

‘সময় বদলায়, ঈদের স্মৃতি বদলায় না’
ঈদ বরাবরই আনন্দের অনাবিলতা। গ্রাম, মফস্বল কিংবা শহুরে আবহ— সবখানেই তার একই উজ্জ্বল উপস্থিতি। মিলেনিয়ালদের একজন হিসেবে ঈদের ছুটি, হৈহুল্লোড় আর মাতোয়ারা আনন্দের নির্যাস লুফে নিতে কখনোই কার্পণ্য ছিল না। স্কুলজীবনে ঈদের ছুটি তীব্রভাবে প্রতীক্ষিত থাকত। তবে শুধু স্কুল বন্ধ থাকার আনন্দ নয়, বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডার টানটাই ছিল বেশি। কারণ বাসায় থাকলেই আব্বু আম্মুর পড়ার চাপ অপেক্ষা করত। তাই স্কুল খোলা থাকলে বন্ধুদের সঙ্গে সময় কাটানোই ছিল সবচেয়ে বড় আনন্দ।
ঈদের আগের ছুটিগুলো বিশেষভাবে রঙিন হয়ে উঠত ক্রিকেটকে ঘিরে। ছুটি মানেই এলাকার এক ক্লাবের সঙ্গে আরেক ক্লাবের ম্যাচ ঠিক করা। কখনো কখনো একদিনেই সকালে আর বিকেলে দুটি ম্যাচ। সাধারণ সময়ে শুক্রবার ছাড়া এমনটা হতো না, কিন্তু ঈদের দীর্ঘ ছুটিতে ক্রিকেটের এই উন্মাদনা অন্য মাত্রা পেত।
নতুন জামা জুতার আনন্দও ছিল, তবে সেসব নিয়ে খুব বেশি মোহ ছিল না কখনো। ছোটবেলায় আত্মীয়স্বজনদের কাছ থেকে অনেক পোশাক উপহার পেতাম, কিন্তু আসল আনন্দটা ছিল অন্য জায়গায়। ঈদের নামাজ শেষে বন্ধুদের নিয়ে বাড়ি বাড়ি ঘুরে সেমাই নুডুলস খাওয়াতেই যেন তৃপ্তি মিলত সবচেয়ে বেশি।
বন্ধুদের সংখ্যাটাও ছিল বেশ বড়। প্রায় ২৪-২৫ জনের একটি দল, যারা দিনরাত একসঙ্গে কাটাতাম এক অদ্ভুত আত্মিক বন্ধনে। এখন সেই বন্ধুরাই কেউ বিসিএস ক্যাডার, কেউ প্রতিষ্ঠিত আইনজীবী, কেউ শিক্ষক, কেউ ব্যাংকার, কেউ রাজনীতিবিদ, আবার কেউ সফল ব্যবসায়ী।
আজও ঈদের ছুটিতে বাড়ি গেলে সেই পুরোনো বন্ধুদের কাছেই ফিরে যাই। দুই ঘণ্টার আড্ডাতেই যেন শৈশব কৈশোরের দিনগুলো আবার জীবন্ত হয়ে ওঠে। সময় বদলেছে, চেহারা বদলেছে, পেশা বদলেছে, কিন্তু সেই নির্মল অনুভূতিগুলো এখনো অমলিন।
তবে এখন আর আগের মতো দল বেঁধে ঘোরা হয় না। অথচ একসময় ঈদের বিকেল মানেই ছিল সবুজ মাঠে বসে প্রাণখোলা হাসি, কিংবা নদীর তীরে দীর্ঘ সময় কাটানো। মিহি বাতাসের আলিঙ্গনে গাওয়া হতো নচিকেতা, অঞ্জন বা সুমনের গান। কখনো বন্ধুদের অনুরোধে কবিতার দু একটি পংক্তি আবৃত্তি, কখনো ব্যর্থ প্রেমে কাতর বন্ধুকে সান্ত্বনা, আবার কখনো নতুন প্রেমে মত্ত কাউকে নিয়ে হালকা টিপ্পনী। সব মিলিয়ে ছিল এক অনন্য আবেগঘন সময়।
পড়াশোনায় ভালো ছাত্র হিসেবেই পরিচিত ছিলাম, আর বাবা মায়ের শাসনও ছিল বেশ কড়া। সন্ধ্যার আগেই বাড়ি ফিরতে হতো। তবে ঈদের সময়টাতে সেই নিয়মে কিছুটা শিথিলতা আসত। তবুও বাসায় ফিরলেই আব্বু আম্মুর গম্ভীর মুখ, আর আম্মুর অপেক্ষা করে থাকা খাবার। অথচ সারাদিন বন্ধুদের সঙ্গে এ বাড়ি ও বাড়ি খেয়ে পেট তখন ভরা।
