

দূরদর্শী রাষ্ট্রনায়ক আছেন, উচ্চ আদর্শে বিশ্বাসী আলোচক আছেন, বাস্তববাদী মধ্যস্থতাকারী ও পেশাদার কূটনীতিকও আছেন। আবার এমন লোকও আছেন, যারা না বুঝেই সবকিছুতে হস্তক্ষেপ করেন এবং পরিস্থিতি আরও জটিল করে তোলেন। যখন একের পর এক যুদ্ধবিরতি ভেঙে পড়ছে, অসংখ্য বেসামরিক মানুষ নিহত হচ্ছে বা ঘরবাড়ি ছেড়ে পালাতে বাধ্য হচ্ছে, আর ডোনাল্ড ট্রাম্প যে যুদ্ধগুলো শুরু করেছেন, উসকে দিয়েছেন কিংবা শেষ করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, সেগুলো নিয়ন্ত্রণহীনভাবে চলতেই আছে, তখন তিনি কোন শ্রেণির মানুষ, তা নিয়ে খুব একটা সন্দেহ থাকে না। বেসবলের ভাষায় বলতে গেলে, ইউক্রেন, ইরান-লেবানন এবং ইসরায়েল-ফিলিস্তিন প্রশ্নে ট্রাম্পের ফল হলো ‘শূন্যে তিন’। তিনি দাবি করেছিলেন, একমাত্র তিনিই সমঝোতা করাতে পারবেন এবং শান্তি প্রতিষ্ঠা করতে পারবেন। কিন্তু বাস্তবে তিনি কোনোটিই করতে পারেননি। বরং তার প্রচেষ্টা বহু ক্ষেত্রে পরিস্থিতিকে আরও খারাপ করেছে।
ঊনবিংশ শতাব্দীর কূটনীতির যে গৌরবময় যুগ ছিল, যখন অস্ট্রিয়ার রাজনীতিক মেটারনিখ ইউরোপের শক্তিগুলোর মধ্যে ভারসাম্য রক্ষার নীতি অনুসরণ করতেন কিংবা ব্রিটিশ নেতা বেঞ্জামিন ডিজরেইলি বলকান অঞ্চলে ‘সম্মানজনক শান্তি’ প্রতিষ্ঠার কথা বলতেন, সেই যুগ এখন অতীত। তবে খুব বেশিদিন আগের কথা নয়, যখন জাতিসংঘের মহাসচিব কফি আনান, ফিনল্যান্ডের কূটনীতিক মার্তি আহতিসারি কিংবা মার্কিন সিনেটর জর্জ মিচেলের মতো নোবেলজয়ী শান্তিদূতরা বিশ্বের বিভিন্ন জটিল সংঘাত নিরসনে সক্রিয় ভূমিকা পালন করতেন। উত্তর আয়ারল্যান্ডের গুড ফ্রাইডে চুক্তির অন্যতম রূপকার ছিলেন জর্জ মিচেল। আজ যখন তাদের মতো নেতৃত্বের প্রয়োজন, তখন ডেসমন্ড টুটু, আন্দ্রেই সাখারভ কিংবা ইয়িৎসহাক রবিনের উত্তরসূরিরা কোথায়? বর্তমান সময়ে যুদ্ধবিরতি ব্যর্থ হওয়া যেন নিয়মিত ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
লেবাননের সর্বশেষ যুদ্ধবিরতি প্রচেষ্টা এ সপ্তাহেই ব্যর্থ হয়েছে। ইরানের যুদ্ধবিরতিও প্রায় প্রতিদিনই লঙ্ঘিত হচ্ছে। সুদানে তো কোনো যুদ্ধবিরতিই নেই। প্রশ্ন হলো, কেন এখন তথাকথিত ‘অন্তহীন যুদ্ধ’ বন্ধ করা এত কঠিন হয়ে পড়েছে? বিশ্বজুড়ে সংঘাতের মাত্রা যখন রেকর্ড উচ্চতায় পৌঁছেছে, তখন সম্মানিত, নিরপেক্ষ মধ্যস্থতাকারী এবং রাজনৈতিক ঝুঁকি নিতে সক্ষম সাহসী নেতাদের অভাব এর অন্যতম কারণ। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, বসনিয়া যুদ্ধের অবসানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখা মার্কিন কূটনীতিক রিচার্ড হলব্রুকের দক্ষতার সঙ্গে ট্রাম্পের অনভিজ্ঞ দূত স্টিভ উইটকফ ও জ্যারেড কুশনারের তুলনা করলে তা অনেকটা আর্সেনাল ফুটবল ক্লাবের সঙ্গে কোনো পার্কে খেলতে নামা অপেশাদার দলের তুলনার মতো।
