ড. মিহির কান্তি মজুমদার
প্রকাশ : ০৪ জুন ২০২৬, ১২:০০ এএম
আপডেট : ০৪ জুন ২০২৬, ০৫:৩৯ পিএম
প্রিন্ট সংস্করণ

জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় নীল অর্থনীতি

জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় নীল অর্থনীতি

মাথাপিছু ভূমির স্বল্পতা এবং জ্বালানি সীমাবদ্ধতা—এ দুটি সংকট আমরা উত্তরাধিকার সূত্রে পেয়েছি। অতিমাত্রার এ জনবহুল দেশে খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন এবং উন্নয়নের জন্য ভূমি ও জ্বালানি দুটিই অপরিহার্য ক্ষেত্র। আমাদের দেশীয় জ্বালানির প্রধান উৎস প্রাকৃতিক গ্যাস। দেশে এ পর্যন্ত ২৯টি গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কার হয়েছে। যেখানে গ্যাস মজুত রয়েছে ৪০ ট্রিলিয়ন ঘনফুট। এর মধ্যে ২৮ ট্রিলিয়ন ঘনফুট উত্তোলনযোগ্য। মজুতের তুলনায় চাহিদা অনেক বেশি। ঢাকাসহ কিছু এলাকার আবাসিক চাহিদা, শিল্প-কারখানা, বিদ্যুৎ উৎপাদন, রাসায়নিক সার বিশেষ করে ইউরিয়া ও এমোনিয়াম সালফেট উৎপাদনের জন্য আমরা এরই মধ্যে ২০ ট্রিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস উত্তোলন করে ফেলেছি। শিল্পায়ন, বিদ্যুৎ উৎপাদন ও রাসায়নিক সার উৎপাদনের জন্য প্রতি বছর আমাদের গ্যাসের চাহিদা বাড়ে। বর্তমান চাহিদা বার্ষিক এক ট্রিলিয়নের একটু বেশি। গ্যাসের ব্যবহারে নুন আনতে পান্তা ফুরায় অবস্থা। ইউরিয়া সার উৎপাদন করতে গেলে বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যাহত হয়। আবার বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়াতে গেলে ইউরিয়া উৎপাদনে লাগাম টানতে হয়। শিল্পায়ন সম্প্রসারণে নতুন গ্যাস সংযোগ এখন আকাশকুসুম কল্পনা। আর বাসাবাড়িতে নতুন গ্যাস সংযোগের প্রশ্নই আসে না। নতুন গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কার এবং উৎপাদন হ্রাস পাওয়া বা বন্ধ হওয়া গ্যাসক্ষেত্রের গভীরে গ্যাস উত্তোলনের জন্য অনুসন্ধান চালানো ছাড়া কোনো বিকল্প নেই। আমাদের প্রাকৃতিক গ্যাস খুবই উন্নতমানের। এর ৯৭ ভাগ থেকে ৯৮ ভাগই মিথেন। যার অর্থ আমাদের প্রাকৃতিক গ্যাসের উৎপাদনশীলতা বেশি।

তবে উৎপাদনশীলতা যতই বেশি হোক, বিদ্যমান মজুত ৮ ট্রিলিয়ন ঘনফুট থেকে আর কত বছর চলা যাবে? তিন থেকে পাঁচ বছরের বেশি নয়। অথচ আমাদের উৎপাদনক্ষম জনসংখ্যা প্রায় এখন সর্বোচ্চ পর্যায়ে। জনশক্তির ব্যবহার ও উন্নয়নের জন্য দরকার অতিদ্রুত শিল্পায়ন। এসব বিবেচনায় ২০১৮ সাল থেকে আমদানি শুরু হয়েছে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস। বৈদেশিক রিজার্ভে টান পড়ে জ্বালানি আমদানিতে। এ সংকটে আশার আলো এখন বাপেক্স। বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম এক্সপ্লোরেশন অ্যান্ড প্রোডাকশন লিমিটেড। ১৯৮৯ সালে প্রতিষ্ঠিত পেট্রোবাংলার এ প্রতিষ্ঠান কিন্তু এরই মধ্যে কারিগরি সক্ষমতায় উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি করেছে। ভূগর্ভস্থ খনিজ সম্পদ অনুসন্ধান, খনন দক্ষতা ও ব্যবস্থাপনায় বাপেক্স অনেক দূর এগিয়েছে। দ্বিমাত্রিক ও ত্রিমাত্রিক ভূতাত্ত্বিক জরিপ পরিচালনায় বাপেক্স এখন স্বাবলম্বী। বাপেক্সের গ্যাস কূপ আবিষ্কারের সফলতা বরং বিদেশি প্রতিষ্ঠানের চেয়ে ভালো। সাধারণত পাঁচটি থেকে ছয়টি কূপ খনন করলে গড়ে একটি গ্যাসক্ষেত্র শনাক্ত হয়। সেখানে বাপেক্স তিনটি কূপ খনন করে গড়ে একটিতে গ্যাস পেয়েছে। শাহবাজপুর, শ্রীকাইল, ভোলা উত্তর এবং ইলিশগড় গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কার বাপেক্সের কারিগরি দক্ষতার উৎকৃষ্ট প্রমাণ। বাপেক্স দেশের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ গ্যাসক্ষেত্র পরিচালনা ও বাণিজ্যিকভাবে গ্যাস উৎপাদন করছে বেশ সফলতার সঙ্গে।

