

তারুণ্যের গতি নিয়ে অনেকক্ষণ ধরে বক্তৃতা করলেন এক অশীতিপর জ্যোতির্ময় বৃদ্ধ। বিখ্যাত নির্মাতা ও কবি হিসেবে খ্যাতি তার। দর্শক-শ্রোতার বেশিরভাগই ছিল নিম্নআয়ের মানুষ। দিন আনে দিন খায়। সুযোগ পেলে দিন বদলের গল্প শোনে আর লটারি কিনে বাড়ি ফেরে। বক্তা শেষের দিকে বললেন, ‘তার সব কাজই মেহনতি মানুষ ঘিরে। সাধারণ মানুষের জন্য সারা জীবন কাজ করেছেন তিনি’। এ কথা শুনে দর্শক সারির একজন আরেকজনের কাছে জানতে চাইলেন, উনি কি করেন? দ্বিতীয়জন উত্তরে বললেন, উনি লেখালেখি করেন। সিনেমা-নাটকও বানান। বুদ্ধিজীবী মানুষ। এটা শুনে প্রথমজন হতাশ হলেন। লেখালেখি ও সিনেমা-নাটক বানানো আবার কাজ হয় কীভাবে? শখের জিনিসকে কাজ বলে চালিয়ে দিচ্ছেন!
সাধারণ মানুষ কাজ বলতে কায়িক শ্রম আর দৃশ্যমান ভূমিকাকে বোঝে। দেশে মেহনতি মানুষের জন্য রাজনীতি আর সংস্কৃতি চর্চায় এটা একটা বড় ট্র্যাজেডি। যাদের জন্য করা হয়, তারাই বোঝে না। যে কারণে ডাকসাইটে অনেক নেতা বড় বড় কথা বললেও সারা জীবন সাইট লাইনেই কাটিয়ে দেন। লক্ষ্য-উদ্দেশ্য মহৎ হলেও আরাধ্য জনতার আস্থা অর্জন করতে পারেন না। জনতার সঙ্গে নেতার চিন্তা-চেতনার যোজন যোজন দূরত্ব যুগ যুগ ধরে চলমান। তবে মেধাবী এ সব নেতা, সমাজ-সংস্কারকরা ‘বু্দ্ধিজীবী’ হিসেবে সমাজে পরিচিতি পান। বৈষম্যহীন, কুসংস্কারমুক্ত, প্রগতিশীল, আধুনিক রাষ্ট্র গঠনের স্বপ্ন দেখেন এবং বলেন। অনাচার দেখলে সাধ্যমতো প্রতিবাদ করেন, বিবৃতি দেন। সীমিত সামর্থ্য নিয়েও অসীম ক্ষমতাধর গোষ্ঠী বা সরকারকে প্রশ্ন করেন। এ জন্য পৃথিবীজুড়ে বুদ্ধিজীবীদের সম্মান করা হয়। সম্মান এবং প্রভাব দেখে ইদানীং অনেক কুবুদ্ধিওয়ালা লোকও বুদ্ধিজীবী তকমা লাগিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে। যে কারণে বুদ্ধিজীবীরাও এখন প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছেন।
‘বুদ্ধিজীবী’ শব্দটি ইংরেজি ‘Intellectual’-এর ভাবানুবাদ। ঊনবিংশ শতাব্দীতে শব্দটি আত্মপ্রকাশ করে। তবে, এর ক্রমবিকাশ মূলত সমাজ, রাজনীতি ও দর্শনের হাত ধরে ঘটেছে। শব্দটি ল্যাটিন ‘Intellectualis’ এবং ‘Intellectus’ (যার অর্থ ‘বোধশক্তি’ বা ‘জ্ঞান’) থেকে এসেছে। চতুর্দশ শতকে এটি মূলত আধ্যাত্মিক বা মানসিক কোনো ধারণাকে বোঝাত। আধুনিক অর্থে, যারা প্রজ্ঞা ও মেধার চর্চা করেন, তাদের ক্ষেত্রে এ শব্দের ব্যবহার