সাইদুল ইসলাম, চট্টগ্রাম
প্রকাশ : ১২ জুন ২০২৩, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ

বঙ্গবন্ধু টানেলে পড়ছে তুলির শেষ আঁচড়

বঙ্গবন্ধু টানেলে পড়ছে তুলির শেষ আঁচড়

নির্মাণাধীন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান টানেল প্রকল্পের ৯৮ শতাংশ কাজ এরই মধ্যে শেষ হয়েছে। তুলির শেষ আঁচড় পড়ছে কর্ণফুলীর তলদেশে। দুটি সুড়ঙ্গের মধ্যে তিনটি ক্রস প্যাসেজ, অ্যাপ্রোচ সড়ক, ভায়াডাক্টসহ কার্পেটিং, পেইন্টিং, কেবল ওয়্যারিং, সার্ভিস এরিয়ার কাজও শেষ পর্যায়ে। সেপ্টেম্বরে টানেলটি যান চলাচলের জন্য উন্মুক্ত করতে চলছে জোর প্রস্তুতি। ইংল্যান্ড থেকে স্ক্যানার মেশিন এলে সেগুলো যুক্ত করার মাধ্যমেই শতভাগ কাজ শেষ হবে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

চট্টগ্রামে শিল্প খাতের ব্যাপ্তি বেড়ে যাওয়ায় কর্ণফুলী নদীর অন্য পাড়ে দক্ষিণ চট্টগ্রামের উন্নয়নে মনোযোগী হয় সরকার। দক্ষিণ চট্টগ্রামকে ঘিরে কোটি কোটি টাকার উন্নয়ন প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়। একাধিক অর্থনৈতিক অঞ্চল, মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দর ছাড়াও বৃহৎ কয়েকটি বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র চালু করার মাধ্যমে দেশের অর্থনীতিতে অবদান রাখার মতো উন্নয়নযজ্ঞ শুরু করা হয়। কিন্তু কর্ণফুলী নদীর ওপর বিদ্যমান শাহ আমানত সেতু দিয়ে সারা দেশের সঙ্গে দক্ষিণ চট্টগ্রামের সংযোগ চালু রাখা সম্ভব হবে না। এ কারণে টানেলের মাধ্যমে দুই প্রান্তকে যুক্ত করতে কাজ শুরু হয়। আগামী সেপ্টেম্বরে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বাণিজ্যিকভাবে যানবাহন চলাচলের জন্য উদ্বোধন করবেন এ স্বপ্নের টানেল।

প্রকল্প সূত্রে জানা গেছে, ২০১১ সালে সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের পর ও ২০১৪ সালে সমঝোতা চুক্তির পর ২০১৫ সালের ৩০ জুন ঋণচুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান নিয়োগের পর ২০১৭ সালের ৫ ডিসেম্বর পূর্তকাজ শুরু হয়। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ২০১৯ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি পতেঙ্গা থেকে

আনোয়ারামুখী প্রথম বা উত্তর সুড়ঙ্গের খননকাজের (বোরিং) উদ্বোধন করেন। ২ হাজার ৪৪৬ মিটার দীর্ঘ এ সুড়ঙ্গের খননকাজ শেষ হয় ২০২০ সালের ২ আগস্ট। দ্বিতীয় বা দক্ষিণ সুড়ঙ্গের (আনোয়ারা থেকে পতেঙ্গামুখী) খননকাজ শুরু হয় ২০২০ সালের ১২ ডিসেম্বর। গত বছরের ৭ অক্টোবর এ কাজ শেষ হয়। আর দুটি সুড়ঙ্গের মধ্যে তিনটি ক্রস প্যাসেজ বা সংযোগপথের কাজ, অ্যাপ্রোচ সড়ক, ভায়াডাক্টসহ কার্পেটিং, পেইন্টিং, ক্যাবল ওয়্যারিং, সার্ভিস এরিয়ার নির্মাণকাজ শেষ পর্যায়ে রয়েছে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, যমুনা সেতু কিংবা পদ্মা সেতু চালুর পর দেশের উত্তর ও দক্ষিণাঞ্চলে যেভাবে শিল্পের বিকাশ হয়েছে, দেশের অর্থনীতিতে এ দুটি মেগা প্রকল্প যেভাবে জিডিপিতে বাড়তি অবদান রেখেছে, সেভাবেই বঙ্গবন্ধু টানেল দেশের অর্থনীতিতে অবদান রাখতে সক্ষম হবে। টানেলটি চালু হলে দেশি-বিদেশি শিল্পকারখানা স্থাপনের মাধ্যমে দেশে আমদানি-রপ্তানির পরিমাণ বেড়ে যাবে। এতে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বৃদ্ধিসহ প্রায় কয়েক লাখ মানুষের নতুন কর্মসংস্থান হবে। মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দরের মাধ্যমে দেশের পণ্য আমদানি-রপ্তানি বৃদ্ধি করে দেশকে আরও বেশি অর্থনৈতিকভাবে সমৃদ্ধ করতে বঙ্গবন্ধু টানেল ভূমিকা রাখবে বলে মনে করছেন তারা।

