

বাংলাদেশে উচ্চশিক্ষার প্রসার গত দুই দশকে অভূতপূর্বভাবে বেড়েছে। স্বাধীনতার পর যেখানে হাতে গোনা কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয় ছিল, সেখানে বর্তমানে সরকারি ও বেসরকারি মিলিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে প্রায় ১৭৫টিতে। নতুন নতুন বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনাও চলমান। সংখ্যার এ বিস্তার নিঃসন্দেহে শিক্ষার সুযোগ বাড়িয়েছে, কিন্তু প্রশ্ন হলো, এ বিস্তারের সঙ্গে কি শিক্ষার মানও বেড়েছে? বাস্তবতা বলছে, বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা বাড়লেও মানসম্মত শিক্ষা, গবেষণা, দক্ষ মানবসম্পদ ও কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে কাঙ্ক্ষিত অগ্রগতি দেখা যাচ্ছে না। বরং উচ্চশিক্ষিত বেকারের সংখ্যা বাড়ছে, তরুণদের মাঝে হতাশা গভীর হচ্ছে এবং শিক্ষা ও কর্মবাজারের মধ্যে এক ভয়াবহ অসামঞ্জস্য তৈরি হয়েছে।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো ও বিভিন্ন শ্রমশক্তি জরিপের তথ্য অনুযায়ী, দেশে শিক্ষিত বেকারের হার সাধারণ বেকারত্বের তুলনায় বেশি। বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর শেষ করেও লাখো তরুণ চাকরির জন্য বছরের পর বছর ঘুরছেন। অনেকেই আবার নিজের শিক্ষাগত যোগ্যতার সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ কাজ করতে বাধ্য হচ্ছেন। অন্যদিকে বিভিন্ন শিল্পপ্রতিষ্ঠান, আইটি খাত কিংবা কারিগরি সেক্টর বারবার অভিযোগ করছে—বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বের হওয়া শিক্ষার্থীদের বড় অংশের মধ্যে প্রয়োজনীয় দক্ষতার ঘাটতি রয়েছে। অর্থাৎ, বিশ্ববিদ্যালয় ডিগ্রি দিচ্ছে, কিন্তু দক্ষতা তৈরি করতে পারছে না।
এ বাস্তবতার পেছনে অন্যতম কারণ হলো উচ্চশিক্ষার অনিয়ন্ত্রিত সম্প্রসারণ। বহু বিশ্ববিদ্যালয়ে পর্যাপ্ত শিক্ষক নেই, গবেষণাগার নেই, আধুনিক লাইব্রেরি নেই, এমনকি স্থায়ী ক্যাম্পাসও নেই। কোথাও কোথাও একটি ছোট ভবনে কয়েক হাজার শিক্ষার্থী নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্যক্রম চলছে। অনেক প্রতিষ্ঠানে শিক্ষক নিয়োগেও মানদণ্ড নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। রাজনৈতিক বিবেচনা, স্বজনপ্রীতি কিংবা অস্বচ্ছ প্রক্রিয়ার অভিযোগ শিক্ষাঙ্গনের ভাবমূর্তিকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। ফলে মেধাবী শিক্ষক ও গবেষক তৈরির পরিবেশও দুর্বল হয়ে পড়ছে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের মূল উদ্দেশ্য কেবল সনদ প্রদান নয়; বরং জ্ঞান সৃষ্টি, গবেষণা, উদ্ভাবন ও মানবিক মূল্যবোধসম্পন্ন নাগরিক তৈরি করা। কিন্তু বাংলাদেশের অধিকাংশ বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণা কার্যক্রম অত্যন্ত সীমিত। আন্তর্জাতিক মানের গবেষণা প্রকাশনা, পেটেন্ট কিংবা উদ্ভাবনের ক্ষেত্রে দেশের অবস্থান এখনো দুর্বল। বিশ্বের নামকরা বিশ্ববিদ্যালয়গুলো যেখানে গবেষণাকে অগ্রাধিকার দেয়, সেখানে আমাদের অনেক বিশ্ববিদ্যালয় এখনো মুখস্থনির্ভর পরীক্ষাকেন্দ্রিক শিক্ষায় আটকে আছে। এর ফলে শিক্ষার্থীদের সৃজনশীলতা ও বাস্তব দক্ষতা বিকাশ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
