

ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় ‘বনলতা এক্সপ্রেস’ চলচ্চিত্রের প্রদর্শনী বন্ধ হয়ে যাওয়ার ঘটনা শুধু একটি সিনেমা প্রদর্শনী বাতিল হওয়ার বিষয় নয়। এটি বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক স্বাধীনতা, আইনের শাসন এবং রাষ্ট্রের চরিত্র নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তোলার মতো একটি ঘটনা। প্রশ্নটি সরল: একটি সাংবিধানিক রাষ্ট্রে কোনো চলচ্চিত্রের প্রদর্শনী বন্ধ করার ক্ষমতা কার? রাষ্ট্রের, নাকি একটি ক্ষুদ্র—কিন্তু সংগঠিত চাপ সৃষ্টিকারী গোষ্ঠীর?
ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা সদরে কওমি মাদ্রাসার কিছু শিক্ষার্থীর বিরোধিতার কারণে অন্নদা সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ে ‘বনলতা এক্সপ্রেস’-এর প্রদর্শনী স্থগিত করা হয়। পরে জেলার কসবা উপজেলায়ও একই চলচ্চিত্রের প্রদর্শনী পুলিশ ও প্রশাসনের হস্তক্ষেপে বন্ধ করে দেওয়া হয়। আয়োজকদের ভাষ্য অনুযায়ী, প্রদর্শনী শুরুর মাত্র ১৫ মিনিট আগে বিপুলসংখ্যক পুলিশ সদস্য, নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট এবং থানার ওসি এসে জানান, জেলা শহরে চলচ্চিত্রটি নিয়ে বিতর্ক চলছে, তাই প্রদর্শনী বন্ধ রাখতে হবে।
এ ঘটনার পর স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠেছে—কট্টর মৌলবাদী গোষ্ঠীগুলো যদি চলচ্চিত্রবিরোধী অবস্থান নেয়, তাহলে সরকারও কি সেই অবস্থানের সঙ্গে একাত্মতা প্রকাশ করছে? যদি তা না হয়, তাহলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে ব্যবহার করে কেন একটি বৈধ সাংস্কৃতিক আয়োজন বন্ধ করে দেওয়া হলো?
বাংলাদেশে শরিয়া আইন চালু হয়নি। দেশের সংবিধান এখনো বহাল আছে। রাষ্ট্র পরিচালিত হচ্ছে একটি লিখিত সাংবিধানিক কাঠামোর অধীনে। বর্তমানে দেশে জনগণের ভোটে নির্বাচিত একটি গণতান্ত্রিক সরকার দায়িত্ব পালন করছে। এমন বাস্তবতায় দেশের একটি জেলার একটি অংশ কি কার্যত শরিয়াহ আইনের যুক্তিতে পরিচালিত হবে? যদি কোনো গোষ্ঠী কোনো সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডকে নিজেদের ধর্মীয় ব্যাখ্যার ভিত্তিতে অগ্রহণযোগ্য বলে ঘোষণা করে এবং রাষ্ট্র সেই অবস্থানের কাছে নতি স্বীকার করে, তাহলে সংবিধান কোথায় দাঁড়ায়?
এ ঘটনার প্রতিক্রিয়ায় মডেল, অভিনেত্রী ও আইনজীবী পিয়া জান্নাতুল তার ভেরিফায়েড ফেসবুক অ্যাকাউন্টে লিখেছেন, ‘ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় বনলতা এক্সপ্রেস বন্ধ হয়ে গেল। যারা জুলাইয়ে মাঠে-ঘাটে নেমে দেশ উদ্ধার করতে চলে এসেছিলেন, বিশেষ করে কিছু মিডিয়াকর্মী এবং সেসব মানুষ, যারা সময় ও পরিস্থিতি অনুযায়ী একেকবার একেক পক্ষের অবস্থান নেন, তারা কি এখন এগিয়ে এসে নিজেদের সিনেমা, নিজেদের সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যকে রক্ষা করতে পারবেন?’
