

২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য প্রায় ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার জাতীয় বাজেট ঘোষণা করতে যাচ্ছে সরকার। আগামী ১১ জুন উপস্থাপিত হতে যাওয়া এ বাজেট হবে নবনির্বাচিত সরকারের প্রথম বাজেট এবং সংখ্যার বিচারে বাংলাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় বাজেট। স্বাভাবিকভাবেই বাজেট ঘোষণার আগেই এটি নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গন, ব্যবসায়ী মহল, অর্থনীতিবিদ এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে আলোচনা শুরু হয়েছে।
তবে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন থেকেই যায়, কেবল টাকার অঙ্কে বড় হলেই কি একটি বাজেটকে বড় বলা যায়?
বাংলাদেশে গত এক দশকের বেশি সময় ধরে জাতীয় বাজেট ঘোষণার পর একটি পরিচিত দৃশ্য দেখা যায়। সংবাদমাধ্যমের শিরোনামে প্রায়ই উঠে আসে ‘রেকর্ড বাজেট’, ‘বৃহত্তম বাজেট’ কিংবা ‘ঋণনির্ভর বিশাল বাজেট’। কিন্তু অর্থনীতিবিদদের মতে, বাজেটের প্রকৃত গুরুত্ব নির্ধারিত হয় শুধু মোট টাকার অঙ্ক দিয়ে নয়; বরং একটি দেশের অর্থনীতির আকার, রাজস্ব সক্ষমতা, ব্যয়ের গুণগত মান এবং বাস্তবায়ন দক্ষতার মাধ্যমে।
বাজেটের আকার বনাম অর্থনীতির আকার: প্রথম দর্শনে ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকা বিশাল অঙ্ক বলে মনে হতে পারে। কিন্তু অর্থনীতির একটি মৌলিক সূচক হলো মোট দেশজ উৎপাদন (জিডিপি)। একটি দেশ এক বছরে যত পণ্য ও সেবা উৎপাদন করে তার মোট মূল্যই জিডিপি। বাজেটকে যদি জিডিপির সঙ্গে তুলনা করা হয়, তাহলে বাংলাদেশের অবস্থান ভিন্ন চিত্র তুলে ধরে।
আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে বাংলাদেশের সরকারি ব্যয় ছিল জিডিপির মাত্র ১২ দশমিক ০৩ শতাংশ। অর্থাৎ দেশের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের তুলনায় সরকারের ব্যয়ের পরিমাণ খুবই সীমিত। একই সময়ে ভারতের সরকারি ব্যয় ছিল জিডিপির ২৮ দশমিক ৩৮ শতাংশ, পাকিস্তানের ১৯ দশমিক ৪৭ শতাংশ এবং শ্রীলঙ্কার ১৯ দশমিক ৩২ শতাংশ। এমনকি ভুটানের সরকারি ব্যয়ও ছিল জিডিপির ২৭ দশমিক ১৩ শতাংশ। কম্বোডিয়া, ইন্দোনেশিয়া কিংবা হংকংয়ের মতো অর্থনীতিতেও সরকারি ব্যয়ের হার বাংলাদেশের চেয়ে উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি। জিডিপির আকারের সঙ্গে তুলনা করলে বাংলাদেশ ভুটানের চেয়েও ছোট বাজেট করছে। এ তুলনা থেকে বোঝা যায়, কেবল অঙ্কের বিচারে বাংলাদেশের বাজেট বড় হলেও অর্থনীতির আকারের তুলনায় এটি এখনো বেশ ছোট। অনেক অর্থনীতিবিদ এ অবস্থাকে তুলনা করেন দ্রুত সম্প্রসারিত একটি শহরের সঙ্গে, যেখানে জনসংখ্যা বাড়ছে, চাহিদা বাড়ছে, কিন্তু সেই তুলনায় পানির ট্যাংক বা বিদ্যুৎ সরবরাহের সক্ষমতা বাড়ছে না।
কেন সরকারি ব্যয়ের আকার গুরুত্বপূর্ণ?
