জিল্লুর রহমান শুভ্র
প্রকাশ : ২৩ মার্চ ২০২৬, ০৯:২০ পিএম
অনলাইন সংস্করণ

জিল্লুর রহমান শুভ্রর ৭টি প্রেমের কবিতা

জিল্লুর রহমান শুভ্র। ছবি : সংগৃহীত
জিল্লুর রহমান শুভ্র। ছবি : সংগৃহীত

চারুতা

ওগো চারুতা! যেতে পারো না তুমি গন্ধবণিকের বাতাসে। দাঁড়াও খোলা আকাশে। কথা শোনো! যদি ভিজতে চাও আমি সন্ধ্যার বৃষ্টি হব, বুকের জমিন জলকাদায় ভরাব। তুমি যদি মেঘ ছুঁতে চাও আকাশের সিঁড়ি হব। যদি ছায়া প্রহরের গান হতে চাও আমি তার সুর হব। তুমি যদি ঝর্ণাধারা হতে চাও অসম্ভবকে ঘুম পাড়িয়ে চাঁদহীন আকাশের জোছনা হব। যদি জয়ী হতে চাও ছাপোষা মানুষের মতো আমি হেরে যাব বারবার। তুমি যদি আমার হও বসন্ত বাতাস হয়ে সিঁথিতে বিলি কাটব, ঝুম অন্ধকার হয়ে পায়ে চুমু খাব; আর শপথ করে বলছি 'আমি' বলে কিছু নেই তোমাতেই বিলীন হব। তুমি যদি কবিতার চাষবাস করো, কবিতায় বসবাস করো, আবুল হাসানের 'কবিতা সমগ্র’এনে দেব। রাত জেগে বের করো একটি শব্দ ‘ভালোবাসি’; অতঃপর উৎকীর্ণ করো হৃদয়ের দেয়ালে। এ পৃথিবীর কোথাও যাব না আর, নক্ষত্রে নক্ষত্রে জ্বালাব না আগুন কোনও বনলতা সেনের খোঁজে। তোমার ছায়া হয়ে লেবুপাতার মতো ‘ভালোবাসি’র ঘ্রাণ নেব, চারপাশ ঘুরে ঘুরে।

মেয়ে

মেয়ে, তুমি কোথায় যাও? এই অতিপ্রাকৃত সন্ধ্যায়। কালশিটে আকাশ, ঝিমধরা উপবন, নিশ্চল বাতাস তাদের জাদুময় দরজা খুলে রেখেছে, কেমন যেন ভয় ভয় করে! কীসের টানে, কার টানে তুমি এত উতলা? করাতের শব্দ থেমে গেছে, তবু অদ্ভূত সাজের দুর্জন করাতিরা ফিসফাস করছিল শিবলিঙ্গ ঘিরে। তবে কী আজ ডাইনিরা রুদ্রাক্ষের মালা হাতে তন্ত্রেমন্ত্রে বসবে? তবে কী সম্মোহনী-উচ্চাটনী-আকর্ষণী ক্রিয়ার ডমরু বাজবে? আলোর তীরন্দাজ কী পথ হারাবে ডাইনিদের ফাঁদে? ভেসে আসছে বোবা পাহাড়ের চাপাকান্না! প্রপঞ্চিত বালিয়াড়ির পথ ধরে হেঁটে যাচ্ছে রক্তের পানপাত্র হাতে নিষ্ঠুর পিশাচের দল! জেগে উঠছে হিংস্র সরীসৃপদের ঘুমন্ত ফসিল! কুৎসিত আঁধারের বুকে লাটিমের মতো বোঁ বোঁ ঘুরছে রাহু চণ্ডালের হাড়! দগদগে ঘায়ের মতো বীভৎস ভয়; গা ছমছম করে! ওইদিকে যেও না তুমি। উদ্ভিন্নযৌবনা মেয়ে, কী গভীর তিতিক্ষা তোমার উদ্বাস্তু মনে? শুনল না কথা। এগিয়ে গেল হন্তারক মায়ার টানে; অশরীরী ফুলের ঘ্রাণ নিতে। অতঃপর আতঙ্কের বিষধর সাপ হিস্ হিস্ করে উঠল শকুনদের দরজায়! নদী ফুঁসে উঠল ভয়ঙ্কর! ত্রস্ত চাউনির নক্ষত্ররা ঢোক গিলল ভয়ে, আর নপুংশক কালপুরুষ ছোটাছুটি করল উদভ্রান্ত হয়ে! অলক্ষণা মেয়ে, গেরস্থালী সুখ বিবর্ণ করে তোমার ভুলের প্রাসাদ থেকে বিষাদের ঝরাপাতা নিয়ে এল বেদনার নীল কাব্য, এবং হিম শীতল শূন্যতা। হায়, তবে কী ভালোবাসা ব্যাধির মতন? নিজের হৃৎপিণ্ড নিজেই খেয়ে ফেলে।

