রীতা ভৌমিক
প্রকাশ : ১২ জুন ২০২৩, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ

শিশুশ্রম প্রতিরোধে দরকার শিশু সুরক্ষা ব্যবস্থা

শিশুশ্রম প্রতিরোধে দরকার শিশু সুরক্ষা ব্যবস্থা

পুরান ঢাকার ওয়াইজঘাট এলাকার মুন কমপ্লেক্স মার্কেট। এর সরু বারান্দার নিচে এক হাত জায়গায় সব ধরনের নষ্ট বাল্ব সারাইয়ের দোকান। দেখলেই মনে হয় দোকান নয়, যেন সুড়ঙ্গ। দোকানটা রাস্তার সমান সমান নয়, রাস্তা থেকে দুই হাত নিচু। শাটারের ওপাশে দোকানের ছাদের উচ্চতাও অনেক কম। মাথা সোজা করে বসা যায় না। দোকানের পাশে রাস্তার এক কিনারে কার্টনভর্তি নষ্ট বাল্ব

ছড়িয়ে-ছিটিয়ে পড়ে রয়েছে। ইট দিয়ে ঢালু জায়গাটা উঁচু করে একটি তক্তা পাতা। সামনে আরেকটি তক্তায় বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম। ওই তক্তায় বসে মাথা নুইয়ে মেশিন দিয়ে নষ্ট এনার্জি বাল্বসহ যন্ত্রপাতি মেরামত করছিল ১২ কি ১৩ বছরের এক শিশু। ওর নাম হাবীব। প্রতিদিন এভাবে সে ২০০ থেকে ৩০০ নষ্ট বাল্ব মেরামত করে। সপ্তাহে শুক্রবার ছাড়া প্রতিদিন সকাল ১০টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত এভাবেই কাজ করে সে।

কাজের ব্যস্ততার মধ্যেই হাবীব জানাল, বাবা কলা বিক্রেতা। দুই ভাই, দুই বোন মা-বাবাসহ থাকে পাটুয়াটুলীতে ভাড়া বাসায়। হাবীব বলে, বাবার একার আয়ে সংসার চলে না। বাবাকে সহযোগিতা করতে ৫ বছর আগে এই দোকানে কাজে আসি। দোকানের মালিক রফিকের ভাগ্নে রাকিবের কাছে কাজ শিখতে ছয় মাস লাগে। সে সময় প্রতি মাসে ২ হাজার টাকা পেতাম। কাজ পুরোপুরি শেখায় প্রতি মাসে বেতন পাই ৭ হাজার টাকা। পুরো টাকা মায়ের হাতে দিই। বড় ভাই নদীর ওপারে এমব্রয়ডারির কাজ করে।

নষ্ট লাইট ঠিক করা প্রসঙ্গে হাবীব জানায়, নষ্ট বাল্বগুলো কোম্পানির কাছ থেকে আমার মালিক কিনে আনে। অন্য জায়গা থেকেও বাল্ব মেরামত করতে নিয়ে আসে। লাইটের ওয়াটের ওপর মজুরি নির্ভর করে।

রাজধানীর ওয়াইজঘাট, পাটুয়াটুলী, ইসলামপুর এসব এলাকা ঘুরে দেখা যায়, শুধু হাবীব নয়, এখানে নিম্ন আয়ের

পরিবারের শিশুরা ঝুঁকিপূর্ণ শিশুশ্রমের সঙ্গে যুক্ত।

আজ সোমবার বিশ্ব শিশুশ্রম প্রতিরোধ দিবস। এবারের প্রতিপাদ্য ‘শিশুর শিক্ষা ও সুরক্ষা নিশ্চিত করি, শিশুশ্রম বন্ধ করি।’