শুরু হয়। ঊনবিংশ শতাব্দীর ষাটের দশকে রাশিয়ায় প্রথম ‘Intelligentsia’ শব্দটির ব্যবহার শুরু হয়। তৎকালীন জারতন্ত্রের বিরুদ্ধে শিক্ষিত মধ্যবিত্ত সমাজ, সমাজ ও রাষ্ট্রে পরিবর্তনের ডাক দিয়েছিলেন। তাদের বোঝাতেই এ পরিভাষাটি তৈরি হয়েছিল। পরে ১৮৯৮ সালে ফ্রান্সের ‘ড্রেফাস অ্যাফেয়ার’ (Dreyfus affair)-এর সময় এমিল জোলা প্রমুখ লেখক ও বুদ্ধিজীবীরা অন্যায়ের প্রতিবাদে রাস্তায় নেমে ‘Intellectual’ শব্দটিকে একটি সামাজিক ও রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেন। পরবর্তীকালে মার্কসবাদী তাত্ত্বিক আন্তোনিও গ্রামশি (Antonio Gramsci) বুদ্ধিজীবীদের নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত করেন। তিনি বুদ্ধিজীবীদের দুভাগে ভাগ করেন—‘ঐতিহ্যবাহী বুদ্ধিজীবী’ (যাজক, দার্শনিক) এবং ‘জৈব বুদ্ধিজীবী’ (যারা সমাজ পরিবর্তনের রূপকার হিসেবে কাজ করেন)। বিংশ শতাব্দীতে সমাজবিজ্ঞানী এডওয়ার্ড সাঈদ প্রমুখ তাত্ত্বিকদের মতে, বুদ্ধিজীবী হলেন তিনি, যিনি স্বাধীনতা ও ন্যায়বিচারের পক্ষে কথা বলেন এবং সত্য প্রকাশে কখনো আপস করেন না। সাধারণত স্কুল-কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, গবেষক, সাংবাদিক-কলামিস্ট, সাহিত্যিক-শিল্পী, চিকিৎসক-প্রকৌশলী-আইনজীবী-প্রযুক্তিবিদরা বুদ্ধিজীবী হিসেবে গণ্য হন।
বাংলাদেশের ইতিহাসে বুদ্ধিজীবীরা একটি বিশেষ তাৎপর্য বহন করেন। ১৯৭১ সালে স্বাধীনতা যুদ্ধের শেষ মুহূর্তে (১৪ ডিসেম্বর) পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী ও তাদের এ দেশীয় দোসররা দেশের শ্রেষ্ঠ শিক্ষক, চিকিৎসক, সাংবাদিক ও সাহিত্যিকদের পরিকল্পিতভাবে হত্যা করে। যার মূল উদ্দেশ্য ছিল সদ্য স্বাধীন হতে যাওয়া দেশকে মেধাশূন্য করে দেওয়া। এ বিশেষ প্রেক্ষাপটে তারা বাংলাদেশের ‘শহীদ বুদ্ধিজীবী’ হিসেবে সর্বোচ্চ সম্মানের অধিকারী। বুদ্ধিজীবীদের ক্ষুদ্র একটি অংশ স্বাধীনতার বিপক্ষে অবস্থান নিয়ে সে সময়ে পাকিস্তান সরকারের পদলেহন করেছেন। সময়ের পরিক্রমায় তারা ইতিহাসের আস্তাকুঁড়ে নিক্ষিপ্ত হয়েছে। তারপরও জাতির যুগসন্ধিকালের প্রতিটি ঘটনায় অন্যদের মতো বুদ্ধিজীবীরাও বিভক্ত হয়ে পড়েন। নব্বই ও চব্বিশের অভ্যুত্থানেও বিষয়টি দৃশ্যমান হয়েছে। তবে, দুটির বাস্তবতা বিপরীত। নব্বইয়ে গুটিকতক বুদ্ধিজীবী স্বৈরাচারকে মদদ দিয়েছেন। আর, ফ্যাসিস্টের পক্ষে ছিলেন বিখ্যাত সব বুদ্ধিজীবী ও শিল্পী সমাজ। তাদের নির্লজ্জ দালালিতে পুরো বুদ্ধিজীবী সমাজ এখন প্রশ্নবিদ্ধ। হাসিনা রেজিমে এই সর্বনাশটি হয়েছে। ক্ষমতা টিকিয়ে রাখতে বুদ্ধিজীবী, খেলোয়াড় এবং শিল্পী সমাজকে রাতারাতি রাজনীতিবিদ বানিয়ে ফেলা হয়। নিজ নিজ ক্ষেত্রের জনপ্রিয়তাকে কাজে লাগিয়ে ভোটহীন নির্বাচনে জনপ্রতিনিধি হয়ে যান অনেকে। দলীয় জনপ্রতিনিধি ও বিশিষ্টজন আবার নিরপেক্ষ বুদ্ধিজীবীর সম্মানও দাবি করেন। ফলে, জনআস্থা হারিয়ে ফেলেন তারা। বুদ্ধিজীবী সম্প্রদায়কে সাধারণ মানুষ এখন সন্দেহের চোখে দেখে। তথ্যপ্রযুক্তির অবাধ অপব্যবহারে কেউ এখন আর নিরাপদ নয়। নিশ্চুপ থাকলেও সমালোচনার শিকার হচ্ছেন কেউ কেউ। ফ্যাসিস্ট আমলের দমন-পীড়নের প্রতিবাদে অশ্লীল ও ঘৃণাসূচক শব্দ জনপ্রিয়তা পায়। এ সুযোগে অযোগ্য-অদক্ষ মিছিলকারীও নিজেকে রাজনৈতিক বিশ্লেষক দাবি করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে। আরও ভয়ংকর ব্যাপার হলো, প্রতিপক্ষের জবাবে শিক্ষিত-অশিক্ষিত সবাই অশ্লীলতা আর ঘৃণা ছড়াচ্ছেন। এক্ষেত্রে আদর্শ বড় কথা নয়, ডলার অর্জনকেই গুরুত্ব দিচ্ছেন পরিচিত তথাকথিত বুদ্ধিজীবীরা। নান্দনিক বিতর্কের বিষয়টি এখন নারকীয় ঝগড়ায় রূপ নিয়েছে।
হাজার বছরের বাঙালি সংস্কৃতি, ধর্মীয় ও সামাজিক মূল্যবোধের পাশাপাশি অসাম্প্রদায়িক চেতনা নিয়েই পথ চলছে বাংলাদেশ। ক্ষুধা, দারিদ্র্য, নিত্য প্রাকৃতিক দুর্যোগের সঙ্গে লড়তে লড়তে মানুষই মানুষের সবচেয়ে আপন হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়ে আসছে অনাদিকাল থেকে। সেই সহজ-সরল সমাজব্যবস্থায় বিষবাষ্প ছড়াচ্ছেন দলীয় তথাকথিত বুদ্ধিজীবীরা। বুঝে না বুঝে তাদের লাখ লাখ অনুসারী সেই বাষ্প দিয়ে ইঞ্জিন চালিয়ে ঘৃণা ছড়াচ্ছে। সংজ্ঞা অনুযায়ী বুদ্ধিজীবীদের বাহাস হওয়ার কথা বুদ্ধিদীপ্ত। পারস্পরিক সম্মান ও শ্রদ্ধাবোধ রেখে যৌক্তিক বিতর্কে সমাজ তথা রাষ্ট্রকে এগিয়ে নেওয়ার দায়িত্ব তাদের। অথচ, পরিস্থিতি দল নিরপেক্ষ বুদ্ধিজীবীদের নির্বাক করে রেখেছে। দল বা গোষ্ঠীর স্বার্থে মূর্খের আস্ফালন বেড়ে যাচ্ছে। পরিস্থিতি এতটাই ভয়াবহ যে, প্রতিপক্ষের কেউ মারা গেলে ‘আলহামদুলিল্লাহ’ বলে। শুধু বলে না, রীতিমতো প্রচারণায় নামে। মৃত ব্যক্তির ভালো গুণগুলো বাড়িয়ে প্রচারে নামে