নদী ও চাঁদ

কী জানি বাপু নদী নাকি পরকীয়া করে চাঁদের সাথে! ভ্রষ্ট আলোয় মাছখেকো উদ্বিড়াল ‘উঁকি দেয়ার বদঅভ্যাস’ ছাড়েনি তখনও। সঙ্গমের বেলফুল গন্ধ ছড়ানোর আগেই খবরটা চাউর করে দেহাতি সন্ধ্যা উঁইপোকাদের বিশ্রাম ঘরে।

ষড়যন্ত্রের আলখেল্লা পরা যমজ তারারা আঙুল তুলেছিল নদীর দিকে; তখন উদভ্রান্ত ও ভ্রমাসক্ত চাঁদকে মাৎসর্যের মন্ত্রজল ঢেলে কোনও এক উটকপালি ডাইনি নিয়েছিল বেতাল অন্ধকারে।

কুচক্রীদের উপহাসের উদ্দণ্ড নৃত্য নদীকেই ঘিরে। কী এক গভীর বেদনার কোরক তার বুকে! আপন মুদ্রাদোষে চাঁদকে সে-ই বলেছিল তার গভীর গোপন জীবনোপাখ্যান এবং ভালোবাসার ভেষজ গুণ। তবে কী সেটাই তার কাল? কালান্তক ঝড়?

এখনও কী সে সুদূরেই রয়ে যাবে? ভেংচি কাটা প্রহরে ভালোবাসার ডুমুর হাতে দাঁড়াবে না কী আর তার অপেক্ষার দরজায়? আঙুল ফোটাতে ফোটাতে বলবে না কী আর মন্দ্রভাষে, দরজা খোলো, প্লিজ!

অতঃপর বর্গীর মতো ঝাঁপিয়ে পড়ে আর কেড়ে নেবে না কী তার মদির মন! আগ বাড়িয়ে কামশাস্ত্রের ছলাকলা শেখাবে না কী আর! পরমানন্দে নাচবে না কী আর তা থৈ তা থৈ!

অনিকেত আঁধারে চাঁদের পানে চেয়ে নদী সুদূর অতীত থেকে ভেসে আসা বিষণœতার ভৈরবী গান শোনে, একাকিত্বের কুঠারে ক্ষতবিক্ষত হয়; অতঃপর শ্রান্ত পাখিরা যখন ঘুমের কফিনে, নিশাচররা গন্দমের খোঁজে, নদী তখন নিজেকে সঁপে দেয় ভাটির টানে; মায়াজাল ছিন্ন করে।