আন্তর্জাতিক শ্রম আইন সংস্থা (আইএলও) এবং জাতিসংঘের শিশু অধিকার সনদ অনুযায়ী, যখন কোনো শ্রম বা কর্ম পরিবেশ শিশুর জন্য দৈহিক, মানসিক, আধ্যাত্মিক, নৈতিক এবং সামাজিক বিকাশের ক্ষেত্রে অন্তরায় ও ক্ষতিকর হিসেবে গণ্য হবে, তখন তা শিশুশ্রম হিসেবে গণ্য হবে।

মুন কমপ্লেক্সের মার্কেটের আন্ডারগ্রাউন্ডে বাল্ব মেরামত করে রাজু নামে আরেক শিশু শ্রমিক। ব্যাটারি ঠিক আছে কি না চেক করে বাতিলগুলো এক কার্টনে ভালোগুলো আরেক কার্টনে রাখছিল। এরপর বাতিলগুলো লাইটে লাগিয়ে চার্জ দিচ্ছিল। ভ্যানচালক বাবা অভাবের কারণে ছেলেকে পঞ্চম শ্রেণির পর আর পড়াতে পারেনি। কাজে লাগিয়ে দেয়। চার ভাইবোন বাবা-মায়ের সঙ্গে পাটুয়াটুলীতে ভাড়া বাসায় থাকে। ১০ বছর বয়সে রাকিবের কাছে ইলেকট্রিক লাইট মেরামতের কাজ শেখে। চার বছর ধরে কাজ করছে এখানে। বেতন পায় ৮ হাজার টাকা।

রাজু বলল, চার বছর ধরে কাজ করছি। অকেজো ব্যাটারি, নষ্ট বাল্ব কোম্পানি থেকে কার্টনে করে নিয়ে আসা হয়। এগুলো যন্ত্রপাতি দিয়ে মেরামত করতে হয়।

অসাবধানতাবশত প্লাস, যন্ত্রপাতিতে হাত লেগে ঘটে যেতে পারে দুর্ঘটনা। দুর্ঘটনার কথা জেনেও পরিবারের খরচের কথা ভেবে ওরা ঝুঁকিপূর্ণ শিশুশ্রমে জড়িত রয়েছে। বাংলাদেশ শ্রম আইন ২০০৬ অনুসারে ‘শিশু’ অর্থ ১৪ বছর বয়স পূর্ণ করেনি এমন ব্যক্তি এবং ‘কিশোর’ অর্থ ১৪ বছর বয়স পূর্ণ করেছে এবং ১৮ বছর বয়স পূর্ণ করেনি এমন ব্যক্তি। জাতীয় শিশুশ্রম নিরসন নীতি ২০১০ অনুসারে শিশুদের আনুষ্ঠানিক কর্মক্ষেত্রে দেওয়া যাবে না। কিশোরদের ঝুঁকিপূর্ণ কাজে নিয়োগ দেওয়া যাবে না। ক্ষেত্রবিশেষে চিকিৎসকের কাছ থেকে শিশু-কিশোরদের সক্ষমতা সনদ নিয়ে শর্ত সাপেক্ষে হালকা কাজে নিয়োগ দেওয়া যাবে।

কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তরের ঢাকা জেলার উপমহাপরিদর্শক এ কে এম সালাউদ্দিন কালবেলাকে বলেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ২০২৫ সালের মধ্যে সব সেক্টরে শিশুশ্রম নিরসনে প্রকল্প গ্রহণ করেছেন। সে লক্ষ্যে সরকার অভিভাবক ও বিভিন্ন ঝুঁকিপূর্ণ কারখানার মালিকদের শিশুশ্রমের বিরুদ্ধে সচেতন করতে নানামুখী পদক্ষেপ নিয়েছে। এসব শ্রমজীবী শিশুকে স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনতে আইএলওর সঙ্গে সরকার কাজ করছে।