অনুসারীরা। আর, প্রতিপক্ষ খুঁজে খুঁজে মন্দ দিকগুলো ছড়িয়ে দেয়। এতে করে মৃত ব্যক্তির সারা জীবনের অর্জন প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছে। এ সর্বনাশা খেলায় নাম লিখিয়েছে ধার্মিক থেকে নাস্তিক সব ভিউ ব্যবসায়ী। অনলাইন প্রচারণায় ধর্মাশ্রয়ী রাজনৈতিক দলগুলোকে এগিয়ে রেখেছে বিশ্লেষকরা। মুহূর্তে শত শত নামে-বেনামের অ্যাকাউন্ট থেকে কুৎসা রটায় তারা। অথচ, গীবতে সায় নেই ধর্মের। প্রগতিশীল দাবি করা ব্যক্তিরাও অকথ্য-অশ্লীল-অসভ্য ভাষা ব্যবহার করছে। বলা হচ্ছে, প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করার পাশাপাশি ভিউ শিকারও লক্ষ্য থাকে। তার মানে, দেশের মানুষ অসভ্যতার দিকে ঝুঁকছে? বিতর্কিত ও ঝগড়াটে কনটেন্ট পাবলিক খায় বেশি। দর্শকপ্রিয়তার নতুন মাপকাঠি আবিষ্কার হয়েছে নেট দুনিয়ায়। তাহলে আবহমানকাল ধরে প্রচারিত সহজ-সরল, শান্তিপ্রিয় বাংলাদেশি পরিচয় দ্রুত খসে পড়ছে। নাকি, এতদিন ‘এমন দেশটি পাবে নাকো কোথাও’ বলে কদর্যতাকে আড়াল করা হয়েছে?
সব আমলেই উপাচার্য, গভর্নর, বিভিন্ন বাহিনী বা প্রতিষ্ঠান প্রধান, এমডি, ডিজি নিয়োগে নিজেদের লোক খুঁজে থাকে সরকারগুলো। এতে করে সবসময় সফল হয় না তারা। কোনো কোনো ক্ষেত্রে ব্যর্থ হয়ে চরম মূল্য দিতে হয় তাদের। বুদ্ধিজীবী পরিচয়ের আড়ালে অনেক জ্ঞানপাপী দলীয় লেজুড়বৃত্তি করে পদগুলো হাতিয়ে নেয়। পরে নিজেসহ তার সরকারকে লেজেগোবড়ে করে পালিয়ে যায়। এ বিষয়ে যোগাযোগের চেয়ে যোগ্যতাকে জরুরি মনে করা দরকার। দলীয় কর্মীর চেয়ে সর্বজনীন মানুষ বেছে নেওয়া উচিত। দলীয় যোগ্য বা সৎ লোক নিয়োগ পেতেই পারে। তবে, তাকে সব মানুষের হয়ে উঠতে হবে। দেশে নাক উঁচু সম্প্রদায় রাজনীতিকে সব সময় তুচ্ছতাচ্ছিল্য করে। আবার, সুবিধা আদায়ে রাজনীতি এবং রাজনীতিবিদকে ব্যবহার করে। টাকার বিনিময়ে শ্রদ্ধা বিক্রির উদাহরণও কম নেই এই দেশে। তবে আশার কথা হলো, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান তার আচরণের মাধ্যমে প্রতিদিন পরিবর্তনের বার্তা দিচ্ছেন। সেটা কতটা কার্যকর হচ্ছে, তা দেখার জন্য হয়তো সরকারের ছয় মাস পূর্তির জন্য অপেক্ষা করতে হবে। পর্যবেক্ষকরাও কলমে শান দিয়ে অপেক্ষা করছে। রাজনীতির গুণগত পরিবর্তন না হলে পেশাজীবীদের নির্লজ্জ দালালির সংস্কৃতি দূর হবে না।
লেখক: হেড অব নিউজ, আরটিভি