রামজি বারউদ
প্রকাশ : ০৯ জুন ২০২৩, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ

ফিলিস্তিন নিয়ে নতুন স্নায়ুযুদ্ধের শঙ্কা

ফিলিস্তিন নিয়ে নতুন স্নায়ুযুদ্ধের শঙ্কা

জাতিসংঘে চীনের রাষ্ট্রদূত গেং শুয়াংয় গত ২৪ মে অধিকৃত ফিলিস্তিনের পরিস্থিতি সম্পর্কে একটি মন্তব্য করেছিলেন। সেই মন্তব্যটি ছিল আন্তর্জাতিক আইনের সঙ্গে পুরোপুরি সামঞ্জস্যপূর্ণ। তবে মার্কিন অবস্থানের তুলনায় (যা মূলত জাতিসংঘ এবং নিরাপত্তা পরিষদকে ইসরায়েলি স্বার্থরক্ষার জন্য একটি যুদ্ধক্ষেত্র হিসেবে বিবেচনা করে) চীনের রাজনৈতিক বক্তৃতা অনেকটাই বাস্তবসম্মত এবং তাদের এ বক্তব্য মূলত গভীর একটি উপলব্ধির ওপর ভিত্তি করে প্রস্তুত। এ বক্তব্যে বিদ্যমান আইনি অবস্থানেরই প্রতিফলন ঘটেছে।

বিগত একটি ইউএনএসসি সেশনে ‘ফিলিস্তিনসহ মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতির ওপর ব্রিফিং’ চলাকালীন চীনা চিন্তাভাবনাকে তুলে ধরেন গেং। কিন্তু তার কথায় তিনি কোনো কটাক্ষ, আঘাত বা সমালোচনা করেননি। তার বক্তব্যে তিনি জেরুজালেমে ইসরায়েলের ‘উসকানি’ বন্ধ করার এবং সেখানে বসবাসরত মুসলমানদের অধিকার এবং সেইসঙ্গে শহরের পবিত্র স্থানগুলোতে ‘জর্ডানের তত্ত্বাবধানের’ প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে একটি ব্যাপক এবং ন্যায্য সমাধানের প্রয়োজনীয়তার বিষয়ে জোর দিয়ে কথা বলেছেন। ফিলিস্তিনে সাম্প্রতিক সহিংসতার পেছনের কারণগুলোর প্রেক্ষাপট এবং গত মে মাসের ৯ তারিখে গাজায় ইসরায়েলি যুদ্ধের প্রেক্ষাপটকে বিস্তৃত করে গেং এমন একটি অবস্থান তুলে ধরেন। কিন্তু তেল আবিব এবং ওয়াশিংটন উভয়ই এ চীনা অবস্থানকে সম্পূর্ণ আপত্তিজনক বলে মনে করছে। তিনি অনাকাঙ্ক্ষিতভাবে অধিকৃত ফিলিস্তিনে ‘(ইসরায়েলের ইহুদি) বসতি স্থাপনের অবৈধ সম্প্রসারণ’ এবং ইসরায়েলের ‘একতরফা পদক্ষেপ’-এর নিন্দা জানিয়েছেন। তিনি তেল আবিবকে অবিলম্বে সব অবৈধ কার্যকলাপ বন্ধ করার আহ্বানও জানিয়েছেন। গেং মূলত ফিলিস্তিনি উদ্বাস্তুদের দুর্দশাসহ তুলনামূলকভাবে উপেক্ষিত বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা করতে এগিয়ে যান। এ ছাড়া গেং তার বক্তব্যে ফিলিস্তিনের একটি ন্যায়সংগত সমাধানের বিষয়ে তার দেশের রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরেন। এতে ইসরায়েলি দখলদারিত্বের অবসান, তেল আবিবের সম্প্রসারণবাদী নীতিগুলো বন্ধ করা এবং ফিলিস্তিনি জনগণের অধিকারকে সম্মান করার কথাও বলা হয়েছে। কিন্তু কথা হচ্ছে, চীনের এ অবস্থান কি নতুন কিছু?

