু আক্রান্ত হচ্ছে, বাড়ছে মৃত্যুর সংখ্যা। উদ্বেগজনক বিষয় হলো, এ পরিস্থিতি হঠাৎ তৈরি হয়নি। বহু আগেই সংকটের পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু সেই সতর্কবার্তা যথাযথ গুরুত্ব পায়নি। ফলে প্রতিরোধযোগ্য একটি রোগ শত শত শিশুর প্রাণ কেড়ে নিচ্ছে।
জাতিসংঘের শিশুবিষয়ক সংস্থা ইউনিসেফের বাংলাদেশ প্রতিনিধি রানা ফ্লাওয়ার স্পষ্ট ভাষায় বলেছেন, ২০২৪ সাল থেকেই তারা সরকারকে টিকার সংকট সম্পর্কে বারবার সতর্ক করেছিলেন। অন্তত ১০টি বৈঠক এবং পাঁচ থেকে ছয়টি আনুষ্ঠানিক চিঠির মাধ্যমে তারা সম্ভাব্য বিপদের কথা জানিয়েছিলেন। শুধু স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় নয়, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কেও বিষয়টি অবহিত করা হয়েছিল। তার বক্তব্যের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো, ‘আমরা ২০২৪ সালেই টিকার সংকটের পূর্বাভাস দিয়েছিলাম। পরবর্তী দুই বছরে বিভিন্ন রোগের ক্ষেত্রে প্রভাব ফেলতে পারে। তাই আমরা আগেভাগেই সতর্ক করছিলাম এবং ক্রমাগত মনে করিয়ে দিচ্ছিলাম যে, তারা সংকটের মুখে পড়তে যাচ্ছে।’
এ বক্তব্যের তাৎপর্য অত্যন্ত গভীর। কারণ এটি প্রমাণ করে যে, সংকটের মূল কারণ শুধু রোগের সংক্রমণ নয়, সময়মতো সিদ্ধান্ত গ্রহণে ব্যর্থতা। প্রতিবেদন অনুযায়ী, দেশে বছরে প্রায় ৭ কোটি হামের টিকার প্রয়োজন হলেও ২০২৫ সালের আগস্ট থেকে নভেম্বর পর্যন্ত এসেছে মাত্র ১ কোটি ৭৮ লাখ ডোজ, যা মোট চাহিদার এক-তৃতীয়াংশেরও কম। এই ঘাটতির ফলে লাখ লাখ শিশু নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচির বাইরে থেকে গেছে। ইউনিসেফের তথ্য অনুযায়ী, প্রতি বছর প্রায় পাঁচ লাখ শিশু টিকা কর্মসূচির আওতায় আসছে না। এ বাস্তবতা অত্যন্ত ভয়াবহ।
বিশ্বখ্যাত জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ পল ফার্মার বলেছেন, ‘The idea that some lives matter less is the root of all that is wrong with the world’. অর্থাৎ কিছু মানুষের জীবনকে কম গুরুত্বপূর্ণ মনে করার মানসিকতাই বহু সংকটের মূল। দেশের বর্তমান পরিস্থিতি সে কথাকেই নতুনভাবে স্মরণ করিয়ে দেয়। যখন সময়মতো টিকা সংগ্রহ নিশ্চিত করা যায় না, তখন সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে পড়ে দরিদ্র ও প্রান্তিক পরিবারের শিশুরা।
এখানে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, টিকা কেনার নীতিগত জটিলতা। ইউনিসেফ জানিয়েছে, উন্মুক্ত দরপত্রের সিদ্ধান্তের কারণে টিকা সংগ্রহে বিলম্ব হয়েছে। অথচ টিকা সাধারণ কোনো পণ্য নয়। এটি অত্যন্ত বিশেষায়িত এবং জীবনরক্ষাকারী উপাদান। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার অনুমোদিত নিরাপদ টিকা দ্রুত সংগ্রহ করাই এখানে প্রধান বিবেচ্য হওয়া উচিত ছিল। প্রশাসনিক প্রক্রিয়া যদি জনস্বাস্থ্যের জরুরি প্রয়োজনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ না হয়, তাহলে তার ভয়াবহ মূল্য দিতে হয় সাধারণ মানুষকে।
আমরা মনে করি, স্বাস্থ্য খাতে সিদ্ধান্ত গ্রহণে রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক সমন্বয় আরও জোরদার করতে হবে। সবচেয়ে বড় কথা, ভবিষ্যতের জন্য শিক্ষা নিতে হবে। দেশে হামের বর্তমান প্রাদুর্ভাব আমাদের সামনে কঠিন এক প্রশ্ন তুলে ধরেছে, আমরা কি সত্যিই শিশুদের স্বাস্থ্য ও জীবনের নিরাপত্তাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিচ্ছি? এ প্রশ্নের জবাব এখনই খুঁজে বের করা জরুরি। টিকা ক্রয়ে কোনো অবহেলা, অনিয়ম বা দুর্নীতি হয়ে থাকলে সংশ্লিষ্টদের আইনের আওতায় এনে বিচারের মাধ্যমে শাস্তি নিশ্চিত করা প্রয়োজন।