স্কুল শেষে কলেজে ঢাকায় ভর্তি হই। তবুও ঈদ মানেই ছিল এলাকায় ফিরে যাওয়া, পরিবার আর বন্ধুদের কাছে। সারা বছর যোগাযোগ কিছুটা ফিকে হয়ে গেলেও ঈদকে কেন্দ্র করে সেই সম্পর্কগুলো আবার নতুন করে প্রাণ পেত। তাই ঈদের ছুটি ছিল এক ধরনের গভীর প্রতীক্ষার নাম। কলেজ বা বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে ছুটিতে বাড়ি ফিরেই কোনো মতে ব্যাগ রেখে ছুটে যেতাম বন্ধুদের আড্ডায়। কখনো স্কুলের মাঠে, কখনো এলাকার কোনো মিষ্টির দোকানের আড়াল করা পেছনের সারিতে। সেখানে লুকিয়ে সিগারেট ফোঁকা, ভয় একটাই যদি কোনো মুরুব্বির চোখে পড়ে।
বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে টিউশনি করতাম বেশ কয়েকটি। স্বাভাবিকভাবেই টিউশনের বেতনটা ঈদের সময় বড় এক প্রতীক্ষা হয়ে উঠত। নিজের উপার্জনের টাকায় পরিবারের জন্য কিছু কিনে নেওয়ার আনন্দটা ছিল ভীষণ ব্যাকুলতাময়। প্রায় প্রতি ঈদেই নিজের জন্য বাজেট রাখতাম চারশ টাকা। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রায় চার বছর একই ছিল সেই হিসাব। একশ টাকায় একটি টি শার্ট, আর তিনশ টাকায় একটি কাউবয় জিন্স বা গ্যাবার্ডিন প্যান্ট। খুব অল্প মনে হলেও এই সীমিত সুখটুকুই দারুণ প্রাণ জোগাত। আর বাবা আর ছোট ভাই বোনদের জন্য কিছু কিনে দেওয়ার ইচ্ছায় টিউশনির টাকা আব্বুর হাতে তুলে দেওয়ার যে গর্ব, সেটি ছিল অন্যরকম এক আনন্দ।
মাকে হারিয়েছিলাম কলেজে থাকতেই। মনে আছে, প্রতি ঈদের দিন ভোর বেলাতেই আব্বু ডেকে তুলতেন। ঘুম ভাঙতে আলস্য থাকত, কিন্তু দেখতাম আম্মু ভোর পাঁচটা থেকেই রান্নার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। আব্বুও তাড়া দিতেন উঠে গোসল করে নতুন পাঞ্জাবি পরে ঈদের নামাজে যাওয়ার জন্য। যদিও জামাত হতো আটটা বা সাড়ে আটটার দিকে, তবুও আব্বুর সেই ভোর থেকেই তাড়া দেওয়া আজও মনে পড়ে।
ঈদের আরেকটি দারুণ দিক ছিল এর অসাম্প্রদায়িকতা। ধর্মীয় আয়োজন হলেও এখানে সবার অংশগ্রহণ ছিল উন্মুক্ত। আমাদের বন্ধুদের অনেকেই ছিল ভিন্ন ধর্মের। তবুও ঈদের আনন্দে আমরা সবাই একসঙ্গে মেতে উঠতাম। বাসায় বিধর্মী বন্ধুদের জন্য আলাদা খাবারের আয়োজনও থাকত। আমাদের বাবা মায়েদের দেখতাম কতটা নির্মল ও উদার মানসিকতায় এই উচ্ছ্বাসগুলোকে ধারণ করতেন।
সময় পেরিয়েছে। আমাদের মিলেনিয়ালদের কেউ চল্লিশ পেরিয়েছে, কেউ চল্লিশ ছুঁইছুঁই। দায়িত্ব বদলেছে, পরিবার পরিজনের পরিধি বেড়েছে। অনেকে বিদায় নিয়েছে, আবার নতুন করে অনেকেই জীবনে যুক্ত হয়েছে।
এখনো ঈদে নিয়মমতো ছুটি হয়। কিন্তু আগের মতো সবাইকে একসঙ্গে পাওয়া যায় না। তবুও মাঝেমধ্যে স্মৃতিকাতরতা হৃদয়কে ভীষণভাবে নাড়া দেয়। জাগিয়ে তোলে সেই শৈশব, কৈশোর আর স্মৃতির সাদাকালো ফ্রেমে আটকে থাকা রঙিন অতীত।