বাস্তবতা হলো, কূটনীতির ক্ষেত্রে ট্রাম্পের রেকর্ড অত্যন্ত হতাশাজনক। তিনি প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, ইউক্রেন যুদ্ধ এক দিনের মধ্যেই শেষ করবেন। অথচ যুদ্ধ এখন পঞ্চম বছরে গড়িয়েছে। তিনি প্রকাশ্যেই রাশিয়ার পক্ষ নিয়েছিলেন। ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কিকে বলেছিলেন, তার হাতে কোনো শক্তিশালী অবস্থান নেই। একই সঙ্গে অস্ত্র সরবরাহও কমিয়ে দিয়েছিলেন। কিন্তু ট্রাম্প নিজের ক্ষমতাকে অতিরিক্ত মূল্যায়ন করেছিলেন। একই সঙ্গে তিনি রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের প্রতারণার প্রবণতা এবং ইউক্রেনের প্রতিরোধক্ষমতাকে অবমূল্যায়ন করেছিলেন। মস্কোতে অনুষ্ঠিত আলোচনায় ক্রেমলিনের কর্মকর্তারা সহজেই উইটকফ ও কুশনারকে কৌশলে পরাস্ত করেছেন। লজ্জার বিষয় হলো, এই দুই দূত এখনো কিয়েভ সফর করার প্রয়োজনও মনে করেননি। ট্রাম্প নিজে রাজনৈতিকভাবে বিব্রত হওয়ার পর এ বিষয়েও আগ্রহ হারিয়ে ফেলেছেন। অন্যদিকে জেলেনস্কি এখন মনে করছেন, পরিস্থিতি ধীরে ধীরে তার পক্ষে যাচ্ছে। তাই তিনি নতুন করে যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব দিয়েছেন।
তবে অতীতের অভিজ্ঞতা যদি কোনো ইঙ্গিত দেয়, তাহলে বলা যায়, পুতিন সম্ভবত সেই প্রস্তাবও প্রত্যাখ্যান করবেন। ফেব্রুয়ারিতে আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন করে ইরানের ওপর হামলা চালানোর পর ট্রাম্প এপ্রিল মাসে যুদ্ধবিরতি ঘোষণা করেন। কিন্তু তার ঘোষিত প্রধান লক্ষ্যগুলোর একটিও অর্জিত হয়নি। একই সময়ে হরমুজ প্রণালিও বেশিরভাগ জাহাজ চলাচলের জন্য কার্যত বন্ধ ছিল। যুদ্ধবিরতি প্রায় প্রতিদিনই লঙ্ঘিত হচ্ছে। অজ্ঞাত মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে চলা অনাগ্রহী শান্তি আলোচনা কোনো ফল দিচ্ছে না। এর প্রভাব পড়ছে বৈশ্বিক অর্থনীতিতেও। এ ক্ষেত্রে ট্রাম্প পরিস্থিতির জটিলতাকে অবমূল্যায়ন করেছিলেন। তিনি অতিরিক্তভাবে বিশ্বাস করেছিলেন যে সামরিক শক্তি দিয়ে রাজনৈতিক বাস্তবতা বদলে ফেলা সম্ভব। নিজের ভুল সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করেছিলেন, ইউরোপীয় মিত্রদের গুরুত্ব কমিয়ে দেখেছিলেন এবং দ্রুত ও সহজ একটি বিজয় অর্জনের চেষ্টা করেছিলেন। ফলে এখন তাকে দীর্ঘস্থায়ী সংঘাত, বিদ্রোহী কংগ্রেস এবং ক্ষুব্ধ জনমতের মুখোমুখি হতে হচ্ছে।
এদিকে গাজায় গত অক্টোবরের যুদ্ধবিরতিকে ট্রাম্প একসময় যুগান্তকারী সাফল্য হিসেবে তুলে ধরেছিলেন। তখন কয়েকজন ইসরায়েলি জিম্মিও মুক্তি পেয়েছিলেন। কিন্তু আজ সেই সাফল্যের দাবি অনেকটাই ফাঁপা শোনায়। হামাসকে নিরস্ত্র করার লক্ষ্য কেন্দ্র করে তৈরি তার বিশ দফা পরিকল্পনা খুব দ্রুতই ভেস্তে যায়। তার প্রস্তাবিত ‘শান্তি বোর্ড’ এবং গাজা পুনর্গঠনের জাঁকজমকপূর্ণ পরিকল্পনাগুলোরও তেমন বিশ্বাসযোগ্যতা নেই।