বাংলাদেশে ইউনিসেফের প্রতিনিধি শেলডন ইয়েট বলেন, শিশুশ্রম নির্মূলে ইউনিসেফ এবং সরকারের প্রচেষ্টা সত্ত্বেও আজও অনেক শিশু রয়েছে, যারা প্রায়ই বিপজ্জনক ঝুঁকিপূর্ণ কাজ করতে বাধ্য হয়। এ ক্ষেত্রে শিশুদের সুরক্ষায় যে আইনগুলো রয়েছে সেগুলোর যথাযথ প্রয়োগ নিশ্চিত করা প্রয়োজন। আমাদের অবশ্যই একটি শক্তিশালী সমাজসেবা কর্মী বাহিনীকে তৈরি করতে হবে, যা শিশুশ্রমে আটকে পড়া শিশুদের সাহায্য করতে পারবে। দারিদ্র্য এবং সুযোগের অভাবের মতো যে কারণগুলোর জন্য শিশুরা শিশুশ্রমে যুক্ত হয়ে থাকে, সে সমস্যাগুলোরও সমাধান প্রয়োজন। আমাদের গ্রাম পর্যায় পর্যন্ত বিস্তৃত একটি শক্তিশালী শিশু সুরক্ষা ব্যবস্থা দরকার, যাতে সমাজকর্মীরা সব শিশু, পিতামাতা এবং সম্প্রদায়ের সাথে কাজ করতে পারে।

বাংলাদেশ মেডিকেলের শিশু বিভাগের চিকিৎসক ডা. মুকতাফি সাবি বললেন, শিশুশ্রম আমাদের সমাজে গ্রহণযোগ্য না হলেও আমাদের দেশের শিশুরা বাধ্য হয়ে কাজ করছে।

কালবেলা অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

সিলেট বিমানবন্দরের উন্নয়ন কাজের গতি বাড়ানোর নির্দেশ মন্ত্রীর

বায়তুল মোকাররম এলাকায় মিটিং নিষিদ্ধের পাঁয়তারা সুখকর হবে না : চরমোনাই পীর

৬০ লাখ কর্মীকে বিদেশ পাঠাতে চায় সরকার

অফশোর গ্যাস উত্তোলনে বিদেশি বিনিয়োগ চান প্রধানমন্ত্রী

বাকস্বাধীনতা না থাকলে ভাষা থেকেও লাভ হয় না : আনোয়ারউল্লাহ চৌধুরী

‘ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে জ্বালানিতে অতিরিক্ত খরচ ১২ বিলিয়ন ডলার’

৪৫ এর কম এবং ৬৫ এর বেশি বয়সে ব্যাংকের এমডি পদ নয়

শাবিতে জাতীয় পরিসংখ্যান দিবস পালিত

বইমেলায় রাশিদুল হাসান বাচ্চুর ‘ওয়াকিং অন দি পাথ অব পোয়েট্রি’

শেষ সময়ে বইমেলার নিরাপত্তায় ঢিলেঢালা

১০

বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধির সিদ্ধান্ত বাতিল চান সাইফুল হক 

১১

জাবির দুই শিক্ষার্থীর বহিষ্কারাদেশ বাতিলের দাবি

১২

শিশু চুরির মামলায় দুই নারীর যাবজ্জীবন কারাদণ্ড

১৩

বিআরটিসি যেন আর পিছিয়ে না যায় : তাজুল ইসলাম

১৪

ঢাবির নাটমণ্ডলে মঞ্চায়িত হচ্ছে থিয়েটার বিভাগের নাটক ‘সিদ্ধান্ত’

১৫

টিআইবির ফেলোশিপ পেলেন সাংবাদিক সজিবুর রহমান

১৬

রংপুরে এরিক ও বিদিশার ওপর হামলার অভিযোগ

১৭

বইমেলার সময় বাড়ল

১৮

রিহ্যাব নির্বাচনে ব্যবসায়ী ঐক্য পরিষদের নিরঙ্কুশ জয়

১৯

৬ মাস বিশ্ববাজারে পেট্রোল বিক্রি করবে না রাশিয়া

২০
X