

একটি সময়কাল বা দেশের সামগ্রিক বাস্তবতা কোন পর্যায়ে আছে, তা বোঝার অন্যতম মাধ্যম হলো—সে সময়ের শিল্পীদের সৃষ্টিশীল কর্মকাণ্ড পর্যবেক্ষণ করা। কেননা শিল্পের আয়নায় সময়ের ছাপ নানা রূপে প্রতিফলিত হয়—কখনো তা হয় সৌন্দর্যের সূক্ষ্ম রেখায়, আবার কখনো তা হয়ে ওঠে প্রতিবাদী তুলির আঁচড়। প্রকৃত শিল্পী স্বতঃস্ফূর্তভাবেই সমাজের অন্তর্নিহিত রূপকে উন্মোচন করার দায়ভার নিয়ে নেয়। মিথ্যার আবরণ বা খোলস সরিয়ে নির্ভীকভাবে তুলে ধরে সময়ের নগ্ন বাস্তবতা। তেমনটাই আমরা দেখতে পাই ৭০ থেকে ৯০ দশকের বাংলাদেশ, সে সময়কার উল্লেখযোগ্য শিল্পীদের করা কাজের মধ্য দিয়ে। সম্প্রতি কলাকেন্দ্র গ্যালারি আমাদের এ সুযোগটি করে দিয়েছে। ৭০ থেকে ৯০ দশকের ১৪ জন বিশিষ্ট শিল্পীর শিল্পকর্ম নিয়ে গত ৩১ নভেম্বর শুরু হল ‘ফিরে দেখা’ শীর্ষক প্রদর্শনী।
শিল্পের ভাষা সবসময় পরিবর্তনশীল; সময়ের প্রবাহে তা নতুন রূপ নেয়। কখনো সময়ের সীমা অতিক্রম করে কয়েক ধাপ এগিয়ে থাকে—যার প্রতিফলন দেখা যায় এসব ছবিতে। সমকালকে ছাপিয়ে আধুনিকতার রীতিনীতি ও তার প্রবাহ শুরু হয়েছিল, যা দেখার স্বাদ পাওয়া যায় প্রত্যেকের ছবিতে। ছবিগুলো মূলত বর্ণনামূলক, যেখানে বেশিরভাগ কাজেই মানবাকৃতি থাকলেও তা বাস্তবের মানুষের মতো হুবহু প্রতিরূপ নয়। প্রতিটি শিল্পী নিজস্ব ঢঙে মানুষের শারীরিক গঠন ও রূপ বদলে এক অনন্য শৈলী তৈরি করেছেন। জয়নুল কিংবা সুলতানের মতো বাস্তবধর্মী রীতির মতো নয়, বরং তা থেকে বেরিয়ে এসে ভিন্নভাবে কাজ করতে দেখা যায়। চিত্রকর্মের পাশাপাশি বহুমাত্রিক এ প্রদর্শনীতে রয়েছে ভাস্কর্য, ছাপচিত্র ও মিশ্র মাধ্যমে করা শিল্পকর্ম। শিশির ভট্টাচার্য, কাজী রকিব, দীপা হক, দিলারা জামান, ঢালী আল মামুন, রতন মজুমদার, নিসার হোসেন, ফারেহা জেবা, হাবিবুর রহমান, রুহুল আমিন কাজল, লাল রুখ সেলিম, তৌফিকুর রহমান, সাইদুল হক জুইস ও ওয়াকিলুর রহমান এ ১৪ জন ক্ষ্যাতিমান গুণী শিল্পীর কাজ দ্বারা সজ্জিত গ্যালারি মহিমান্বিত হলো, যা এখনকার তরুণ শিল্পীদের দেখার বিশেষ সুযোগ করে দিল ঠিক যেমন দূর থেকে দেখা প্রাচীন বটবৃক্ষ। কাছে গেলে পুরোটা দেখা যায় না, সময়ের রেলপথ বেয়ে বহুদূর এসে অতীতে ফিরে তাকানোর মতো। তাইতো ‘ফিরে দেখা’ প্রদর্শনীর নামকরণে সার্থকতা রয়েছে।
চিত্রকর্ম শুধুই চোখের আনন্দের জন্য নয়; বরং তা এক গভীর সামাজিক ও ঐতিহাসিক চিন্তার স্থান তৈরি করে। আমাদের ইতিহাস, স্মৃতি ও বর্তমান সময়কে নতুন দৃষ্টিতে দেখতে শেখায়। শিল্পীরা তাদের প্রতিটি চিত্রে তখনকার সময়ের গল্প তুলে ধরেছেন। মুক্তিযুদ্ধ, রাষ্ট্র, জাতীয়তাবাদ এবং সামাজিক সংকট কি তীব্রভাবে আক্রান্ত করেছে সে সময়কার তরুণ শিল্পীদের মন। সমাজে বিদ্যমান বৈষম্য, ক্ষমতার রাজনীতি ও সাধারণ মানুষের সংগ্রাম তাদের চিত্রে প্রকাশ পেয়েছে, যেখানে বাস্তবতা ও বিমূর্ততার এক সুন্দর মেলবন্ধন দেখা যায়। প্রতিটি ছবিতেই যেন রাজনৈতিক অস্থিরতা, সামাজিক অবক্ষয় ও পুরুষতান্ত্রিকতার বিরুদ্ধে এক শৈল্পিক প্রতিবাদের সুর ধ্বনিত হয়েছে। সমাজে অবহেলিত নারী, মৌলবাদ, কুসংস্কারের বিরুদ্ধে সরাসরি বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়েছে শিল্পীগোষ্ঠীরা।
১৯৬০-এর দশকে ঢাকা সরকারি আর্ট কলেজকে (বর্তমান চারুকলা অনুষদ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়) কেন্দ্র করে এক সজীব শিল্পপরিবেশ গড়ে উঠেছিল। সে সময়ের তরুণ শিল্পীরা প্রথাগত ধারার বাইরে গিয়ে শিল্পচর্চায় নতুন দিশা খুঁজছিলেন। ইউরোপীয় আধুনিক শিল্পধারার প্রভাব গ্রহণ করেও তারা নিজের সমাজ, সংস্কৃতি ও সময়ের বাস্তবতা প্রকাশের জন্য স্বতন্ত্র রূপভাষা নির্মাণে মনোযোগী হন। এ প্রেক্ষাপটে কিছু উদ্যমী তরুণ শিল্পী মিলে ‘ঢাকা পেইন্টারস’ নামে একটি গোষ্ঠী গঠন করেন। তাদের শিল্পকর্মে সমাজবাস্তবতা ও মানবচেতনার বিমূর্ত প্রকাশ, স্বাধীনতা-পূর্ব রাজনৈতিক অস্থিরতা, রং-রেখা ও টেক্সচারের মাধ্যমে আবেগ প্রকাশ এবং নিরীক্ষামূলক কাজের প্রবণতা স্পষ্টভাবে লক্ষ করা যায়। বলতে গেলে আধুনিক শিল্প চেতনার বীজ রোপণ করেছিলেন আজকের এই প্রবীণ শিল্পীরা—যার মধ্যে অনেকেই সেই গোষ্ঠীর শিল্পী ছিলেন। প্রদর্শনীটি আমাদের অনুপ্রেরণা দেয় শিল্পপথে এগিয়ে যাওয়ার জন্য। প্রদর্শনী চলবে ১৫ নভেম্বর পর্যন্ত।