

স্তব্ধতা
ডিসেম্বর, জেঁকে বসা কুয়াশারাত, কোলাহল কবরস্থ; কবরের সুনসান স্তব্ধতায় যেন ঘানি টানছি আমার গ্লানি ও দুরাশার।
দূরে, ওই দূরে, অজস্র চকিত শোভন স্থির হয়ে আছে কিংবা ঘানি টানছে তাদের কৃতকর্মের ফল, আমারই মতন; তাদের আড়ালে যে-সমস্ত ভোজবাজি দেখেছিল মহাকাল সেসমস্ত ভোজবাজিও আজ স্তব্ধতায় নাকাল।
ঘানিটানা হলে শেষ যতসব উড়ালদৃশ্য, মুখ হা করে আসা বেড়ালের শ্বাস নিখুঁত তরবারির কলাকৌশলে ফালি ফালি হলে চলে যাব চুম্বনের প্রহরে তোমার মায়াবী স্পর্শ থেকে দূরে আরেক স্তব্ধতায়।
কাছে কিংবা দূরে যেখানেই থাকো তোমার নাকফুল খুঁজে পাও আর না পাও অপাপবিদ্ধ অস্তিত্বের নেকাব পরে আমার স্তব্ধতা মুখরিত করো তোমার বুকের পাঁজরে।
টান
তুমি যখন চাঁদের মুখে দাঁড়িয়ে ফোটাচ্ছিলে শিস আমি তখন শহরের উপকণ্ঠে অন্ধ ভিক্ষুকের ভাণ্ডে পাচ্ছিলাম পাকস্থলীর ঘ্রাণ। আহা, আমার লোহালক্কড় জীবন! কষ্টের হাপরে আর কত পোড়াবে আমাকে?
ফিরে পাব কি সেই চৈত্রের দুপুর? দেবদাস পড়তে পড়তে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদব।
সেইসব শীতের রাত, সদ্যোজাত নক্ষত্রের হু হু কান্নার মতো হিমেল বাতাস; তবুও একাগ্রচিত্তে "সয়ফুলমুলুক-বদিউজ্জামাল” পুঁথিখানি পাঠ করতেন গফুর চাচা; লেপ-কাঁথা মুড়িয়ে পরির প্রেমকাহিনির মৌতাতে এতটাই বিভোল এতটাই বশীভূত বেড়ালের কান্নায় জিরাফের গলা নিচু হয়ে আসে তবুও ভুলে থাকতাম আমরা কে?
ভাল্লাগে না তোমার এ শহর!
ঘোড়দৌড় অসমাপ্ত রেখে ফিরে যেতে চাই সেই গ্রামে যেখানে আমার বাবা-মায়ের কবর। কবরের উপরে নেই কোনও এপিটাফ, নৈঃশব্দ্যের কাফেলায় ফেলে এসেছিলাম যেটুকু চোখের জল শোকের সংলাপ হয়ে আজও কথা বলে মৃতপ্রায় নক্ষত্রের সাথে, হেমন্তের সন্ধ্যায় অশ্বথের বুকে যে হাহাকার ওঠে তার সাথে, যে শাদা বক দলছুট হয়ে ঘন অন্ধকারে একাকী ফিরে আসে, ঝুপ করে বসে বেদনার অংসকূটে তার সাথে।
ভাঙনের শব্দ শুনে শুনে বৃহন্নলারা সতীত্ব গুঁজে রাখে যে নদীর ভাঁজে আবারও সেই নদীর তীব্র শিৎকার হতে চাই।
হাঁটু গেড়ে থাকা নাগরিক ছায়ার বিলাস, ঘুণপোকার ফুৎকার আমাকে ঠেলে দেয় জন্মভিটেয়। স্মৃতির জায়নামাজে বসে কে কাঁদতে চায় না, একটু? বলো, কে না চায়!