প্রেম বিভ্রম

তেঁতুল বনে ফাগুনের আগুন! ঝিরঝির বাতাসে খোলা জানলা দিয়ে আবার যদি প্রথম প্রেম কখনও ফিরে আসে চানঘরে বসে দেবতাকে বলব তুমি হেরে গেছ মানুষের কাছে। চোখের নিচে কালি হয়ে, বেদনার যত কাব্যই জমে থাক, যদি ফিরে আসো বেদনাকে বলব- তুমি চলে যাও প্রস্তর যুগে, ভেলায় ভেসে ডাকিনীদের দেশে, বিলুপ্ত নগরীর অন্ধ হস্তীদের পানশালায়। তোমার চোখে ছিল শতদল আমার চোখে হয়ত আগুন আমার চোখে ছিল শতদল তোমার চোখে হয়ত আগুন আমাদের না বলা ভাষাগুলো যে আগুনেই পুড়ছে, পুড়ুক না! হয়ত গণ্ডগোল ছিল প্রেমের ধারাপাতে, তাতে কী! শোনো পিকাসোর রহস্যময়ী মেয়ে যদি আবার ফিরে আসো বিমূর্ত ক্যানভাসে, নিগ্রো রমণীর ট্যাটুতে, কলাবতীর সিঁথির সিঁদুরে, ফর্সা মেয়ের আলতা পায়ে এবং ধাপে ধাপে নেমে যাওয়া সিঁড়ি ঘাটে, জ্যোছনা রাতে। কথাটা সেকেলে তবুও মাইরি বলছি, তেত্রিশ কোটি দেবতার গ্রাস কেড়ে নেব আমি! ভেঙে তছনছ করব অহঙ্কারী মেঘেদের সিংহাসন, আর পৃথিবীর সমস্ত বাগান থেকে গোলাপ এনে দেব তোমার হাতে! অভিমানী অতীত হাওয়ায় ভেসে ওঠা আমার অভিমানী অতীত তোমাকে আর ছুঁতে পারছি না। ভেসে যাচ্ছ গ্যাসীয় বেলুনের মতো দূরে বহুদূরে এক দ্রাঘিমা থেকে আরেক দ্রাঘিমায়। আমাদের ঘুঘুডাকা গ্রাম, ক্রন্দসী নদী, চাতরা বিল, এবং ধুলাউড়ি হাট সূর্য ও ছায়াদের সঙ্গমে অনেক আগেই ধূসর লোমশ ভেড়াদের সাথে পথ হারিয়েছে ধূলোর সাগরে। শীতল পাটির মায়াবী আদর নকশিকাঁথায় অশ্বখুরা ছেঁড়া পাতায় দুয়োরানী হারিকেনের আলোয় পুঁথিপাঠ প্রাচীন মুদ্রায় বৃদ্ধ জরথুস্ত্র আলেক্সান্ডারের সাহসী ঘোড়া এই সমস্ত রত্ন স্মৃতির জাদুঘর থেকে বেমালুম উধাও। বিবস্ত্র অন্ধকারে হয়ত এসেছিল যান্ত্রিক তস্করের দল। হে অভিমানী অতীত ফিরিয়ে দাও স্বচ্ছ জলের আয়নায় দেখা মায়ের কম্পিত মুখ, ঈথারে বন্দি তার বিশ্রম্ভালাপ । ফিরিয়ে দাও সেনপাড়ার বলাইকে, যে সাত সকালে আমাদের ঘুম ভাঙাত- ’মুড়ি নেবে মুড়ি? গরম গরম মুড়ি?’ ফিরিয়ে দাও চক আলমের হ্যাদাম আলি, যে গলা ভারী করে বলত- ‘এই রস! খেঁজুরের রস, টাটকা রস!’ হে অভিমানী অতীত আদালত মানিনা নিঃশর্তে ফিরিয়ে দাও আমার শৈশবের কোলাহল বড়দের মিথ্যে আশ্বাস নিঝুম রাতের পিশাচিনীর ঘুঙুর, বয়ঃসন্ধি শেয়ালের কামজ চিৎকার, আর কলাপাতায় শিরনি খাওয়ার সুসারিত ঘ্রাণ। আর কোনোদিন কী দেখতে পাব লুকিয়ে লুকিয়ে রজঃস্বলা মেয়ের রক্তমাখা গোপন কাপড় এবং বয়োবৃদ্ধ বটের সবুজ জানালা দিয়ে ঈশ্বরের জ্যোছনাস্নান? হয়ত পাব না! বিবর্ণ সময়ের অভিঘাতে বড় বেশি অভিমানী আমি চূর্ণ-বিচূর্ণ উৎপীড়ক হতাশায়, মূঢ় নিঃসঙ্গতায়।

চেতনায় যখন দীর্ঘশ্বাস

এসো খেলা করি বায়োস্কোপের ঘোড়া দূরবিনে দেখি ভুলের চাঁদ; একদা যে ছিল হৃদয়ের গভীর গোপনে এবং বাড়িয়েছিল তার হাত কেন হাতছাড়া হলো তার নাকফুল কেন ডুবল সে সমুদ্র মন্থনে? সময়ের প্রহরীরা কি গিয়েছিল পানশালায়? তারা পান করেছিল কি একটু বেশি? তারা কি যুবতি বাঘিনীর তাড়া খেয়ে ছিল উদভ্রান্ত? কোথাও ভেসে ওঠেনি তার লাশ তবে কী বিভ্রম সনাতনী ঢংয়ে আমাকে করেছিল পরিহাস! যখনই গিয়েছি অন্ধকারে দেখেছি সর্বনাশ! কোনও এক চাঁদ সওদাগরের সাথে শুনেছি ফিসফাস। চেনা নক্ষত্ররা ঢেকে রেখেছিল মুখ জোনাকিরাও নিভিয়েছিল তাদের আলো। জানি না কোন ভুলে আমার রক্তে শুধুই দীর্ঘশ্বাস।