বাস্তবতা হলো, ফিলিস্তিনিদের দুর্ভোগ এখনো অব্যাহত রয়েছে এবং ইসরায়েলি সামরিক দখল আরও বিস্তৃত হচ্ছে। এখন ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ সহযোগী, ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু, দক্ষিণ লেবাননে প্রায় একই কৌশল প্রয়োগ করছেন, যা তিনি গাজায় করেছিলেন। এর ফলে জনশূন্য ও ধ্বংসপ্রাপ্ত একটি এলাকা তৈরি হচ্ছে। একই সঙ্গে এটি যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সম্ভাব্য সমঝোতার পথও বাধাগ্রস্ত করছে। বর্তমান বিশ্বব্যবস্থায় কোনো সর্বজনস্বীকৃত নিয়মকানুন নেই। বড় শক্তিগুলো এবং বিভিন্ন গোষ্ঠী আন্তর্জাতিক আইন ও আন্তর্জাতিক আদালতকে প্রায়ই অবজ্ঞা করে। এমনকি শান্তির অর্থও এখন আপেক্ষিক হয়ে গেছে। যুক্তরাষ্ট্রের একজন যুদ্ধবাজ প্রেসিডেন্ট যখন একাধিক দেশে বোমা হামলা চালিয়েও নিজেকে শান্তির পুরস্কারের যোগ্য বলে দাবি করতে পারেন, তখন জর্জ অরওয়েলের নাইনটিন এইটি-ফোর উপন্যাসের দ্বৈত ভাষার কথাই মনে পড়ে। যুদ্ধবিরতি নিয়ে অন্তহীন ও নিষ্ফল বিতর্ক প্রায়ই সাধারণ মানুষের ওপর যুদ্ধের ভয়াবহ প্রভাবকে আড়াল করে দেয়। সহিংসতা বন্ধ করার যে গভীর মানবিক কারণ রয়েছে, সেগুলোকেও পেছনে ঠেলে দেয়। ইরান যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে দেশটিতে অন্তত ৩ হাজার ৪৬৮ জনের মৃত্যু হয়েছে বলে জানা গেছে। আহত হয়েছেন ২৬ হাজার ৫০০ জন। বাস্তুচ্যুত হয়েছেন লাখো মানুষ। এ পরিস্থিতিতে অনেক গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাও জনদৃষ্টির আড়ালে চলে গেছে। উদাহরণ হিসেবে ২৮ ফেব্রুয়ারি মিনাবের একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে বোমা হামলার কথা বলা যায়। অভিযোগ রয়েছে, ওই হামলায় যুক্তরাষ্ট্রের বাহিনীর আঘাতে শতাধিক শিশু নিহত হয়েছিল। কিন্তু এখনো সে ঘটনার পূর্ণ হিসাব পাওয়া যায়নি। যদি আবার পূর্ণমাত্রার যুদ্ধ শুরু হয়, তাহলে আরও নৃশংসতা ঘটবে, আরও নিরপরাধ মানুষ কষ্ট ভোগ করবে। সমগ্র মধ্যপ্রাচ্যজুড়েই বেসামরিক হতাহতের সংখ্যা বাড়ছে। লেবাননে আগের যুদ্ধবিরতি ব্যর্থ হওয়ার পরও হাজার হাজার মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন। জাতিসংঘের শিশু তহবিল ইউনিসেফ মে মাসের শেষ সপ্তাহের একটি চিত্র তুলে ধরে জানিয়েছে, ওই এক সপ্তাহেই ৭৭ জন শিশু নিহত বা আহত হয়েছে। এসব মর্মান্তিক ঘটনা গাজা যুদ্ধের সবচেয়ে ভয়াবহ সময়ে শিশু ও নবজাতকদের ব্যাপক মৃত্যুর স্মৃতি ফিরিয়ে আনে। এই ৭৭টি শিশু আমাদের মনে করিয়ে দেয়, যুদ্ধবিরতি নিয়ে আলোচনা কোনো আত্মপ্রচারমূলক রাজনৈতিক প্রদর্শনী নয়। এটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিনোদনের উপাদানও নয়, যেমনটি ট্রাম্পের দৈনিক মন্তব্য শুনে কখনো কখনো মনে হতে পারে। এগুলো জীবন ও মৃত্যুর প্রশ্ন। শেষ পর্যন্ত এ যুদ্ধগুলোর কোনোটিই সামরিক শক্তি দিয়ে শেষ করা সম্ভব হবে না। প্রশ্নটি কার বোমা বড় বা কে বিজয়ের ঘোষণা দিতে পারবে, তা নয়, মি. ট্রাম্প। প্রশ্নটি মানুষের জীবন নিয়ে। ইতিহাসের অধিকাংশ সময়ের মতো আজও সত্য হলো, কূটনীতিই শান্তির পথ খুলে দেয়। তবে সেই কূটনীতি হতে হবে পেশাদার, সক্রিয়, দক্ষ এবং দীর্ঘ অভিজ্ঞতায় সমৃদ্ধ।
লেখক: গার্ডিয়ানের আন্তর্জাতিক বিষয়ক বিশ্লেষক। গার্ডিয়ানে প্রকাশিত নিবন্ধটি ভাষান্তর করেছেন তহমিনা মিলি