

মৃত তারা
খুব ভালো, তুমি এসেছ বহুদিন পর।
যেন দেখলাম একটা জলাশয়; বাঁশপাতা নৌকার মতো দুলছে অবিরাম অন্তহীন, কেন্দ্রীভূত সুবিস্তীর্ণ মেঘখণ্ডে।
বহুকাল আগে রূপ দেখে খণ্ড-খণ্ড হয়েছি, বাঁচার চেষ্টা করছি সহজ করে, বক্রস্রোতের সাথে মিশে যেতে যেতে... মিশতে মিশতে ঘুমিয়ে গিয়েছিলাম।
দুপুরে অদ্ভুত গান। তুমি আর আমি... কেমন বিচিত্র টানাপোড়েনে প্রিয় কৃষি ডুবে যায়, ডুবে যাচ্ছে আজ...
ধূসর চুলের মধ্যে ফুল দিয়ে তপ্ত দাহ করি দুপুর, অদ্ভুত গান ভেসে আসে তোমার দেহ থেকে বেরিয়ে। গান উড়ে অনাদি মহাবিশ্বে। আদি-ভূত এসে রক্তবীজের মধ্যে চন্দ্র অভিযান চালিয়ে যেতে থাকে...
তারার ভেতরে, রক্তের ভেতরে, মাংসের ভেতরে।
তারার আগুনে পুড়ে নিশ্চিহ্ন হয়ে বসে আছি তুমি আর আমি—
দুটি মৃত তারা।
লাজুক মৃগেল
ফিরে আসে বীজের ঐক্য, দেহহীন সেচ— দিকে দিকে ছড়িয়ে পড়ে ফেটে যাওয়া ফলের বীজের মতো অগুনতি চোখ।
কতিপয় বন্ধ হাতে দেখা যায় আলো, বিভিন্ন আগুনের ধোঁয়া মিলিয়ে যাচ্ছে বিব্রত অন্ধকারে; দূরে দূরে ভস্ম ছড়িয়ে পড়ছে সন্ধ্যার বিমূর্ত বাতাসে।
যে বাতাস সুপারি গাছের ওই উঁচু ডালে গুমরে গুমরে কাঁদে, সেসব গান ভেসে আসে আজ; সাপ ও স্রোত গড়িয়ে যায় সুরের ভেতরে, কুকুরগুলো বিলাপ করে আমাদের অস্তিত্বের বিরান উঠানে।
সেসব অনন্ত মুহূর্তগুলো চোখে দ্যাখো— চাঁদ-লেখা ভুল পত্র, প্রত্যাখ্যান— পাঠ করো লাজুক মৃগেলের হাসি, তার খলবল, তার গমনের বৃষ্টি।
ক্লান্ত হওয়ার আগে, মরে যাওয়ার আগে— এই বিমূর্ত সন্ধ্যায় পাঠ করো লাজুক মৃগেল।
ওই যে লাজুক মৃগেল— ঘাই দিয়ে ডুবে গেল পরানের গহীন ভেতরে।
একক উৎস থেকে হাঁটছি
একক উৎস থেকে হাঁটছি রাস্তায় আমরা, এই মৃত পথে পথে... কল্পজগতের বিশাল বিশাল পাথরের সাথে। রাত হলে পথে গজিয়ে উঠেছে রাজ্যের আগাছা আর অজ্ঞানের সবটুকু চরিত্রের ভাস্কর্য।
সংগ্রহ করি উচ্চারণ শব্দ-স্ফটিক প্রতিসাম্য করি এবং অভিকর্ষ করি অজ্ঞানের সবটুকু চরিত্রের ভাস্কর্যের সাথে।
ভদ্র প্রকৃতির সাথে পুরোপুরি একমত হতে পারি না; তবু তুমি—এই রকম হস্তক্ষেপের অধিকার নেই বলে— পৃথিবীর সবচেয়ে বড় আশা করে গিয়েছিলে ঈশ্বরের মনোযোগ আকৃষ্ট করার জন্য।
যেহেতু খাঁটি কবিতা আর প্রার্থনা উপেক্ষিত; যুগের অবসানে যখন নগ্ন মানুষ প্রকৃতির সাথে পুরোপুরি একমত— তবু, তুমি চলে যাবে উঁচু মিনারে, প্রতীকে মাথা রেখে। যাও তবে, উঁচু গাছগুলোতে দরদ প্রকাশ করো; গবেষকগণ যেন বুঝতে না পারে কোন্ সৌর কল্পনা।
শুকনো পাতার নৌকো
শুকনো পাতার নৌকোখানি ভাসে জলের ওপরে হিজলের নতমুখী ঠান্ডা ছায়া মাঘের শীতের প্রলুব্ধ ইশারা দিয়ে নিয়ে আসে ছায়ার সান্নিধ্য বাতাস আদরে কেঁপে চুমু খায় ভোরের পুকুরে।
এখন শহরে তীব্র যানজটে বিরক্তির ঘামে নৌকোয় উঠিয়া বসি, নৌকো চলে মনের নদীতে জলপোকা খেলা করে, পাতিহাঁস পোহায় রোদ্দুর আমের বোলের গন্ধ উড়ে আসে বিরান আত্মায়।
পরক্ষণে কার্বনের কালো ধোঁয়া বসায় ছোবল আচমকা চেয়ে দেখি অজগর ঘুমায় রাস্তায় নৌকো কই? জলপোকা? পুকুরের জল নাই শুধু মাইল মাইল দীর্ঘ বাহনের জটিল জঙ্গল!
পুকুর গিয়েছে ডুবে শহরের ভিড়ের সমুদ্রে সব কিছু যাচ্ছে ডুবে ঠান্ডা ছায়া রঙিন শৈশব শুধু আমি আছি ভেসে, মনে মনে মনের পুকুরে ভিড়ে বসে ঘুরি আমি অহরহ স্মৃতির মেরাজে।
ঐন্দ্রজালিক হাওয়া
এগিয়ে দিলাম দুটো চোখ বন্ধ করে দিগন্ত-স্রোতের কাছে; সেখানে আসে সাপ, আর ভালোবাসা মরে যায় গগনতলে।
প্রেমের মতো বন্ধ হয়ে আত্মার অভয়ারণ্যে— ঘুরে ঘুরে দেখা হবে উচ্চারণ;
অবহেলার শব্দ আর গল্পগুলো কীভাবে হরফে আছে গেঁথে। ফলের পোকার মতো মহৎ হৃদয় থেকে বেরিয়ে কথা-পাখিদের গান শুনে দেখি, সরল— অথচ কী ব্যঞ্জনায় বসে আছে নীরবতা!
দাগ দিতে দিতে দৈব হাওয়ায় উড়তে থাকে নৌকা থেকে দগ্ধ আফসোস। আলতো ছুঁয়ে অজানা কারণে জলজ উদ্ভিদে ছেয়ে আছে রাতগুলো;
আহত স্বপ্নগুলো বিকেলের এই মৃত হাওয়ায় বিরহ-গীতের মতো কাঁপছে তিরতির। শেষ হয়ে আসা ঝিঁঝির গীত চত্বরে এসে একটা লজিক বানিয়ে আঁকে তটরেখা;
অস্ত যাওয়া সূর্যের আলোয় মর্মরিত হচ্ছে মহাবিশ্বের বিবিধ ঐন্দ্রজালিক হাওয়া।