বিষাদ

প্রাচীন গুহার ভেতর কানকাটা ভ্যানগগ আমাকে করেছিল তেমন্তন্ন। ছিল বনমোরগের ঝলসানো মাংস, রুটি ও মদ। গুহাচিত্রে কীভাবে চমরীগাইয়ের জরায়ূ আঁকতে হয়, শেখাতে চেয়েছিল।

চরে আটকে যায় নৌকা; এক বিষণ্ণ কলাবতী হেঁটে হেঁটে আসে গুহার ভেতর; তার চোখে ছিল পুরুষের প্রতি ক্ষমাহীন ঘৃণা। অথচ তার মন পেতে আমরা দুজনেই তৎপর; সে আঁকে তার ছবি, আমি লিখি কবিতা। প্রেমের অমীমাংসিত সূত্রে দুজনেরই অভিনিবেশ; সে করে চিত্রে আমি করি কবিত্বে। সে করে বহুবিধ রঙের খেলা আর আমি নক্ষত্র থেকে চুরি করি চিত্রকল্পের ভেলা।

প্রবল প্লাবনে হারিয়ে গেছে মেগালিথিক সভ্যতা; টুকরা-টাকরা যা রয়ে গেছে তা এখনও পৃথিবীর হৃদয়ে লুকোচুরি খেলে জ্যামিতিক বিস্ময়ে। আর, কলাবতী, আমাদের তুমুল ঝগড়ার প্লাবনে হঠাৎ উধাও। তার শূন্যতার অপার বেদনার গভীর বিস্ময় গুহার ভেতর ফিসফিস করে প্রতিধ্বনির মতো।

ফুরিয়ে আসে মাংস, রুটি ও মদ ফুরিয়ে আসে বোঝাপড়া। তবুও সে আঁকে ছবি, আমি লিখি কবিতা। দুজনের মধ্যে আশ্চর্যজনক মিল; তার ছবিতে শুধুই বিষাদের রং আমার কবিতায়ও তাই।

কালবেলা অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন
  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

বিচারককে হাইকোর্টে তলব / হবিগঞ্জে ৫ বছরেও শেষ হয়নি ‘ধর্ষণ ও হত্যা’ মামলার বিচার

নকল ও ভেজাল খাদ্যের বিরুদ্ধে অভিযান অপ্রতুল : বিএসটিআইকে ক্যাব

ইরান ও হুথিদের পদক্ষেপের প্রশংসায় হিজবুল্লাহ

মিরপুরে বৃষ্টির হানা, খেলা না হলে কে জিতবে?

শেষ ম্যাচে তারকাবহুল দল নিয়ে নামছে আর্জেন্টিনা

ইসরায়েলি হামলায় লেবাননে নিহত বেড়ে ৩,৬৬৬

স্থায়ী যুদ্ধক্ষেত্রে পরিণত হচ্ছে লেবানন

বাজেটে বেতন নিয়ে সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য সুখবর

রাজশাহীতে বাড়ছে ডেঙ্গু উদ্বেগ

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অধীনে চাকরি, এসএসসি পাসেই আবেদন

১০

চার খাতে অতিরিক্ত ৪২৬০০ কোটি টাকা ভর্তুকির চাপ : অর্থমন্ত্রী

১১

তাপপ্রবাহ নিয়ে নতুন বার্তা

১২

তিন নতুন জিরো : ইউনূস সরকারের তিক্ত প্রাপ্তি

১৩

অভিজ্ঞতা ছাড়াই সিটি ব্যাংকে চাকরি, আবেদন অনলাইনে

১৪

ইনজুরিতে বিশ্বকাপ শেষ এক ডাচ ডিফেন্ডারের

১৫

ডিজিটাল মাধ্যমেও নারী-শিশুরা নিরাপদ নয় : নিপুণ রায় 

১৬

বকেয়া পৌরকরে ১৫ শতাংশ সারচার্জ মওকুফের ঘোষণা ডিএসসিসি প্রশাসকের

১৭

উত্তরা মটরসে চাকরি, বেতন ৪০ হাজার টাকা

১৮

অভিজ্ঞতা ছাড়াই ২০ জনকে নিয়োগ দেবে মিনিস্টার, এখনই আবেদন করুন

১৯

১১ রানে হারল বাংলাদেশ

২০
X