

জাতীয় বাজেট কোনো সরকারের আয়-ব্যয়ের হিসাবমাত্র নয়। এটি একটি দেশের অর্থনৈতিক দর্শন, উন্নয়ন কৌশল এবং জনগণের প্রতি রাষ্ট্রের অঙ্গীকারের প্রতিফলন। ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটকে সরকার ‘অর্থনীতির গণতন্ত্রীকরণ’-এর বাজেট হিসেবে তুলে ধরেছে। অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর ভাষায়, অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের সুফল সমাজের সব শ্রেণি-পেশার মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়া, দরিদ্র জনগোষ্ঠীকে সহায়তা করা এবং অর্থনীতির মূলধারার বাইরে থাকা মানুষদের অন্তর্ভুক্ত করাই এ বাজেটের মূল লক্ষ্য। এ দৃষ্টিভঙ্গি নিঃসন্দেহে ইতিবাচক। তবে সাধারণ মানুষের কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হচ্ছে, এ বাজেট কি তাদের জীবনে স্বস্তি এনে দিতে পারবে?
বাংলাদেশের অর্থনীতির বর্তমান বাস্তবতায় জনগণের সবচেয়ে বড় উদ্বেগ দ্রব্যমূল্য। গত কয়েক বছরে খাদ্যপণ্য, জ্বালানি, পরিবহন, বাসা ভাড়া এবং চিকিৎসা ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। আয়ের তুলনায় ব্যয়ের চাপ বাড়ায় মধ্যবিত্ত ও নিম্ন আয়ের মানুষের জীবনযাত্রা কঠিন হয়ে উঠেছে। ফলে এবারের বাজেট নিয়ে মানুষের প্রধান প্রত্যাশা হলো এমন পদক্ষেপ নিতে হবে, যা বাজারকে স্থিতিশীল করবে এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যকে ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে রাখবে। অর্থনীতির গণতন্ত্রীকরণ তখনই অর্থবহ হবে, যখন এর সুফল বাজারে প্রতিফলিত হবে। কৃষক উৎপাদনের ন্যায্য মূল্য পাবেন, আবার ভোক্তাও সহনীয় দামে খাদ্যপণ্য কিনতে পারবেন। এ জন্য কৃষি উৎপাদন, সংরক্ষণ, পরিবহন ও বিপণন ব্যবস্থার দুর্বলতাগুলো দূর করা জরুরি। শুধু ভর্তুকি বা প্রণোদনা ঘোষণা করলেই হবে না, বাজারে সিন্ডিকেট, কৃত্রিম সংকট ও অযৌক্তিক মুনাফার বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। অর্থমন্ত্রী ব্যবসা-বাণিজ্যে নিয়ন্ত্রণ কমানোর কথা বলেছেন। বিনিয়োগ ও উদ্যোক্তা বিকাশের জন্য এটি প্রয়োজনীয় হতে পারে। তবে নিয়ন্ত্রণমুক্ত পরিবেশ যেন বাজারে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি না করে, সেদিকেও নজর রাখতে হবে। মুক্ত বাজারের পাশাপাশি কার্যকর তদারকি থাকতে হবে, যাতে কিছু গোষ্ঠী বাজারকে জিম্মি করতে না পারে। প্রতিযোগিতামূলক বাজারই ভোক্তার স্বার্থ রক্ষা করতে পারে। স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা ও সামাজিক নিরাপত্তা খাতে বরাদ্দ বৃদ্ধির বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশে স্বাস্থ্য ব্যয়ের বড় অংশ মানুষকে নিজের পকেট থেকে বহন করতে হয়। ফলে একটি অসুস্থতা অনেক পরিবারকে আর্থিক সংকটে ফেলে দেয়। ইউনিভার্সাল হেলথ কেয়ার ও প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবার ওপর জোর দেওয়ার ঘোষণা আশাব্যঞ্জক। তবে বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে দক্ষতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। বাজেটের আরেকটি ইতিবাচক দিক হলো ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা, হস্তশিল্পী, তাঁতি, কুমার, নাট্যকর্মী ও সংস্কৃতিকর্মীদের অর্থনীতির মূলধারায় অন্তর্ভুক্ত করার উদ্যোগ। দীর্ঘদিন ধরে তারা অর্থনৈতিক পরিকল্পনার বাইরে ছিলেন। তাদের জন্য সহজ ঋণ, বাজার সুবিধা এবং প্রযুক্তিগত সহায়তা নিশ্চিত করা গেলে কর্মসংস্থান বৃদ্ধি পাবে এবং স্থানীয় অর্থনীতি শক্তিশালী হবে। একটি সফল বাজেটের মানদণ্ড কেবল প্রবৃদ্ধির হার নয়। সাধারণ মানুষের জীবনে তার প্রভাবই প্রকৃত মূল্যায়নের ভিত্তি। বাজারে চাল, ডাল, তেল, সবজি, মাছ, মাংস এবং অন্যান্য নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম যদি স্থিতিশীল থাকে, কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়ে এবং মানুষের আয় ক্রয়ক্ষমতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হয়, তখনই জনগণ বাজেটের সুফল অনুভব করবে।
দেশের মানুষ আজ জাঁকজমকপূর্ণ প্রতিশ্রুতির চেয়ে বেশি প্রত্যাশা করে একটি স্বস্তির বাজেট। এমন বাজেট, যা বাজারে স্থিতিশীলতা আনবে, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করবে, উৎপাদন ও বিনিয়োগকে উৎসাহিত করবে এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় সহনীয় রাখবে। অর্থনীতির গণতন্ত্রীকরণের প্রকৃত অর্থও সেখানেই নিহিত। যখন উন্নয়নের সুফল সমাজের প্রতিটি স্তরে পৌঁছাবে এবং মানুষের দৈনন্দিন জীবনে স্বস্তি ফিরিয়ে আনবে, তখনই এ বাজেট তার উদ্দেশ্য পূরণ করতে সক্ষম হবে।