দেশের পার্বত্য অঞ্চলসহ প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ অঞ্চল এখনো ভূতাত্ত্বিক জরিপের বাইরে। পাশাপাশি আছে বিশাল সমুদ্রাঞ্চল। ২০১২ সালে মিয়ানমার ও ২০১৪ সালে ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের সমুদ্রসীমার নিষ্পন্ন হয়। এ অর্জনের ফলে বাংলাদেশের সমুদ্রাঞ্চলের এলাকা বর্তমানে ১,১৮,৮১৩ বর্গকিলোমিটার। কাজেই দেশের ভূতাত্ত্বিক জরিপের বাইরে থাকা দুই-তৃতীয়াংশ এলাকা এবং বিশাল সমুদ্রাঞ্চলে ভূতাত্ত্বিক জরিপ পরিচালনার মাধ্যমে গ্যাসক্ষেত্রসহ খনিজ সম্পদ আবিষ্কার ও উত্তোলন এখন সময়ের দাবি। যদিও এত সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও বাপেক্সে প্রয়োজনীয় এবং পর্যাপ্ত বিনিয়োগ হয়নি। আর পর্যাপ্ত বিনিয়োগ হয়নি বলে স্থলভাগের গভীরে এবং সাগরের তলদেশে তেল-গ্যাস অনুসন্ধানের জন্য প্রয়োজনীয় রিগ সংগ্রহ ও প্রযুক্তিতে বাপেক্স এখনো অনেকটা পিছিয়ে। বিভিন্ন গবেষণায় উঠে এসেছে যে, তরলীকৃত গ্যাস আমদানির চেয়ে বাপেক্সে বিনিয়োগ ১৪ গুণ বেশি সাশ্রয়ী। বাপেক্সের সক্ষমতা বৃদ্ধি এখনো গ্যাস উন্নয়ন তহবিলের ওপর নির্ভরশীল। যেখানে প্রয়োজন অনুযায়ী পর্যাপ্ত অর্থ বরাদ্দ পাওয়া যায় না। দেশের জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় ব্লু-ইকোনমি অনন্য সম্ভাবনা।

বঙ্গোপসাগরের নীল অর্থনীতির ব্যবহারের কোনো আলোচনায় জার্মান জাহাজ ‘আরভি সোনে’ কর্তৃক পরিচালিত গবেষণার ফল নিয়ে কোনো সুপারিশ হয়েছে বলে শুনিনি। অথচ বঙ্গোপসাগরের নীল অর্থনীতির আলোচনায় ‘আরভি সোনে’ জাহাজের অনুসন্ধানের কথা বলতেই হয়। এ জাহাজ আশির দশকের শেষভাগ থেকে নব্বই দশকে বঙ্গোপসাগরে অনেক গুরুত্বপূর্ণ বৈজ্ঞানিক জরিপ পরিচালনা করে। বিশেষ করে নব্বইয়ের দশকে পরিচালিত এসও-৯৩ ও তাদের পরবর্তী মিশনগুলো ছিল খুবই গুরুত্বপূর্ণ। ‘আরভি সোনে’ জাহাজের মাধ্যমে পরিচালিত জার্মান বিজ্ঞানীদের গবেষণার মূল লক্ষ্য ছিল সমুদ্রতলে উচ্চ চাপে ও নিম্ন তাপমাত্রায় জমাটবদ্ধ গ্যাস হাইড্রেট নামে মিথেন গ্যাস শনাক্ত করা, হিমালয় থেকে নেমে আসা পলি সমুদ্রতলে সঞ্চিত হয়ে কোনো হাইড্রোকার্বন বা জ্বালানি উৎস তৈরি করে কি না এবং সমুদ্রতলে টেকটোনিক প্লেটের চলাচলে ভূমিকম্প বা সুনামির ঝুঁকি সৃষ্টি করে কি না, তা নিরূপণ করা। বাপেক্স ও বাংলাদেশের জিওলজিক্যাল সার্ভের প্রতিনিধি দল অভিজ্ঞতা সঞ্চয়ের জন্য ‘আরভি সোনে’ জাহাজের তিন বা চারটি ট্রিপে অংশগ্রহণ করে। তখন বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের সচিব মুহ. ফজলুর রহমান। মৌলিক ও প্রায়োগিক গবেষণায় সহযোগিতার জন্য তিনি মন্ত্রণালয়ে রিসার্চ তহবিল সৃষ্টি করেন। বাংলাদেশি বিজ্ঞানীদের উৎসাহ দিতে তিনি কক্সবাজারে ‘আরভি সোনে’ জাহাজে গিয়েছিলেন। হলোসিন পিরিয়ডের সেডিমেন্টেশন নিয়ে গবেষণার জন্য জিওলজিক্যাল সার্ভের গবেষণা দলকে ওই গবেষণা তহবিল থেকে অর্থায়নও করেন। সোনে জাহাজ থেকে আনা গবেষণা ডাটা পর্যাপ্ত তথ্যের অভাবে ডিকোড করা যায়নি। তবে জানা যায়, ‘আরভি সোনে’ জাহাজের গবেষণা তথ্যে উঠে এসেছে, বঙ্গোপসাগরের তলদেশে বিপুল গ্যাস হাইড্রেট সঞ্চিত আছে।