দ্য চিটাগাং চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজের সভাপতি মাহবুবুল আলম কালবেলাকে বলেন, টানেলটি এ অঞ্চলের যোগাযোগ ব্যবস্থার ইতিহাসে নতুন যুগের সূচনা করবে। এটি দেশের বাকি অংশের সঙ্গে সংযোগ স্থাপনের মাধ্যমে দেশের দক্ষিণ-পূর্ব অঞ্চলের উন্নয়নের জন্য একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ হবে।

কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগের ত্রাণ ও সমাজকল্যাণবিষয়ক সম্পাদক মো. আমিনুল ইসলাম আমিন কালবেলাকে বলেন, উন্নয়নের প্রথম দিক হচ্ছে যোগাযোগ ব্যবস্থা। এটা যত উন্নত হবে, দেশের উন্নয়ন আরও ত্বরান্বিত হবে। এ বাস্তবতার আলোকে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান টানেলটি সরকারের একটি গৌরবের অর্জন।

টানেল প্রকল্পের পরিচালক (পিডি) ইঞ্জিনিয়ার হারুনুর রশীদ চৌধুরী কালবেলাকে বলেন, সরকারের অগ্রাধিকার প্রকল্প হিসেবে করোনার প্রকোপের মধ্যেও নির্ধারিত সময়ে বাস্তবায়নে কাজ করে গেছি। প্রায় ৯৮ শতাংশ কাজ শেষ হয়েছে। স্ক্যানার বসানোর পর টানেলটি বাণিজ্যিকভাবে চালু করা সম্ভব হবে।

২০২২ সালের ডিসেম্বরে টানেলের পূর্ত কাজের সমাপ্তি অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছিলেন, টানেল নির্মাণের কাজটি বাংলাদেশের বিস্ময়। এটি আমাদের জন্য বিরাট কাজ। টানেল নির্মাণের ফলে চট্টগ্রামসহ দেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতি আরও বেশি দৃশ্যমান হবে। নদীর দুই পাড় সংযুক্ত হওয়ার কারণে ‘টুইন সিটি’ হবে চট্টগ্রাম। কর্ণফুলী নদীর দক্ষিণ প্রান্ত চট্টগ্রাম শহরের চেয়েও পরিকল্পিত উন্নয়ন ঘটবে।

যেমন হবে বঙ্গবন্ধু টানেল : চার লেন বিশিষ্ট দুটি টিউব সংবলিত ৩ দশমিক ৪ কিলোমিটার টানেলের প্রতিটি টিউব চওড়ায় ১০ দশমিক ৮ মিটার বা ৩৫ ফুট এবং উচ্চতা ৪ দশমিক ৮ মিটার বা অন্তত ১৬ ফুট। একটি টিউব থেকে অন্য টিউবের পাশাপাশি দূরত্ব অন্তত ১২ মিটার। টানেলের প্রস্থ ৭০০ মিটার এবং দৈর্ঘ্য ৩ হাজার ৪০০ মিটার। এ ছাড়া টানেলের পশ্চিম ও পূর্ব প্রান্তে ৫ দশমিক ৩৫ কিলোমিটার অ্যাপ্রোচ রোড এবং ৭২৭ মিটার ওভার ব্রিজ সম্পন্ন টানেলটি চট্টগ্রাম শহরের সঙ্গে আনোয়ারা উপজেলাকে সংযুক্ত করবে।

টানেল চালুর প্রথম বছর ৬৩ লাখ গাড়ি টানেলের নিচ দিয়ে চলাচল করবে। যেটি ক্রমান্বয়ে বাড়তে বাড়তে দেড় কোটিতে গিয়ে দাঁড়াবে। চালুর প্রথম বছরে চলাচলকারী গাড়ির প্রায় ৫১ শতাংশ হবে কনটেইনার পরিবহনকারী ট্রেইলর এবং বিভিন্ন ধরনের ট্রাক ও ভ্যান। বাকি ৪৯ শতাংশের মধ্যে ১৩ লাখ বাস ও মিনিবাস। আর ১২ লাখ কার, জিপ ও বিভিন্ন ছোট গাড়ি চলাচল করবে।

অর্থনৈতিক সম্ভাবনা : টানেল প্রকল্পকে ঘিরে দক্ষিণ চট্টগ্রামে ইকোনমিক জোনসহ বিশাল অর্থনৈতিক কর্মযজ্ঞ চলছে। আনোয়ারায় অবস্থিত কোরিয়ান রপ্তানি প্রক্রিয়াজাতকরণ অঞ্চল (কেইপিজেড), বেসরকারি খাতে সবচেয়ে বড় সার কারখানা (কাফকো), চট্টগ্রাম ইউরিয়া সার কারখানা লিমিটেড (সিইউএফএল) এবং চট্টগ্রাম বন্দর কার্যক্রম সম্প্রসারণ করা হচ্ছে। এ ছাড়া কক্সবাজারের মহেশখালী উপজেলার মাতারবাড়ীতে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগে কয়লাভিত্তিক তাপবিদ্যুৎকেন্দ্র, এলএনজি স্টেশনসহ বহু শিল্পকারখানা গড়ে উঠছে। মিয়ানমার হয়ে প্রস্তাবিত এশিয়ান হাইওয়ের সঙ্গে সংযুক্তিসহ সাতটি গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্যে এগিয়ে যাচ্ছে টানেল নির্মাণের কাজ।