আরও উদ্বেগজনক বিষয় হলো, উচ্চশিক্ষার এ বিস্তার অনেক ক্ষেত্রে সামাজিক মর্যাদা অর্জনের প্রতিযোগিতায় পরিণত হয়েছে। অভিভাবকরা সন্তানকে যে কোনো মূল্যে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি করাতে চান, যদিও সেই শিক্ষার বাজারমূল্য বা বাস্তব প্রয়োজন নিয়ে খুব কমই ভাবা হয়। ফলে একদিকে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় অপ্রয়োজনীয় বিষয়ে অতিরিক্ত গ্র্যাজুয়েট তৈরি হচ্ছে, অন্যদিকে কারিগরি ও দক্ষতাভিত্তিক শিক্ষার খাত অবহেলিত থেকে যাচ্ছে। অথচ উন্নত বিশ্বে দক্ষতাভিত্তিক শিক্ষা ও প্রযুক্তিনির্ভর প্রশিক্ষণকে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়।
বাংলাদেশে বর্তমানে তরুণ জনগোষ্ঠীই সবচেয়ে বড় শক্তি। এ বিপুল যুবশক্তিকে দক্ষ মানবসম্পদে রূপান্তর করতে না পারলে জনসংখ্যাগত সুবিধা একসময় বোঝায় পরিণত হতে পারে। উচ্চশিক্ষিত কিন্তু বেকার ও হতাশ তরুণ সমাজ সামাজিক অস্থিরতা, অপরাধপ্রবণতা ও মানসিক সংকটের ঝুঁকি বাড়ায়। এরই মধ্যে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কিংবা বাস্তব জীবনে তরুণদের হতাশা, ক্ষোভ ও অনিশ্চয়তার বহিঃপ্রকাশ স্পষ্ট হয়ে উঠছে।
এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য প্রথমেই প্রয়োজন উচ্চশিক্ষার গুণগত মান নিশ্চিত করা। নতুন বিশ্ববিদ্যালয় অনুমোদনের আগে অবকাঠামো, শিক্ষকসংখ্যা, গবেষণা সক্ষমতা ও আর্থিক সামর্থ্যের কঠোর মূল্যায়ন করতে হবে। শুধু রাজনৈতিক বা ব্যবসায়িক বিবেচনায় বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার সংস্কৃতি বন্ধ করতে হবে। একই সঙ্গে বিদ্যমান বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর একাডেমিক কার্যক্রমের নিয়মিত মূল্যায়ন জরুরি।
শিক্ষাক্রমকেও সময়োপযোগী করতে হবে। চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের যুগে কেবল তাত্ত্বিক জ্ঞান নয়, প্রযুক্তিগত দক্ষতা, যোগাযোগ সক্ষমতা, সমস্যা সমাধানের যোগ্যতা এবং উদ্যোক্তা মানসিকতা গড়ে তোলার ওপর জোর দিতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয় ও শিল্প খাতের মধ্যে সমন্বয় বাড়িয়ে শিক্ষার্থীদের বাস্তব অভিজ্ঞতা অর্জনের সুযোগ তৈরি করতে হবে।
একই সঙ্গে কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষাকে সামাজিকভাবে মর্যাদা দিতে হবে। সব শিক্ষার্থীকে বিশ্ববিদ্যালয়মুখী করার প্রবণতা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। একজন দক্ষ টেকনিশিয়ান, কৃষি উদ্যোক্তা বা আইটি বিশেষজ্ঞ দেশের অর্থনীতিতে যে অবদান রাখতে পারেন, তা অনেক ক্ষেত্রে প্রচলিত ডিগ্রিধারী চাকরিজীবীর চেয়েও বেশি হতে পারে।
শিক্ষক নিয়োগ ও পদোন্নতিতে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। যোগ্য ও গবেষণামুখী শিক্ষক ছাড়া কখনোই মানসম্মত শিক্ষা সম্ভব নয়। এজন্য রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত, মেধাভিত্তিক ও জবাবদিহিমূলক নিয়োগব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। পাশাপাশি গবেষণায় বরাদ্দ বাড়াতে হবে এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতা বৃদ্ধি করতে হবে।
সবশেষে বলা যায়, বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা বৃদ্ধি কোনো দেশের উন্নয়নের একমাত্র সূচক নয়; প্রকৃত উন্নয়ন নির্ভর করে সেই শিক্ষা কতটা মানসম্পন্ন, বাস্তবমুখী ও মানবসম্পদ উন্নয়নবান্ধব তার ওপর। শুধু সনদধারী বেকারের সংখ্যা বাড়িয়ে কোনো জাতি এগোতে পারে না। এখন সময় এসেছে উচ্চশিক্ষার পরিমাণ নয়, গুণগত মানকে অগ্রাধিকার দেওয়ার। অন্যথায় বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিড়ে হারিয়ে যাবে প্রকৃত শিক্ষা, আর হতাশ তরুণদের দীর্ঘশ্বাস একসময় জাতীয় সংকটে রূপ নেবে।
লেখক: অধ্যাপক, বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়; গবেষক ও কলামিস্ট