প্রশ্নটি কেবল তার নয়, অনেকের। ২০২৪ সালের কোটা আন্দোলন থেকে গণঅভ্যুত্থানের সময় আমরা দেখেছি ইসলামপন্থি দল ও ধর্মনিরপেক্ষ রাজনৈতিক-সামাজিক গোষ্ঠীগুলো একই দাবিতে রাজপথে নেমেছিল। তখন বলা হয়েছিল, দেশ হবে সবার। মত ও পথের ভিন্নতা সত্ত্বেও সবাই সমান অধিকার ভোগ করবে। কিন্তু শেখ হাসিনার বিদায়ের পর কি সেই প্রতিশ্রুতি ক্ষয় হতে শুরু করেছে? বাংলাদেশ কি ধীরে ধীরে কেবল একটি বিশেষ মতাদর্শিক গোষ্ঠীর জন্য নিরাপদ জায়গায় পরিণত হচ্ছে?
এটি অবশ্য বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়। ২০২৫ সালে ঈদের সময় টাঙ্গাইলের কালিহাতী উপজেলার আউলিয়াবাদ এলাকায় জেলা পরিষদের কমিউনিটি সেন্টার কাম মাল্টিপারপাস হলে ‘তাণ্ডব’ চলচ্চিত্র প্রদর্শনের আয়োজন করা হয়েছিল। স্থানীয় সংস্কৃতিকর্মীরা বৈধভাবে হল ভাড়া নিয়ে প্রদর্শনীর ব্যবস্থা করেছিলেন। কিন্তু পারকি ইউনিয়ন ওলামা পরিষদের ব্যানারে বিক্ষোভের পর চলচ্চিত্রটির প্রদর্শন বন্ধের দাবি ওঠে। পরে নিরাপত্তাহীনতার অজুহাতে আয়োজকদের অনুষ্ঠান বন্ধ করতে বাধ্য করা হয়।
তখন পরিস্থিতি ছিল ভিন্ন। অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের সময় ইসলামী রাজনৈতিক শক্তিগুলোর প্রভাব নিয়ে নানা আলোচনা ছিল। কিন্তু এখন তো সে পরিস্থিতি নেই। এখন একটি নির্বাচিত সরকার ক্ষমতায়। তাহলে একই ধরনের ঘটনা আবার কেন ঘটছে?
ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় ‘বনলতা এক্সপ্রেস’ প্রদর্শিত না হলেও দেশের অন্যান্য স্থানে চলচ্চিত্রটি প্রদর্শিত হয়েছে। দর্শকের ইতিবাচক সাড়াও পেয়েছে। ফলে এর প্রযোজক হয়তো চূড়ান্ত অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের মুখে পড়বেন না। কিন্তু ক্ষতি যে হয়নি, তা বলা যাবে না। ক্ষতি হয়েছে মুক্ত সাংস্কৃতিক চর্চার। ক্ষতি হয়েছে শিল্পের স্বাধীনতার। ক্ষতি হয়েছে রাষ্ট্রের ভাবমূর্তির।
সবচেয়ে বড় ক্ষতি হয়েছে সরকারের। কারণ এ ঘটনা এমন একসময়ে ঘটেছে, যখন প্রধানমন্ত্রী নিজে কন্যাসহ ঢাকার একটি সিনেপ্লেক্সে চলচ্চিত্র দেখতে গিয়েছেন। সেই উপস্থিতিকে চলচ্চিত্র জগত এবং সাধারণ মানুষ ইতিবাচক বার্তা হিসেবে গ্রহণ করেছিলেন। মনে করা হয়েছিল, সরকার সংস্কৃতির পাশে দাঁড়াতে চায়। কিন্তু কয়েক মাসের মধ্যেই একটি জেলার চাপের মুখে একটি চলচ্চিত্রের প্রদর্শনী বন্ধ হয়ে যাওয়ার ঘটনা সম্পূর্ণ বিপরীত বার্তা দেয়। একদিকে সরকার সংস্কৃতিবান্ধব হওয়ার বার্তা দেবে, অন্যদিকে মাঠপর্যায়ে প্রশাসন কোনো গোষ্ঠীর আপত্তির মুখে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান বন্ধ করে দেবে—এ দ্বৈততা দীর্ঘ মেয়াদে টেকসই নয়।