যদিও এটা সত্য যে, ফিলিস্তিন এবং ইসরায়েল সম্পর্কে চীনের নীতি ঐতিহাসিকভাবে আন্তর্জাতিক আইনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। এ ছাড়া চীন সাম্প্রতিক বছরগুলোতে আরও ভারসাম্যপূর্ণ অবস্থান তৈরি করার চেষ্টা করেছে। এতে ক্রমবর্ধমান ইসরায়েল এবং চীনের মধ্যে বাণিজ্য—বিশেষ করে উন্নত মাইক্রোচিপ প্রযুক্তির ক্ষেত্রগুলো কোনোভাবেই বাধাগ্রস্ত হয় না। তবে কারণ যাই হোক, চীন-ইসরায়েলের সখ্য বাণিজ্যের চেয়ে অন্য কিছু দ্বারা আরও বেশি অনুপ্রাণিত।

আনুষ্ঠানিকভাবে চালু হওয়ার পর থেকেই চীনের বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ বেইজিংয়ের বৈশ্বিক দৃষ্টিভঙ্গির একটি ভিত্তিপ্রস্তর হিসেবে কাজ করেছে। এ সুবিশাল প্রকল্পটি প্রায় ১৫০টি দেশের সঙ্গে জড়িত। এ উদ্যোগের মূল লক্ষ্য হচ্ছে স্থল ও সামুদ্রিক নেটওয়ার্কের মাধ্যমে এশিয়াকে ইউরোপ এবং আফ্রিকার সঙ্গে সংযুক্ত করা।

ভূমধ্যসাগরে অবস্থানের কারণে, চীনের কাছে ইসরায়েলের কৌশলগত গুরুত্ব রয়েছে এবং অনেক বছর ধরে ইসরায়েলের সমুদ্রবন্দরগুলোতে অভিগমনের সুযোগ পাওয়ার জন্য চীন আগ্রহী ছিল। সময়ের পরিক্রমায় বর্তমানে সেই আগ্রহ বলতে গেলে প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। তবে চীনের এ ধরনের উচ্চাকাঙ্ক্ষা ওয়াশিংটনের জন্য অত্যন্ত উদ্বেগের ব্যাপার। কারণ অনেক মার্কিনি নৌযান প্রায়ই হাইফা বন্দরে অবস্থান করে।

এ কারণেই বেইজিংয়ের সঙ্গে ক্রমবর্ধমান নৈকট্যের বিরুদ্ধে ওয়াশিংটন বারবার তেল আবিবকে সতর্ক করেছে। মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মাইক পম্পেও ২০১৯ সালের মার্চে ইসরায়েলকে এ ব্যাপারে সতর্ক করে দিয়েছিলেন। তিনি বলেছিলেন যে, যতক্ষণ না তেল আবিব চীনের সঙ্গে তার সহযোগিতার পুনর্মূল্যায়ন না করে, ততক্ষণ পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্র ‘গোয়েন্দা তথ্য ভাগাভাগি করা এবং নিরাপত্তা সুবিধাগুলোর সহাবস্থান’ হ্রাস করে ফেলতে পারে। চীনের বর্তমান (কিন্তু সম্ভাব্য বৈশ্বিক শক্তিকেও সম্পূর্ণভাবে উপলব্ধি করেই), ইসরায়েল একটি ভারসাম্যপূর্ণ অবস্থান খুঁজে বের করার জন্য পরিশ্রম করেছে। মনে করা হয় যে, এটি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে তার ‘বিশেষ সম্পর্ক’ চালিয়ে যেতে সহায়তা করবে। পাশাপাশি চীনের সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠতা থেকে আর্থিক এবং কৌশলগতভাবে সহযোগিতা পেতে অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টি করবে। ইসরায়েলের ভারসাম্যমূলক আইন চীনকে মধ্যপ্রাচ্যে তার ক্রমবর্ধমান অর্থনৈতিক দক্ষতাকে রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক বিনিয়োগে উৎসাহিত করেছে। উদাহরণস্বরূপ বলা যায় যে, ২০১৭ সালে চীন একটি শান্তি পরিকল্পনা চালু করেছিল। তবে এ পরিকল্পনাটি প্রাথমিকভাবে প্রণীত হয় ২০১৩ সালে। একে চার দফা প্রস্তাব নামেও অভিহিত করা হয়। পরিকল্পনাটি মার্কিন পক্ষপাতের বিকল্প হিসেবে চীনা মধ্যস্থতার প্রস্তাব করেছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত এ শান্তি প্রক্রিয়া আশানুরূপ ফল লাভ করতে পারেনি। আবার ফিলিস্তিনি নেতৃত্ব চীনের এ সম্পৃক্ততাকে স্বাগত জানিয়েছে। অন্যদিকে ইসরায়েল এ পরিকল্পনায় অংশগ্রহণের ব্যাপারে অমত জানিয়েছে।