সরকারি ব্যয় কেবল সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন দেওয়ার জন্য নয়। স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা, কৃষি, সামাজিক নিরাপত্তা, অবকাঠামো উন্নয়ন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষা এবং দারিদ্র্য বিমোচন—সবকিছুই মূলত সরকারি ব্যয়ের ওপর নির্ভরশীল।
বিশ্বের বিভিন্ন দেশের অভিজ্ঞতা বলছে, স্বাস্থ্য ও শিক্ষায় অধিক বিনিয়োগ দীর্ঘ মেয়াদে মানবসম্পদ উন্নয়ন ঘটায়। দক্ষ ও সুস্থ জনগোষ্ঠী অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে ত্বরান্বিত করে। একইভাবে অবকাঠামো উন্নয়নে সরকারি ব্যয় বেসরকারি বিনিয়োগ আকৃষ্ট করে এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টি করে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে অবকাঠামো উন্নয়ন, বিদ্যুৎ সরবরাহ, পরিবহন ব্যবস্থা, নগর ব্যবস্থাপনা এবং জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলার জন্য বিপুল বিনিয়োগ প্রয়োজন। কিন্তু সীমিত বাজেটের কারণে এসব খাতে কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় ব্যয় করা সম্ভব হয় না।
রাজস্ব আহরণের দুর্বলতা
বাংলাদেশের ছোট বাজেটের অন্যতম প্রধান কারণ হলো দুর্বল রাজস্ব আহরণ ব্যবস্থা। জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) দীর্ঘদিন ধরেই লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী রাজস্ব আদায়ে ব্যর্থ হচ্ছে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে এনবিআরের রাজস্ব সংগ্রহ ছিল ৩ লাখ ৭০ হাজার ৮৭৪ কোটি টাকা, যা সংশোধিত লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে প্রায় ৯২ হাজার ৬২৬ কোটি টাকা কম। চলতি অর্থবছরও শেষ হচ্ছে লক্ষ্যমাত্রা থেকে বহু দূরে গিয়ে। তাই আগামী অর্থবছরের জন্য সরকার যখন ৭ লাখ কোটি টাকার রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা ঠিক করে তখন মানুষ প্রমাদ গুনে। নিম্ন কর আদায়ের কারণে কর-জিডিপি অনুপাত বর্তমানে প্রায় ৬ দশমিক ৮ শতাংশে নেমে এসেছে, যা বিশ্বের সর্বনিম্নগুলোর মধ্যে একটি। অনেক উন্নয়নশীল দেশে এ হার ১৫ থেকে ২০ শতাংশের মধ্যে রয়েছে। অর্থনীতিবিদদের মতে, এর পেছনে কয়েকটি কারণ রয়েছে—
• কর প্রশাসনের দুর্বলতা
• কর ফাঁকি ও কর এড়ানোর প্রবণতা
• অপ্রাতিষ্ঠানিক অর্থনীতির বড় আকার
• করদাতার সীমিত সংখ্যা
• নীতিগত ও প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা
• সুশাসনের ঘাটতি
ফলে সরকার প্রয়োজনীয় রাজস্ব সংগ্রহ করতে না পেরে ঋণ ও বৈদেশিক সহায়তার ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে।
দক্ষতার অভাব: বাংলাদেশের আরেকটি বড় সমস্যা হলো বাজেট বাস্তবায়ন। প্রতি বছরই দেখা যায়, উন্নয়ন প্রকল্পের জন্য বরাদ্দ দেওয়া অর্থের বড় অংশ সময়মতো ব্যয় করা যায় না। বাস্তবায়ন, পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের (আইএমইডি) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম ১০ মাসে সংশোধিত এডিপি বরাদ্দের মাত্র ৪১ দশমিক ৪১ শতাংশ ব্যয় করা হয়েছে। অর্থাৎ, অর্থ বরাদ্দ থাকলেও প্রকল্প বাস্তবায়নের গতি সন্তোষজনক নয়।