ঘূর্ণন থেমে যাওয়ার আগে
ঘুরছে পৃথিবী, ঘুরছি তুমি আর আমি পৃথিবী হয়তো থামবে না থেমে যাব তুমি আর আমি।
তার আগে এসো দরজা-জানালা খুলি; প্রাণখুলে দেখি সূর্যমুখীদের উপর বয়ে যাওয়া মৃদু ঝড় কাপড় শুকানোর আড়াআড়ি বাঁশে দোয়েলের পুচ্ছনাচ তালগাছে বাবুই পাখিদের বাসার আয়োজন, এবং সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসার আগে আগে কুকুরীয় সঙ্গম।
অন্ধকারে শেয়ালের জ্বলজ্বলে চোখ, বারান্দায় দাদুর হুঁকোটানা, মধ্যরাতে আলেয়ার আলো, বড়োদার কবোষ্ণ ফিসফিসানি, পেটিকোট খুলতে পারঙ্গম বউদির বেলোয়ারি চুড়ির ঝনঝনানি।
স্থল ও জলপথ আমাদের হবে না বাধা, হবে না আকাশপথ। চলে যাব অনেক দূরে, বেগুনি বর্ণের মানুষদের নগরে ; তোমার শরীরের ঘ্রাণ পেয়ে জেগে উঠবে দ্বারপাল, খানিকক্ষণ থমথমে থেকে সান্দ্রস্বরে বলবে, সুস্বাগতম!
অতঃপর, ঘুরে ঘুরে দেখব হাঁসমুখো জাহাজের দেয়ালচিত্র, বাইশটি ব্যঞ্জনবর্ণের বর্ণমালা; চোখ আরামের এসব দৃশ্য মসলার ঘ্রাণের মতো লেগে থাকবে আমাদের স্মৃতির ভেতর।
তারপর ধূসর রঙের বাস্তুঘুঘুর ডাকে ভোরের কুয়াশার ভেতর চরের মতো জেগে উঠব আমরা।
ঘূর্ণন থেমে যাওয়ার আগে চলো হাত ধরাধরি করে একটু হাঁটি; যেখানে মানুষের হৃদয় হাঁস-ফাঁস করে মরুভূমিরমতো।
অবহেলা
আমাকে সম্মান জানানোর দরকার নেই তোমাদের অবহেলা সযতেœ লালন করি বুকে; যেটুকু রক্তক্ষরণ হয়, তা ঢেকে রাখি টিস্যু পেপারে। আমার ভেতরে বসবাস করে তেলাপোকা বাঘ হয়ে হালুম-হুলুম করার ইচ্ছে নেই আমার; মাথা নিচু করে হেঁটে যেতে চাই কোলাহলের বাইরে। যদি আকাশ দেখার বারান্দা কেড়ে নিতে চাও, নাও আকাশ আর দেখব না;
গুবরে পোকার মতো গোবরেই পড়ে থাকব। আমার পদধ্বনি শুনতে কেউ দাঁড়ায় না জানালার পাশে কোনও যুবতি রাগ করে কোমরে বাঁধে না তার আঁচল; আমি তো রয়েই গেছি তাদের চোখের আড়ালে। খোয়াবের দরজাগুলো ভেঙে পড়ে বারবার আগলে রাখি না বলে;
আমার দুঃখ ভারাক্রান্ত চাঁদ কখনোই ডোবে না। বন্ধুরা, আমি পাহোম হতে আসিনি এসেছি বিষাদের স্তন চুষে চুষে খেতে; তারপর দেহহীন নদীতে ভাসব দেহহীন এই আমি।
কলিংবেল
কলিংবেলের বোতাম সংরক্ষণ করে না তোমার আঙুলের ছাপ পুলিশি তদন্তের ভয় নেই তবুও বোতাম চাপতে কেন অচেনা শঙ্কা? কেন দ্বিধা থরোথরো? কেন, লজ্জার পোশাক আঁটোসাটো হয়ে তোমাকে শ্বাসরোধ করছে? কেন, তোমার দমবন্ধ কণ্ঠে মরুভূমির লু হাওয়া? কেন, তোমার অস্থিরতার পালতোলা ডিঙি ওলটপালট খাচ্ছে? তার মানে যার সঙ্গে এই প্রথম দেখা করতে এসেছ দূর থেকে নিশ্চয় দিবারাত্রি গভীর মগ্ন ছিলে তার কল্পনা ও ধ্যানে ; যেমন সমুদ্রপৃষ্ঠ মগ্ন থাকে সুদূরতম চন্দ্রপ্রেমে।