সমুদ্রতলে নিম্ন তাপমাত্রায় ও উচ্চ চাপে সৃষ্ট মিথেন গ্যাস হাইড্রেটকে ফায়ার আইস বলা হয়। এ গ্যাস হাইড্রেট আহরণ করার প্রযুক্তি সীমিত কিছু দেশের আছে। যাইহোক, ‘আরভি সোনে’ জাহাজের গবেষণায় যেহেতু বঙ্গোপসাগরে মিথেন গ্যাস হাইড্রেটের বিশাল ভান্ডার শনাক্ত হয়েছে এবং কৃষ্ণা-গোদাবরী অববাহিকায় ভারত মিথেন হাইড্রেট উত্তোলনের প্রস্তুতি করেছে। আমাদের ‘আরভি সোনে’ জাহাজের সার্ভে রিপোর্ট সংগ্রহ করতে হবে। স্থল ভাগ ও সমুদ্রের গভীরে অনুসন্ধান চালানোর জন্য প্রয়োজনীয় রিগ ও প্রযুক্তির সমৃদ্ধি ঘটাতে হবে বাপেক্সে। জাপান ও চীনের সহযোগিতায় সমুদ্রতল থেকে গ্যাস হাইড্রেট আহরণের প্রস্তুতি নিতে হবে। গ্যাস উত্তোলন কমে যাওয়া বিদ্যমান গ্যাসক্ষেত্রের গভীরে অনুসন্ধানের জন্য বাপেক্সকে দায়িত্ব দিতে হবে। জরিপের বাইরে থাকা দেশের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ অঞ্চল ও গভীর সমুদ্রসীমায় নতুন নতুন ব্লকে ভাগ করে অনুসন্ধান চালাতে হবে। প্রয়োজনে বাপেক্সকে বিপিসির মতো স্বতন্ত্র শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান সৃষ্টি করে আর্থিক ও প্রযুক্তি সক্ষমতা বৃদ্ধি করতে হবে। আমাদের উত্তোলনযোগ্য গ্যাস রিজার্ভ অনেক কমে গেছে। এখন সভা-সম্মেলন আর সুপারিশ করার সময় নেই। আশা করি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ গুরুত্বের সঙ্গে প্রয়োজনীয় জরুরি ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।

লেখক: সাবেক সচিব

কালবেলা অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন
  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

প্রেমিকের সঙ্গে বেড়াতে গিয়ে নারীর রহস্যজনক মৃত্যু

খবরের কাগজে গরম খাবার খান, এতে শরীরে কী কী ঘটে জানুন

‘গোলাপ’ নিয়ে পরীমণি-নীরবের ইতিবাচক আলোচনা 

নজর কাড়ছে কসাই রিপনের পশুর মাথার শোপিস

‘ভুয়া’ চিকিৎসকের পরিচয় প্রকাশ করে প্রতিবেদন, প্রতিবেদকের বিরুদ্ধে মামলা

ভারতে প্রশ্নফাঁস ঠেকাতে বিশেষ দায়িত্ব পেল বিমানবাহিনী

সাফজয়ী ফুটবলার ঋতুপর্ণা চাকমাকে প্রধানমন্ত্রীর উপহার

চলচ্চিত্রের গল্পে নারী সুরক্ষা ও দেশীয় সংস্কৃতিকে গুরুত্ব দেওয়ার আহ্বান

জাপানের পর এবার নেপালেও নিষিদ্ধ ভারতের আম

গাড়ি চালিয়ে পার্থকে নিয়ে ‘সংসদের পথে’ প্রধানমন্ত্রী

১০

দিনে কয়টি আম খাওয়া উচিত? সুস্থ থাকতে জানুন সঠিক পরিমাণ

১১

বাজেটে বাড়ছে না সিগারেটের দাম

১২

হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসা নারীকে ধর্ষণ, গ্রেপ্তার ৩

১৩

প্রথমবার ১২ পারমাণবিক ওয়ারহেড মোতায়েন করল ভারত

১৪

ছুরিকাঘাতে লাদেন নিহত

১৫

বাজেটে পে-স্কেল নিয়ে বড় সুখবর

১৬

হামের উপসর্গে আরও ৩ শিশুর মৃত্যু

১৭

পূর্ণিমাকে নিয়ে শাবনূর বললেন ‘আমাদের দা-কুড়াল সম্পর্ক না’

১৮

দেশে নিবন্ধিত সিমের পরিমাণ জনসংখ্যার দ্বিগুণ

১৯

কুয়েতে গৃহকর্মী নিয়োগ : ১০ দেশের তালিকা প্রকাশ 

২০
X