মূলত কর্ণফুলী টানেলকে ঘিরে চীনের সাংহাই সিটির মতো চট্টগ্রামে গড়ে তোলা হচ্ছে ‘ওয়ান সিটি টু টাউন’। এতে উন্মোচিত হতে যাচ্ছে নতুন অর্থনৈতিক সম্ভাবনার নতুন দ্বার। ফলে এ অঞ্চলের মানুষের জীবনযাত্রা বদলে যাবে।

প্রকল্পের উদ্দেশ্য : কর্ণফুলী বাণিজ্যিক নগরী চট্টগ্রামকে দুই ভাগে বিভক্ত করেছে। এ নদীর ওপর এরই মধ্যে তিনটি সেতু নির্মিত হলেও গুরুত্বপূর্ণ এ অঞ্চলের জন্য তা যথেষ্ট নয়। এ ছাড়া কর্ণফুলী নদীর ওপর সেতু নির্মাণে তলদেশে পলি জমে সমস্যা তৈরি করে, যা চট্টগ্রাম বন্দরের জন্য বড় হুমকি। এ সমস্যার মোকাবিলায় কর্ণফুলীতে নতুন কোনো সেতু নির্মাণ না করে তলদেশে টানেল নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়।

২০০৮ সালে কর্ণফুলী নদীর তলদেশে দেশের প্রথম টানেল নির্মাণের প্রতিশ্রুতি দেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। পরে টানেল নির্মাণের জন্য ২০১৪ সালের ১০ জুন প্রধানমন্ত্রীর উপস্থিতিতে বেইজিংয়ে একটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়। পরে ২০১৬ সালের অক্টোবরে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং প্রকল্পের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন। এরপর ২০১৯ সালে ২৪ ফেব্রুয়ারি চট্টগ্রামের পতেঙ্গায় টানেল প্রকল্প এলাকার কনস্ট্রাকশন ইয়ার্ডে সুইস টিপে আনুষ্ঠানিকভাবে খনন কাজের উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী।

প্রকল্পটি বাংলাদেশ ও চীন সরকারের (জিটুজি) যৌথ অর্থায়নে বাস্তবায়ন হচ্ছে। মোট ব্যয় ১০ হাজার ৩৭৪ কোটি ৪২ লাখ টাকা। এর মধ্যে বাংলাদেশ সরকার দিচ্ছে ৪ হাজার ৪৬১ কোটি ২৩ লাখ টাকা আর চীন সরকারের ঋণ ৫ হাজার ৯১৩ কোটি ১৯ লাখ টাকা। চীনের কমিউনিকেশন ও কনস্ট্রাকশন কোম্পানি লিমিটেড (সিসিসিসি) টানেল নির্মাণের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান কাজটি বাস্তবায়ন করছে।

কালবেলা অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

মধ্যপ্রাচ্যে টিকে থাকতে ইসরায়েলকে যা করতে বললেন বাইডেন

রাজপথ দখলে আবারও মাঠে নামছে ইমরান খানের পিটিআই

আ.লীগ নেতার রক্তাক্ত মরদেহ উদ্ধার

এক শর্তে জাহাজে হামলা বন্ধের বিষয়টি বিবেচনা করবে ইয়েমেন

গাজীপুরে মার্কেটে আগুন

শিক্ষার্থীকে শাসন করায় শিক্ষককে বেধড়ক মারধর

প্যারিসে একুশের কবিতা পাঠ ও আলোচনা সভা

রাশিয়ার ভয়ে পিছু হটল ন্যাটো

নসিমন-মোটরসাইকেল সংঘর্ষে নিহত ২

২৮ ফেব্রুয়ারি : কী ঘটেছিল ইতিহাসের এই দিনে

১০

বুধবার রাজধানীর যেসব এলাকায় যাবেন না

১১

২৮ ফেব্রুয়ারি : নামাজের সময়সূচি

১২

কর্ণফুলী নদীতে ৩ দিন বন্ধ থাকবে ফেরি চলাচল

১৩

মিয়ানমার সীমান্ত এখন শান্ত, ফের গোলাগুলি শুরুর আশঙ্কায় আতঙ্ক

১৪

বোনাস দাবিতে সার কারখানা শ্রমিকদের মানববন্ধন

১৫

সিলেটে পরিবহন শ্রমিকদের অনির্দিষ্টকালের ধর্মঘট শুরু আজ

১৬

হাসপাতালে রেখে তরুণ-তরুণী উধাও, ছোটমণি নিবাসে ঠাঁই হলো নবজাতকটির

১৭

চট্টগ্রামে শাস্তির মুখে ৮ ল্যাব-হাসপাতাল

১৮

এবার বাড়ছে সব ধরনের ছোলা ও ডালের দাম

১৯

বিধবা মেয়েকে নিয়ে ঢাকায় যাওয়ার পথে চলন্ত ট্রেনে বাবার মৃত্যু

২০
X