যদি ভূরাজনীতিতে ভারসাম্য বজায় রাখা সম্ভব হতো, তাহলে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ হঠাৎ করেই শেষ হয়ে যেত। এ ক্ষেত্রে সাবেক ইতালীয় কূটনীতিক স্টেফানো স্টেফানিনির কথায় নতুন ভূরাজনৈতিক বাস্তবতা প্রকাশ করা যেতে পারে। ন্যাটোতে ইতালির প্রাক্তন এ রাষ্ট্রদূত লা স্ট্যাম্পায় একটি নিবন্ধ লিখেছিলেন। সেখানে তিনি বলেছিলেন যে, আন্তর্জাতিক ভারসাম্য আইন শেষ হয়ে গেছে এবং নিরাপত্তা ব্যবস্থার যে জাল (সেফটি নেট), তা আর অবশিষ্ট নেই। হাস্যকর শোনালেও, তিনি ইতালিকে পশ্চিমা মিত্র এবং চীন—দুটির মধ্যে যে কোনো একটি বেছে নেওয়ার প্রয়োজনীয়তা উল্লেখ করেছিলেন। একই যুক্তি ইসরায়েল ও চীনের ক্ষেত্রেও প্রয়োগ করা যেতে পারে।এপ্রিলের ৬ তারিখে চীন, সৌদি আরব এবং ইরানের মধ্যে একটি যুগান্তকারী চুক্তি সফল হয়। এর ঠিক কিছু পরেই চীন আবার ফিলিস্তিন এবং ইসরায়েলের মধ্যে শান্তি স্থাপনের ব্যাপারটি নিয়ে কর্মকাণ্ড শুরু করার ধারণাটি প্রচলন করে। জানা গেছে যে, চীনের নতুন পররাষ্ট্রমন্ত্রী কিন গ্যাং শান্তি আলোচনা পুনরায় শুরু করার পদক্ষেপ নিয়ে উভয়পক্ষের সঙ্গে পরামর্শ করেছেন। আবার ফিলিস্তিনিরা ব্যাপারটি মেনে নিলেও ইসরায়েল বিষয়টি উপেক্ষা করেছে। এতে আংশিকভাবে এ ব্যাপারটিই প্রতীয়মান হয় যে, ইসরায়েল এবং যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চীন তার সম্পর্ক নিয়ে হতাশ। ওয়াশিংটনে চীনের প্রাক্তন রাষ্ট্রদূত হিসেবে (২০২১-২৩ পর্যন্ত) কিনকে অবশ্যই ইসরায়েলের প্রতি মার্কিন সহজাত পক্ষপাতের সঙ্গে পরিচিত হতে হবে। এ ধারণাটি গাজায় ইসরায়েলের সর্বশেষ যুদ্ধের সময় চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র হুয়া চুনয়িং প্রকাশ করেছিলেন। এ বছরের ১৪ মে হুয়া বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্রের এটা বুঝতে হবে যে, ফিলিস্তিনি মুসলমানদের জীবনও সমান মূল্যবান।’ ফিলিস্তিনের পরিস্থিতি সম্পর্কে চীনা ভাষার একটি সাধারণ বক্তৃতা বিশ্লেষণ এ ব্যাপারটিই স্পষ্ট করে তোলে যে, বেইজিং যুক্তরাষ্ট্র এবং অব্যাহত সংঘাতের মধ্যে একটি সরাসরি যোগসূত্র দেখতে পায়। একই সঙ্গে এ সমস্যার একটি ন্যায়সংগত সমাধান এখনো খুঁজে পাওয়া যায়নি। আবার এই একই দাবি রাষ্ট্রদূত গেংয়ের সাম্প্রতিক ইউএনএসসি মন্তব্য থেকেও সংগ্রহ করা যেতে পারে। সেখানে তিনি বিস্তৃত এবং ন্যায়সংগত সমাধানের ওপর ভিত্তি করে একটি চীনা বিকল্প প্রস্তাব করেন। সেখানে এ অঞ্চলে মার্কিন কূটনীতির সরাসরি উল্লেখ করে তার কিছুটা সমালোচনাও তিনি করেছিলেন।