আরও বিস্ময়কর হলো, যখন ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় একটি চলচ্চিত্র প্রদর্শিত হতে পারছে না, তখনো চলচ্চিত্র নিয়ে আশাবাদী বক্তব্য দিচ্ছেন রাজনৈতিক নেতারা। সম্প্রতি বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী চলচ্চিত্র পরিষদের এক আলোচনা সভায় বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. মঈন খান বলেছেন, বিএনপি যখন ক্ষমতায় থাকে, তখন চলচ্চিত্রের উন্নয়ন সবচেয়ে বেশি হয় এবং ভবিষ্যতেও তাদের সরকার চলচ্চিত্রের উন্নয়নে কাজ করবে। নিশ্চয়ই চলচ্চিত্রের উন্নয়ন নিয়ে রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি গুরুত্বপূর্ণ; কিন্তু বাস্তবতা হলো, একটি জেলার ক্ষুদ্র একটি গোষ্ঠীর চাপের মুখে যদি প্রশাসন চলচ্চিত্র প্রদর্শনী বন্ধ করে দেয়, তাহলে উন্নয়নের এসব প্রতিশ্রুতির কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন উঠবেই। চলচ্চিত্রের উন্নয়ন কেবল অনুদান দেওয়া, নতুন হল নির্মাণ বা প্রযোজনা বাড়ানোর মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। শিল্পচর্চার নিরাপত্তা নিশ্চিত করাও তার অবিচ্ছেদ্য অংশ।
একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে কারও কোনো চলচ্চিত্র পছন্দ না-হতেই পারে। কেউ তার বিরুদ্ধে মত প্রকাশ করতে পারেন, প্রতিবাদ করতে পারেন, বর্জনের আহ্বান জানাতে পারেন। সেটি তার নাগরিক অধিকার। কিন্তু সেই আপত্তির কারণে রাষ্ট্র যদি অন্য নাগরিকের সাংস্কৃতিক অধিকার কেড়ে নেয়, তাহলে সেখানে সমস্যা তৈরি হয়। কারণ, গণতন্ত্রের মূল ভিত্তি সংখ্যাগরিষ্ঠের মত নয়, বরং সবার অধিকার রক্ষা।
সরকার যদি সত্যিই নাগরিকদের কাছে প্রমাণ করতে চায় যে, তারা সংস্কৃতিবান্ধব, তাহলে শুধু বিবৃতি দিয়ে হবে না। কথায় কথায় যা মন চায় তাই বন্ধ করে দেওয়ার সংস্কৃতির বিরুদ্ধে আইনগত ও প্রশাসনিক অবস্থান নিতে হবে। কোনো গোষ্ঠী চাপ সৃষ্টি করলেই যেন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, চলচ্চিত্র প্রদর্শনী, নাটক, সংগীতানুষ্ঠান কিংবা শিল্পচর্চা বন্ধ না হয়ে যায়, তা নিশ্চিত করতে হবে।
‘বনলতা এক্সপ্রেস’-এর প্রদর্শনী ফের চালুর প্রশ্ন গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হলো ভবিষ্যৎ। ভবিষ্যতে যেন কোনো চলচ্চিত্র, কোনো নাটক, কোনো বইমেলা, কোনো সাংস্কৃতিক আয়োজন কোনো গোষ্ঠীর আপত্তির কারণে বন্ধ না হয়, সে নিশ্চয়তা তৈরি করতে হবে। কারণ, একটি চলচ্চিত্রের প্রদর্শনী বন্ধ হওয়া হয়তো সাময়িক ঘটনা, কিন্তু সাংস্কৃতিক স্বাধীনতার ওপর বারবার আঘাত আসতে থাকলে তার ক্ষতি বহন করতে হয় পুরো সমাজকে।
রাষ্ট্রের দায়িত্ব কোনো বিশেষ গোষ্ঠীর পছন্দ-অপছন্দ বাস্তবায়ন করা নয়; রাষ্ট্রের দায়িত্ব সব নাগরিকের সাংবিধানিক অধিকার রক্ষা করা। সে পরীক্ষাতেই আজ সরকারকে উত্তীর্ণ হতে হবে।
লেখক: সাংবাদিক ও রাজনীতি বিশ্লেষক