প্রকল্প বাস্তবায়নে সাধারণত যেসব সমস্যা দেখা যায় সেগুলোর মধ্যে রয়েছে—
• জমি অধিগ্রহণে বিলম্ব
• দরপত্র ও ক্রয় প্রক্রিয়ার জটিলতা
• প্রশাসনিক ধীরগতি
• প্রকল্প ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা
• ব্যয় বৃদ্ধি ও সময় বৃদ্ধি
• দুর্নীতি ও অনিয়ম
এর ফলে প্রকল্পের ব্যয় বাড়ে, কিন্তু জনগণ কাঙ্ক্ষিত সুবিধা সময়মতো পায় না।
বৈদেশিক সহায়তার অর্থও পুরোপুরি ব্যবহার হয় না
বাংলাদেশ বিভিন্ন উন্নয়ন সহযোগী সংস্থা ও দাতা দেশের কাছ থেকে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ ঋণ ও অনুদান পাওয়ার সুযোগ পায়। কিন্তু বাস্তবতা হলো, অনেক বিদেশি অর্থায়নপ্রাপ্ত প্রকল্পও নির্ধারিত সময়ে বাস্তবায়িত হয় না। ফলে একদিকে উন্নয়ন বিলম্বিত হয়, অন্যদিকে বৈদেশিক অর্থের ব্যবহার দক্ষভাবে করা যায় না। অনেক ক্ষেত্রে প্রতিশ্রুত অর্থ অব্যবহৃত থেকে যায় বা প্রকল্পের মেয়াদ বাড়াতে হয়।
বড় বাজেট মানেই বড় উন্নয়ন নয়: বাজেটের আকার গুরুত্বপূর্ণ হলেও সেটিই সবকিছু নয়। একটি ছোট কিন্তু দক্ষভাবে বাস্তবায়িত বাজেট অনেক সময় একটি বড়; কিন্তু অকার্যকর বাজেটের চেয়ে বেশি ফলপ্রসূ হতে পারে। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, যদি স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ বাড়ানো হয়, কিন্তু হাসপাতালগুলোয় চিকিৎসক, ওষুধ বা যন্ত্রপাতির সংকট থেকেই যায়, তাহলে সে অতিরিক্ত বরাদ্দ কাঙ্ক্ষিত সুফল দেবে না। একইভাবে অবকাঠামো প্রকল্পে অর্থ বরাদ্দ থাকলেও যদি প্রকল্প বছরের পর বছর ঝুলে থাকে, তাহলে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে তার প্রত্যাশিত অবদান আসবে না।
সামনে কী করা প্রয়োজন: বাংলাদেশকে টেকসই উন্নয়নের পথে এগিয়ে নিতে হলে শুধু বাজেটের অঙ্ক বাড়ালেই হবে না। প্রয়োজন রাজস্ব সংগ্রহ বৃদ্ধি, কর ব্যবস্থার সংস্কার, ব্যয়ের দক্ষতা বৃদ্ধি এবং উন্নয়ন প্রকল্পের বাস্তবায়ন সক্ষমতা শক্তিশালী করা। করজাল সম্প্রসারণ, ডিজিটাল কর প্রশাসন, সুশাসন প্রতিষ্ঠা, দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণ এবং প্রকল্প ব্যবস্থাপনার আধুনিকীকরণ ছাড়া বাজেটের আকার বড় হলেও কাঙ্ক্ষিত উন্নয়ন অর্জন কঠিন হবে।
৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার বাজেট নিঃসন্দেহে সংখ্যার বিচারে বাংলাদেশের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় বাজেট। কিন্তু অর্থনীতির আকারের তুলনায় এটি এখনো দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম ছোট বাজেট। তাই প্রকৃত প্রশ্ন বাজেট কত বড়, সেটি নয়; বরং সরকার কত দক্ষতার সঙ্গে রাজস্ব সংগ্রহ করতে পারে, কত কার্যকরভাবে অর্থ ব্যয় করতে পারে এবং কত দ্রুত উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে পারে। কারণ উন্নয়নের প্রকৃত পরিমাপ বাজেটের অঙ্কে নয়, বরং সেই অর্থ মানুষের জীবনমান, কর্মসংস্থান, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক কল্যাণে কতটা ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে পারে—সেখানেই নিহিত।
লেখক: জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক ও রাজনীতি বিশ্লেষক