

বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা ও সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের ৪৫তম শাহাদাতবার্ষিকী উপলক্ষে আয়োজিত এক আলোচনা সভায় দেশের সামনে অপেক্ষমাণ ‘কঠিন ও গুরুত্বপূর্ণ সময়ের’ কথা উল্লেখ করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তিনি বলেন, বর্তমান সরকার জনগণের প্রত্যাশা পূরণে বদ্ধপরিকর এবং নির্বাচনি ইশতেহার বাস্তবায়নের মধ্য দিয়েই জনগণের আশা-আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন ঘটাতে চায়। একই সঙ্গে তিনি দলীয় নেতাকর্মীদের একটি সফল সরকার গঠনে সহযোগিতার আহ্বান জানিয়েছেন। তার বক্তব্যে যেমন প্রত্যাশার কথা রয়েছে, তেমনি রয়েছে বাস্তবতার কঠিন সতর্কবার্তাও।
বাংলাদেশ বর্তমানে এমন একসময় অতিক্রম করছে, যখন অর্থনীতি, রাজনীতি, সমাজ ও আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি একসঙ্গে নানা ধরনের চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে। মূল্যস্ফীতি, বেকারত্ব, বিনিয়োগ সংকট, বৈদেশিক ঋণের চাপ এবং বৈশ্বিক অস্থিরতা সাধারণ মানুষের জীবনকে কঠিন করে তুলেছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে আন্তর্জাতিক ভূরাজনীতির পরিবর্তিত বাস্তবতা, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত এবং বিশ্ববাজারের অনিশ্চয়তা। এমন পরিস্থিতিতে রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণ করা যে সহজ কাজ নয়, তা প্রধানমন্ত্রী নিজেও স্বীকার করেছেন।
নির্বাচনের আগে জনগণের কাছে দেওয়া প্রতিশ্রুতিই যে সরকারের রাজনৈতিক বৈধতা ও নৈতিক শক্তির প্রধান ভিত্তি, সে কথাও তার বক্তব্যে উঠে এসেছে। গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় জনগণ ভোটের মাধ্যমে একটি কর্মপরিকল্পনার পক্ষে রায় দেয়। তাই নির্বাচনি ইশতেহার কেবল একটি রাজনৈতিক দলিল নয়, এটি জনগণের সঙ্গে সরকারের এক ধরনের সামাজিক চুক্তি। তবে ইশতেহারের প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন শুধু সরকারের সদিচ্ছার ওপর নির্ভর করে না; প্রয়োজন দক্ষ প্রশাসন, সুশাসন, জবাবদিহি এবং কার্যকর নীতি বাস্তবায়ন। অতীতের অভিজ্ঞতা বলে, অনেক সময় ভালো পরিকল্পনাও বাস্তবায়নের দুর্বলতায় কাঙ্ক্ষিত ফল দিতে পারে না। তাই সরকারের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ প্রতিশ্রুতিগুলোকে বাস্তবে রূপ দেওয়া।
প্রধানমন্ত্রী তার বক্তব্যে বিচার, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের বিষয়েও গুরুত্বারোপ করেছেন। নিঃসন্দেহে এগুলো রাষ্ট্রের মৌলিক খাত। একটি দেশের উন্নয়ন শুধু অবকাঠামো নির্মাণ বা অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির মাধ্যমে পরিমাপ করা যায় না। নাগরিকের ন্যায়বিচার পাওয়ার অধিকার, মানসম্মত শিক্ষা, সহজলভ্য স্বাস্থ্যসেবা এবং রাজনৈতিক স্বাধীনতাও উন্নয়নের গুরুত্বপূর্ণ সূচক। জনগণ এসব ক্ষেত্রেই দৃশ্যমান পরিবর্তন দেখতে চায়।
একই সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী সামাজিক ও পারিবারিক মূল্যবোধের অবক্ষয়ের বিষয়টিও তুলে ধরেছেন। এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ। প্রযুক্তিনির্ভরতা, সামাজিক পরিবর্তন এবং দ্রুত নগরায়ণের ফলে পারিবারিক বন্ধন ও সামাজিক দায়বদ্ধতার ক্ষেত্রে নানা পরিবর্তন ঘটছে। তবে এ সংকট মোকাবিলায় শুধু সরকারের উদ্যোগ যথেষ্ট নয়; পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, ধর্মীয়-সামাজিক সংগঠনগুলোকেও সক্রিয় ভূমিকা পালন করতে হবে।
তবে একটি বিষয় মনে রাখা জরুরি। গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে সরকারের সাফল্য কেবল দলীয় কর্মীদের সহযোগিতার ওপর নির্ভর করে না; নির্ভর করে সমগ্র জনগণের আস্থা অর্জনের ওপর। বিরোধী মতের প্রতি সহনশীলতা, সমালোচনা গ্রহণের মানসিকতা এবং অংশগ্রহণমূলক রাজনৈতিক সংস্কৃতি সফল সরকারের অপরিহার্য উপাদান। রাষ্ট্র কোনো একক দলের নয়, সব নাগরিকের।
প্রধানমন্ত্রী যে কঠিন সময়ের কথা বলেছেন, তা নিঃসন্দেহে বাস্তব। কিন্তু ইতিহাস বলে, সংকটের সময়ই নেতৃত্বের প্রকৃত সক্ষমতা যাচাই হয়। জনগণ এখন প্রতিশ্রুতির চেয়ে বেশি দেখতে চায় কার্যকর পদক্ষেপ, দৃশ্যমান পরিবর্তন এবং সুশাসনের প্রতিফলন। সরকারের সামনে সুযোগ রয়েছে নির্বাচনি অঙ্গীকার বাস্তবায়নের মাধ্যমে মানুষের আস্থা সুদৃঢ় করার। সে লক্ষ্য অর্জন করতে পারলেই কঠিন সময়কে সম্ভাবনার সময়ে রূপান্তর করা সম্ভব হবে।