আবার এটাও সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ যে, চীনা অবস্থান আরব দেশগুলোর সঙ্গে অন্তর্নিহিতভাবে যুক্ত বলে মনে করা হচ্ছে। আরব রাজনৈতিক আলোচনায় ফিলিস্তিন যত বেশি কেন্দ্রীভূত হবে, চীনের বৈদেশিক নীতি এজেন্ডায় বিষয়টি ততই বেশি গুরুত্ব পাবে। সাম্প্রতিক আরব সম্মেলনে (জেদ্দায় অনুষ্ঠিত) আরব সরকারগুলো ফিলিস্তিনকে অগ্রাধিকার দিতে সম্মতি জানিয়েছে। আর এ সম্মতির ব্যাপারটি চীনের মতো মিত্ররা খুব ভালো করেই খেয়াল করেছে। তবে এসব ঘটনাপ্রবাহ অবশ্যই এমন কোনো ইঙ্গিত দেবে না যে, চীন ইসরায়েলের সঙ্গে তার সম্পর্ক ছিন্ন করবে। কিন্তু এই ইঙ্গিত অবশ্যই আছে যে, চীন ফিলিস্তিনের বিষয়ে তার নীতিগত অবস্থানে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ আর চীন এ অবস্থান গত কয়েক দশক ধরেই ধরে রেখেছে। তবে মনে করা হচ্ছে যে, খুব দ্রুতই চীন ও ইসরায়েলের মধ্যে সম্পর্ক মার্কিন চাপ এবং আলটিমেটামগুলো একটি বড় ধরনের পরীক্ষার সম্মুখীন হবে। একদিকে ইসরায়েলের প্রতি ওয়াশিংটনের অতুলনীয় গুরুত্ব এবং অন্যদিকে চীনের কাছে আরব-মুসলিম বিশ্বের তাৎপর্য বিবেচনা—ভবিষ্যতে কী ঘটবে তা সহজেই অনুমান করা যায়। ফিলিস্তিনের বিষয়ে চীনের রাজনৈতিক বক্তৃতা বিচার করলে (বক্তব্যটি মূলত আন্তর্জাতিক এবং মানবিক আইনের মধ্যে অবস্থান করছে) মনে হচ্ছে চীন এরই মধ্যে তার সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছে।

লেখক : আন্তর্জাতিক সিন্ডিকেটেড কলামিস্ট ও লেখক। নিবন্ধটি আরব নিউজ থেকে অনুবাদ করেছেন তৌহিদা জান্নাত

কালবেলা অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

বইমেলায় রাশিদুল হাসানের ‘ওয়াকিং দ্য পাথ অব পোয়েট্রি’

শেষ সময়ে বইমেলার নিরাপত্তায় ঢিলেঢালা

বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধির সিদ্ধান্ত বাতিল চান সাইফুল হক 

জাবির দুই শিক্ষার্থীর বহিষ্কারাদেশ বাতিলের দাবি

শিশু চুরির মামলায় দুই নারীর যাবজ্জীবন কারাদণ্ড

বিআরটিসি যেন আর পিছিয়ে না যায় : তাজুল ইসলাম

ঢাবির নাটমণ্ডলে মঞ্চায়িত হচ্ছে থিয়েটার বিভাগের নাটক ‘সিদ্ধান্ত’

টিআইবির ফেলোশিপ পেলেন সাংবাদিক সজিবুর রহমান

রংপুরে এরিক ও বিদিশার ওপর হামলার অভিযোগ

বইমেলার সময় বাড়ল

১০

রিহ্যাব নির্বাচনে ব্যবসায়ী ঐক্য পরিষদের নিরঙ্কুশ জয়

১১

৬ মাস বিশ্ববাজারে পেট্রোল বিক্রি করবে না রাশিয়া

১২

ফরিদপুরে আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে সংঘর্ষ, আহত ২০

১৩

গাধা বেচবে চিড়িয়াখানা

১৪

রাজধানীতে ৬ স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠান বন্ধ ঘোষণা

১৫

হকিতে মেরিনার্স-আবাহনীর সহজ জয়

১৬

ভিনদেশের মোহ কেটেছে জামালের! 

১৭

পানগাঁও আইসিটিকে মুখ থুবড়ে পড়তে দেওয়া যাবে না : নৌপরিবহন প্রতিমন্ত্রী

১৮

বিপিএম পদকে ভূষিত হলেন মো. শাহ আলম

১৯

পুলিশের ৪০০ সদস্যকে পদক পরিয়ে দিলেন প্রধানমন্ত্রী

২০
X